ঢাকা: ঘরে বিপদ, বাইরে আপদ! | আলাপ | DW | 02.07.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

ঢাকা: ঘরে বিপদ, বাইরে আপদ!

নিমতলী-চকবাজার-বনানী-মগবাজার; অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঝরে গেছে শত প্রাণ৷ তবু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসতি নগরবাসীর৷ বিপদ ওৎ পেতে থাকে পথেও৷ শহর ঢাকায় পরিকল্পিত নগরায়ন রয়ে যায় শুধু কাগজেই৷

ঢাকা শহরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সুনির্দিষ্ট তালিকা কখনোই তৈরি হয়নি৷ সরকারের একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম সংখ্যা জানিয়েছে৷

ঢাকা শহরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সুনির্দিষ্ট তালিকা কখনোই তৈরি হয়নি৷ সরকারের একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম সংখ্যা জানিয়েছে৷

চলচ্চিত্র নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠু রিকশায় ছিলেন ধানমন্ডির এক সড়কে৷ আচমকা পায়ে চলা পথের গাছের পতনে প্রাণ হারান তিনি৷ এটা পাঁচ বছর আগের দুর্ঘটনা৷ সম্প্রতি খিলগাঁওয়ে নর্দমায় হারিয়ে মারা গেছে একজন যুবক৷ আর পায়ে চলা পথে যানবাহন উঠে এসে কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের ইটের পতনে পথচারীর মৃত্যু ঢাকা শহরের নিয়মিত আসা দুঃসংবাদ৷

এভাবেই ঢাকা শহরে পদে পদে অপেক্ষা করে থাকে বিপদ৷ সেটা বাইরে শুধু নয়, ঘরের ভেতরেও থাকে৷ হালে এসি বিস্ফোরণে আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা কিন্তু কম নয়৷ বিদ্যুৎজনিত আরো ঝুঁকি আছে রাজধানী ঢাকায়৷ ঘিঞ্জি এলাকায় ভবনের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে সঞ্চালনের তার৷ কোনো কোনো বাড়ির বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই ধরা যায় খুঁটির তার কিংবা ট্রান্সফরমার৷ ২০১০ সালের ৩ জুন পুরনো ঢাকার নিমতলীতে যে আগুনে ১২৪ জন মানুষ মারা যায়, সেখানে এমন ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন৷ তখন শহরের ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে কথা হলেও সমস্যার সমাধান আজো হয়নি৷ শহরের বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা মাটির নিচে নেয়ার উদ্যোগ এখনো আছে পরীক্ষামূলক অবস্থায়৷

অডিও শুনুন 01:36

জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে, তা বাস্তবায়ন হয় না: আজিম বখশ

অন্যদিকে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় যে আগুন রাস্তা থেকে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে৷ সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণই ছিলো প্রধান কারণ৷ আর গলি আগুনের নদীতে পরিণত হয় বাড়িতে বাড়িতে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের গুদাম থাকায়৷ সেই অগ্নিকাণ্ডে ৭৮ জন মানুষ প্রাণ হারালেও এখনো রয়ে গেছে রাসায়নিকের গুদাম৷ পুরান ঢাকার বাইরে রাসায়নিক গুদাম নিয়ে যাওয়ার সরকারি উদ্যোগ এগুচ্ছে ধীরগতিতে৷ সচেতন হয়নি স্থানীয় বাড়িওয়ালারাও৷ তবে দায় ভাড়াটিয়াদেরও আছে বলে মনে করেন ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিম বখশ৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ভাড়া দেয়ার বিষয়টাও কিন্তু কঠিন৷ ভাড়া নেয়ার সময় অনেকেই সরাসরি জানায় না রাসায়নিক পদার্থের গুদাম করবে৷

তবে পুরান ঢাকার নগরায়নের বিশৃঙ্খলা দূর করার উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকার আদি বাসিন্দা আজিম বখশ৷ তিনি জানান, এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন কাজ করতে হবে৷ জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে, তা বাস্তবায়ন হয় না৷

তিনি আরো বলেন, পুরান ঢাকায় অনেক দোকান আছে৷ এরমধ্যে রেস্তোরাঁগুলোয় চুলা অবশ্যই থাকে৷ এগুলো সারারাত খোলা থাকে৷ এগুলোতে মানুষ খাবার খায়৷ ব্যবসা না চললে দোকান খোলা রাখা সম্ভব ছিল না৷ এসব বাস্তবতার কারণে পুরান ঢাকায় বাসাবাড়ি, দোকান- এভাবে মিশ্র নগরায়ন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন৷

ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কত?

ঢাকা শহরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সুনির্দিষ্ট তালিকা কখনোই তৈরি হয়নি৷ সরকারের একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম সংখ্যা জানিয়েছে৷ ২০১৬ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জানানো হিসেবে শহরে ঝুঁকিতে আছে এমন ভবন সংখ্যা ৭২ হাজার৷ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পাঁচ বছর আগের একটি হিসেবে ঢাকা শহরে ভবনের সংখ্যা ২২ লাখ৷ সেই সময় তারা অতি ঝুকিপূর্ণ বলেছিলো ৩২১টি ভবনকে৷ যার মধ্যে পুরান ঢাকায় রয়েছে ৩৯টি৷ তবে তাদেরই এক জরিপ থেকে জানা যায়, ঢাকা নগরের ৭৫ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে নিয়ম লঙ্ঘন করেছে৷ এ হিসেবে সেসব ভবনে নিরাপত্তাহীনতার বিষয় রয়েছে৷

রাজধানী ঢাকার সেবাসংস্থাগুলোর অপরিকল্পিত সঞ্চালন লাইনের কারণে অনেক এলাকা বিপদজনক পরিস্থিতিতে পড়তে পারে৷ আবাসিক ভবনের পাশে কলকারখানা গড়ে উঠার কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়৷ বাড়িতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ অবকাঠামোর কারণেও ঝুঁকি তৈরি হয়৷ মগবাজারে ২৭ জুনের গ্যাস বিস্ফোরণে ১১ জনের যে প্রাণহানি হলো, সেখানে গ্যাস লাইনের ত্রুটির বিষয়টি সামনে এসেছে৷ আবার বর্জ্য জমে মিথেন গ্যাস তৈরির সম্ভাব্য কারণের কথাও বলা হচ্ছে৷

অডিও শুনুন 06:11

কিছুদিন পর সবাই সবকিছু ভুলে যায়: তাইমুর ইসলাম

নির্মাণের নীতিমালা মেনে যথাযথ ভূমিকম্প প্রতিরোধী ও অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা না থাকলেও ভবনের বাসিন্দারা ঝুঁকিতে পড়েন৷ তবে ঢাকা শহরে ভবন নির্মাণে নকশা না মানার অভিযোগ অনেক পুরনো৷

২০১৯ সালের ২৮ মার্চ বনানীর ২২ তলা ভবন এফআর টাওয়ারে আগুন ধরে যায়৷ যাতে ২৬ জনের মৃত্যু হয়৷ আহত হয় ৭০ জন৷ সেই ভবনে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দ্রুত বের হওয়ার বিকল্প কোনো সিঁড়িই ছিলো না৷ অনেকেই তাই কাঁচের দেয়া ভেঙে লাফিয়ে পড়ে আহত-নিহত হন৷ তবে এই ভবন নিয়ে বড় অভিযোগ হলো নকশা লঙ্ঘন৷ এফ আর টাওয়ার রাজউক থেকে ১৮ তলার নকশার অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা করা হয়৷ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরে নকশার এই অনিয়ম নিয়ে মামলা হয়৷ যা এখনো চলছে৷

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এক হিসাব মতে- তাদের এলাকায় ১ হাজার ৯২৪টি রাসায়নিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে৷ যার প্রায় সবই ভবন শুধু নয়, এলাকাকেই ঝুঁকির মুখে রেখেছে৷ এছাড়া পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী অনেক ভবনই বসবাসের অনুপযোগী৷ কিন্তু সেখানে জনবসতি রয়ে গেছে৷

তবে নিরাপত্তার নামে ঐতিহ্যবাহী ভবন ভেঙে নতুন ভবন গড়ার বিষয়টি ভালো চোখে দেখেন না আরবান স্টাডি গ্রুপের (ইউএসজি) প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম৷ তিনি ডয়চে ভেলে বাংলাকে বলেন, নতুন অনেক ভবনের কারণেই নগরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে৷ গত ১৫-২০ বছরে পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় নির্মাণ আইনের তোয়াক্কা না করে অনেক ভবন তৈরি হয়েছে৷ এক্ষেত্রে রাজউক নিয়ম নিশ্চিতে তেমন কোনো তদারকি করেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন৷

স্থপতি তাইমুর ইসলাম আরো বলেন, ঢাকা শহরে কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা নিয়ে খুব হইচই হয়৷ যেমন বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা নিয়ে কিছুদিন আলোচনা থাকে৷ মগবাজারের দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছে৷ কিন্তু কিছুদিন পর সবাই সবকিছু ভুলে যায়৷ হয়তো তদন্ত কমিটি হয়৷ কিন্তু তারপর আর কোনো কাজ হয় না৷ গত ১০ বছরে যেসব দুর্ঘটনা হয়েছে, সেগুলোর কারণ উদঘাটন করা গেলেও কোনো সমাধান করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন৷