ডিজিটাল স্টার্ট আপেই ভবিষ্যৎ খুঁজছে ভারত | আলাপ | DW | 23.01.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

ডিজিটাল স্টার্ট আপেই ভবিষ্যৎ খুঁজছে ভারত

সাড়ে ৪ ঘণ্টা৷ ২২৪ কিলোমিটার৷ বদলে দিতে পারে মানসিকতা৷ বদলে দিতে পারে জীবনের চালচিত্র৷ বেঙ্গালুরুর অঙ্কিত ভাটির চেয়ে ভালো আর কে-ই বা জানে সে কথা৷

২০১০ সালের গোড়ার দিকে বেঙ্গালুরু থেকে বন্দিপুর যাচ্ছিলেন অঙ্কিত৷ পাড়ার ট্র্যাভেল এজেন্সি থেকে ভাড়া করেছিলেন একটি গাড়ি৷ কিন্তু মাঝ রাস্তায় পৌঁছে ড্রাইভার অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন৷ অঙ্কিত স্বভাবতই তা দিতে রাজি হননি৷ অগত্যা মাঝরাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেন ওই চালক৷ অঙ্কিত জড়িয়ে পড়েন তর্কাতর্কিতে৷ ভারত-বাংলাদেশে এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন অনেকেই৷ কিন্তু মুম্বই আইআইটি'র ছাত্র অঙ্কিত সেই ঘটনাটিকেই জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন৷

চ্যালেঞ্জ থেকে স্টার্ট আপ

অঙ্কিত অবশ্য চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন আগেই৷ বড় চাকরির মোহ ছেড়ে ডিজিটাল স্টার্ট আপের পরিকল্পনা আগেই ছিল তাঁর৷ সেই মতো সেট আপও তৈরি করছিলেন৷ কিন্তু বেঙ্গালুরুর ঘটনার পর তিনি ঠিক করে ফেলেন যে, পরিবহন ক্ষেত্রেই স্টার্ট আপ তৈরি করবেন৷ আরও পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো অঙ্কিতের পরিবারও এই ভাবনায় খুশি হয়নি৷ আইআইটি পাশ ছেলে শেষ পর্যন্ত ‘ট্র্যাভেল এজেন্ট'? কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে সরেননি অঙ্কিত৷ পুরনো স্টার্ট আপের সেট আপেই ট্যাক্সি অ্যাপ তৈরির কাজ শুরু করেন৷ সঙ্গে পেয়ে যান বন্ধু ভবিশ আগরওয়ালকে৷ পরিবহনের ব্যবসায় নিজেদের গাড়ি না কিনে অঙ্কিত এবং ভবিশ একটি অ্যাপ তৈরির কাজ শুরু করেন৷ অনেকটা পশ্চিমা দেশে প্রচলিত ‘উবার'এর মতো৷ কিছুদিনের মধ্যেই দু'জন বিনিয়োগকারীও পেয়ে যান তাঁরা৷ ফলাফল, ভারত জুড়ে ‘ওলা ক্যাব', এই মুহূর্তে যার বার্ষিক টার্ন ওভার ৫ বিলিয়ন ডলার৷ শুধু তাই নয়, ভারত জুড়ে ১১০টি শহরে ৬লক্ষ গাড়ি এখন ওলার দখলে৷ ট্যাক্সি থেকে শুরু করে অটো পর্যন্ত নানা ধরনের গাড়ির স্টিকারে এখন ‘ওলা'৷

ভারত তিন নম্বরে

ইউরোপ এবং আমেরিকায় স্টার্ট আপের রমরমা শুরু হয়েছিল একুশ শতকের গোড়ার দিকেই৷ ‘অরকুট' ‘ফেসবুক'এর মতো বহু সংস্থাই কাজ শুরু করেছিল স্টার্ট আপ হিসেবে৷ ‘ফেসবুক'পরবর্তী ভারতেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিজিটাল স্টার্ট আপ তৈরির উৎসাহ এখন চোখে পড়ার মতো৷ হিসেব বলছে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ডিজিটাল স্টার্ট আপ তৈরির নিরিখে ভারতের স্থান ৩ নম্বরে৷ অ্যামেরিকা এবং ব্রিটেনের পরেই৷ এই মুহূর্তে দেশের নথিভুক্ত টেক স্টার্ট আপের সংখ্যা ৪,৭৫০৷ 

আমুল-আম্বানি

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলেন, ভারতে স্টার্ট আপ ভাবনা আগে থেকেই ছিল৷ যদিও ‘স্টার্ট আপ' শব্দটির অস্তিত্ব ছিল না তখন৷ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কো-অপারেটিভ মুভমেন্টকে অনেকেই স্টার্ট আপের পূর্বসুরী বলে মনে করেন৷ ‘আমুল' যেভাবে শুরু হয়েছিল, অনেকেই তাকে স্টার্ট আপ বলতে চাইছেন ইদানীংকালে৷ বস্তুত, মধ্য প্রাচ্য থেকে ফিরে এসে অতি সামান্য অর্থ নিয়ে ধীরুভাই আম্বানি যেভাবে রিল্যায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাকেও একপ্রকার স্টার্ট আপই বলা যায়৷ তবে ডিজিটাল স্টার্ট আপ শুরু হয়েছে ফেসবুক পরবর্তী সময়েই৷ ‘ওলা', ‘ফ্লিপ কার্ট', ‘বিগ বাস্কেট'কে যার পথিকৃৎ বলা চলে৷

স্টার্ট আপ ইন্ডাস্ট্রি

বর্তমান ভারতে স্টার্ট আপ একটি ইন্ডাস্ট্রি৷ কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলিও স্টার্ট আপে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ করে দিচ্ছে৷ সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবও খানিক সেরকমই৷ ২০১৫ সালে সারা ভারতে স্টার্ট আপে বিনিয়োগ হয়েছিল ৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার৷ ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার৷ ২০১৭ সালে অঙ্কটি এক লাফে গিয়ে পৌঁছেছে ১৩ দশমিক ৭ বিলিয়ান ডলারে৷তবে  সংখ্যাতত্ত্ব বলছে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে অনেক বেশি স্টার্ট আপ কোম্পানি ফান্ড পেয়েছিল৷ ২০১৬ সালে পেয়েছিল ১,০৩৪টি কোম্পানি৷ ২০১৫ সালে পেয়েছিল ৯১৩টি কোম্পানি৷ ২০১৭ সালে সেই সংখ্যাটি কমে দাঁড়িয়েছে ৮২০৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন স্টার্ট আপের চেয়ে প্রতিষ্ঠিত স্টার্ট আপগুলিতেই বিনিয়োগকারীরা টাকা ঢেলেছেন বেশি৷ তাঁরা বলছেন, মোট বিনিয়োগের ৭০ শতাংশ গেছে মাত্র ১০টি কোম্পানির কাছে৷

ফ্লিপ কার্ট, ওলা কিংবা পেটিএমের মতো কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগকারীরা আরও টাকা ঢালতে আগ্রহী৷ যদিও তাঁদের মতে, এই কোম্পানিগুলিকে আর স্টার্ট আপ বলা যায় না৷ কারণ বিপুল পরিমাণ ব্যবসার মুখ ইতিমধ্যেই কোম্পানিগুলি দেখে ফেলেছে৷

তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ২০১৯ এবং ২০২০ সালে ভারতে ডিজিটাল স্টার্ট আপের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়বে৷ কারণ, কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলি স্টার্ট আপ তৈরিতে উৎসাহ দিচ্ছে৷ দু'টি বিষয় সরকারের কাছে স্পষ্ট৷ আগামী কয়েকবছরের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় শতাংশ হবে তরুণ প্রজন্ম৷ বিশ থেকে ত্রিশের কোঠায় যাঁদের বয়স৷ তাঁদের জন্য কর্মসংস্থান করতে হলে নতুন নতুন কোম্পানি দরকার৷ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কেবলমাত্র বড় কারখানা এবং শিল্পেই গুরুত্ব দিয়েছিল তৎকালীন সরকার৷ কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি দেখে বর্তমান সরকার বুঝে গেছে যে, স্টার্ট আপই ভবিষ্যৎ৷ শুধু তাই নয়, দেশে আইটি প্রফেশনালের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ তাঁদের যদি দেশে রাখতে হয়, তাহলে স্টার্ট আপ তৈরির পরিবেশ তৈরি করতে হবে দেশ জুড়ে৷ গড়ে দিতে হবে কাজের পরিসর৷

ডিজিটাল বিশ্ব

আরও একটি বিষয় সরকার বুঝে গেছে৷ বিশ্ব এখন ‘ডিজিটালাইজড'৷ পরিষেবা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্রুত ডিজিটালাইজেশন প্রয়োজন৷ ছোট ছোট স্টার্ট আপ সহজেই এই ডিজিলাইজেশনের কাজ করতে পারে৷ সুতরাং, পরিষেবা ক্ষেত্রে ডিজিটাল স্টার্ট আপকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে৷

কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই স্টার্ট আপ তৈরির জন্য তরুণ এবং যুবকদের উদ্দীপিত করছে৷ কর ছাড়ের সুবিধাসহ আরও বেশ কিছু সুযোগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে৷ যদিও স্টার্ট আপ কোম্পানিগুলির বক্তব্য করের ক্ষেত্রে আরও কিছু সুবিধা পেলে স্টার্ট আপের সংখ্যা বাড়বে৷

এবং পশ্চিমবঙ্গ

পিছিয়ে নেই পশ্চিমবঙ্গও৷ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকারের মতে, রাজ্য সরকার স্টার্ট আপ তৈরির জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে৷ সম্প্রতি স্টার্ট আপের জন্য একটি বড় ফান্ডও তৈরি করা হয়েছে৷ নতুন নতুন কোম্পানি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এই ফান্ডের জন্য দরখাস্ত করতে পারে৷

ব্রিটেনের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ রায় ভারতের স্টার্ট আপ নিয়ে সম্প্রতি গবেষণা করেছেন৷ তাঁর মতে, দেশের মানসিকতার মধ্যেই এখন ডিজিটাল হাওয়া৷ বিষয়টিকে তিনি দু'দিক থেকে দেখতে চাইছেন৷ ছোট ছোট এলাকাতেও যুবকেরা ছোট ছোট ব্যবসা তৈরির পরিকল্পনা করছেন৷ এই চেষ্টা আগেও ছিল৷ কিন্তু এখন আর সাধারণ একটি ট্র্যাভেল এজেন্সি খুলে খরিদ্দারের অপেক্ষায় কেউ বসে থাকছেন না৷ বাড়িতে বসে ট্র্যাভেল এজেন্সি খুলে কোনও ডিজিটাল স্টার্ট আপকে সেই এজেন্সির ডিজিটাল পোর্টাল তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাড়িতে বসেই অনেক বড় পরিসরে ব্যবসা চালানো যায়৷ ইন্দ্রজিত রায়ের মতে, এর ফলে দু'দিক থেকে স্টার্ট আপের রমরমা বাড়ছে৷ ডিজিটাল স্টার্ট আপ নিয়ে কথা বলতে হলে তাই অন্যান্য ক্ষেত্রের স্টার্ট আপগুলিকেও মাথায় রাখতে হবে৷ তাঁর বিশ্বাস, এভাবে চললে আগামী ১০ বছরের মধ্যে স্টার্ট আপ ইন্ডাস্ট্রিতে ভারত বিশ্বের দরবারে আরও বড় জায়গা করে নেবে৷ তিনি মনে করেন, কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলি ইতিমধ্যেই স্টার্ট আপ তৈরির জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে৷ প্রয়োজন সরকারের সেই সুযোগ সুবিধাগুলি সকলের কাছে পৌঁছানো৷ অনেকেই সেই বিষয়ে এখনও অবগত নন৷

ওলার কর্ণধার অঙ্কিত বলেছিলেন চ্যালেঞ্জের কথা৷ চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন বলে আম্বানির সংস্থা এখন পৃথিবীর অন্যতম ধনী প্রতিষ্ঠান৷ ভারতকে স্টার্ট আপ ব্যবসায় ৩ থেকে ১-এ নিয়ে যাওয়াই কি হবে নতুন প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ?

 

স্টার্টআপের ভবিষ্যত কেমন ভারতে? মন্তব্য করুন নিচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন