ধর্ষণ, ধর্ষণ নিয়ে রাজনীতি এবং দেশজুড়ে আতঙ্ক | বিশ্ব | DW | 18.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

ধর্ষণ, ধর্ষণ নিয়ে রাজনীতি এবং দেশজুড়ে আতঙ্ক

সব দেশেই শিশুদের সুরক্ষিত থাকার কথা৷ কিন্তু ইদানীং ভারতে মেয়েদের জন্য তেমন পরিবেশ নেই৷ তারা আতঙ্কিত৷ বলতে গেলে সারা দেশেই নারী তো বটেই, শিশুদের সঙ্গেও ঘটে চলেছে ন্যক্কারজনক যৌন নিপীড়নের ঘটনা৷

দেশজুড়ে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শোরগোল চলছে৷ বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষায় উঠে আসছে নানা তথ্য৷ একটি হিসেব বলছে, প্রতিদিন গড়ে ১০০টির‌ও বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়৷ বছরে যা ৪০,০০০-‌এর বেশি৷ প্রতি ১০টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে অন্তত ৪টির শিকার নাবালিকারা৷ প্রত্যেকটি ঘটনার পর সরকার ও পুলিশ, ‌প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক‌ঠোর শাস্তির কথা বলা হয়৷ কিন্তু আইনের প্রয়োগ চোখে পড়ে না৷ ‘‌ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো'‌ বা এনসিআরবি-‌র ২০১৩ সালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে গোটা দেশে মোট ২৪,৯২৩ ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়েছিল৷ এরমধ্যে ২৪,৪৭০টি, অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ ঘটিয়েছে নির্যাতিতার পরিচিত লোকেরাই৷ কিছুদিন আগেই কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী মানেকা গান্ধী লোকসভায় জানিয়েছেন, এনসিআরবি-‌র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ সালে গোটা দেশে ১৩,৭৬৬জন শিশুকন্যা ধর্ষিতা হয়েছে৷

বিগত কয়েকদিন ধরে একের পর এক ধর্ষণের সংবাদ সামনে আসছে৷ উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে ১৭ বছরের মেয়েকে গণধর্ষণ করা হয়েছে৷ অভিযুক্ত এলাকার শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির বিধায়ক কুলদীপ সিং সেঙ্গার ও তার দলবল৷ তার‌ রেশ কাটতে না কাটতেই জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়ায় মাত্র ৮ বছরের একটি শিশুকন্যাকে অপহরণ করে গণধর্ষণ ও হত্যার সংবাদ আসে৷ তারপর একে একে গুজরাট, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ৷ প্রায় সর্বত্র৷

সাধারণ মানু্যের মনে প্রশ্ন, কোন পথে এগোচ্ছে ভারত?‌ এদেশে কি ধর্ষণ ক্রমশ বাড়ছে? নাকি নানাবিধ ‘অবাধ' তথ্য পরিবেশনের এ যুগে তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে বলে বহুকাল ধরে চলে আসা একটি সামাজিক ব্যাধিকে হঠাৎ ভয়ংকর মনে হচ্ছে?‌ দেশের সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলো কি এক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে?‌ নাকি কেউ টিআরপি-র পেছনে ছুটছে আর কেউ কেউ শুধু ভোটবাক্সের রাজনীতিতে ব্যস্ত? এই প্রতিবেদনে‌ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ৷

‌রাজধানী নয়া দিল্লিতে কর্মরত বাঙালি সাংবাদিক পল্লবী ঘোষ মনে করেন অবাধ তথ্যপ্রবাহই এখন সারা দেশের খবর এনে দিচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও এতটা সম্ভব ছিল না৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন,‌ ‘‌‘‌ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে বলে মনে হয় না৷ বরং এই ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে আনার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে৷ মিডিয়াও বেশি করে প্রচার করছে৷ এর ভালো-‌মন্দ উভয় দিকই আছে৷ একজন সাংবাদিক হিসেবে বহু মানুষের ফোন আসে৷

অডিও শুনুন 03:08
এখন লাইভ
03:08 মিনিট

‘প্রত্যন্ত গ্রামে এমন ঘটনা ঘটলে অনেকেই এগিয়ে এসে অভিযোগ করতে ভয় পেত’

ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে এখন মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে৷ ফেসবুক, টুইটার‌সহ সোশ্যাল সাইটেও প্রচার হয়ে যাচ্ছে৷ ফলে পুলিশ, প্রশাসনের ওপর চাপ বেড়েছে৷ প্রত্যন্ত গ্রামে এমন ঘটনা ঘটলে অনেকেই এগিয়ে এসে অভিযোগ করতে ভয় পেত৷ ইদানীং ক্রমশ অভিযোগ জানানোর সাহস পাচ্ছে মেয়েরা৷ অভিভাবকদের মানসিকতা বদলাচ্ছে৷ নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের আধিকারিকরাও তা-‌ই বলছেন৷ অনেক বেশি অভিযোগ জমা পড়ছে বলে মনে হয় ঘটনা বেড়ে গেছে৷''

পল্লবী ঘোষ জানালেন ধর্ষণ নিয়ে শুধু রাজনীতি করার প্রবণতাও বেশ চোখে পড়ে৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘কাঠুয়ার ঘটনার পর ইন্ডিয়া গেটের সামনে ক'‌দিন আগে এক মাঝরাতে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর মিছিলে গিয়েছিলাম৷ দেখলাম, উপস্থিত সকলেই রাজনীতি করতেই ব্যস্ত৷ সবাই নরেন্দ্র মোদী ও ভারতীয় জনতা পার্টিকে গালমন্দ করছেন৷ কেউ বলল না, ‘‌চলুন, মেয়েটির পরিবারের পাশে দাঁড়াই৷'‌ অনেক পরে কিছু ছাত্র-ছাত্রী এসে বলল, ‘‌আমরা অযথা রাজনীতি চাই না৷ বিহিত চাই৷'‌ তাই আশাহত হওয়ার কিছু নেই৷'‌'‌

ভারতের সামাজিক অবস্থা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে অনেকের মনে৷ অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায়৷ কীভাবে নিজেদের সন্তানকে রক্ষা করবেন তাঁরা?‌ চিন্তা বাড়াচ্ছে এনসিআরবি-‌র রিপোর্ট৷ সংস্থার ২০১৬-‌র রিপোর্ট দেখে চক্ষু চড়কগাছ!‌ দেখা যাচ্ছে, ওই বছর আগের বছরের তুলনায় শিশুদের সঙ্গে যৌন হেনস্থার ঘটনা প্রায় ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ ওই রিপোর্ট বলছে, ২০১৫ সালে ১০,৮৫৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল৷ ‌

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারা এবং ‘‌প্রোটেকশন অফ চিল্ড্রেন এগেনস্ট সেক্সুয়াল অফেন্সেস' বা পসকো‌ আইনের ৪ ও ৬ নং ধারা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা ১৯,৭৬৫৷ ২০১৬ সালে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনার নিরিখে সবার ওপরে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ ২,৪৬৭, মহারাষ্ট্র ২,২৯২, উত্তর প্রদেশ ২,১১৫, ওড়িশা ১,২৫৮ এবং তামিলনাড়ু ১,১৬৯ ৷

অডিও শুনুন 03:09
এখন লাইভ
03:09 মিনিট

‘ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে, নাকি কমেছে তা নির্ধারণ করা মুশকিল’

২০১৮ সালের রিপোর্ট এখনও সামনে আসেনি৷ তবে পরিসংখ্যানটা খুব আশা জাগানোর মতো হওয়ার কথা নয়৷ ২০১৭ সালের এনসিআরবি রিপোর্ট বিগত ২০১৫ ও ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানকে টপকে গেছে৷ চলতি বছরে তা আরও বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক৷

কলকাতার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘‌প্রতীচী'-‌র কর্ণধার সাবির আহমেদের মতে, ‘‌‘আগে ধর্ষণ হতো না এমন নয়৷ দেশভাগের সময়েও আমরা ধর্ষণের ঘটনা দেখেছি৷ বেড়েছে, নাকি কমেছে তা নির্ধারণ করা মুশকিল৷ কারণ, এর কোনো ভিত্তিরেখা নেই৷ তবে, ইদানিং মহিলাদের প্রতি আগ্রাসন বেশি মাত্রায় বেড়েছে৷ শাসকের ক্ষমতা জাহির করার একটা উপায়৷ মহিলা নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশি সক্রিয়তা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের প্রয়োজন৷ এই সমস্যার অন্যতম সমাধান হলো ধর্ষণ-‌আইনের সঠিক প্রয়োগ৷ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি৷ এখন দেখা যাচ্ছে,‌ ধর্ষিতার ধর্ম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যা কখনোই কাম্য নয়৷ বিষয়টা ধর্মীয় বিভাজনের একটা প্রয়াস৷ এক্ষেত্রে বর্তমান আইনের প্রয়োগের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব৷'‌'‌

প্রবীন সাংবাদিক এবং সাংবাদিক সংগঠন ‘‌প্রেস অ্যাসোসিয়েশন'‌-‌এর সভাপতি জয়শঙ্কর গুপ্তা ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‌‘‌বলাৎকারের ঘটনা বেড়েই চলেছে৷ এমন একটা দিন নেই, যেদিন শিশুকন্যার ওপর নির্যাতনের খবর আসেনি৷ গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মতো ঘটনা সামনে আসছে৷ ধর্ষণের পর হত্যা করে দেওয়ার নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে৷ গতবছর (‌২০১৭)‌ ২৮,৯৪৭ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে৷ ১৬,৮৬৩টি ঘটনা ঘটেছে শিশুকন্যাদের ওপর৷ প্রতি ঘন্টায় ভারতে ৪ জন ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন৷ তারমধ্যে দু-‌জন শিশু৷ উন্নাওয়ে যে মেয়েটির ওপর যারা অত্যাচার হয়েছে, একবছর ধরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি৷

অডিও শুনুন 07:20
এখন লাইভ
07:20 মিনিট

‘ধর্ষিতার পাশে নয়, ধর্ষকের পাশেই দাঁড়াচ্ছে পুলিশ ‌প্রশাসন’

অভিযুক্ত টিভিতে মুখ দেখাচ্ছে৷ আদালত সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করার পর মামলা সিবিআইকে দেওয়া হলো৷ গ্রেপ্তার করা হলো৷ মনে রাখতে হবে, এই ঘটনায় নির্যাতিতার বাবাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে৷ এর থেকে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা আর কীইবা হতে পারে৷ সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ধর্ষিতার পাশে নয়, ধর্ষকের পাশে দাঁড়াচ্ছে পুলিশ ‌প্রশাসন৷''

তবে পাশাপাশি তিনি মনে ধর্ষণ নিয়ে আগে রাজনীতি হয়েছে, এখনো হচ্ছে৷ তাঁর মতে, ‘‘নির্ভয়া‌কাণ্ডে ভারতীয় জনতা পার্টি রাজনীতি করেছিল৷ এখন কংগ্রেস করছে৷ রাজনীতি যাঁরা করেন, তাঁরা তা করবেন৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতি করার পর ক্ষমতায় এলেই ভোল বদলে ফেলছে দলগুলো৷ ধর্ষণ সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো, ধর্ষকদের মনে ভয় তৈরি করতে হবে৷'‌'

শিক্ষিকা সিলভি সাহা তুলে ধরলেন ধর্ষণের খবরে সংবাদ মাধ্যমের একটি দায়িত্বহীনতার দৃষ্টান্ত৷

অডিও শুনুন 03:32
এখন লাইভ
03:32 মিনিট

‘কোনো একটি ঘটনা নিয়ে হইচই করার পর সেই ঘটনার কী হলো, তা প্রচারে আসা উচিত’

তাঁর মুখে উঠে এলো সমাজে যে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগেও তোলপাড় হয়, নির্দোষ ব্যক্তিও সামাজিকভাবে অপদস্থ হন, সেই বিষয়টি৷

ডয়চে ভেলেকে সিলভি সাহা বলেন, ‘‌‘‌আমার পাড়ায় এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে পসকো আইনে অভিযোগ জমা পড়েছিল৷ অভিযুক্ত শিক্ষক ও তাঁর পরিবারের জীবন তছনছ করে দিয়েছিল৷ কিন্তু পরে জানা গেল, ওই শিক্ষক সম্পূর্ণ নির্দোষ৷ দুঃখের বিষয় হলো, নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার সংবাদ আর পরিবেশন করল না সংবাদমাধ্যম৷ এ জন্য কোনো একটি ঘটনা নিয়ে হইচই করার পর শেষমেষ সেই ঘটনার কী হলো, তা প্রচারে আসা উচিত৷ এক্ষেত্রে মিডিয়া তার ভূমিকা পালন করে না৷'‌'

পাঠক, আপনারা কি মনে করেন ভারত শিশুদের জন্য নিরাপদ দেশ'? মতামত জানান নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন