ধরা পড়লে অপরাধী, নইলে হিরো | আলাপ | DW | 23.10.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

ধরা পড়লে অপরাধী, নইলে হিরো

গত দুই দশকে লাখ লাখ গরিব মানুষ ভারত ছেড়ে অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন৷ কেউ অপরাধী হয়েছেন, বাকিরা হিরো৷

লেবাননে দুই ভারতীয় অভিবাসী শ্রমিক

লেবাননে দুই ভারতীয় অভিবাসী শ্রমিক

বিমল জেঠুর সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল বছরকয়েক আগে৷ অধুনা নব্বই পেরনো বিমল জেঠু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ষাটের দশকে পাড়ি দিয়েছিলেন অ্যামেরিকা৷ নব্বইয়ের দশকেও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে একটি কথা খুব প্রচলিত ছিল, কথাটা হলো ‘অ্যামেরিকান ড্রিম’৷ পড়াশোনা করে অ্যামেরিকা চলে যাওয়াই তখন ছিল একমাত্র স্বপ্ন৷ উনিশ শতকে ঠিক যেমন ছিল বিলেতের স্বপ্ন৷ যুক্তরাজ্যে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ে আসতে পারলে ভবিষ্যৎ ঝকঝকে৷

মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের ছেলে বিমল জেঠু আর কখনো দেশে ফেরেননি৷ আশি বছর বয়সে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন এক পঁচাত্তরের মার্কিনিকে৷ তাঁকে নিয়ে দেশে এসে খুব অবাক হয়েই অধমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘অ্যামেরিকায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখো না? সে কী কথা? কোয়ালিটি লাইফ নিয়ে তোমাদের প্রজন্মের কোনো ভাবনা নেই?’’

বিশ শতকের শেষ অর্ধে জন্ম আমাদের প্রজন্মের৷ একুশ শতকের গোড়ার ভারতকে আমরা চিনি৷ নব্বইয়ের দশকে ভারতের অর্থনীতি মনমোহন সিংয়ের হাত ধরে ‘উদার’ হয়ে যাওয়ার পর মধ্যবিত্ত ভারতীয় দেশেই বিদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে৷ বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ভারতে বাজার তৈরি করেছে৷ দেশে বসেই বিদেশি বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে৷ তাতে দেশের আদৌ উন্নতি হয়েছে কিনা, গরিব মানুষের সংস্থান হয়েছে কিনা, সেসব পণ্ডিতের আলোচনার বিষয়৷ বিতর্কেরও৷ মধ্যবিত্ত ভারতীয় বুঝে গিয়েছে, দেশে বসেই এখন কোয়ালিটি লাইফ বাড়িয়ে ফেলা যায়৷ বিদেশে গিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়ার চেয়ে দেশে রসে-বসে থাকা অনেক বেশি সম্মানের৷ বিদেশ হলো বেড়াতে যাওয়ার জায়গা, অথবা অফ শোর প্রজেক্টে৷ কয়েক মাস, অথবা কয়েক বছর৷ দু'হাতে টাকা নিয়ে দেশে ফিরে বড়লোকীপনা করা যায়৷

একুশ শতকের প্রথম দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে বহু বন্ধু বিদেশ গিয়েছে৷ পড়াশোনা করতে৷ নব্বইয়ের দশকে আমার দিদি যখন অ্যামেরিকায় পড়তে গেল, তখনো তা ছিল একটা ব্যাপার৷ পাড়ায় বেশ খবর হয়েছিল৷ একুশ শতকের গোড়ায় আমাদের প্রজন্ম যখন বিদেশ যাচ্ছে, তখন তা সকলের কাছে জল-ভাত৷ যারা গেল, তাদের অধিকাংশই কিন্তু পড়া শেষ করে ফিরে এসেছে দেশে৷ দেশের বিবিধ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, বিদেশি সংস্থায় মোটা মাইনের চাকরিতে ঢুকে পড়েছে৷ যারা থেকে গিয়েছে, তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো সময় দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করে রেখেছে৷ কেউ কেউ অবশ্য সুযোগ মতো পাসপোর্ট বদলে ফেলেছে, ভিসার সুবিধার্থে৷

তেমনই এক থেকে যাওয়া বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম অস্ট্রিয়ায়৷ বছর দশেক আগে৷ কার্যত পোশাকহীন অস্ট্রিয়া সে বছর জমিয়ে গরম উপভোগ করছে৷ মনে আছে, ভিয়েনার সিটি সেন্টারে মোৎসার্ট থিয়েটারের টিকিট কাটতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল এক বাঙালির সঙ্গে৷ বলতে দ্বিধা নেই, মধ্যবিত্ত পরিশীলতা ছিল না তাঁর মধ্যে৷ পেশায় রেস্তোরাঁকর্মী ওই বাঙালি পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার এক হদ্য গ্রামের বাসিন্দা৷ কিভাবে অস্ট্রিয়ায় পৌঁছে গেলেন, তা বলতে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়েছিলেন৷ দশ ক্লাসের পর পড়াশোনা ছেড়ে বাবার জমিতে চাষ, এই ছিল তাঁর ভবিতব্য৷ সেখান থেকে অস্ট্রিয়া পৌঁছানোর গল্প অনেকটা রূপকথার মতোই৷ আজ যেই অভিবাসীরা বসনিয়া সীমান্তে আটকে পড়েছেন এবং খবর হচ্ছেন, ভাগ্য সহায় না হলে ওই ভদ্রলোকও তেমন খবর হতে পারতেন৷ প্রায় বছরখানেকের চেষ্টায় এ দেশ ও দেশে পালিয়ে বেরিয়ে অবৈধ ভাবে অস্ট্রিয়ায় পৌঁছান তিনি৷ বিয়েও করেন এক অস্ট্রিয়ার নারীকে৷ অর্থের বিনিময়ে৷ তাতে নাকি বৈধ নথি পেতে সুবিধা হয়৷ সেই থেকে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কাজ করতে শুরু করেছেন ওই বাঙালি৷ এখন শেফের সহযোগীর প্রোমোশন পেয়েছেন৷

যে ভদ্রলোকের কথা বললাম, তিনি মধ্যবিত্ত ছিলেন না৷ কিন্তু বিদেশের স্বপ্ন বা মোহ ছিল তাঁর৷ তিনি জানতেন, বিদেশ চলে যেতে পারলে জীবন বদলে যায়৷ ঠিক যেমন এক সময় মধ্যবিত্ত বিমল জেঠুরা ভাবতেন৷ শিক্ষিত বিমল জেঠুরা বৈধ পদ্ধতিতে বিদেশ গিয়েছিলেন৷ 'অশিক্ষিত' ওই রাঁধুনি অন্য রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন৷ বিদেশ, তা মধ্যপ্রাচ্যও হতে পারে, অ্যামেরিকাও হতে পারে, অথবা ইউরোপ৷ দালাল যেখানে পৌঁছে দেবে৷ বলার কথা এই যে, উনিশ-বিশ শতকে উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত ভারতীয় যে স্বপ্ন দেখতেন, একুশ শতকে সেই স্বপ্ন দেখছেন নিম্নবিত্ত মানুষ৷ এখন উচ্চ ও মধ্যবিত্তের বিদেশে গিয়ে থেকে যাওয়ার চাহিদা কম, নিম্নবিত্তের বেশি৷

তথ্য দিয়ে এ লেখা ভারাক্রান্ত করার ইচ্ছে নেই৷ তবু সামান্য নথি তুলে ধরা যাক৷ হিসেব বলছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শুধুমাত্র অ্যামেরিকায় ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ৷ ২০১৭ সালে অ্যামেরিকায় অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা ছি্ল পাঁচ লাখ ২৫ হাজার৷ ২০১০ সালে সেই সংখ্যাটাই ছিল চার লাখ৷ তার দশ বছর আগে সংখ্যাটা ছিল দুই লাখ ৪০ হাজার৷ এ তথ্য থেকেই স্পষ্ট দালাল ধরে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে৷ নিম্নবিত্ত মানুষ সে পথ নিচ্ছেন৷ তুলনায় মধ্যবিত্ত বৈধ পথে থাকার জন্য কম যাচ্ছেন৷

Syamantak Ghosh

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

অর্থাৎ, যত দিন যাচ্ছে, ইউরোপ এবং অ্যামেরিকায় অবৈধ ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা বাড়ছে৷ দেশের গরিব মানুষ এখন অ্যামেরিকান ড্রিমে মগ্ন৷ পাঞ্জাব থেকে কী ভাবে অবৈধ পথে ক্যানাডা এবং অ্যামেরিকায় নাগরিকদের নিয়ে যাওয়া হয়, তা নিয়ে বছর দুয়েক আগে এক চমৎকার ছবি বানিয়েছিলেন এক পরিচালক৷ উল্লেখ্য, এক সময় তিনিও ওই পথেই ক্যানাডায় গিয়েছিলেন৷ জড়িয়ে পড়েছিলেন অপরাধমূলক কাজে৷ থাকতে পারেননি৷ ফিরে এসেছেন দেশে৷ আবার এ-ও সত্য, যাঁরা বিদেশ যাচ্ছেন অবৈধ পথে, তাঁদের অনেকেই দেশে অবৈধ কাজকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন৷

চাকরি সূত্রে আমার স্ত্রী থাকেন গুজরাতে৷ ওর বাড়িওয়ালা গল্প শুনিয়েছিলেন, কিভাবে গুজরাত ফাঁকা করে হাজার হাজার মানুষ বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন অবৈধ ভাবে৷ প্রথমে নিজে যাচ্ছেন, তারপর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাচ্ছেন সুযোগ মতো৷ আবার বিদেশ যেতে গিয়ে বন্দি হয়েছেন, এমন গল্পও আছে৷ এমন পরিবারের সঙ্গেও কথা হয়েছে, যাঁদের পরিবারের কোনো এক সদস্যের সঙ্গে দশকের পর দশক কোনো যোগাযোগ নেই৷ শেষ খবর মিলেছিল, অভিবাসন দফতর আটক করে জেলে পুড়ে দিয়েছে৷

বসনিয়ায় যে বাংলাদেশি মানুষদের ছবি তুলে ধরেছেন সহকর্মী অনুপম এবং আরাফাতুল ভাই৷ তাঁদের সঙ্গে ভারতের বহু মানুষের চেহারার কোনো তফাত নেই৷ তাঁরা যা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে গুজরাত-- একই কথা শুনেছি বিভিন্ন মানুষের মুখে৷ তাঁদের স্বপ্ন, অর্থনৈতিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা-- সবই কেমন একরকম৷ সমস্যাটা আসলে কোয়ালিটি লাইফের৷ ভালো খারাপের নিক্তিতে যার বিচার হয় না৷ বৈধ, অবৈধ এ সব কথারও আসলে কোনো অর্থ হয় না৷ মানুষ যখন মরিয়া হয়ে স্বপ্নের পিছনে ছোটে, ইতিহাস তাকে দুই ভাবে মনে রাখে-- অপরাধী অথবা হিরো৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন