তালেবানের দখলে আফগানিস্তান: দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণ | আলাপ | DW | 20.08.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

তালেবানের দখলে আফগানিস্তান: দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

আফগানিস্তানে রাজনৈতিক পটভূমির পরিবর্তন শুধু যে দেশটির মানুষের উপর প্রভাব ফেলে তা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকেও তাতে নড়েচড়ে বসতে হয়৷ দেশটি আবারও তালেবানের দখলে যাওয়া কী ইঙ্গিত দিচ্ছে এই অঞ্চলের জন্যে?

আফগানিস্তানের সঙ্গে ছয়টি দেশের সীমান্ত৷ তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি পাকিস্তানের সঙ্গে৷ প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন ভাগ করেছে দুই দেশে বসবাসরত পশতুনদের৷ ছুঁয়েছে পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখাওয়া, বালুচিস্তান, গিলগিট বালগিস্তানকে৷ ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের রয়েছে তাই নিবিড় সম্পর্ক

ঠিক এমন ভূরাজনৈতিক সুবিধাকেই পাকিস্তান কাজে লাগিয়েছিল আশির দশকে৷ আফগানিস্তান তখন সোভিয়েত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রনে৷ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সঙ্গে সহায়তায় আফগান মুজাহিদিনদের প্রশিক্ষণ দেয় পাকিস্তান৷ যার মধ্য দিয়েই পরবর্তীতে ঘটে তালেবানের উত্থান৷ ডয়চে ভেলের উর্দু বিভাগের সহকর্মী আবিদ হোসেন কোরেশি বলছিলেন, পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখাওয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানের সাদরান অঞ্চলের সংস্কৃতি, ভাষার মিল রয়েছে৷ সেখানকার পশতুভাষীরাই জন্মগতভাবে তালেবানের প্রধান শক্তি৷  

১৯৯৬ সালে প্রথমবার আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবানরা৷ এ সময় যে তিনটি রাষ্ট্র তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল তার একটি পাকিস্তান৷ তবে ৯/১১-র পর সেই দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে৷ কোরেশি বলেন, এরপর থেকে শুরু করে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বা জাতীয় পর্যায়ে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের দৃশ্যমান সেই নিবিড় যোগাযোগটি আর নেই৷ সময়ের সঙ্গে পাকিস্তান ছাড়িয়ে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, বিভিন্ন আরব রাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে৷ অর্থাৎ, পাকিস্তানের উপর তাদের নির্ভরতা অনেকটাই কমে গেছে৷

কিন্ত পাকিস্তানের বিভিন্ন উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর উপর তালেবানের প্রভাব অস্বীকারের উপায় নেই৷ নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিকই তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি তার একটি৷ নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তান সীমান্তভিত্তিক পশতুনদের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী শুধু গত মাসেই ২৬ টি সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেছে৷ এর বাইরেও পাকিস্তানের আরো উগ্রপন্থি গোষ্ঠী আছে, যাদের জন্য আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান অনুপ্রেরণার কারণ হয়ে উঠতে পারে৷ তবে এ নিয়ে ভিন্নমত সাংবাদিক আবিদ হোসেন কোরেশির৷ আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের খবরে পাকিস্তানে অবস্থানরত বিভিন্ন গোষ্ঠী উল্লাস প্রকাশ করলেও দেশটির তালেবান সমর্থকরা তাতে নতুন শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হবে- এমনটা তিনি মনে করেন না৷ তার মতে, আফগান তালেবান এখন আগের চেয়ে অনেক পরিণত৷ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নিজেদের নতুন নতুন গ্রুপ খুলেছে৷ তাদের এমনকি সামাজিক, সাংস্কৃতিক  কমিশন আছে৷ পাকিস্তানি তালেবান সেই তুলনায় ততটা পরিণত হতে পারেনি৷ খাইবার-পাখতুনখাওয়াসহ শহরাঞ্চলে যেসব উগ্র গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের কাছেও আফগান তালেবান আর আগের মতো সম্মানিত নয় বলে মনে করেন তিনি৷ তবে বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, তালেবান কাবুল দখলের পর উচ্ছাস লুকাতে পারেননি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান৷ তিনি একে তুলনা করেছেন দাসত্বের শেকল ভাঙার সঙ্গে৷ ভারতের সঙ্গে তালেবান পূর্ববর্তী আফগান সরকারের সুসম্পর্ক হয়ত পাক প্রধানমন্ত্রীর এমন উচ্ছাসের একটি কারণ হতে পারে৷

বিপরীত দিক থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত না থাকলেও তালেবানদের নতুন উত্থান ভারতের জন্য অস্বস্তির হয়েছে৷ এর ঐতিহাসিক কারণ তুলে ধরতে গিয়ে ডয়চে ভেলের হিন্দি বিভাগের নিখিল রঞ্চন তুলে ধরেন কান্দাহারে ভারতীয় বিমান অপহরণের ইতিহাস৷ ১৯৯৯ সালে নেপালের ত্রিভুবন থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট হাইজ্যাক করে নিয়ে যাওয়া হয় আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের ওই শহরে৷ নিখিল বলেন, অপহরণটি মূলত কাশ্মীরের জঙ্গিরা ঘটালেও তাতে সমস্ত সহায়তা দিয়েছিল তালেবান৷ ভারতের জন্য যা ছিল ভীষণ লজ্জাজনক৷ এই অপহরণ নাটকের ইতি ঘটে ভারতের কারাগারে জঙ্গিদের তিন নেতার মুক্তির মধ্য দিয়ে৷ এরপর স্বভাবতই তালেবানকে আর সুনজরে দেখার সুযোগ ছিল না ভারতের জন্য৷

নিখিল বলছিলেন, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তানে হামলা চালায় তখন ভারতকেও সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব দেয় বুশ প্রশাসন৷ সেই সময় বাজপেয়ী সরকার সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি৷ কিন্তু যুদ্ধ শেষে তালেবান শাসনের অবসান হলে দেশটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে৷ ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ৪০০ টি অবকাঠামো প্রকল্পে ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করে তারা৷ নয় কোটি ডলার খরচে নির্মিত পার্লামেন্ট ভবন উদ্বোধনে ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই যান দেশটিতে৷

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের বাণিজ্যিক সম্পর্কও উত্তরোত্তর বেড়েছে৷ ২০১৯-২০ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে৷ ইরান থেকে আফগানিস্তান হয়ে ভারতে গ্যাস সরবরাহের একটি পাইপলাইন প্রকল্পও ছিল আলোচনাতে৷ তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসায় ভারতের বিশাল আকারের এই বিনিয়োগ আর বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে৷ নিখিল জানান, এই পরিস্থিতিতে তালেবানের সঙ্গে দিল্লি প্রাথমিক একটি যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে৷ সরকার থেকে তা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করা হচ্ছে না, যা আসলে এই খবরের সত্যতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে৷

কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছালেও তালেবান নিয়ে ভারতের অস্বস্তি যে খুব সহজে দূর হবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ কারণ হিসেবে নিখিল বলেন, যে মতাদর্শের দ্বারা তালেবান চালিত সেটির উদ্ভব ভারতের দেওবন্দের মাদ্রাসা থেকে৷ এ কারণে দেশটির অনেক মুলসিম সংগঠন, ইসলামিক স্কলারদেরও তালেবানের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে৷ আফগানিস্তানে যখন তালেবান ক্ষমতায় যায় তখন একই ভাবাদর্শ বা ভারতে অবস্থানরত তাদের সমর্থক গোষ্ঠীরাও উৎসাহিত ও একত্রিত হতে চাইবে৷ বিশেষত কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের জন্য তালেবান বড় মাথা ব্যথার কারণ৷ সেখানকার ইসলামিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এর আগেও তালেবান ও আলকায়দার সম্পর্ক ছিল৷ ক্ষমতায় এসে তালেবান তদের সমর্থন দিক সেটি কখনো ভারত চাইবে না৷

ফয়সাল শোভন, ডয়চে ভেলে

ফয়সাল শোভন, ডয়চে ভেলে

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার জন্য সমস্যাটা ভিন্ন৷ ২০০০ সালের পর থেকে জেমা ইসলামিয়াহ, আইএসসহ বেশ কয়েকটি উগ্রপন্থি মুসলিম সংগঠনের বোমা হামলার শিকার হয়েছে দেশটি৷ তবে তাদের কারো সঙ্গে তালেবানের সরাসরি যোগাযোগ নেই বলে মনে করেন ডয়চে ভেলে ইন্দোনেশিয়া বিভাগের হেন্দ্রা পাসুহুক ৷ তিনি বলেন, উগ্রগোষ্ঠীগুলো তালেবানের উদাহরণ টেনে হয়ত আরো বেশি মনযোগ আদায়ের চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু ইন্দোনেশিয়াতে তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম৷ কেননা, দেশটির মুসলিমরা বরাবরই তালেবান মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে৷

তবে হেন্দ্রার মতে, তালেবানের আগমন ইন্দোনেশিয়ার আফগান শরণার্থী সমস্যায় নতুন প্রভাব ফেলতে পারে ৷ আফগানিস্তান যুদ্ধ চলাকালে দেশটির কয়েক হাজার মানুষ তৃতীয় কোনো দেশে পাড়ি জমানোর আশায় ইন্দোনেশিয়ায় আশ্রয় নেন৷ ইউএনএইচসিআর-এর হিসাবে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল আট হাজার৷ ২০১৬ সালে ১২৭১ জন, ২০১৮ সালে ৫০৯ জন ইন্দোনেশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়া বা আফগানিস্তানে ফেরত যান৷ নতুন করে যাতে শরণার্থী না আসতে পারে তা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার রয়েছে সতর্ক অবস্থান৷

ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার বাইরে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায়ও তালেবানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিদ্যমান৷ এই তিন রাষ্ট্রই বিগত বছরগুলোতে উগ্রপন্থি ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর হামলার শিকার হয়েছে৷ এদের কারো কারো সঙ্গে আফগানিস্তানে তালেবান মদতপুষ্ট আল-কায়দা, কারো সঙ্গে আইএসের সর্ম্পক থাকার তথ্য পাওয়া যায়৷ দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে পুনরায় তালেবান শাসন এসব দেশে উগ্রপন্থার বিস্তারে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে দিতে পারে, যার ধাক্কা হয়ত গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই লাগবে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়