নির্বাচনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 24.01.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

নির্বাচনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা

ইউরোপের দেশগুলোতে টেরই পাওয়া যায় না যে ভোট হচ্ছে৷ কেমন নির্বিষ৷ একদিক থেকে ভালো৷ ঝামেলা নেই৷ কিন্তু যে মানুষ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ভোটের রোমাঞ্চের স্বাদ নিয়েছে, তার চাওয়া কি এতে মেটে?

সাংবাদিক হিসেবে নির্বাচন বরাবরই আমার কাছে সবচেয়ে পছন্দের ইভেন্ট৷ বিশেষ করে বাংলাদেশে যেভাবে উৎসবের মতো নির্বাচনে অংশ নেন মানুষ, তাতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোট ও ভোটের ফল প্রকাশ পর্যন্ত রোমাঞ্চ অনুভূত হয়৷ কখনো তিস্তা, কখনো রূপসার পাড়ে, কখনো দাগনভূঁইয়ার অখ্যাত জনপদে, সিলেটের সীমান্তবর্তী কোনো ভোটকেন্দ্রে কিংবা দক্ষিণের পাহাড়ি জনপদে, উত্তেজনার কমতি নেই৷ কখনো উপজেলা নির্বাচন, কখনো উপ-নির্বাচন, কখনো জাতীয় নির্বাচন বা কখনো সিটি করপোরেশন নির্বাচন৷ তবে উত্তেজনার পাল্লায় মাপলে কোনোটিই জাতীয় নির্বাচনের পর্যায়ে পড়ে না৷ জাতীয় নির্বাচন একটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার৷

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন কাভার করতে আমি ছিলাম খুলনায়৷ তখন বাংলাভিশনে কাজ করি৷ ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন৷ পরিকল্পনা ছিল খুলনা শহরে একটি অস্থায়ী স্টুডিও করা৷ সেখান থেকে প্রতিদিন একটি করে স্টোরি ফাইল করা এবং স্টুডিও থেকে সন্ধ্যায় লাইভে যোগ দেয়া৷ কখনো কখনো এই স্টুডিও থেকেই লাইভ খবর প্রচার করা৷ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ৷ খুব ছোট্ট একটা টিম নিয়ে ভোটের ১০-১২ দিন আগে পৌঁছলাম৷ এরপর শুরু হলো ঘোড়দৌড়৷ প্রথম এক দুইদিন লেগে গেল ঘর বাছাই করে একে স্টুডিওর জন্য তৈরি করতে৷ এরপর শুরু হলো খবরের পেছনে ছোটা৷ ভোর সাতটায় পরিপাটি হয়ে বের হতাম৷ নাশতায় দু'টো পরোটা সঙ্গে ভাজি, ডিম বা মাংস আর এক কাপ চা কোনোমতে পেটে পুরে ভোঁ দৌঁড়৷ রূপসা নদীর এপার ওপার ঘুরে কখনো চরমপন্থা নিয়ে প্রতিবেদন, কখনো খালিশপুরের শ্রমিকদের কথা শোনা, কখনো নদীতীরের নারীদের কথা, শহুরে তরুণদের ভাবনাগুলো বোঝার চেষ্টা করা কিংবা ভোটব্যাংকের হিসেব নিকেষ কষা৷ মনে পড়ে, চারদলীয় জোটের এক প্রার্থী মিয়া গোলাম পরোয়ারের পিছু নিতে নিতে গা ছমছমে এক জায়গায় চলে গিয়েছিলাম৷  ফুলতলা বলে একটি জায়গা আছে৷ সেখানে যাওয়ার পথে পড়ে জায়গাটি৷ 

Bangladesch | Wahlen | Talkshow

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

যাই হোক সবকিছু শেষে বিকেলে এসে প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠাতাম ঢাকায়৷ সন্ধ্যা সাতটার খবরে প্রচার হতো এবং একইসঙ্গে লাইভে যোগ দিতাম৷ এরপর স্টোরি আপডেট করার থাকলে সেটি করে আবার রাত দশটার সংবাদে লাইভ করে, কখনো রাতের টকশোতে যোগ দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে পৌঁছাতাম ১২টার দিকে৷ দিনের হিসেব নিকেষ করে পরের দিনের পরিকল্পনা গুছিয়ে কয়েকটি টেলিভিশনের সংবাদ দেখে ঘুমোতে যেতাম রাত দু'টোর পর৷ পরদিন আবার সকাল সাতটা থেকে শুরু হত দৌড়৷ একদিন নয়, দু'দিন নয় ২৯ তারিখ পর্যন্ত চলতে থাকে৷ মজার বিষয় হলো খরচের হিসেবগুলোও আমাকে করতে হত, যেটা আমার কাছে বাড়তি কাজ মনে হতো৷ তাই পরে আর কখনো সে দায়িত্ব নেইনি আমি৷

ফল ঘোষণা করার দিনটির কথা মনে পড়ে৷ খুলনার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে আমরা৷ সেখানে একের পর এক ফলাফল ঘোষণা দেয়া হচ্ছে৷ কিন্তু রাত গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ খুলনা-২ আসনের ফলাফল দেয়া হচ্ছে না৷ বাইরে চলছে নাটক৷ কখনো বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কখনো আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে মিছিল হচ্ছে৷ শেষ পর্যন্ত ফলাফল এলো ভোরে৷ মনে আছে, ঢাকার স্টুডিওতে কেউ ছিল না৷ ঘুম থেকে উঠে এসে বার্তা সম্পাদক বায়েজিদ মিল্কি ভাই স্টুডিওতে এসে লাইভ করলেন আমার সঙ্গে৷

যতটুকু মনে পড়ে একবার ফেনী ও নোয়াখালীতে উপজেলা নির্বাচনের সময় একেবারে সীমান্তবর্তী একটি কেন্দ্রে গিয়েছিলাম৷ সেখানে কেন্দ্র দখল করা হয়েছিল৷ সহিংসতার মাত্রা ছিল বেশ অনেকখানি৷ অবাক হয়েছিলাম লাঠিসোটা নিয়ে সংঘর্ষে যারা লিপ্ত হয়েছিলেন তাদের অনেকেরই বয়স ১২ থেকে ১৪৷

যদিও জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অন্যগুলোর তুলনা হয় না, তবু সম্প্রতি সিটি করপোরেশন নির্বাচন বেশ সাড়া ফেলেছে৷ নগর মর্যাদা পাওয়া নতুন শহরগুলোতে নগরপিতা বাছাইয়ের লড়াইকে ঘিরে নতুন করে সাড়া ফেলে সিটি নির্বাচনগুলো৷

শুরুটা নারায়ণগঞ্জ দিয়ে৷ ২০১১ সালে তখনো শামসুল হুদা কমিশন দায়িত্বে৷ এই কমিশনের অধীনে নির্বাচন হয়৷ আওয়ামী লীগের স্ব ও বিরোধী দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর হেভিওয়েট লড়াইয়ের নীচে চিড়েচ্যাপ্টা বিএনপির প্রার্থী৷ রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এই নগরের ভোট নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন৷ সব পত্রিকা-টেলিভিশন চ্যানেল কয়েকটি করে টিম পাঠায়৷ এর কিছুদিন আগে মাছরাঙা টেলিভিশন অনএয়ারে আসে৷ আমরাও হৈহুল্লোড় করে বেশ কয়েকটি টিম গেলাম নির্বাচন কাভার করতে৷ খুব আয়োজন করে কাভারও করলাম৷ নারায়ণগঞ্জে আমাদের স্টুডিও ছিল না৷ এত লোকের থাকার জায়গা করাও দুষ্কর হয়ে পড়ে৷ আমরা অস্থায়ী স্টুডিও বানালাম৷ সেখানে নীচে ফ্লোরিং করে থাকলাম৷ সে এক অভিজ্ঞতা৷ একটা ঘটনা না বললেই নয়৷ একটা হোটেলে খেতে গেলাম৷ খাবার পর সেখান থেকে বলা হলো, আমাদের বিল নাকি দেয়া হয়ে গেছে৷ জানতে চাইলাম কে দিয়েছে৷ একজন জানালো শামীম ভাই (শামীম ওসমান)৷ আমরা জোর করে বিল চুকিয়ে বেরিয়ে এলাম৷ বললাম, আমাদেরটা না দিলেও হবে৷

