নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো খেলা | বিশ্ব | DW | 11.09.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো খেলা

মঙ্গলে পানির সন্ধানে মানুষ৷ আছে কি নাই এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের খেলায় ফেসবুক-ইউটিউবে নানা বিষয়-বিভ্রমের পসরা৷ এরই মাঝে অলৌকিক গ্রন্থের মাঝে এইসবের নিশানা খুঁজে ফেরে একদল তরুণ৷

আর তার বিপরীতে পুঁজির অসামান্য চাপে বাজার অর্থনীতির এই দিনে দিশেহারা অপর দল মেতে ওঠে অহেতুক প্রতিযোগিতায়, ভোগ-লিপ্সায়৷ মাঝামাঝি থাকে আরেক দল৷ তাঁরা কবিতা লেখে, প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, শিল্পের নানা শাখা-প্রশাখা নিয়ে আলাপ জুড়ে দেয় চা-স্টলে, খোলা মাঠে, নিবিড় আড্ডায়৷ সিনেমা-উপন্যাস-চিত্রকলা-থিয়েটারে নানা বিভঙ্গের খোঁজ করে চলে৷ তাঁদের কেউ কেউ যে সফল হয় না এ কথা দিব্যি দিয়ে বলার উপায় কোথায়! সেই সংখ্যা হাতে গোণা৷ বাকিরা ব্যর্থতার নিম্নগামী সিঁড়ি দিয়ে ক্রমাগত হতাশা উদগীরণ করতে করতে হারিয়ে যায় দৈনন্দিনতার মতোই৷ তবু এ তো সত্য– স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখে এঁরাই৷ নিজেকে পুড়িয়ে সুন্দরের সম্ভাবনাটুকু জিইয়ে রাখে৷ 'নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়'৷

ইট-কাঠ-পাথরের শহর ঢাকায়, কয়েকশ' নাট্যদল সরবে অথবা ঢিমেতালে মঞ্চনাটকের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে– আপাত বিবেচনায় শুদ্ধ অথবা অশুদ্ধ মুদ্রায়৷ তবু এটুকু চিত্তে প্রশান্তি জাগাতে পারে– মঞ্চনাটকের জন্যই নিবেদিত তাঁরা, কোনো অশুভ কর্মে তো আর ব্যাপৃত রাখেনি নিজেকে৷ এই দলগুলোর সঙ্গে জড়িত হাজারো নাট্যকর্মী৷ বয়সে অধিকাংশই তরুণ৷ তারুণ্যের সোনালি সময়ের অনেকটুকু এই কর্মীরা ঢেলে দিচ্ছে মোহরের প্রলোভন ছাড়াই– শুধু মঞ্চের আলো-আঁধারির মায়াকে ভালোবেসে৷ আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকগণ কিছু পরিমাণ ভর্তুকি দিয়েই এই অঙ্গনটিতে যথেষ্ট সহায়তা দিচ্ছেন ভেবে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে যাচ্ছেন৷ সেসব নেপথ্যে পড়ে থাক৷

বাংলাদেশের নাগরিক থিয়েটারচর্চা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক৷ এর বাইরে নিয়মিত চর্চার উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামকে বিবেচনা করতে হয়৷ আর বাকি বিভাগীয় শহরগুলোতে নানামাত্রায় চালু রয়েছে থিয়েটারচর্চা৷ কতিপয় ব্যতিক্রম বাদে জেলা শহর আর থানাগুলোতে বিভিন্ন দিবস ঘিরে নাটকের টিমটিমে বাতিটি জ্বলে থাকলেও তাতে প্রাণের প্রতিষ্ঠা নেই৷

এবার আশার কথা বলি৷ বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন নাট্যদল ছাড়াও ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে থিয়েটার বিষয়ক উচ্চতর পড়াশোনা-গবেষণা হচ্ছে৷ প্রতি বছর শত শত তরুণ প্রাণ এই বিভাগগুলো থেকে নাট্যকলা বিষয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নাট্যাঙ্গনে৷ এদেশে থিয়েটারকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণের পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি৷ ফলে পেশাদারিত্বের চলতি অর্থবোধকতা দিয়ে একে বিচার করতে গেলে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বৈকি৷ এই প্রশিক্ষিত তরুণেরা কিংবা থিয়েটার বিষয়ে স্বশিক্ষিত যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা (কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া) অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গেই তো পালন করেন৷ যিনি লিখছেন, তিনি তাঁর চিন্তা-পাণ্ডিত্য-বোধের সমন্বয়ে লিখছেন নাটক৷ নির্দেশক দৃশ্য পরম্পরাকে গেঁথে দিচ্ছেন, অভিনয়শিল্পী রূপায়ন করে যাচ্ছেন নানা চরিত্র, আলোক-সেট-পোশাক-সংগীত পরিকল্পনাকারীগণ তো নিজেদের মেধাকে কাজে লাগিয়েই তাঁদের পরিকল্পনার অনুবাদ করে চলেছেন মঞ্চে৷ তবে কোন নিক্তির নিরিখে তাঁদের অপেশাদার বলে চিহ্নিত করবো? শুধু অর্থযোগ ঘটছে না বলে? যাঁরা ওভাবে দেখতে কিংবা ভাবতে ভালোবাসেন, তাঁরা তা করতেই পারেন৷ এই চর্চার সঙ্গে যুক্ত আমি অন্তত ওই দৃষ্টিভঙ্গির অনুগামী হতে রাজি নই৷ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, পেট চালানোর যে মামলা, তা যদি থিয়েটার থেকেই ফয়সালা করা যেতো, তবে বেশ হতো৷ মোষ তাড়ানো রাখালগুলো তখন আর ইচ্ছের বিরুদ্ধে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে কর্তার ইচ্ছে মাফিক ‘দাসের' জীবনে যুক্ত হতো না৷ অথচ এরপরও কী অবাক! যে কোনো ছুতোয়, সময় পেলেই মঞ্চনাটকের স্বাদ পাওয়া এই তরুণেরা ছুটে আসেন জাতীয় নাট্যশালায়, নাটক সরণির মঞ্চে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির অডিটোরিয়ামে, নাটমলে কিংবা অন্য কোথাও, যেখানে পাওয়া যায় নাটকের নিশানা৷

