ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্তচিন্তা বিরোধী, নিপীড়নমূলক | আলাপ | DW | 20.02.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্তচিন্তা বিরোধী, নিপীড়নমূলক

সবচেয়ে বড় সত্য এই যে, ৫৭ ধারা বিলোপের যে কথা বলা হয়েছে, তা সত্য নয়৷ সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট যে, ৫৭ ধারাকে আরও বিস্তৃত এবং আরও ভয়ংকর রূপ দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংযুক্ত করা হয়েছে৷

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এখন বলছেন, ৫৭ ধারায় মত প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার মতো উপাদান ছিল৷ সঙ্গে যোগ করেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মত প্রকাশে প্রতিবদ্ধকতা তৈরি করে এমন উপাদান নেই৷ ৫৭ ধারা বা ৩২ ধারার ক্ষেত্রে একটি কথা বলা হয় ‘অপব্যবহার' হয়েছে বা ‘অপব্যবহার' হবে না৷ কথাটা উদ্ভট এবং অসত্য৷

‘আইন' বোঝার চেষ্টা করি, ঠিক বুঝি না৷ বোঝার কথাও নয়৷ আইনের মানুষ না হওয়ায় মনে করি, পুরোটা বোঝার দরকারও নেই৷ স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেকের ভিত্তিতে বিষয়টির ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি৷ ‘ডিম আগে না মুরগি আগে' ‘ঘোড়া আগে, না গাড়ি আগে'– বাংলা ভাষায় কথাগুলো খুব ব্যবহার হয়৷ এই আলোকে ৫৭ ধারা এবং এখনকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ নিয়ে কিছু পর্যালোচনা৷

১৷ ৫৭ ধারা যখন সামনে এলো, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো ‘অপব্যবহার' হবে না৷ গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দের অনেকে সরকারের কথায় আশ্বস্ত হলেন৷ তারপর ৫৭ ধারায় গণমাধ্যম কর্মীদের নামে মামলা হতে থাকল৷ গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দসহ অনেকে বলতে শুরু করলেন, আইনের ‘অপব্যবহার' করা হচ্ছে৷ এ কথার অর্থ দাঁড়ায় ‘আইনটি ভালো, কিন্তু অপব্যবহার হচ্ছে'৷

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ক্ষেত্রেও বলা হচ্ছে ‘অপব্যবহার' হবে না৷ যখন এই আইন প্রয়োগ শুরু হবে, তখন বলা হবে ‘অপব্যবহার' হচ্ছে৷ অমুক ওসি বা এসআই ‘বিএনপি-জামায়াত'৷ তিনি বা তারা আইনের ‘অপব্যবহার' করে সংবাদকর্মীদের নাজেহাল-হয়রানি করছেন৷ গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দসহ আরও অনেকের থেকে এমন আলোচনা শোনাটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র৷ প্রশ্ন হলো, এটাকে ‘অপব্যবহার' বলা হবে কেন?

২৷ আইন করে সরকার৷ আইন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিয়ে একটি আইন করে৷ মন্ত্রিসভায় পাস হয়৷ জাতীয় সংসদে আলোচনা করে বা না করে পাস হলে, তা আইনে পরিণত হয়৷ পাস হওয়ার আগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া আইনটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে যায়৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু আলোচনা, সংশোধন হয়, কখনো হয় না৷ সংসদে পাস হওয়ার পর আইনটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়, অর্থাৎ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব পায় পুলিশ৷

এইসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ৫৭ ধারা আইনে পরিণত হয়েছিল৷ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মন্ত্রিসভায় পাস হয়েছে৷ বলা হচ্ছে, এটা ‘খসড়া' আইন৷ না, এটা ‘খসড়া'-র চেয়ে বেশি কিছু৷ বুঝতে হবে, প্রধানমন্ত্রীসহ সকল মন্ত্রী এই আইনটি সংসদে পাস হোক, তা চাইছেন৷ প্রধানমন্ত্রী চাওয়ার পরে, এই সংসদ সদস্যরা পাস করার আগে বড় কোনো সংশোধনী আনবেন, বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই৷ তারপরও দেখছি, অনেকে বিশেষ করে গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দ বিশ্বাস করতে চাইছেন৷ এরাই আইনটি প্রয়োগ হওয়ার পর বলবেন ‘অপব্যবহার' করা হচ্ছে৷

৫৭ ধারায় ছিল, আছে ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারাতেও৷ স্পষ্টভাবে বলা আছে ‘পুলিশ যদি বিশ্বাস করে যে অপরাধ হয়েছে' তাহলে মামলা নিতে পারবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অর্থাৎ গ্রেফতার করবে৷ এই ক্ষমতা বা অধিকার, জিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশকে দেয়া হয়েছে৷ সেই ক্ষমতা এবং অধিকার অনুযায়ী, পুলিশ যদি বিশ্বাস করে যে, এটা অপরাধ এবং যদি ব্যবস্থা নেয়, মানে একজন সাংবাদিক বা সম্পাদককে গ্রেফতার করে, এটা তো আইনের ‘অপব্যবহার' নয়৷ এটা তো স্বাভাবিক ‘ব্যবহার'৷

কথা যদি বলতে হয়, বলতে হবে, আইন করে যারা পুলিশকে ‘বিশ্বাস করার' ‘গ্রেফতার  করার' ক্ষমতা-অধিকার দিল, তাদের বিরুদ্ধে৷ আইন করেছে সরকার, পুলিশ নয়৷ সরকার আইন করে, পুলিশকে সেই অনুযায়ী কাজ করতে বলেছে৷ ‘অপব্যবহার' হচ্ছে বলে পুলিশকে দায়ী করার কোনো কারণ নেই৷ অথচ আমরা তাই করছি৷ কেন করছি? দলীয় আনুগত্য এবং সুবিধা নেয়ার কারণে সরকারের সমালোচনা করার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেছি৷ লোক দেখানোর জন্যে একজন এসআই, ওসি বা এসপির সমালোচনা করে বলছি, তিনি বা তারা আইনের ‘অপব্যবহার' করে সাংবাদিকদের হয়রানি করছেন৷

বাস্তবে বিষয়টি মোটেই এত সরল নয়৷ সরকার আইন করে পুলিশকে দিয়ে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার উদ্যোগ নিয়েছে৷ এই সহজ কথাটা বুঝতে না পারলে, বুঝেও আনুগত্য বজায় রেখে তোষামোদ করলে, ‘অপব্যবহার'-এর অজুহাত দেখালে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকবে না৷

আইন পাস হওয়ার আগেই একথা বলা দরকার যে,  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারাগুলো ৫৭ ধারার চেয়েও ভয়ংকর নিপীড়নমূলক৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

৩৷ ৩২-এর ১ ধারায় ‘কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ ও দণ্ড' বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘‘যদি কোনো ব্যক্তি বে-আইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি,স্বায়ত্বশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার কোনো ধরনের অতি গোপণীয় বা গোপণীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ৷''

এই অপরাধের শাস্তি ১৪ বছরের জেল, ২৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে৷

প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল ