দূরের তারা, কাছের তাঁরা | বিশ্ব | DW | 14.07.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ফুটবল

দূরের তারা, কাছের তাঁরা

জীবনের বাকিটা সময় এই বিশ্বকাপ স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে যাবো অবিরাম৷ তুলে আনবো অমূল্য সব মণিমুক্তো৷ এত কাছ থেকে মারাদোনা, ফন বাস্তেন, মেসি, নেইমার, হ্যাজার্ড, মদ্রিচদের দেখা! দূরের তারাদের এমন কাছের হয়ে যাওয়া বলে কথা!

মেসির ওই ঐশ্চরিক বাঁ পায়ের পাতা এত ছোট! নেইমার এমন ছিপছিপে; প্রায় হাড় জিরজিরে! পুঁচকে এডেন হ্যাজার্ডের শরীর এত সুগঠিত! রোমালু লুকাকু বিশালদেহী বুঝতাম, তাই বলে এমন দানবের মতো! উগো লরির হাতের পাঞ্জাও দেখি বিশাল! 

ওদিকে মার্কো ফন বাস্তেন আছেন ঠিক আগের মতোই; চুলের আধিক্য কমে যাওয়া এবং রং বদলে যাওয়াটুকুন বাদ দিলে৷ গ্যারি লিনেকারের ভেতর ইংরেজসুলভ অহমিকা তো দেখলাম না! পাচাত্তরেও ফুটবল নিয়ে কেমন মেতে কার্লোস আলবের্তো পাহেইরা! আর ‘পাগলা' হোসে লুইস চিলাভার্তের সেই পাগলাটে চাহনিটা তো রয়েছে ঠিকই; সঙ্গে শিশুর সারল্যমাখা হাসিও৷ বিসেন্তে লিজারাজু এতই ছোটখাট যে, রাস্তা দিয়ে হাঁটলে হারিয়ে যাবেন জনারণ্যে৷ সেই ভিড়েও মাথা উঁচু হয়ে থাকবেন মার্টিন কিওন৷

তাঁরা সবাই দূর আকাশের তারা৷ দূর থেকে দেখেছি এতকাল৷ তাঁদের আলো, তাঁদের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি; ফুটবলীয় সামর্থ্য-প্রজ্ঞায় কুর্ণিশ করেছি বারবার৷ কিন্তু বরাবরই তাঁরা থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ চোখ আর তারার মাঝে যেমন আকাশ-মহাকাশের ব্যবধান, আমাদের সঙ্গে ফুটবলের এসব রথী-মহারথীরও তাই৷ টেলিভিশন পর্দার বাধাটুকুন ঘোচেনি কখনো৷

Bangladeschischer Reporter in Russland (Noman Mohammad)

ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার মার্সেলোর সঙ্গে লেখক

রাশিয়া বিশ্বকাপে এসে তা ঘুচে গেল৷ আকাশের তারারা নেমে এলেন মাটিতে৷ নক্ষত্রের খইফোটার মতো তাঁরা ঘুরতে থাকেন চোখের সামনে৷ মাঠের খেলায়; সংবাদ সম্মেলনে; মিক্সড জোনে৷ সে কারণেই তো বিস্ময়ের ঘোর কাটে না কিছুতেই৷ প্রথম মহাকাশে গিয়ে ইউরি গ্যাগারিনও নিশ্চয় অমন অনন্ত-বিস্ময়ে ডুবে গিয়েছিলেন; প্রথম চাঁদে পা রাখা নীল আর্মস্ট্রংও৷ ফুটবল-নক্ষত্রদের চোখের সামনে, স্পর্শের দূরত্বে; নিঃশ্বাসের ব্যবধানে দেখে তাই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায় রোমাঞ্চে৷ এত দিনের টিভি পর্দায় দেখা, বই-সংবাদপত্রে পড়ার সঙ্গে মেলাতে চাই বারবার৷ তাতে বিস্ময় বাড়ে আরো; কমে না কিছুতেই৷

সমকালের সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেলমেসির সঙ্গে এমন প্রথম দেখা ব্রোনোত্‍সিতে৷ আর্জেন্টিনার বেস ক্যাম্পে৷ মস্কো শহরের ঠিক বাইরে ৬০ মাইল দূরত্বে আবাস গড়েছিলেন তাঁরা৷ ঘণ্টা দুয়েক ভ্রমণ শেষে, জনে জনে জিজ্ঞাসার পর খোঁজ মেলে অবশেষে আলবিসেলেস্তেদের৷ গণমাধ্যমের জন্য ১৫ মিনিটের উন্মুক্ত সেশনে চোখের সামনে কতো তারকা! গনসালো হিগুয়েইন, সের্হিয়ো আগুয়েরো, হাভিয়ের মাসচেরানো, পাউলো দিবালারা৷ কিন্তু দৃষ্টি শুধু খুঁজে ফেরে তাঁকে৷ মেসিকে৷ ওই তো ১০ গজ দূরত্বে দাঁড়িয়ে জাদুকর৷ একটু পর হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে যান মাঠের ভেতর৷ দলের অনুশীলনের সময়টায় অবশ্য নিজেকে গুটিয়ে রাখলেন পুরোপুরি৷ একটিবারের জন্য বলের সঙ্গে তাঁর পায়ের স্পর্শ হয়নি৷ জাদুকরী মুহূর্তের আক্ষেপ নিয়েই শেষ হয়ে যায় ১৫ মিনিট৷ হেঁটে বেরিয়ে যান৷ চর্মচক্ষের তৃষ্ণা তাতে মেটে না৷

Bangladeschischer Reporter in Russland (Noman Mohammad)

নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ফুটবলার মার্কো ফন বাস্তেনের সঙ্গে লেখক

মিটেছে পরে৷ স্পার্তাক স্টেডিয়ামে মেসিদের অনুশীলনে৷ সেন্ট পিটার্সবার্গে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে৷ সে ম্যাচের পরের সংবাদ সম্মেলনে৷ এমনিতে নাকি ম্যাচের আগে-পরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন না এই ফুটবল কিংবদন্তি৷ সেদিন নাইজিয়াকে হারানোর আনন্দেই কিনা চলে এলেন! মাত্র দুটো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে না হয় চলেও গেলেন, তবু তো মাত্র ৭-৮ হাত দূর থেকে দেখা হলো মেসিকে৷ জার্সি-শর্টসের সঙ্গে চপ্পল পরা অবস্থায়; ছেলের আঁকিবুকিতে পায়ে যে ট্যাটু এঁকেছেন – তা-ও দেখলাম স্পষ্ট৷

নেইমারের সঙ্গে প্রথম দেখাও অনুশীলনে৷ তবে সেটি দূর থেকে৷ চোখের সামনে চলে আসেন কোস্টা রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে৷ মিক্সড জোন দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যাবার সময়৷ আক্ষরিক অর্থেই তখন তিনি স্পর্শসীমায়৷ আর সার্বিয়ার বিপক্ষে খেললেনই তো চোখের ঠিক সামনে৷ স্পার্তার স্টেডিয়ামে সেদিন সিট পড়েছে একেবারে প্রথম সারিতে৷ টাচলাইন ২০ হাত দূরত্বেও না৷ বাঁ প্রান্ত দিয়ে নেইমার আক্রমণ করছিলেন যখন, এক অর্ধের পুরো ৪৫ মিনিট দেখলাম তাঁকে৷ তাঁর কারিকুরি; তাঁর জাদুকরী৷ ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে দেখা মেলে আবার৷ কথা বলেন না কারো সঙ্গে৷ কিন্তু সতীর্থদের সঙ্গে খোশগল্পে হেসে হেঁটে বেরিয়ে যান ঠিকই৷ বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর সে মুখেই কী রাজ্যের বিষন্নতা! ফেলিপে কুতিনিয়ো, গাব্রিয়েল জেসুস, থিয়াগো সিলভা –সবার৷

সেদিন মিক্সড জোন থেকে বেরোতেই আচমকা মার্সেলোর সামনে৷ ওখানে তখন তাঁর থাকার কথা নয়, কী যেন খুঁজছিলেন হন্তদন্ত হয়ে৷ 'টাফ লাক' বলে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টায় ভাষাটা বুঝলেন কী বুঝলেন না, কিন্তু সে ব্যবধান দূর হয়ে যায় সমবেদনার বৈশ্বিক ভাষায়৷ কাঁধ ঝুঁকিয়ে সমবদেনাটুকুন গ্রহণ করলেন মার্সেলো, এরপর ওই কষ্টসাগরে হাবুডুবু খেতে খেতেও মেটালেন ছবি তোলার আবদার৷ পেশাদারিত্বের খোলসে নিজেকে ঢেকে নিয়ে৷

পেশাদার হিসেবে সবচেয়ে বড় সুখ্যাতি জার্মানদের৷ আত্মবিশ্বাসের জন্যও৷ বিশ্বকাপে তাঁরা প্রথম ম্যাচে হারে মেক্সিকোর কাছে৷ মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামের সে খেলার পর সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন কোচ ইওয়াখিম ল্যোভ৷ সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের দুর্দশার কথা মনে করিয়ে ছোঁড়া প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘‘আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, ওই দলগুলোর মতো জার্মানি প্রথম রাউন্ডে বাদ হবে না৷'' লাইটের আলোয় ল্যোভের চেহারায় তখন দেখেছি ঝিকঝিকে আত্মবিশ্বাস৷ আর বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে সত্যি সত্যি জার্মানি বাদ হবার পর স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে ১৭ জুনের লুজনিকির সংবাদ সম্মেলনে ফিরে সেটিকে মনে হয় আত্মম্ভরিতা৷

রাশিয়া বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি ব্রাজিল৷ তবে ‘সংবাদ সম্মেলনে চ্যাম্পিয়ন' দলের কোনো মুকুট থাকলে সেটি ব্রাজিলেরই প্রাপ্য৷ কোচ তিতের উপস্থিতিতে তা কেবল প্রশ্নোত্তর পর্বে সীমিত থাকে না, হয়ে যায় ফুটবল-দর্শনের উপভোগ্য শ্রেণিকক্ষ৷ সাংবাদিকদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক; প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করেন; আবার মজা-কৌতুকও করেন তিতে৷ আবার সংবাদ সম্মেলনে আসেনও দলবল নিয়ে৷ একেক ম্যাচে একেক অধিনায়ক তত্ত্বে মার্সেলো, থিয়াগো সিলভা, মিরান্দাদের নিয়ে এসেছেন৷ সঙ্গে কোচিং স্টাফের অনেককে৷ সংবাদ সম্মেলন শেষের পরও সঞ্চালককে থামিয়ে দিয়ে সহকারী কোচকে দেখিয়ে যেমন বলেন এক দিন, ‘‘আমি আরো কিছুক্ষণ বসছি৷ কারণ, আপনারা তো সিলভিনহোকে তেমন কোনো প্রশ্ন করেননি৷ একটি কঠিন প্রশ্ন করুন ওকে; দেখি কী বলে!'' হাসির হুল্লোড় বয়ে যায় কক্ষজুড়ে৷

আর্জেন্টিনার কোচ হোর্হে সাম্পাওলির সংবাদ সম্মেলনগুলো ঠিক উলটো৷ সেখানে বাজে বিষাদের বিষণ্ণ সুর, কখনো তা হয়ে ওঠে উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মতো৷ নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি বাদ দিলে নিজেদের আত্মরক্ষা করতে করতেই তো দিন গেছে সাম্পাওলির৷ আর মেসি বন্দনা৷

ফ্রান্সের দিদিয়ে দেশঁ-ও সবসময় কেবল বলেন খেলোয়াড়দের কথা৷ নিজে অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সকে জিতিয়েছেন বিশ্বকাপ৷ কিন্তু সে আলোচনায় তাঁকে টানা দায়৷ অতীত স্মৃতিতে বাঁচেন না দেশঁ, তৈরি করতে চান নতুন স্মৃতি৷ কথার ভাঁজে ভাঁজে বুঝিয়ে দেন তা৷

Noman Mohammad (privat)

নোমান মোহাম্মদ, ক্রীড়া সাংবাদিক

বিশ্বকাপের আকাশে বর্তমান তারকারাই যে জ্বলজ্বল করেন, তা নয়৷ পুরনো তারার হাটও বসে সেখানে৷ যাঁদের দ্যুতি কমেনি এখনো৷ যেমন, মার্কো ফন বাস্তেন৷ সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ডাচ ফরোয়ার্ডকে পেয়ে যাই ফ্রান্স-বেলজিয়াম সেমিফাইনালে; সেন্ট পিটার্সবার্গে৷ শশব্যস্ত তিনি, তবু দু'দণ্ড দাঁড়িয়ে কথা বলেন, ছবি তোলেন৷ ১৯৮৮ ইউরো ফাইনালের সেই অত্যাশ্চর্য ভলির গোলকে বর্ণনা করেন ‘স্বর্গ থেকে আসা' হিসেবে৷ ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী কোচ কার্লোস আলবের্তো পাহেইরা বুড়িয়ে গেলেও এখনো কী কর্মক্ষম! গ্যারি লিনেকার অমনই হাস্যোজ্জ্বল৷ বিশালবপু নিয়ে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক হোসে লুইস চিলাভার্ত ছবি তোলার আবদারে জড়িয়ে ধরেন; বুড়ো আঙুল উঁচু করে পোজও দেন৷ ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী লেফট ব্যাক বিসেন্তে লিজারাজু তাঁর ছোট্ট শরীর নিয়েও যেমন৷

এবং তারকাকূলের বৃহষ্পতি দিয়েগো মারাদোনা৷ আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ড ম্যাচে দেখা হয়ে গেল তাঁর সঙ্গেও৷ স্পর্শের দূরত্বে ছিলেন না সত্যি৷ তবে যে গ্যালারির নীচে বসে খেলা দেখছিলাম সেই গ্যালারির মাঝামাঝিতেই ছিলেন তিনি৷ ৪৫ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্বে৷ দু'হাত উঁচিয়ে দর্শক অভিবাদনের জবাব দেন৷ অদ্ভুতুড়ে সানগ্লাসে নাচেন তাঁদের সঙ্গে৷ মেসির পেনাল্টি মিসের সময় আবার ঝিম মেরে থাকেন অভিমানী বালকের মতো৷ শিশুর সারল্যমাখা এই মারাদোনাকে ভালোবাসে সবাই্ তাঁর যাবতীয় মানবীয় ভুল সত্ত্বেও৷ মাঠের খেলায় মেসিদের চেয়ে গ্যালারিতে মারাদোনার আকর্ষণও কম ছিল না৷ চোখের সামনে খেলা আর পেছনে মারাদোনার ওই আনন্দ-মেলা দেখতে দেখতে ঘাড়টাই সেদিন যেন বাঁকা হয়ে ৪৫ ডিগ্রি৷

জীবনের বাকিটা সময় এই বিশ্বকাপ স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে যাবো অবিরাম৷ তুলে আনবো অমূল্য সব মণিমুক্তো৷ এত কাছ থেকে মারাদোনা, ফন বাস্তেন, মেসি, নেইমার, হ্যাজার্ড, পগবা, মদ্রিচ, পাহেইরা, লিজারাজুদের দেখা! দূরের তারাদের এমন ‘কাছের তাঁরা' হয়ে যাওয়া বলে কথা!

প্রতিবেদনটি কেমন লাগলো জানান আমাদের, লিখুন মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন