তৃতীয় লিঙ্গের পক্ষে বার্তা দিলো ‘নগরকীর্তন’ | বিশ্ব | DW | 07.03.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

তৃতীয় লিঙ্গের পক্ষে বার্তা দিলো ‘নগরকীর্তন’

তৃতীয় লিঙ্গকে স্বীকৃতি দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত৷ তবুও চেনা ছকের বাইরে থাকা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা ব্রাত্য রয়ে গিয়েছেন৷ তাঁদের জীবন ঘিরে তৈরি ছক-ভাঙা নতুন সিনেমা কি পারবে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে?

খ্যাতনামা বাঙালি পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক ছবি ‘নগরকীর্তন'-এ রূপান্তরকামী সমাজের অনেক কথাই বলা হয়েছে৷ কেন্দ্রীয় চরিত্র পুঁটি ওরফে পরিমলের কাহিনি মিলে যাচ্ছে অনেকের জীবনের সঙ্গে৷ পুঁটিকে ‘পুরুষের শরীরের খাঁচায় বন্দি নারী মন'-এর জন্য বাড়ি ছাড়তে হয়৷

এমনই গল্পতো উৎসব গঙ্গোপাধ্যায়েরও৷ লেক গার্ডেন্সের উৎসব যেদিন বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন, সেদিন ঠাকুমার ব্লাউজ, মায়ের শাড়ি আর প্রতিবেশীদের নকল চুল, লিপস্টিক খোয়া গিয়েছিল৷ উৎসবের মা অপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায় সেদিন এ সবের মানে কিছুই বুঝতে পারেননি৷ তারপর আস্তে আস্তে সমাজটাকে একটু একটু করে পালটাতে দেখেছেন তিনি৷ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় বেরোনোর পর রূপান্তরকামী বা ট্রান্সজেন্ডার সম্পর্কে তাঁরও ধারণা গড়ে উঠেছে৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘আমার কোনো লজ্জা নেই বলতে যে উৎসব আমার মেয়ে৷ আমি খুব সাধারণভাবেই বলতে পারি, আমার এক ছেলে, এক মেয়ে৷'' 

অডিও শুনুন 08:59

‘ফিল্ম, স্টেজ, অভিনয় একটা জোরালো মাধ্যম’

আবার উৎসবের মতোই অতীত ব্যারাকপুরের মেকআপ শিল্পী ও মডেল অদিত্রি চৌধুরীর৷ তিনি জন্মেছিলেন ছেলে হয়ে৷ কিন্তু তাঁর মহিলাতে রূপান্তরের সার্জারিকে মেনে নিয়েছেন তাঁর মা মীনা চৌধুরী আর বাবা নন্দলাল চৌধুরী৷ তাঁরা রূপান্তরকামিতা নিয়ে কোনো ছুঁৎমার্গ রাখেননি৷ তাঁরা সন্তানের পরিস্থিতি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ এমন অজস্র নমুনা ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারপাশে

কী বলছেন বিশিষ্টরা?

এলজিবিটি সম্প্রদায়ের জন্য ছবি এর আগেও হয়েছে৷ ২০১০ সালে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি ‘আরেকটি প্রেমের গল্প'-র মতো দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল ঋতুপর্ণ ঘোষ অভিনীত ‘চিত্রাঙ্গদা' বা ‘মেমোরিজ ইন মার্চ'৷ কিন্তু ২০১৯-এর ‘নগরকীর্তন' ছবিটি পেয়েছে আরও বেশি জনপ্রিয়তা৷ অনেকেই বলছেন, তৃতীয় লিঙ্গের ছক-ভাঙা জীবন এর থেকে পাচ্ছে সাহস এবং লড়াই করার উৎসাহ৷ ছবি সম্পর্কে পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘রূপান্তরকামী মেয়ে-পুরুষেরা দলে দলে আমার নগরকীর্তন ছবিটা দেখতে আসছেন৷ খোলাখুলি আলোচনা করছেন৷ ২০১০-এ ‘আরেকটি প্রেমের গল্প'-ও দর্শকদের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু তখন তৃতীয় লিঙ্গভুক্তদের ভিড় এতটা দেখিনি৷''

চলচ্চিত্র সমালোচক নির্মল ধর ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সমকামী বা ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে এইসব ছবি আরও বেশি করে করা উচিত৷ কৌশিক সেটাই করেছেন৷ তাতে আমাদের দৃ্ষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও বদলাবে৷ এর আগে ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরে এই বিষয় নিয়ে বাংলায় ছবি হয়ে থাকলেও সেখানে উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষদের দুঃখ-কষ্ট দেখানো হয়েছে৷ কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবিতে রাস্তার বৃহন্নলাদের জীবন বা আম রূপান্তরকামীর জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, তাতে কোথাও দুঃখবিলাস নেই৷ এই ছবিটা হয়তো আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার সূচনা করবে৷'' 

এই ছবি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে, এ কথা মনে করেন সাহিত্যিক-সমালোচক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তিনি বলেন, ‘‘অতীতের অনেক সংস্কার থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি৷ তেমনভাবেই সভ্যতাকে নতুন দিক মেনে নিতে হবে৷ দুটো একই লিঙ্গের মানুষ, তাদের মধ্যে একজন একটু বেশি মেয়েলি, এই প্রেমটাও তো প্রেম৷ সেই জন্যই বাংলায় প্রথম এমন একটা প্রেমের ছবি দেখলাম যার সঙ্গে কোনো ছবি তুলনীয় নয়৷'' 

গোঁড়ামি কি দূর হবে?

অতীতে পরিচালক ওনিরের ‘মাই ব্রাদার নিখিল' কিংবা গত বছরের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘ইভনিং শ্যাডোস' - এইসব ছবিগুলি তুলে ধরছে এলজিবিটি সম্প্রদায়ের মানুষদের সুখ-দুঃখ৷ এই ছবিগুলি অভিভাবকের সঙ্গে তাঁদের ভিন্ন ধারার সন্তানদের টানোপড়েনের গল্প বলেছে৷ অদিত্রি চৌধুরীর মতো ভাগ্য সকলের হয় না৷ সকলেই পাশে পরিবারকে পান না৷ তাই প্রশ্ন উঠছে, চলচ্চিত্র কি পারবে সমকামিতা, রূপান্তরকামিতা নিয়ে সামাজিক ট্যাবু তথা গোঁড়ামি দূর করতে?

এ ব্যাপারে রূপান্তরিত নারী অভিনেত্রী তিস্তা দাস ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘ফিল্ম, স্টেজ, অভিনয় একটা জোরালো মাধ্যম৷ এর মাধ্যমে অনেক বড় বার্তা দেওয়া যায়৷ তবে কিছু মানুষ থাকে, যারা কোনো কিছুতেই মানবে না৷ কিন্তু তাদের কথা না ভেবে চেষ্টাতো করা উচিত৷ ফিল্মও সেই চেষ্টাটাই করে৷ তবে শুধু একটা ছবিতে কিছুই হবে না৷''

রূপান্তরকামীদের সহায়তার জন্য তিস্তার নিজের একটি সংগঠন আছে৷ সেখানে তিনি কাউন্সেলিংও করেন৷ তিস্তার কাছে রূপান্তরকামীদের অনেকেই সামাজিক, মানসিক সমস্যা নিয়ে যান৷ সেই ব্যাপারে তিস্তা বলেন, ‘‘অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যাপ্রবণও হয়ে পড়েন৷ ১০০ জনের মধ্যে ৪ জনের এই সমস্যা আছে৷ পরিবার বা সমাজকে সচেতন করতে আরও ছবি তৈরি করতে হবে৷ এলজিবিটিদের সমস্যা যাঁরা বুঝছেন, তাঁরা সংখ্যালঘু, সংখ্যাগরিষ্ঠরা কিন্তু বোঝেন না৷ এজন্য পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হবে৷ পরিবারকে বুঝতে হবে সমস্যাটা কোথায়! সমাজকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিবারের পাশে থাকাটাও কিন্তু দরকার৷'' 

পরিবর্তনের পথে এক পা

চলচ্চিত্র আর বাস্তবের মধ্যে মিলের মতো অমিলও আছে প্রচুর৷ পশ্চিমবঙ্গ ট্রান্সজেন্ডার বোর্ডের সদস্য রঞ্জিতা সিনহা বলেন, ‘‘দীর্ঘ কুড়ি বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি নানা ঘটনায় রূপান্তরকামীরা অত্যাচারিত হয়৷ ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে তাঁদের আত্মহত্যারও নজির প্রচুর আছে৷ সেই হিসেবে এমন প্রেমের ছবি করাকে স্বাগত জানাই৷ তবে আমার মনে হয়, শেষটা আরেকটু আশাবাদী হলে সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটা আশার বার্তা যেত৷ তবে সিনেমা এককভাবে মানুষের মনে বদল আনতে পারবে না৷ এগিয়ে আসতে হবে পরিবারের লোকজনেদেরও৷''

এই শহরের বাসিন্দাদের অনেকেই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমস্যা বুঝতে পারেন৷ প্রাচী সিনেমা হলে ‘নগরকীর্তন' ছবির দর্শক রূপালী সরকার ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘সত্যি বলতে তো এসব কিছুই জানতাম না৷ সিনেমার মাধ্যমে বুঝতে পারছি আসলে এঁরাও রক্তমাংসের মানুষদের মতো৷ এঁদেরও দুঃখ, শোক, ভালোবাসা আছে৷ এই ধরনের ছবি আরো তৈরি করলে আমরা অনেক কিছু জানতে পারব৷''

জানতে পারবেন রূপান্তরকামীদের আত্মীয়-পরিজনরাও৷ ৯-১০ বছর যাবৎ রূপান্তরকামী উৎসবের নিজের পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই৷ অপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায় এখন উৎসবকে শুধু একটিবারের জন্য চোখের দেখা দেখতে চান৷ তিনি উৎসবের এই নতুন সত্তাকে মেনে নিয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘সত্যি সমাজ কিছুটা হলেও পালটেছে৷ আমি তখন সেভাবে ভাবতে পারিনি৷ কারণ, আমি বুঝতে পারিনি ছেলের চিন্তাভাবনা৷ আমি যদি জানতে পারতাম, অন্যভাবে ভাবতাম বৈকি! এই সচেতনতার জন্যই এমন চলচ্চিত্রের দরকার, বাবা-মায়েরা যাতে সন্তানের অবস্থাটা বুঝতে পারেন৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন