দুদকের পাস মার্ক পেতে এত দেরি! | আলাপ | DW | 25.02.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

দুদকের পাস মার্ক পেতে এত দেরি!

একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করতে আইনি কাঠামো, লোকবলসহ যা প্রয়োজন, তার মোটামুটি সবকিছুই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর আছে৷ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারকে সরকার চাইলেই কলমের এক খোঁচায় বরখাস্ত করতে পারে না৷ 

দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ও পুলিশের তৎকালীন ডিআইজি মিজানুর রহমানকে সম্প্রতি কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে

দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ও পুলিশের তৎকালীন ডিআইজি মিজানুর রহমানকে সম্প্রতি কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে

দুদক আইন ২০০৪-এর ৭ ধারা অনুযায়ী, কমিশনারদের মেয়াদকালের নিশ্চয়তা বিধান করে বলা হয়েছে, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যাতীত কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাইবে না৷’’

আইন অনুযায়ী, দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার যথাক্রমে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন৷

একজন চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনারের বাইরে দুদকের রয়েছে একাধিক মহাপরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালকসহ অসংখ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী৷ কিছু পদ শূন্য আছে বটে, তবে তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে নেই৷

দুদকের কোন কোন কাজ করার কথা? আইন অনুযায়ী, দুদকের কাজের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত, মামলা দায়ের ও পরিচালনা, দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ে গবেষণা পরিকল্পনা তৈরি করা এবং ফলাফলের ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ, সমাজে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টি করা, গণসচেতনতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা৷ এর বাইরে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত অন্য যে কোনো কাজ সম্পাদন করা৷

দুদকের আগে দুর্নীতি প্রতিরোধে যে প্রতিষ্ঠানটি ছিল, তার নাম দুর্নীতি দমন ব্যুরো৷ ব্যুরো বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের আইনের মধ্য দিয়ে ওই বছর দুদক প্রতিষ্ঠিত হয়৷

দুই দশকের কাছাকাছি সময় পার করলেও দুদকের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে৷ এখন বোধ করি, একটা নির্মোহ বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে পড়েছে৷ কারণ জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় ব্যয় হচ্ছে৷ সেই অর্থ দেশের সঠিক প্রয়োজনে ব্যয় হবে, এতটুকু প্রত্যাশা নাগরিকেরা করতেই পারে৷

স্বয়ং এই প্রতিষ্ঠানেরই একজন চেয়ারম্যান যখন বলেন, দুদক নখদন্তহীন বাঘ, তখন সত্যিই নড়েচড়ে বসতে হয়৷ আমরা ওই চেয়ারম্যানের কথা ভুলে যাইনি৷ ২০০৯ সালের ১৪ অক্টোবর দুদকে যোগদানের পর এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছিলেন, ‘দুদক এখন একটি দন্তহীন বাঘ৷ এর সঙ্গে বাঘের সব নখ কেটে দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাহীন করার প্রক্রিয়া চলছে৷’ চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৩ সালের ২০ জুন বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে একই বাক্য আবার ব্যবহার করেন তিনি৷ অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে দুনীতি দমনে কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারার ব্যর্থতা তিনি স্বীকার করে নেন৷ দুদকের আইন সংশোধন করতে না পারা ছিল তাঁর প্রধান খেদ৷ তবে কাজ না করার জন্য কখনো কখনো আইনের ছুতো দেওয়া আমাদের একটা জাতীয় অভ্যাস৷

গোলাম রহমান চলে যাওয়ার পর পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদী দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে৷ ইত্যবসরে, দুদক আইনের কিছু সংশোধনীও হয়েছে৷ এর মধ্য দিয়ে দুদকের ক্ষমতার আওতা আরও বেড়েছে৷ সেগুলো কি কি? এক সময় দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের মামলা করতে হতো পুলিশি থানায়৷ গত এক বছর ধরে তারা তাদের দপ্তরে মামলা করার সুবিধা ভোগ করছেন৷ এ ছাড়া গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযোগ অনুসন্ধান না করেই সরাসরি মামলা করতে পারে দুদক৷ এর বাইরে দুদক এখন তদন্ত বা অনুসন্ধানের জন্য আয়কর বিভাগ এবং ব্যাংকগুলো থেকে ব্যক্তির যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারে৷ দুদকের কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে৷ সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের গতিবিধি অনুসরণে তথ্যপ্রযুক্তি ও কল রেকর্ডের জন্য নিজস্ব সার্ভার স্থাপন করেছে দুদক৷

২.

কিন্তু কোনো কিছুই যেন দুদকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি করতে পারছে না৷  সম্প্রতি কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দীনের চাকরিচ্যুতি দুদকের দক্ষতা, যোগ্যতা এবং সদিচ্ছা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে৷ শরীফ উদ্দিন কক্সবাজারে সরকারের তিনটি উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের দুনীতির চিত্র অনুসন্ধান করে দুদকের চট্টগ্রামের দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিল করেন, ২০২১ সালের জুন মাসে৷ ওই প্রতিবেদনে কক্সবাজার জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন, পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমানসহ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ ১৫৫ জনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উল্লেখ করেন৷ সরকারের একজন সচিবও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে৷ কিন্তু দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতিবেদনগুলো নিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় না গিয়ে তা দিনের পর দিন ফেলে রাখেন৷ দুনীতির অনুসন্ধান করে শরীফ নাকি দুদককে বিব্রত করেছেন৷ শাস্তিস্বরূপ শরীফকে প্রথমে পটুয়াখালীতে বদলি, পরে চাকরিচ্যুত করা হয়৷ প্রভাবশালী মহলের জীবননাশের হুমকি মাথায় নিয়ে শরীফ এখন ঝুঁকির জীবনযাপন করছেন৷

প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদক তাঁর একজন সৎ, চৌকস অফিসারের পাশে না দাঁড়ালেও ইতিবাচক দিক হলো, শরীফের চাকরিচ্যুতির প্রতিবাদ করেন তাঁর সহকর্মীরাই৷ তারা মানববন্ধন রচনা করে বিরল এক উদাহরণ তৈরি করেন৷ শরীফের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে, এই মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বলা যায়৷ শরীফকে চাকরিচ্যুত করা হয় দুদক চাকরি বিধিমালার ৫৪ (২) বিধি অনুসারে৷ এই বিধি সংস্কারের দাবি অবশ্য সমর্থন করা যায়৷ কারণ দোষী ব্যক্তি হলেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়া নাগরিকের অধিকার৷

৩.

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হয় এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা, সদাচরণ এবং প্রতিষ্ঠানটির নিষ্ঠার মধদিয়ে৷

সততা নিয়ে প্রশ্ন সব সময় কমবেশি ছিল৷ যখন দুর্নীতি দমন ব্যুরো ছিল  তখনো এর গুটিকয় কর্মকর্তার নামে দুনীতির অভিযোগ ছিল৷ দুদক হওয়ার পরেও বিভিন্ন সময় কর্মকর্তাদের নামে অভিযোগ ওঠে৷ এই তো কয়েক মাসে আগে, ২০১৯ সালের জুন মাসে পুলিশের একজন ডিআইজি অভিযোগ করেন, দুদকের মামলা থেকে বাঁচিয়ে দিতে তদন্তকালে দুদকের একজন পরিচালক তাঁর কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন৷ এ ঘটনায় দুদকের তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে৷ তাহলে কি দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা চাইলেই ঘুষের বিনিময়ে কাউকে রেহাই দিতে পারেন কিংবা ঘুষ না পেয়ে কাউকে ফাঁসিয়ে দিতে পারেন? সেই প্রশ্নের কোনো সুরাহা এখন অবধি হয়নি৷ আদালত গত বুধবার উভয়কেই দণ্ড দিয়েছেন৷ এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, তদন্তকালে ঘুষ গ্রহণের চর্চা বিদ্যমান রয়েছে৷ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দুদক কর্মকর্তার মধ্যে ঘুষ লেনদেনের এই ঘটনা জনসমক্ষে এসেছে৷ এ রকম যে খবরগুলো অগোচরে রয়ে যায়, তার কি হবে?

এবার আসি নিষ্ঠার প্রশ্নে৷ কাজ দিয়ে দুদক এখন পর্যন্ত আস্থা অর্জন করতে পারেনি৷ তাঁদের উদাহরণ সৃষ্টি করা কাজের সংখ্যা সহজে মনে করা যায় না৷ এ কথা সবাই জানে এবং আলোচনা করে যে, দুদকের জালে কোনো রাঘববোয়াল, রুই, কাতলা ধরা পড়ে না৷ কেবল কিছু চুনোপুঁটি ওঠে৷ এত বড় একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, এত লোকবল, এত বিনিয়োগ, তার ফলাফল রীতিমতো শোচনীয়৷ বিদেশে অর্থ পাচারকারীরা দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না দুদক৷ আলোচিত বেসিক ব্যাংকের দুনীতির প্রশ্নে চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে দুদক অসহায়৷

অপরদিকে দুদকের ভুল তদন্তে পাটকল শ্রমিক জাহালমকে তিন বছর কারাবাস করতে হয়৷ নামের মিল থাকায় বিনা অপরাধে এক বছর কারাগারে কাটাতে হয় দিনমজুর শুক্কুর শাহকে৷ যেসব কর্মকর্তা এই ভুল তদন্তের সঙ্গে যুক্ত তাদের কোনো সাজা হয় না৷

শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতির পর অবধারিতভাবে এই প্রশ্ন চলে আসে, তবে কি দুদক দুষ্টের পালন আর শিষ্টের দমন করছে? দুদককে ১০০ তে পাশ মার্ক ৩৩ দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে৷

৪.

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি৷ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমাজে ন্যূনতম সাম্য প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি বিরাট বাধা৷ আমাদের দেশটা গরিব৷ আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করেছি বটে, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হয়নি আজও৷ সমাজের শরীরে ঢুকে আছে দুর্নীতির ভাইরাস৷ আজ অবধি এমন কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি, যা দিয়ে এই ভাইরাসকে মেরে ফেলা যায়৷

কিন্তু সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রত্যাশা করি৷ এখানেই দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা জোরালো হয়ে ওঠে৷ কিন্তু সেই ভূমিকাটা দুদক রাখতে পারছে না৷ দুনীতির বিরুদ্ধে শক্ত অভিযান পরিচালনা করতে পারছে না৷

কাজী আলিম-উজ-জামান: কবি ও গবেষক

কাজী আলিম-উজ-জামান: কবি ও গবেষক

আমরা এটা আশা করি না, দুদক রাতারাতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই বা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই হয়ে যাবে৷ কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে৷

একই সঙ্গে এ কথাটি আমরা বলতে চাই, দুদককে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং হচ্ছে৷ এ রকম করা হলে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা তৈরি হবে না৷

আমরা চাই, অসৎ সরকারি কর্মকর্তাদের মনে দুদক ভীতি তৈরি হোক৷

দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তার সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার৷ কারণ এখন একেকজন অফিসারের হাতে মামলার সংখ্যা অনেক বেশি৷ অতিরিক্ত মামলা তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়সারা তদন্তে উৎসাহিত করতে পারে৷

আইনসংশ্লিষ্টরা বলে থাকেন, দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগকে আরও শক্তিশালী হতে হবে৷ অনেক সময় উচ্চ আদালত থেকে দুদকের মামলার আসামিরা জামিন পেলেও দুদক কিছু জানতে পারে না৷ এটা একটা বড় ঘাটতি৷

দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি দরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা, আলোচনা ও শিক্ষা৷ সেই কাজটি মোটেই দৃশ্যমান নয়৷

এই অভিমত প্রকাশের শেষলগ্নে এসে রাজনীতির কথা জোর দিয়ে বলতে হয়৷ কেবলই আইনি সুরক্ষা আর প্রয়োজনীয় লোকবলই বাংলাদেশের মতো সীমিত গণতন্ত্রের দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা দেয় না৷ রাজনৈতিক সরকারের সদিচ্ছা খুব প্রয়োজন হয়৷ আর দুদকের মতো এসব প্রতিষ্ঠানের যিনি প্রধান ব্যক্তি, তাঁকে হতে হয় আপসহীন, অনমনীয় মানসিকতার৷ দুই জায়গাতেই বাঁধন ঢিলেঢালা৷ পাস মার্ক পেতে আর কত দিন লাগবে দুদকের?

সংশ্লিষ্ট বিষয়