নাট্যদলগুলোতে তরুণেরা শুধু মঞ্চকে ভালোবেসেই আসেন– আপ্ত এই বাক্যটি সবসময় শুদ্ধরূপে প্রকাশিত নয়৷ কেউ কেউ টেলিভিশন মিডিয়া কিংবা সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার সিঁড়ি হিসেবেও একে ব্যবহার করেন৷ যাঁরা সুযোগ পেয়ে যান, তাঁরা সাধারণত আর মঞ্চের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারেন না৷ তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে৷ কেউ কেউ সবগুলো মাধ্যমেই কাজ করে যাচ্ছেন নিয়মিত৷

বাংলাদেশে নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় তারুণ্যের একটি অংশ জড়িয়ে আছে৷ সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হবে কিনা তা তর্কসাপেক্ষ৷ কিন্তু এ কথা নির্দ্বিধায় বলাই যায়, এই তারুণ্য এ দেশের থিয়েটারকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন নতুন চিন্তা-ভাষা আর উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে৷ আজ এ পর্যায়ে এসে দাবি করাই যায়– বাংলাদেশের থিয়েটার আন্তর্জাতিক মানের দরজায় কড়া নাড়ছে৷ কিন্তু বিশ্ববাসীর শোনার সময় কোথায়?

Rubayet Ahmed

রুবাইয়াৎ আহমেদ, নাট্যকর্মী

এ তো এমন নয় যে, ডিভিডির ছোট্ট গোলাকার আয়তনে বন্দি করে অথবা অন্তর্জালে ছড়িয়ে দিয়ে নজর কাড়া যেতে পারে৷ থিয়েটার তো ঘটে বর্তমানে৷ সেই বর্তমানে মানুষকে সশরীরে উপস্থিত হতে হয়৷ আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের সেই দায়িত্ব ছিল, আমাদের সমৃদ্ধ শিল্পনিদর্শনগুলোকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করবার৷ একটি ম্যাচে কতিপয় ছক্কা হাঁকালেই তো তারকা৷ রাষ্ট্রও তার পকেট ভরে দিচ্ছে মোহরে৷ বিজ্ঞাপন ছুটছে পিছনে৷ অথচ কত সময়, কত শ্রম আর গাঁটের পয়সা খরচ করে এক একটি নাটকের নান্দনিক নির্মাণ, সেখানে ঘুচে না আঁধার, পড়ে না আলো৷

এই বঞ্চনা সয়ে সয়ে এ কিন্তু প্রতিষ্ঠিত আজ, মোটা দাগে কোনো প্রাপ্তির জন্য এই চর্চায় যুক্ত হয় না কেউ৷ মোটামুটি নিখাদ ভালোবাসার টানেই এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মানুষ৷ কর্পোরেটের সর্বগ্রাসী আয়তনে থেকেও কেনই বা নিজেকে জড়িয়ে রাখছে এর সঙ্গে? কারণ, এখানে এলে চোখ খুলে যায়, সাদা-কালোর প্রভেদ করা যায়, ভালোবাসা পাওয়া যায়, নির্ভেজাল ভালোবাসা যায়৷ সবার সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায়, অন্যায়ে সরব হওয়া যায়, নিঃশঙ্ক হওয়া যায়, ত্যাগের প্রতি আগ্রহী হওয়া যায়৷ ভালো-মন্দ মিলিয়ে আমাদের থিয়েটার এই শিক্ষাই তো দিয়ে আসছে তরুণদের৷

নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া ট্রাফিকজ্যামে আটকে থাকতে থাকতে অমূল্য সময়গুলো নিহত হওয়ার মুহূর্তে অনেক সময়েই মনে হয়- ঢাকা হতে পারতো থিয়েটারের নগরী৷ শহরটির বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠতে পারতো মানসম্পন্ন থিয়েটার হল৷ প্রতি সন্ধ্যায় যে হলগুলো মুখরিত হবে তরুণদের কোলাহলে৷ মাদকের নেশার বদলে তাঁরা মেতে উঠতো নাটকের নেশায়, শিল্পের নেশায়৷ প্রতি সন্ধ্যায় শূন্যমঞ্চগুলো আলোকিত হতো ইদিপাসের চিরন্তন কথামালায়, হ্যামলেটের প্রশ্নে, মহুয়া, নোরা কিংবা শকুনন্তলার জিজ্ঞাসায়, নন্দিনী অথবা কালিন্দীর জীবন পিপাসায়, নূরলদীনের ডাকে– জাগো বাহে! মঞ্চগুলো প্রকম্পিত হতো আমাদের ঐতিহ্যবাহী নাট্যের ঝংকারে, গায়েনের সুরে-নৃত্যে-ছন্দে৷ এই শহরে নাটক দেখতে আসতো দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা৷ শিল্পের-আনন্দের নগরী হতে পারতো এই শহর৷ হাস্যকর শোনাচ্ছে, তাই না? মনে হচ্ছে অপুষ্ট তরুণ মনের খোয়াব! আচ্ছা একটা প্রশ্নের জবাব দিন তো– বিনামূল্যে নাট্যের পেছনে এত মানুষের শ্রম আর কোথায় পাওয়া যায়?

লেখকের সঙ্গে আপনি কি একমত? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন