ঢাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা: মধুচন্দ্রিমা শেষ | বিশ্ব | DW | 11.06.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

ঢাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা: মধুচন্দ্রিমা শেষ

ঢাকা। উপচে পড়া মানুষের ভীড়, অপ্রতুল গণপরিবহণ, পথচারীদের জন্য অবান্ধব ফুটপাথ আর ভয়াবহ বিশৃঙ্খল ট্র্যাফিক সিস্টেম— সব মিলে এ শহরের জুড়ি মেলা ভার।

আজ রোদ খুব কড়া? সিএনজি ও ট্যাক্সি ভাড়া আজ একলাফে দ্বিগুন। শহর আজ বৃষ্টি কবলিত? আজ তো ভাড়ার পারদ আর চূড়া থেকে নামবেই না! শহরে আজ জনসমাবেশ? সেরেছে! দ্বিগুন ভাড়া দিলেও, জ্যামে আটকাবার ভয়ে, সিএনজি তো আজ ওমুখো হবে না!

এভাবেই, দিনের পর দিন, অব্যবস্থাপনার হাতে বন্দী ঢাকাবাসীদের বড় একটি অংশ হাপ ছেড়ে বাঁচলো রাইড শেয়ারিংয়ের সেবাটা পেয়ে। শুরুটা হয়েছিল উবার, পাঠাও দিয়ে। পরে রাতারাতি যোগ হয় ওভাই, স্যামসহ আরো কিছু নাম। এখন শোনা যাচ্ছে, আরো ডজনের বেশি কোম্পানি রয়েছে নতুন করে রেজিস্ট্রেশনের অপেক্ষায়। 

বিনামূল্য বা কমমূল্যের বাহন এগুলো নয়। কিন্তু বাহনের সহজপ্রাপ্যতা ও ভোগান্তিহীনতার কারণেই ভাড়ার মূল্য নিয়ে মানুষ খুব একটা ভাবেনি। আমি নিজেও বর্তে গেলাম। মনে হলো, যাক বাবা! রোজ দুইবেলা আর সিএনজি পাবার যুদ্ধে নামতে হবে না!

অভিযোগ: সিন্ধুর এক বিন্দু

পাঠাও বাইক সার্ভিস আসার পর থেকে বাসা-অফিস-বাসা আমার নিত্যসঙ্গী পাঠাও। কিন্তু কথায় আছে, ‘যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ'! পাঠাওয়ের বাইকারদের স্বেচ্ছাচারিতা, বেপোরোয়া ড্রাইভিং ও অপেশাদারত্বে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন উবার মোটো ডাকলাম। (এমনিতে আগে বাইকের জন্য পাঠাও আর গাড়ির জন্য উবার ডাকতাম।)। কিন্তু অচিরেই বোঝা গেলো, উবার আর পাঠাওয়ের গুণগত ফারাক ‘যেই লাউ, সেই কদু'। 

আমি যখন এই লেখা লিখছি তখন লেখার ফাঁকে ফেসবুকে ঢুকেছিলাম। সেখানে ওয়ালে দেখলাম, সাংবাদিক মোস্তফা হোসেইন রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান ‘ওভাই'-এর সিএনজি চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন: "'ও ভাই' এর গাড়ির ড্রাইভার। বললাম খিলগাঁও কত লাগবে দেখেন তো? জবাব এলো- অ্যাপ এ যাব না। জিজ্ঞেস করলাম, কত লাগবে? জবাব- ২০০ টাকা। বললাম মিটারে ৭০ টাকা। এত টাকা চান কেন? জবাব- মিটারের গাড়িতে যান। পাঠাও বাইকও একই রকম। দেখার কেউ আছে কি?”

বাইকারদের বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। এই রোজায় ঘটা আমারই একটি ঘটনা বলি। এআইইউবি'র ক্যাম্পাস কুরাতলি (বসুন্ধরা সংলগ্ন) থেকে যাবো পান্থপথ। উবার মোটো ডাকলাম। আসবো বলে প্রথমে একজন এলেন না। পরে আরেকজনের সাথে কথা হলো। তিনি বললেন, "আমি কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচেই আছি। আসছি। মাত্র তিন/চার মিনিট লাগবে”। কিন্তু ১০ মিনিট চলে গেলে। বাইকার মেহেদী আসেননি। ফোন দিলাম। একবার। দুইবার। তিনবার। ফোন ধরেন না।

সন্দেহ হলো। ভাবলাম, তিনিও হয়তো যাবেন না। এমনটা প্রায়শই হয়। আসবো বলে আসে না। পরে ফোনও ধরে না। তাই, নতুন রাইড খুঁজতে অ্যাপে ঢুকলাম।

ঢুকে তো অবাক। সেই বাইকার ইতোমধ্যেই আমার রাইড অন করে দিয়েছেন। আমার এখান থেকে রাইড অফ করা যাচ্ছে না। যাত্রী চাইলেও রাইড শেষ করতে পারে না। এটি কেবল বাইকারই পারেন। বেশ কিছুক্ষণ পর, ৯০ টাকা ভাড়া তুলে, তিনি আমার রাইড সমাপ্ত করলেন।

একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাইডের লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে সেবাদানকারী কোম্পানিগুলো অনেক সময় বাইকারদেরকে আর্থিক প্রণোদনা দেয়। তাই, অনেক বাইকার নিজেদের রাইডের সংখ্যা বাড়াতে এরকম করেন।

যাত্রীর যত অভিযোগ 

বেশী অভিযোগ বাইকারদের বিরুদ্ধে। গাড়ি চালকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলনামূলক কম। ঘুর-পথে যাওয়া, এসি চালাতে গড়িমসি করা, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বাক-বিতণ্ডা ইত্যাদি মূলত গাড়ি-চালকদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ। কিন্তু বাইকাররা বেপরোয়া।

কিছু দিন আগে বনানী ওভারপাসের নিচে এক বাইক থেকে নেমে যেতে বাধ্য হয়েছি। সেই বাইকার ৭০-এর উপরে চালাচ্ছিলেন। অথচ বাইকে উঠার আগেই তাকে অনুরোধ করেছি ৫০/৫৫-এর বেশি গতিতে না চালাতে। কিন্তু সে কুড়িল ফ্লাইওভারে উঠেই সাঁই করে ৭০ পার। ফ্লাইওভারে একবার এবং সেখান থেকে নেমে আরেকবার তাকে সতর্ক করি। কিন্তু বনানী ফ্লাইওভারে উঠে সে আবারো একই কাজ করলে এবার বাইক থামাতে বলি।

বনানী ওভারপাস থেকে নেমে আর্মি স্টেডিয়ামের সামনে তিনি থামেন। তাকে আবার বলি, "আপনি ৫০ এর উপরে গাড়ি চালাবেন না, প্লিজ”। তিনি বলেন, "ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি জোরেই টানতে হয়। এটাই নিয়ম”। তাছাড়া গাড়ি কিভাবে চালাতে হয় সেটি তিনি ভালই জানেন। অতএব যেভাবে চালাচ্ছেন সেভাবেই চালাবেন।

অগত্যা, ঝুঁকি নিয়ে আর তার সাথে যাওয়া হয়নি। ওখানেই নেমে গিয়ে আরেক রাইড নিলাম।

বেপরোয়া চালানোর অভিযোগ অসংখ্য। একারণেই গত এপ্রিলে লাবণ্য নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। লাবণ্য ছাড়াও গত বছর আরো কয়েকটি দুর্ঘটনা হয়েছে ঢাকায়।

যত রাইড, তত আয়। তাই, বাইকাররা তিলেকদণ্ড দেরি করতে চান না। পেছনে যে যাত্রী বসেন তাকে ‘আটার বস্তার মতন' কোনো মতন গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারলেই তাদের মুক্তি। জ্যাম এই শহরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু বাইকাররা একপলও জ্যামে বসতে রাজী নন। তারা সাঁই করে ফুটপাথে উঠে পড়েন। ফুটপাথে উঠতে মানা করলে কেউ-কেউ ক্ষেপে যান এবং পরে রাইডারকে কম পয়েন্ট দেন। কেউ-কেউ জ্যামের অজুহাতে সোজা রাস্তায় না গিয়ে এই রাস্তা-সেই রাস্তা, গলি-তস্যগলি দিয়ে ঘুরতে থাকেন। আর অধিকাংশ বাইকার হেলমেটের নামে যাত্রীকে যে বস্তু দেন সেটি মুড়ির-ঠোঙ্গার নামান্তর। জোরে বাইক চালালে বাতাসের ধাক্কায় কত রাইডারের মাথা থেকে যে হেলমেট উড়ে গেছে সেটি একটু খোঁজ নিলেই জানতে পাবেন।

এসব বিড়ম্বনা এড়াতে পরবর্তিতে আমি বাসা-অফিস-বাসা করতে চুক্তিভিত্তিক বাইক ঠিক করি। চুক্তিভিত্তিকেরা বেপোরোয়া নন।

যাই হোক, বিকল্প উপায়ে একটি আপাতঃ সমাধান আমি পেয়েছি বটে। কিন্তু রাইড শেয়ারিং সেবার মান বিশেষ পাল্টায়নি। বাইকাররা আসবো বলে আসেন না। সোজা রাস্তা রেখে ঘুরপথ দিয়ে যান। আসার আগেই রাইড অন করেন। ফুটপাথে উঠে যান। রাস্তা একটু ফাঁকা পেলেই বেপরোয়া গতিতে টান দেন। রাইড অন করে যাত্রীকে আটকে রেখে বাইকার নিজের রাইডের সংখ্যা বাড়ান। কেউ-কেউ হুট করে পাম্পে তেল নিতে ঢুকে যান। একজনের রেজিস্ট্রেশন দিয়ে আরেকজন সার্ভিস দেন।

আজকাল তো আবার সিএনজির মতন বাইকাররাও ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, সামান্য বৃষ্টি-বাদলা হলেই রোজকার দূরত্বের স্বাভাবিক ভাড়াটা আর উবার-পাঠাও রাখছে না। ‘অতিরিক্ত চাহিদা' থাকার অজুহাতে একলাফে তারাও সিএনজির মতন অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকছে। এই নিয়ে নানাজনকে ফেসবুকে তিক্ত-অভিজ্ঞতা লিখতে দেখা যায়।

আর উবার মোটোর একটি বিশেষ সমস্যা আছে। রাইড অন করার আগে তাদের বাইকাররা গন্তব্যস্থল দেখতে পায় না। এটি উবারের আন্তর্জাতিক নিয়ম। ফলে, তাদের ৯৫ ভাগ বাইকার ফোন ধরেই জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবেন? তারপর গন্তব্য অপছন্দ হলে বলে, যাবো না। আর গন্তব্য বলতে না চাইলে কোনো-কোনো বাইকার খারাপ ব্যবহার করেন। কয়েকদিন আগেই এক বাইকারকে গন্তব্য জানাতে চাইনি বলে তিনি কর্কশভাবে বলেছেন, "ডেস্টিনেশন না জেনে যাবো না। ডেস্টিনেশন দেখায় না, এটা উবারের সমস্যা। ডেস্টিনেশন বলতে না চাইলে কল ক্যান্সেল করে দেন”।

তাছাড়া, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নাকি যাত্রীদের ‘হিডেন চার্জ' করে বলেও আজকাল অভিযোগ উঠছে। অর্থাৎ, রাইডারকে শুরুতে হয়তো অ্যাপে সম্ভাব্য ভাড়া দেখালো ১৩০ টাকা। কিন্তু যারা সার্ভিস দেন তাদের কাছেই ওয়ার্ড-অফ-মাউথ হিসেবে শোনা যায় যে, দিনের বিভিন্ন সময়কে পিক/নন-পিক আওয়ারে ভাগ করা থাকে। এ কারণে আগে দেখানো সম্ভাব্য ভাড়ার চেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রকৃত ভাড়া বেশি আসে; এমনকি চলতি পথে অতিরিক্ত কোনো সময় খরচ না হলেও।  

ব্যাধি নিরাময়ে করণীয় কী?

রাইড শেয়ারিং একটি অত্যন্ত জরুরি সেবা। এটি আসার পর কয়েক লাখ মানুষের আয়ের পথ হয়েছে। কেউ-কেউ, এমনকি, ছোটো-খাটো চাকুরি ছেড়ে এটিকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

চলতি বছরের ২৭ মে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, পাঠাওয়ে রয়েছে প্রায় ২ লাখ চালক ও বাহন। আর উবারে আছে ১ লাখের বেশি।

রাইড শেয়ারিং যাত্রীদের স্বস্তি দিয়েছে। গণপরিবহনের অপ্রতুলতা, সিএনজি-ট্যক্সিক্যাবের দৌরাত্ম ও জিম্মিদশা থেকে নগরবাসী পেয়েছে মুক্তির সুবাতাস। তাই, দিন-কে-দিন রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। নির্ভরতা বাড়ারই প্রমান মিলেছে উবারের দেয়া তথ্যে।

ঢাকায় প্রতি মিনিটে ২০৫ জন উবারের অ্যাপ ঢোকে বলে জানিয়েছে উল্লিখিত বিবিসির প্রতিবেদন।

কিন্তু ক্রমবিকাশমান এই খাতটি যেনো বাংলাদেশের গণপরিবহনের মতই আরেকটি নৈরাজ্যে পরিণত না হয় সেজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। রাইডারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাইড সার্ভিস ব্যাবসায় থাকা কোম্পানীগুলোকে নিবিড় মনিটরিং-এ রাখতে হবে।

তবে, আমি মনে করি, কেবল কঠোর আইন দিয়ে শৃঙ্খলা ধরে রাখা সহজ নয়।

বরং এজন্য প্রয়োজন সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ববোধ। মুনাফা করার স্বার্থেই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায় আসে। কিন্তু, অঢেল মুনাফা অর্জনের লোভে গ্রাহকের নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টিকে ঝুঁকির মুখে ফেলা অনৈতিক এবং ব্যাবসার কৌশল হিসেবেও খারাপ। 

তাই, বাইকারদেরকে নিবন্ধন করার আগে অন্তত তিন বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। নিবন্ধনের পর প্রত্যেক বাইকারকে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ এবং চালকদের আচরণ বিধি নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নানান অজুহাতে কোম্পানিগুলোর ভাড়া বাড়িয়ে দেয়ার চর্চা বন্ধ করতে হবে। যাত্রীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ রাইডার যেনো সহজে অভিযোগ জানাতে পারেন তেমন ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং কোনো অভিযোগ এলে সেটিকে আন্তরিকতার সাথে খতিয়ে দেখতে হবে।

এই খাতে শৃঙ্খলা ধরে রাখা জরুরি। গণপরিবহনের মতন রাইড শেয়ারিং খাতও যেনো দুবৃত্তায়িত না হয়, তারাও যেনো কথায়-কথায় বাস ও সিএনজি চালকদের মতন ‘অবরোধ' ডেকে বসতে না পারে সেই দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এ বিষয়ে আপনার মতামত লিখুন মন্তব্যের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন