1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

দুর্নীতির অভিযোগে রাজনীতিবিদদের ঘরে তদন্তকারীদের হানা

১৩ জুন ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পরে বেড়েছে পুলিশের তৎপরতা৷ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান, ধরপাকড় চালাচ্ছে একাধিক সংস্থা৷

https://p.dw.com/p/5FKvc
তৃণমূল বিধায়ক ও সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্রের বাড়িতে হানা দেয় এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট৷ ছবি: Satyajit Shaw

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে নানা অনিয়মের অভিযোগে পুলিশ তৃণমূলের বিধায়ক, প্রাক্তন বিধায়ক, পুরসভার চেয়ারম্যান-সহ নেতাদের গ্রেপ্তার করছে৷ তাদের ডেরায় অভিযান চালাচ্ছে৷

অভিষেকের বাড়িতে পুলিশ

শনিবার ভোররাত থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িকে কেন্দ্র করে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়৷ রাত প্রায় তিনটে নাগাদ পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানা ও কলকাতা পুলিশের একটি যৌথ দল কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে অভিষেকের পটুয়াপাড়ার বাসভবনে পৌঁছায়৷

স্থানীয় সূত্রে খবর, কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় ভোর পাঁচটা নাগাদ একটি বিপর্যয় মোকাবিলা দল ডেকে পাঠানো হয়৷ তারা তালা ভাঙল পুলিশ ভিতরে ঢুকে সাড়ে ছটা থেকে মূল তল্লাশি শুরু করে৷ দোতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত তল্লাশি চলে৷

শালবনি থানায় রুজু হওয়া একটি আর্থিক প্রতারণা মামলার তদন্তে অভিষেকের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের খোঁজে এই তল্লাশি৷ চার ঘণ্টারও বেশি সময় তল্লাশি চালানোর পর তৃণমূলের দাবি, বাজেয়াপ্ত করার মতো কিছুই মেলেনি৷ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন সকালে অভিষেকের বাড়িতে যান৷

অভিষেকের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তার নামে নতুন করে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে৷ বিধানসভার একটি জাল সই সংক্রান্ত মামলায় গত বৃহস্পতিবার সিআইডি তাকে ভবানী ভবনে প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল৷ এই তদন্তে ফের রবিবার তাকে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে৷

মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরাকে পুলিশ সম্প্রতি গ্রেপ্তার করে৷ সূত্রের খবর, তাকে জেরার সময়ে সুমিত রায়ের নাম উঠে আসে৷ সুমিতের মোবাইল ফোনের শেষ টাওয়ার লোকেশন অভিষেকের কালীঘাটের বাসভবনে মেলায়, সেখানে এদিন অভিযান চালায় শালবনি থানা৷

নজরে বিধায়ক মদন

পশ্চিমবঙ্গের পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে শনিবার সকাল থেকে কামারহাটির তৃণমূল বিধায়ক ও সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্রের বাড়িতে হানা দেয় এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট৷ তার সঙ্গে যুক্ত কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি অভিযান একযোগে শুরু করে ইডি৷  দক্ষিণেশ্বরে মদনের বাসভবন ছাড়াও ভবানীপুর, কালীঘাট, জোকা, বেহালা, বেলেঘাটা এবং সন্তোষপুর এলাকার একাধিক আবাসন, অফিস ও একটি ক্লাবে হানা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা৷

তদন্তকারীদের দাবি, কামারহাটি পুরসভায় অযোগ্য প্রার্থীদের বেআইনিভাবে চাকরি দেওয়ার বিনিময়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে মদনের বিরুদ্ধে৷ এই ধরনের ১২৫টিরও বেশি বেআইনি নিয়োগের সঙ্গে তিনি যুক্ত বলে অভিযোগ৷

এক মাসের তৎপরতা

ক্ষমতার পালাবদলের পরে পুলিশ, সিআইডি ও কেন্দ্রীয় সংস্থার যথেষ্ট তৎপরতা দেখা যাচ্ছে৷ যখন-তখন দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন তদন্তকারীরা৷ নেতা থেকে পুলিশ, সবাই রয়েছেন তদন্তের আওতায়৷

পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী সুজিত বসুকে৷ দুর্নীতির মামলায় ওড়িশা থেকে ধরা হয়েছে তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলকে৷ নেপাল সীমান্ত থেকে পাকড়াও করা হয় তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খানকে৷ তাকে ফলতায় নিয়ে এসে হাফপ্যান্ট পরিয়ে প্যারেড করিয়েছে পুলিশ৷ ধরা পড়েছেন কান্দির আইসি শান্তনু বিশ্বাস৷

সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে যুবভারতীর মেসি পর্ব নিয়ে অভিযোগে তৃতীয়বার নোটিস পাঠিয়েছে পুলিশ৷ এবার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাজিরা দিতে বলেছে৷ তার ভাই স্বরূপ বিশ্বাস আগেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ কলকাতা পুরসভার একের পর এক কাউন্সিলর পাকড়াও হয়েছেন৷

বাদুড়িয়ার চেয়ারম্যান দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ তার নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে পাটখেত থেকে৷ সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইউনিয়ন রুম থেকে পাওয়া গিয়েছে নষ্ট হওয়া টাকার বান্ডিল৷ সন্দেশখালি থেকে উদ্ধার হয়েছে বিপুল সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র৷

এমন নানা অভিযান, তল্লাশি, গ্রেপ্তারি চলছে রাজ্য জুড়ে৷ পুলিশের এই তৎপরতাকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন অনেকে৷

আমরা পুলিশের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়, দুই ভূমিকাই দেখতে পাচ্ছি: রঞ্জিত শূর

সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের নেতা ভাস্কর ঘোষ দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করছেন পশ্চিমবঙ্গে রাস্তায়৷ তিনি দেখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ আন্দোলনকারীদের দমাতে অতীতে লাঠি চালিয়েছে৷

ভাস্কর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমরা সরাসরি সরকার পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলাম৷ এখানে আমরা বলেছিলাম পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যে সম্মানহানি বিগত সরকারের হাতে হয়েছে, সেটার কারণ ছিল পুলিশকে সঠিকভাবে কাজ করতে না দেওয়া৷ আমরা বারবার বলে এসেছি পশ্চিমবঙ্গের পুলিশকে যদি সঠিকভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়, তারা দেশের সেরা পুলিশ বাহিনী হয়ে উঠতে পারে৷ কারণ তাদের সেই সক্ষমতা আছে৷ এখন সেই প্রমাণ পুলিশ বাহিনী রাখছে৷''

তিনি মনে করেন, ‘‘এই সরকার আপাতত পুলিশের কাজে হস্তক্ষেপ শুরু করেনি৷ পুলিশকে খোলা হাতে কাজ করতে দিচ্ছে৷ যার ফলে তাদের দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে৷''

সাবেক পুলিশকর্তা নজরুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘পুলিশের সব সময় আইন মেনে নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করা উচিত৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পুলিশমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি পুলিশকে দলদাসে পরিণত করেছিলেন৷ ফলে পুলিশ কাজ করতে পারত না৷ এখন তিনি নেই, ফলে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে৷''

তৃণমূল আমলে বিরোধীরা পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অভিযোগ তুলত৷ এ বিষয়ে নজরুল বলেন, ‘‘এতদিন পুলিশ নিষ্ক্রিয় মোটেই ছিল না৷ শাসকদলের অপরাধীদের বাঁচানো ও বিরোধী পক্ষের লোকেদের হয়রান করার জন্য পুলিশ খুবই সক্রিয় ছিল৷ এটা বলতে পারি পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছিল না৷ এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি পুলিশ অপরাধীদের ধরছে৷ এরপরে কী হবে আমি জানি না৷''

আইনের শাসন না শাসকের আইন

পুলিশের বিরুদ্ধে সাবেক তৃণমূল আমলে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে৷ সেই কামদুনি থেকে আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রতিবাদ তীব্রতর হয়েছে৷ এবার কি পরিস্থিতি বদলাচ্ছে?

মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী রঞ্জিত শূর ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমরা পুলিশের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়, দুই ভূমিকাই দেখতে পাচ্ছি৷ পুলিশ যেভাবে কোমরে দড়ি বেঁধে অভিযুক্তদের ঘোরাচ্ছে, তাতে দেশের আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে৷ এটা তাদের সক্রিয় ভূমিকা৷ আবার যখন তৃণমূল নেতাদের আদালতে পেশ করা হচ্ছে, তখন তাদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হলেও তাদের হেনস্থা ঠেকাতে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না৷''

প্রশ্ন উঠেছে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মনকে ঘিরে৷ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও তিনি তৃণমূলের আমলে ধরা পড়েননি৷ সম্প্রতি তিনি হঠাৎ নিউটাউন এলাকায় গাড়ি নিয়ে ধরা পড়লেও জামিন পেয়ে যান৷

সবমিলিয়ে এখনি পুলিশকে ফুল মার্কস দিতে রাজি নন আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম নেতা, চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো৷ তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আগেকার শাসকদলের যে সব দুষ্কর্ম, থ্রেট কালচার, দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তার বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে, এটা ভালো কথা৷ কিন্তু আরজি করে চিকিৎসকের হত্যার মামলায় কি পুলিশের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে? পুলিশ কর্তাদের সাসপেন্ড করা হলে তাদের গ্রেপ্তার করে জেরা করা হচ্ছে কি? সেটা তো দেখা যাচ্ছে না৷''

অনিকেত বলেন, ‘‘তৃণমূল নেতাদের দুয়ারে পুলিশ যাচ্ছে, এটাতে আমি খারাপ কিছু দেখছি না৷ কিন্তু যারা একটা তদন্তকে বিপথে চালিত করল, তাদের দুয়ারে কেন পুলিশ যাচ্ছে না? কেন বিনীত গোয়েলকে গ্রেপ্তার করে জানতে চাওয়া হবে না, কী কারণে তিনি তদন্ত ঠিক ভাবে করেননি৷''

নজরুল বলেন, ‘‘তৃণমূল আমলে তো নেতাদের আইন ছিল৷ এখন পুলিশ আইন অনুসারে কাজ করছে৷ আবার যদি নেতাদের আইন চালু হয়, তখন তার বিরোধিতা করতে হবে৷ পুলিশের উচিত খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে কাজ করা৷ তখন সেই অনুযায়ী কাজ করত না, সেটা অস্বাভাবিক৷ এখন যে দুয়ারে সিআইডি হয়ে কাজ করছে, সেটাই স্বাভাবিক৷''

ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি পায়েল সামন্ত৷
পায়েল সামন্ত ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি৷
স্কিপ নেক্সট সেকশন এই বিষয়ে আরো তথ্য