এরপর হলো চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন, চার সিটি নির্বাচন (রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল) ও কুমিল্লা সিটি নির্বাচন৷ ঢাকা ভাগ হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ হয়ে গেল৷ চট্টগ্রামের পরের সিটি নির্বাচনে আমি গেলাম৷ তখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাসির উদ্দিন৷ আমার পরিচিত সূত্রগুলো জানালো যে, বাইরের জেলাগুলো থেকে থেকে শত শত তরুণকে আনা হয়েছে চট্টগ্রামে৷ তারা নির্বাচনে কাউন্সিলরদের বা মেয়র প্রার্থীদের হয়ে ‘কাজ' করবেন৷ আমি যে হোটেলে ছিলাম সেটিতে অনেক তরুণের দেখাও পেলাম৷ তাদের আচরণও কিছুটা উদ্ধত মনে হলো৷ নির্বাচনের দিন শহরের কোথাও কোথাও সহিংসতাও দেখলাম৷

সবশেষ একাদশ জাতীয় নির্বাচন কাভার করলাম৷ এবার বিদেশি গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে৷ ঢাকাতেই ছিলাম৷ ঢাকার উবারের এক ড্রাইভারকে ইন্টারভিউ করে জানলাম, ঢাকায় কোথায় কোন মার্কার পোস্টার বেশি দেখেছেন বা প্রচারণা দেখেছেন৷ একটি কেন্দ্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে ভেতরে যেতে যেভাবে বাধা দিলেন, তাতে শুধু বিস্মিতই হইনি, প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছি৷ এমন কখনো দেখিনি৷ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকেন প্রিজাইডিং অফিসার৷ কিন্তু একজন পুলিশ অফিসার কেমন করে এতটা ক্ষমতাবান হন যে একজন সাংবাদিক নির্বাচন কমিশনের অনুমতি সম্বলিত কার্ড গলায় ঝুলিয়েও কেন্দ্রে ঢুকতে পারছেন না, এর চেয়ে অগণতান্ত্রিক আর কিছুই হতে পারে না৷

এগুলো সবই ছোটবড় অভিজ্ঞতা৷ এগুলো লেখার কারণ হলো, এই যে অভিজ্ঞতাগুলো মাঠে ঘাটে মেলে, তা আর কোথাও মেলে না৷ আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে৷ আমি এদের গল্পগুলো বলার চেষ্টা করতাম৷ তাদের একেকটা অসাধারণ গল্প৷ রাজনীতিকরা বা তাদের চেলাচামুন্ডারা যা বলেন, তার মধ্যে সবসময় একটা দিক থাকে৷ তাই এই মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বললেই কেবল পুরোটা জানা যায়৷ এদের অনেকে রাজনীতিই বোঝেন না৷ অনেকে ভোটের আগের দিন ভোট বিক্রিও করেন৷ এমনকি দেশে কত কী ঘটে যাচ্ছে, তার খবরও জানেন না৷ যেমন, সিলেটে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত মানুষ দেখেছি, যারা হৃদয় দিয়ে শেখ হাসিনাকে বা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন৷ তিস্তার পাড়ে দেখেছি লাঙ্গলের জোর৷ একবার বগুড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক চাষি আমাকে বললেন, খালেদা জিয়া নাকি দেশের রাজা৷ তখন শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী৷ এদের অনেকেই কেবল মার্কা চেনেন৷ মার্কায় ভোট দেন৷ প্রার্থী কে, তাতে কিছু আসে যায় না৷ এরা এর বদলে কিছু চানও না৷ এদের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত৷ তারা তাদের নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে থেকেই হিসেব নিকেষ করতেন৷ এদের চাওয়া বলতে একটু ভালো থাকা৷ নির্বাচনকেন্দ্রিক এমন খুব কমই অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেখানে এই মানুষগুলোর ক্ষুদ্র চাওয়াকে কোথাও অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে৷ সব জায়গাতেই নেতাকে খুশি করা, নিজের আখের গোছানো ও ক্ষমতা তৈরির কারবার৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন