ত্রিপুরায় ‘তৃণমূলের পথে′ বিজেপি | বিশ্ব | DW | 12.11.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

ত্রিপুরায় ‘তৃণমূলের পথে' বিজেপি

পশ্চিমবঙ্গের পথে হাঁটলো ত্রিপুরা। পুর নির্বাচনে ৩৪ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বিজেপি প্রার্থীরা। পশ্চিমবঙ্গেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের ৩৪ শতাংশ প্রার্থী এভাবে জিতেছিলেন।

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

ত্রিপুরায় পুর নির্বাচনে ৩৩৪টি আসনের মধ্য়ে ১১২টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী বিজেপি প্রার্থীরা। তার অর্থ, ১১২টি আসনে বিরোধীরা কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি বা দেয়নি। কোনো নির্দলও সেখানে প্রার্থী হননি। বাকি ২২২টি আসনের জন্য অবশ্য ৭৮৫জন প্রার্থী আছেন। ওই আসনগুলিতে গড়ে তিনজনের বেশি প্রার্থী আছেন।

বছর তিনেক আগে পশ্চিমবঙ্গের পুরভোটেও একই ছবি দেখা গিয়েছিল। সেবারও রাজ্যের ৩৪ দশমিক দুই শতাংশ আসনে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে পারেনি। তাদের অভিযোগ ছিল, তৃণমূলের গুণ্ডারা তাদের মনোননপত্র জমা দিতে দেয়নি। অনুব্রত মন্ডলের জেলা বীরভূমে তো ৯০ শতাংশ আসনেই বিরোধী প্রার্থী ছিল না।

পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার পরিস্থিতিতে আশ্চর্য মিল।  দুই রাজ্যেই পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩৪ শতাংশ আসনে ক্ষমতাসীন দল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গেল। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ও ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতায়। দুই রাজ্যেই ক্ষমতাসীন দলের যুক্তিও এক, বিরোধীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পারলে কী করা যাবে?

ত্রিপুরার পরিস্থিতি

রাজ্যের সাতটি পুরসভায় একজনও বিরোধী সদস্য নেই। বিজেপি-র প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে আমবাসা, জিরানিয়া নগর, মোহনপুর, বিশালগড়, উদয়পুর, শান্তিবাজার ও রানীনগর পুরসভা।

সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেছেন, ''প্রার্থীদের জোর করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছে। বিজেপি আশ্রিত গুণ্ডারা এই কাজ করেছে।'' তার দাবি, ''পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘোষণার অনেক আগে থেকেই সহিংসতা চলছে। সাতটি পুরসভা ও নগর পঞ্চায়েতে সিপিএম প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়নি। বিজেপি গুণ্ডাদের জন্যই এই অবস্থা।''

বিজেপি-র বক্তব্য

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা সৌরভ শিকদার ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ''পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ত্রিপুরার একটা ফারাক আছে। পশ্চিমবঙ্গে দেখেছি, বিরোধীদের মনোনয়নপত্র পেশ করতে দেয়া হয় না। গুলি চলে। এরকম কোনো ঘটনা ত্রিপুরায় ঘটেনি। ওখানে দীর্ঘ শাসনের পর বামেরা প্রায় মুছে গেছে। ওখানে বিরোধী নেই। আমরা তো আর ওদের প্রার্থী দাঁড় করাবো না।'' সেক্ষেত্রে বাকি ২২২টি আসনে ৭৮৫ জন প্রার্থী কী করে দাঁড়ালো? সৌরভের জবাব, ''ত্রিপুরায় কোনো সহিংসতা হযনি। গুলি চলেনি। মামলা হয়নি। তারপরেও বিরোধীরা প্রার্থী দাঁড় করাতে না পারলে দায়টা ওদের।''

তৃণমূল যা বলছে

তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ''ত্রিপুরায় তো বিরোধীদের প্রার্থীই হতে দিচ্ছে না বিজেপি। মারামারি করছে। বাধা দিচ্ছে। সহিংসতা করে বিরোধীদের আটকাচ্ছে। নাম ঘোষণা হলেই বাড়ি গিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। মনোনয়নপত্র জমা দিলে জোর করে প্রত্যাহার করাচ্ছে।''

পশ্চিমবঙ্গেও তো গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে একই অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। তাহলে তো পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা এক্ষেত্রে একই জায়গায় আছে? কুণালের জবাব, ''দুই রাজ্য়ের পরিস্থিতির কোনো তুলনাই হয় না{ পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়নের কারণে মানুষ বিরোধীদের দিকে যেতেই চান না। বিধানসভা ভোটের আগে য়ারা গেছিলো, তারাও তো সব ফিরে আসছে{ বিজেপি-র অন্দরের বিরোধ তো প্রমাণিত। আর ত্রিপুরায় সন্ত্রাস চালিয়ে এই কাজ করছে বিজেপি। এটাই তফাৎ।''

কেন এই অবস্থা?

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি করছেন সাবেক বিরোধী নেতা আব্দুল মান্নান। তিনি একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে উঠে এসেছেন। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেছেন, ''বাম আমলেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে জোর করে বিরোধীদের প্রার্থী দাঁড় করাতে দিতো না। কংগ্রেস আমলে এসব হতো না। কিন্তু বাম আমলে হয়েছে। তৃণমূলের সময় তা অনেক বেড়ে গেছে।'' আব্দুল মান্নানের মতে, ''রাজনীতির অপরাধকরণ সম্পূর্ণ। নেতাদের যে কোনোভাবে রোজগার করতে হবে। সেটা করতে গেলে যেভাবে হোক জিততে হবে। ক্ষমতাসীন দল দেখছে, বিরোধীশূন্য হয়ে গেলে তাদের বিরুদ্ধে কেউ বলতে পারবে না। রাজনৈতিক দল ক্রিমিনালদের উপর নিভরশীল হলে এটাই হয়।'' মান্নানের মতে, ''নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতি করলে এটা হতো না।'' 

প্রবীণ সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্রও একটা বিষয়ে আব্দুল মান্নানের সঙ্গে একমত, সেটা হলো, বাম আমলেও বিরোধীদের পঞ্চায়েতে প্রার্থী দিতে দেয়া হয়নি। ডয়চে ভেলেকে শুভাশিস বলেছেন, ''আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার সংখ্যাটা ছিল কম। দশ শতাংশের মতো প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিততেন। এখন সেই পরিমাণটা অনেক বেশি।''  শুভাশিস মনে করেন, ''এটা একদিনে হয়নি। গ্রাম্য রাজনীতিতে বামপন্থিদের হাত ধরে এর জন্ম। তারপর ২০১৮ সালে রাজ্যে ৩৪ শতাংশের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃণমূলের প্রার্থীরা জিতলেন। প্রায় এক কোটি মানুষ ভোট দিতে পারলেন না।''

​​​​​​​

বাংলা পথ দেখাচ্ছে

শুভাশিস মনে করেন, ''এখন এই সহিংসতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অঙ্গ হয়ে গেছে। ত্রিপুরাও বাংলাভাষী রাজ্য। সেখানেও একই সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে তো কিছুদিন আগে পঞ্চায়েত ভোট হলো। ছোটখাট ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু এরকম ঘটনার কথা শোনা যায়নি।'' তিনি আরো বলেন, ''আগে তৃণমূল অন্য রাজ্যে ছিল না। এখন তারা ত্রিপুরায় পা রাখছে। তাই তাদেরও প্রতিবাদ জানাতে হচ্ছে।''

আব্দুল মান্নান মনে করেন, ''রাজনীতি এখন করে খাওয়ার জায়গা হয়ে গেছে। তাই এই অবস্থাই হবে। এখন যে কোনো নেতাই গাড়ি করে ঘুরছে। হিল্লি, দিল্লি যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে। সেই সব টাকা রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে অপরাধীদের রমরমা।''

দুইটি প্রধান দল থাকায় ‘বিপদ'?

মান্নান বলেছেন, ''এ কথা ঠিক একাধিক শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে সরকারকে সংযত হয়ে চলতে হয়। গণতন্ত্রে বিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে শাসকরা বিরোধী দলের সমালোচনা শুনতেই রাজি নয়। তাদের মধ্যে ডিক্টেটরসুলভ ভাব এসে গেছে। দলের মধ্যেও নীতি-আদর্শের বালাই নেই। নেতাকে সন্তুষ্ট করতে হবে, এটাই সব।''

শুভাশিসের বিশ্লেষণ একটু অন্যরকম,''পশ্চিমবঙ্গে একটি বিরোধী দলই সবসময় শক্তিশালী থেকেছে। তাই একাধিক শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে কী হতো, তার কোনো অভিজ্ঞতা পশ্চিমবঙ্গের নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলের অগণতান্ত্রিক মনোভাব ২০০৩ সাল থেকে ক্রমশ বেড়েছে। এখন মাত্রাছাড়া জায়গায় চলে যাচ্ছে।''