নতুন বছরের রাজনীতি | আলাপ | DW | 01.01.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

নতুন বছরের রাজনীতি

নতুন বছরের শুরুতে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করা হয়৷ এই রীতি সারা পৃথিবীতেই৷ যা কিছু খারাপ, যা কিছু জটিলতা, তা চলে যাওয়া বছরে রেখে নতুন করে শুরু করতে চাওয়াটাই চিরন্তন৷ যদিও জীবনের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে সব সময়ই বিস্তর ফারাক থাকে৷

default

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের মতো দেশে সেই ফারাকটা আরও বেশি পরিলক্ষিত হয়৷ ভালো থাকা, খারাপ থাকা – সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতি দ্বারা৷ সেই রাজনীতি কেমন রূপ নেবে ২০১৮ সালে, সেটাই দেখার৷

১. ২০১৮ সাল বাংলাদেশের জন্যে নির্বাচনের বছর৷ এ বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জাতীয় নির্বাচন৷ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের উপ-নির্বাচন৷ সিলেটসহ বড় বেশ কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনও হবে এ বছর৷ যে সিটি কর্পোরেশনগুলোর মেয়র বিএনপির, অর্থাৎ যাঁরা গত পাঁচ বছর প্রায় কোনো কাজ করতে পারেননি, সরকার তাঁদের বারবার বরখাস্ত করেছে৷ এমনকি নানা মামলায় গ্রেপ্তার করে জেলেও রাখা হয়েছে তাঁদের৷

২. জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে আসার আগে স্থানীয় সরকার তথা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার৷ বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষমতায় থাকলে জনপ্রিয়তা কমে৷ বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা সম্ভবত আরও বেশি কমেছে৷ সর্বশেষ রংপুর সিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির কাছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন৷ ঐ অঞ্চলে বিএনপির প্রায় কোনো ভিত্তি নেই৷ তারপরও ভোট বেড়েছে বিএনপির, কমেছে আওয়ামী লীগের৷ ইসলামী জোটের একজন প্রার্থী প্রায় ২৫ হাজার, অর্থাৎ বিএনপির সমান ভোট পেয়েছেন৷ অর্থাৎ বেড়েছে ইসলামী দলের ভোটও৷ আওয়ামী লীগের জন্যে তো বটেই, আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্যেও তা কম চিন্তার নয়৷

৩. ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে৷ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ মোটেই আশাবাদী নয়৷ আনিসুল হক যে নির্বাচনে মেয়র হয়েছিলেন, সেই নির্বাচনটিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ৷ তখনকার চেয়ে এখন আওয়ামী লীগের অবস্থা মোটেই ভালো নয়৷ ফেব্রুয়ারিতে যদি নির্বাচন হয়, আর সেই নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে না পারে, জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের জন্যে তা বিপর্যয়কর হতে পারে৷ বলা বাহুল্য, এই আশঙ্কা থেকেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচনের আগে আদৌ ঢাকা সিটির নির্বাচন হবে কিনা৷ যদিও আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু'দলই প্রার্থী প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছে৷ নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ তবে এরপরও সংশয় কাটছে না৷ সীমানা বা নতুন ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে মামলা হলে বিষয়টি সামনে চলে আসতে পারে৷ সেক্ষেত্রে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যেতে পারে৷

৪. বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার গতি বৃদ্ধি পেয়েছে৷ নতুন বছরের শুরুতে রায় দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷ এই মামলায় খালেদা জিয়া-তারেক জিয়ার যদি শাস্তি হয়, তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকবে – তা নিয়ে শঙ্কা আছে৷ যদিও বিএনপির যে সাংগঠনিক অবস্থা, তা দিয়ে তারা আন্দোলন খুব বড়ভাবে করতে পারবে বলে মনে হয় না৷ তবে খালেদা জিয়ার যদি শাস্তি হয়, তাতেও তিনি নির্বাচন করতে পারবেন বলেই মনে হয়৷ নিম্ন আদালতের শাস্তির পর উচ্চ আদালত, আপিল ডিসেম্বরের মধ্যে হয়ত নিষ্পত্তি হবে না৷ আর খালেদা জিয়া সাজা পেলে, আওয়ামী লীগ তা প্রচারণায় ব্যবহার করতে চাইবে৷ আওয়ামী লীগ বলবে, খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া সাজাপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজ৷ আওয়ামী লীগ মনে করছে এই প্রচারণায় তারা লাভবান হবে, কারণ দেশের মানুষ দুর্নীতিবাজদের ভোট দেবেন না৷

ওদিকে বিএনপি মনে করছে, খালেদা জিয়াকে সাজা দিলেও তাদের কোনো ক্ষতি হবে না৷ উলটে জনমতের সহানুভূতি তাদের পক্ষে আসবে৷ তারা বলতে পারবে খালেদা জিয়ার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে৷ এই প্রেক্ষিতে বিএনপির ভোট আরও বাড়বে৷

বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায় দুর্নীতি বা শান্তিতে রাজনৈতিক নেতাদের জনপ্রিয়তা কমে না৷ স্বৈরাচার এরশাদের ক্ষেত্রে তা প্রমাণ হয়েছে৷ তবে খালেদা জিয়ার মামলা বা রায়কে কেন্দ্র করে রাজনীতি নানা বাঁক নেবে নতুন বছরের পুরো সময় জুড়ে৷

৫. দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া যদি শাস্তি পান, তবে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা – এমন প্রশ্ন এখন আছে, সামনেও থাকবে৷ সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইবে, যাতে বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়৷ তবে সরকারের এই চাওয়ার বিষয়টি বিএনপি যে বুঝতে পারছে না, তা নয়৷ বিএনপির ভেতরের প্রধান অংশটি যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে৷ অবশ্য এজেন্সি নির্ভর চাকরিজীবী ক্ষুদ্র অংশটি বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারে৷

৬. পর্দার অন্তরালে বিএনপি ভাঙার যে চেষ্টা গত কয়েক বছর অব্যাহত ছিল, নতুন বছরে তা-ও অব্যাহত থাকবে৷ নির্বাচনের সামনে নানা কৌশল-প্রলোভনে বিএনপি ভাঙার চেষ্টা দৃশ্যমান হতে পারে৷ বিএনপির একটি অংশকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা হবে৷

৭. কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, সেই আলোচনাও থাকবে বছর জুড়ে৷ বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনাই থাকবেন নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী৷ বর্তমান সংসদও কার্যকর থাকবে৷ একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে একজন সাধারণ প্রার্থী নির্বাচন করলে স্বাভাবিক হিসেব অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনের সংসদ সদস্যের কথাই শোনার কথা৷ সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ‘সবার জন্য সমান সুযোগ' পরিবেশ কীভাবে তৈরি করবে, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন৷

দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, এটা দেখানোর জন্য নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা এবং সর্বশেষ রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করেছে সরকার৷ কিন্তু সিটি নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না৷ সে কারণে সরকার এ সব নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি, এমন কথা আলোচনায় আছে৷ আলোচনাটা অসত্য নয়৷ এই ‘ফর্মুলা' অনুযায়ী ঢাকা সিটির নির্বাচন করার সাহস সরকার দেখাতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে৷ আবার সিলেট, রাজশাহীসহ যেসব সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বিএনপির, তাঁরা যদি এবারও নির্বাচিত হন, তা সরকারের জন্যে কতটা স্বস্তিদায়ক হবে – সে প্রশ্নও সামনে আসছে৷ দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, এমনটা প্রমাণ করতে চাইলে, বিভাগীয় শহরের মেয়র পদ আওয়ামী লীগের হারানোর সম্ভাবনাই বেশি৷ জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভাগীয় শহর হাতছাড়া করা আদৌ সম্ভব কিনা, আওয়ামী লীগকে তা-ও বিবেচনা করতে হচ্ছে৷ আবার নির্বাচন না করাও ভালো দৃষ্টান্ত তৈরি করবে না৷

গোলাম মোর্তজা

গোলাম মোর্তজা, সাংবাদিক

৮. নতুন বছরের রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে জিনিসপত্রের দাম৷ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান স্লোগান ‘উন্নয়ন'৷ আর এই ‘উন্নয়ন' বলতে আওয়ামী লীগ কিছু রাস্তা চার লেন, কিছু ব্রিজ, কিছু ফ্লাইওভার, অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণকে বোঝাতে চাইছে৷ আওয়ামী লীগের ধারণা, পদ্মাসেতুসহ এ সব অবকাঠামো নির্মাণ দেখে মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেবে৷ বাস্তবতা হলো, মানুষ যে এ ধরনের অবকাঠামো দেখে ভোট দেয়, তেমন কোনো নজির বাংলাদেশে নেই৷ তিন থেকে দশগুণ বেশি ব্যয়ে এ সব অবকাঠামো নির্মাণ, দুর্নীতি মানুষকে বেশি নাড়া দিয়েছে৷ ব্যাংক লুট, টাকা পাচার মানুষকে বেশি প্রভাবিত করেছে৷

৩২ টাকা কেজির চাল ৫৫-৫৮ টাকা, ৪৮ টাকা কেজির চাল ৭০-৭৬ টাকা হয়েছে৷ সরকার নানা কথা বলেছে, কিন্তু দাম কমাতে পারেনি৷ যখন বিদেশের বাজারে চাল ছিল, তখনও সরকার দেশের বাজারে দাম কমাতে পারেনি৷ দেশে নতুন ধানের মৌসুমেও চালের দাম কমেনি৷ বরং পেঁয়াজসহ সব জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে৷ গরিব মানুষের ওএমএস-এর চালের কেজি ১৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা করা হয়েছে৷ সেদ্ধ চালের পরিবর্তে আতব চাল দেয়া হয়েছে৷

বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও বারবার মূল্য বৃদ্ধিতে মানুষের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে৷ একদিকে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে গুম-অপহরণ-খুন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশে৷ তার ওপর সুশাসনের অভাব খুব প্রকট আকার ধারণ করেছে৷ নতুন বছরে এর যে অবসান ঘটবে, তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে৷

৯. নতুন বছরে বা নির্বাচনের বছরে এ সব নেতিবাচক প্রভাবে আক্রান্ত হতে হবে আওয়ামী লীগকে৷ অর্থাৎ রাজনীতিতে প্রায় কোনো কিছু না করেও সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে বিএনপি৷ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা – সেই আশঙ্কা বারবার আলোচনায় আসবে৷ এছাড়া ভারত-চীনের সমর্থন আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকলেও, অ্যামেরিকা-ইউরোপের একটা চাপ মোকাবিলা করতে হবে আওয়ামী লীগকে৷ এক কথায়, আন্দোলনে না হলেও তর্ক-বিতর্কে উত্তপ্ত থাকবে ২০১৮ সালের বাংলাদেশের রাজনীতি৷

এ নিয়ে আপনার কিছু বলার থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়