ধর্ষণের শাস্তির মাত্রা কমানো উচিত: ড. শাহদীন মালিক | আলাপ | DW | 15.01.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

ধর্ষণের শাস্তির মাত্রা কমানো উচিত: ড. শাহদীন মালিক

আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ৷ ধর্ষণের শাস্তির পরিমাণ কমানো হলে বেশি অপরাধী শাস্তি পাবে বলেও মনে করেন তিনি৷

ড. শাহদীন মালিক

ড. শাহদীন মালিক

কঠোর শাস্তির বিধান অপরাধ কমায়, এমন কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই বলে ডয়চে ভেলেকে জানান ড. শাহদীন মালিক৷

ডয়চে ভেলে: ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড৷ তারপরও ধর্ষণ কমছেনা৷ এর কারণ কী? শাস্তি বাড়ালে কি অপরাধ কমে?

ড. শাহদীন মালিক: গত ১০০ বছরে যত গবেষণা হয়েছে তাতে দেখা গেছে শাস্তি বাড়ালে যে অপরাধ কমে এই ধারণার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই৷ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় অপরাধের শাস্তি অনেক বাড়ানো হয়েছে৷ ৫-১০ বছর পরে দেখা গেছে শাস্তি বাড়ানোর কারণে অপরাধ কমেছে এমন কোনো নজির নেই৷ বাংলাদেশে গণধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ২০ বছর আগেই করা হয়েছিল৷ কিন্তু আজকাল তো দেখছি গণধর্ষণ বাড়ছে৷ মৃত্যুদণ্ড দিয়ে, শাস্তি বাড়িয়ে হয়তো অস্থায়ীভাবে দুই-চার-পাঁচ মাসের জন্য অপরাধ কমানো যায়৷ কিন্তু এটা যে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান না তা দুনিয়াতে ১০০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত৷

তাহলে কী করতে হবে?

শাস্তির ভয়ে যদি লোকে অপরাধ থেকে বিরত থাকত, তাহলে তো দুনিয়ার সব দেশেই শাস্তি বাড়িয়ে দিলে সব অপরাধ চলে যেত৷ যায়না৷ এর অন্য সামাজিক কারণ বুঝতে হবে৷ আমার দৃষ্টিতে ইদানিং দেশে যারা শক্তিশালী এবং যারা দুর্বল তাদের মধ্যে পার্থক্য অনেক বেড়ে গেছে৷ যারা শক্তিশালী তারা আরো অনেক শক্তিশালী হয়েছে, যারা দুর্বল তারা আরো অনেক দুর্বল হয়েছে৷ অন্তত শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে একটা শক্তিশালী পুরুষ একটা দুর্বল নারীকে ধর্ষণ করে৷ আমরা এখন আরো দেখছি যে শিশু ধর্ষণের হার বেড়ে গেছে৷ এই যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এটা আমার দৃষ্টিতে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ৷ ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা কমাতে হবে৷ ক্ষমতাসীন দলের সাথে থাকলে সাত খুন মাফ৷ মাঝে মাঝে কিছু হুলুস্থুল হচ্ছে৷ বছরে হাজার বা লাখো অপরাধ হচ্ছে৷ তারমধ্যে দুই-চার-দশ বা বিশটা ক্ষমতাসীন অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা কমছেনা৷

ধর্ষণ মামলায় শাস্তির হার এত কম কেন?

আসল দুর্বলতা হলো পুলিশের৷ একটা মামলা প্রমাণ করতে হলে কোর্টে সাক্ষীকে আনতে হবে৷ কোর্টে সাক্ষী আনার দায়িত্ব পুলিশের৷ কিন্তু এই কাজটা পুলিশ মোটেই করেনা৷

তদন্ত প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে মামলা দুর্বল হয়ে যায় কিনা?

না, এটাকে আমরা অতিরঞ্জিত করছি৷ দুনিয়ার যেকোনো দেশে ধর্ষণ হলে তা প্রমাণ করতে শারীরিক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়৷ ডাক্তারি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়৷ আমাদের থানাগুলোতে যদি বেশি সংখ্যক নারী পুলিশ থাকত, ধর্ষণের শিকার যা যৌন হয়রানির শিকার নারী যদি নারী পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করতে পারত তাহলে এটা খুব কঠিন কাজ না৷

বিয়ে করবেন ভেবে সম্মতিতেই হলো৷ পরে বিয়ে হলোনা৷ নারী তখন ধর্ষণ মামলা করলেন৷ এই মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একই ধারার অপরাধ হওয়া কি ঠিক আছে?

এখানে আইনের দুর্বলতা আছে৷ মিনিমাম যে বিদ্যা বুদ্ধি থাকা দরকার আইন প্রণয়নে তাও এখানে নেই৷ ফলে মিথ্যা মামলার অবারিত সুযোগ আছে এখানে৷

ছেলে শিশু ধর্ষণের শিকার হলে অনেক সময় ধর্ষণ মামলা হয়না৷ এখানে করণীয় কী?

বলাৎকারের ব্যাপারে আগে আমরা চোখ বন্ধ করে থাকতাম৷ কিন্তু আস্তে আস্তে আমাদের চোখ খুলছে৷ আর শিশুর কোনো জেন্ডার ভাগ আইনে নেই৷ আমার মনে হয় আমরা আরেকটু সচেতন হলেই এক্ষেত্রেও ধর্ষণ মামলা হবে৷

ধর্ষণ আর ধর্ষণে সহযোগিতার একই শাস্তি কতটুকু যৌক্তিক?

অবশ্যই যৌক্তিক না৷ ১৭৬১ সালের আগে অপরাধের চেষ্টা এবং অপাধের একই শাস্তি ছিল৷ ওই সময় সিজার বেকারিয়া তার এক বইয়ে দেখান, দুইটার শাস্তি এক করলে অপরাধ বাড়বে৷ চেষ্টা আর সংঘটিত অপরাধের শাস্তি এক করা হলে যে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে তাহলে সে অপরাধ করবে৷ ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একই শাস্তি হলে পরের দিন সে ধর্ষণের চেষ্টা করবে৷ আমরা যেসব আইন করছি তাতে অপরাধ দমন না করে বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে৷

আইন সংশোধন করে উভয়ের ডিএনএ টেস্ট এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ এতে কি অভিযুক্তকে শাস্তি দেয়া সহজ হবে?

এটা বিরাট বাধা হবে৷ ডিএনএ টেস্ট করার ল্যাবরেটরি দেশে কয়টা আছে? আমার জানা মতে তিন-চারটা৷ বিভাগীয় শহরের বাইরে যে নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে সে ডিএনএ টেস্ট কেমন করে করাবে? আসামির আইনজীবী বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে৷ বলবে আমার আসামির ডিএনএ টেস্ট করার কথা, করা হয়নি৷ অতএব প্রমাণ হয় নাই৷ অতএব মামলা খারিজ৷

কেউ কেউ বলছেন ধর্ষণের বিচারে জন্য স্পিডি ট্রায়াল করতে আলাদা বিশেষ আদালত দরকার৷ তাতে কি বিচার পাওয়া সহজ হবে?

দেশে এখন নারী ও শিশু আদালত আছে ৯৪-৯৫ টা৷ দ্রুত বিচার করলে বেশি অন্যায় অবিচার হবে৷ সবচেয়ে দ্রুত বিচার হলো বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড৷ হাজার হাজার মানুষকে দ্রুততম সময়ে বিচার করা হলো৷ রাতে ধরল, রাতে ধরে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করল৷ ভোরে মেরে ফেলল৷  এরচেয়ে তো আর দ্রুত বিচার সম্ভব না৷ এই হাজার হাজার দ্রুত বিচার করে কী হয়েছে? সমাজে অপরাধ বেড়েছে৷

ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবারকে দায়ী করার প্রবণতা এখনো আছে৷ কলাবাগানের ধর্ষণের ঘটনায়ও তা আমরা দেখেছি৷ এটা আমাদের মানসিকতার কোন স্তর?

আগেই যে বলেছিলাম ক্ষমতা আর ক্ষমতাহীন৷ কলাবাগানের ঘটনায় যেটা হয়েছে যাদের ক্ষমতা আছে তারা ক্ষমতার ব্যবহার করে তাদের দিকটা তুলে ধরছে৷ ওকে ধর্ষণ করেছি৷ ধর্ষণ করে কোনো খারাপ কাজ করিনি৷  ও দুর্বল তাই দোষ তার৷৷ এটা এখন আরো বেশি হচ্ছে৷ কারণ ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে৷

অডিও শুনুন 16:50

শাস্তি বাড়ালে অপরাধ কমে এমন ধারণার ভিত্তি নেই: ড. শাহদীন মালিক

কঠোর শাস্তি অপরাধ না কমিয়ে বাড়াতে কখনো ভূমিকা রাখে কিনা?

অবশ্যই৷ শাস্তি যত কঠোর হবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার তত কমবে৷ এখন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিতে হলে আপনি বিচারক হাজার বার চিন্তা করবেন৷ কিন্তু যদি ১০ বছরের কারাদণ্ড হয় তখন একটু সন্দেহ থাকলেও বিচারক রায় দিয়ে দেবেন৷ মৃত্যুদণ্ড দিতে বহুবার চিন্তা করবেন আপনি বিচারক হিসেবে৷

আইনের কি কোনো সংস্কারের প্রয়োজন আছে?

আমি বলব শাস্তি কমানোর কথা৷ শাস্তি কমলে যারা দোষী তাদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার বাড়বে৷ তারা আসলেই শাস্তি ভোগ করবে৷ দ্বিতীয়ত, পুলিশকে সাক্ষী হাজির করার ব্যাপারে সক্রিয় করতে হবে৷ তৃতীয়ত, সমাজের ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, আইনের ঊর্ধ্বে থাকার ক্ষমতা- এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীতা কমাতে হবে৷ জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে৷ না হলে সমাজে অপরাধ কমবেনা৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন