ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাঙালির সাথে দু’দণ্ড | আলাপ | DW | 22.05.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাঙালির সাথে দু’দণ্ড

জার্মানির বন থেকে প্যারিসে গিয়েছিলাম ঘুরতে৷ এটিই আমার প্রথম দেশের বাইরে আসা৷ প্যারিসে গিয়ে যখন প্রথম ‘কেইস মারা’ শব্দটি শুনলাম, বিশেষ মজা পেলাম৷ আমার সামনে বসা ভদ্রলোকটি নিজের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছেন৷

প্যারিসে আমি বাঙালিদের যে বাসাটায় উঠেছিলাম, সেখানেই পরিচিত হয়েছিলাম ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ঐ আসামির সাথে৷ অমায়িক ভদ্রলোক, ঢাকার পাশেরই একটি জেলায় বাড়ি৷

মৃদু হাসতে হাসতে বললো, ভাই এখানে পারমানেন্ট রেসিডেন্ট চ্যায়া (চেয়ে) কেইস মারছি৷ উকিলরে বলসি দেশে ধর্ষণ মামলার আসামি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হইছে৷ এখন একটা নিউজ করাইতে হইবো! আপনেরে দরকার৷

প্যারিসে ছিলাম দু'দিন৷ এরমধ্যে যতজনের সাথে পরিচিত হয়েছি, তাদের ৯৯ শতাংশ এখানে ‘কেইস মারছেন', মানে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে দেশে প্রাণ সংশয় আছে, এমন অজুহাতে ফ্রান্সের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন৷

তাদেরই একজন ‘কথিত ধর্ষণ' মামলার আসামি সগির ভাই (ছদ্মনাম)৷ বললেন, ছ'বছর লন্ডন ছিলেন, তারপর সেখানে সমস্যা হওয়ায় প্যারিসে এসেছেন৷ লন্ডনের ছয় বছরের মধ্যে পাঁচ বছর বৈধ ছিলেন, শেষের বছর অবৈধ হয়ে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেরিয়েছেন৷ প্যারিস এসেছেন এ কারণে যে এ দেশ নাকি কাউকে ফেরায় না!

আমার সাথে যে বাঙালি বড়ভাই বন থেকে প্যারিস এসেছেন, তিনি দীর্ঘদিন জার্মান প্রবাসী৷ জানালেন, ফ্রান্সের অভিবাসী আইনে কিছুটা ফাঁকফোঁকর আছে৷ স্মরাণাতীত কাল থেকেই এই দেশ নাকি আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরায় না৷ আবার সবাইকে যে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট বানায় বা থাকার অনুমতি দেয় তেমনটিও নয়৷ মাঝখানে ঝুলন্ত রাখে৷ ফ্রান্স সরকারের আবাসন, ভাতা, বিমা বা সরকারি সুবিধা কিছুই পায় না এরা৷ মার্কসের প্রলেতারিয়েত হয়ে ঘুরে বেড়ায়, শরীর বা শ্রম সম্বল করে৷ 

জানলাম, ফ্রান্সে প্রথমবার থাকার আবেদন বাতিল হলে দ্বিতীয়বার আপিল করলে সরকার ২১ দিনের জন্য সময় নেয়৷ কিন্তু ২১ দিনের মধ্যে কাগজ নিরীক্ষা করতে পারে না বলেই, ফ্রান্সে বসবাসে আগ্রহী আবেদনকারীদের একটা বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বৈধ অভিবাসী হিসেবে আশ্রয় পায়৷

নকল ধর্ষক সগির ভাই বললেন, আগেরটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দেখিয়ে আবেদন করেছিলেন৷ গ্রহণ হয়নি৷ এবার তাই মামলা আরেকটু সাজিয়ে ধর্ষক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে ফ্রান্সে নিজেকে পলাতক দেখাবেন৷

তিনি জানান, দেশের পত্রিকায় এই সংবাদ নাকি পয়সা দিয়ে ছাপানো যায় এবং পুলিশ বা থানাকে কিছু টাকা দিয়ে সত্যিকার মামলায় নাম ঢোকানো যায়৷ ফাঁসির খবর ছাপা হলেই, সেই কাগজ দেখিয়ে দিব্যি ফ্রান্সের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে থাকতে পারবেন৷ এমনকি তার ধর্ষণের সাজা হওয়ার সংবাদটি যে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, সেই পত্রিকা অফিসের ফাইলেও নাকি সেটি রাখার মতো সিন্ডিকেট বাংলাদেশে আছে৷

সগির ভাইয়ের ‘কেইস মারার' গল্প উড়িয়ে দিতে পারতাম৷ কিন্তু প্যারিস জুড়েই বাঙালি অভিবাসন প্রত্যাশী যুবকদের একই ধরনের গল্প৷

আরেকজনের গল্প শুনলাম৷ পাক্কা পরহেজগার ব্যক্তি৷ তিনি নাকি নিজেকে ‘সমকামী' হিসেবে উপস্থাপন করে দেশে প্রাণ সংশয়ের কারণ ফেঁদে আশ্রয় চেয়েছিলেন৷ অবশ্য ওই বাঙালি ভাইয়ের স্ট্র্যাটেজিতে বড় ধরনের ভুল ছিল, কেননা এ ধরনের সমকামিতার মামলাগুলো সাধারণত বিচার করেন সমকামী বিচারকই৷ পাকা ক্রিকেটার তো ব্যাট ধরা দেখলেই বোঝে আনাড়িপনা কতটুকু! কাজেই ওই ভাইয়ের মামলা খারিজ৷ এখন তাকে ‘কেইস মারতে' নতুন ফন্দি পাততে হচ্ছে

হাবিব ইমরান

হাবিব ইমরান, ডয়চে ভেলে

তবে সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার এমন একজনের সাথেও পরিচিত হলাম প্যারিস সফরের শেষদিন৷ ফেসবুকের সূত্রে বাঙালি এই আড্ডাবাজ যুবকের সাথে আগেই পরিচয় ছিল৷ দেশে উগ্র মৌলবাদীরা তার চামড়া কেটে লবণ লাগিয়ে দিয়েছিল বলে জানালেন তিনি৷ দেখলাম, তার সারা হাতে কাটার দাগ৷

বললেন, নির্যাতন করে মেরেই ফেলত যদি না গ্রামের লোক দেখে তাকে না বাঁচাতেন৷ দেশ ছেড়েছেন বহুদিন আগে৷ ইনিও কিছুদিন লন্ডনে ছিলেন, তারপর প্যারিস চলে এসেছেন৷

প্যারিসের বাঙালিদের আস্তানা গার্দো নর্দে ঝাল হালিম খেতে খেতে এরকম নানা ‘কেইস মারা'-র গল্প শুনছিলাম৷ আর ভাবছিলাম, ঠিক কী ধরনের জীবনের স্বাদ পেতে দেশের গরম ভাতের স্বাদ ছেড়ে এ যুবকরা এইখানে, স্বপ্নের নগরী প্যারিসে আসে!

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন