ধর্ষণ মামলা: যেখানে বিচার ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর | বিশ্ব | DW | 28.09.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

ধর্ষণ মামলা: যেখানে বিচার ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর

বাংলাদেশে এখন প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে চারটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে৷ অথচ ধর্ষণের শতকরা মাত্র তিন ভাগ মামলার অপরাধীরা শাস্তি পায়৷ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ধর্ষণের ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা এখন অনেকটাই অকার্যকর৷

বাংলাদেশে মানবাধিবার সংস্থাগুলো থেকে ধর্ষণের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় সেগুলো করা হয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে৷ তাই মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পরিচালক নিনা গোস্বামী বলেন, ‘‘থানায় মামলা হলেও সব ধর্ষণের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসেনা৷ আবার অনেক ঘটনায় মামলাই হয় না৷ আমাদের কাছেও অনেকে আইনি সহায়তার জন্য আসেন৷ ফলে সব মিলিয়ে বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণের কম হবে না৷’’

আসকের হিসেবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন বাংলাদেশে কমপক্ষে চার জন নারী ধর্ষণের শিকার হন৷ নিনা গোস্বামী বলেন, ‘‘মাত্র শতকরা তিন ভাগ ধর্ষণের মামলায় অপরাধীরা শাস্তি পান৷’’

আসকের হিসেব মতে, চলতি বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৪৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে৷ এর মধ্যে চলতি মাসের প্রথম ২৫ দিনে ৫৯টি৷ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জন নারীকে৷ ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন৷ আর ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছেন ১৯২ জন৷ ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ জন৷ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬৩ জনকে ৷ ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৪১৩ জন৷ হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে৷

গত বছর ধর্ষণের ঘটনা কিছুটা কম হলেও এবার করোনা থাকার পরও ধর্ষণ বাড়ছে৷ প্রথম ৯ মাসেই আগের বছরকে ছাড়িয়ে গেছে৷ আর যেহারে ধর্ষণ বাড়ছে তাতে বছর শেষে এই সংখ্যা ২০১৯ সালকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন৷

অডিও শুনুন 04:38

যে আইন আছে সেই আইনে ধর্ষণের শিকার নারীকে আবারো ধর্ষণের শিকার হতে হয়: শিপা হাফিজ

সরকার বলছে কঠোর আইন আছে, আরো বলছে, ধর্ষকদের কাউকেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না; তারপরও পরিস্থিতি এত খারাপের দিকে যাচ্ছে কেন? আসকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজ বলেন, ‘‘এগুলো ফাঁকা বুলি৷ কিসের কঠিন আইন আছে? যে আইন আছে, সেই আইনে ধর্ষণের শিকার নারীকে আবারো ধর্ষণের শিকার হতে হয়৷ আইন ধর্ষকের পক্ষে৷ শুধু যে ঘটনাগুলো আলোচনায় আসে, যেগুলো নিয়ে মানুষ কথা বলে, সেখানেই কিছুটা বিচার পাওয়া যায়৷ সিলেট এমসি কলেজ হোস্টেলের ঘটনা নিয়ে মানুষ কথা বলছেন, তাই এখানে হয়তো বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে৷’’

এই মানবাধিকার কর্মী আরো বলেন, ‘‘সিলেটের ঘটনার পর ওবায়দুল কাদের সাহেব বললেন, ‘এইসব অন্যায়’৷ তিনি ধর্ষণ শব্দটা মুখে আনলেন না৷ এইসব অন্যায় কি? রেপকে আমরা রেপ হিসেবে দেখছি না৷ অনেক হালকাভাবে দেখছি৷’’ তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘‘ ১৯৭১ সালে আমরা দেখেছি বিদেশি হায়েনা, আর এখন পুরো দেশটাই হায়েনায় ভরে গেছে৷’’

কিছু মামলায় নিম্ন আদালতে বিচার হলেও শেষ পর্যন্ত তা উচ্চ আদালতে আটকে যায়৷ আপিলের নামে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে৷ ফলে এক যুগেও বিচার শেষ হয় না বলে নিনা গোস্বামী জানান৷ আর ধর্ষণ মামলার আসামিরা তখন বুক ফুলিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ায়৷ যারা আইনের ফাঁক গলিয়ে ছাড়া পায় তারাও নতুন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে৷ ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর নেমে আসে আরেক ধারাবাহিক সামাজিক ধর্ষণের পর্ব৷

অডিও শুনুন 03:24

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা যে প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছে তা বলা যায়: অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

২০১৬ সালের মার্চে কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ এবং হত্যা মামলার এখানো তদন্তই শেষ হয়নি৷ ২০১৭ সালের মর্চে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার বিচার কবে শেষ হবে তা এখনো অনিশ্চিত৷ এই মামলার আসামিরা খুবই প্রভাবশালী৷ ২০১৭ সালের নভেম্বরে টাইঙ্গাইলে বাসে রূপা খাতুন ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত দ্রুতই রায় দেন৷ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চার জনকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়৷ কিন্তু এখন মামলাটি উচ্চ আদালতে আপিলে আটকে আছে৷

এভাবে ঝুলে থাকে ধর্ষণ মামলাগুলো৷ আর নিম্ন আদালতে রায় হলেও উচ্চ আদালত হয়ে চূড়ান্ত রায় পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়৷ শিল্পপতি লতিফুর রহমানের মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমান ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় পেতে ১৮ বছর লেগেছে৷ চূড়ান্ত রায়ে ২০১৬ সালের আগস্টে একজনের মৃত্যুদন্ড বহাল থাকে৷ ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে শাজনীনকে ঢাকায় তাদের নিজ বাসায় ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ‘‘মডারেট মুসলমানের দেশে ধর্ষণ এবং সংঘবদ্ধ ধর্ষণ যদি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে যায়, তার চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে! আমাদের সবার উচিত লজ্জায় মুখ ঢাকা৷’’

তিনি মনে করেন, ‘‘যে দেশে ৯৭ ভাগ ধর্ষণের মামলায় আসামি খালাস পেয়ে যায়, সে দেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা যে প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছে, তা বলাই যায়৷’’

এই বিচারহীনতাকে কেউ কেউ আবার ‘মিথ্যা’ ধর্ষণ মামলার পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেন৷ তারা বলতে চান, ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের অধিকাংশ মামলাই মিথ্যা৷ এ প্রসঙ্গে আইনের এই অধ্যাপক বলেন, ‘‘বিচারহীনতার সুযোগে কেউ কেউ এ ধরনের কথা বলতেই পারেন৷ প্রায় অকার্যকর ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার কারণেই অপরাধীরা ছাড়া পাচ্ছে৷ কিন্তু নারী যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তা তো আর মিথ্যা নয়৷ তাই যদি হবে, তাহলে আদালতে পুলিশ চার্জশিট দেয় কীভাবে? আসল কথা হলো, আমাদের আইনে তো সমস্যা আছেই, মূল্যবোধও নষ্ট হয়ে গেছে৷ তাই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷’’

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন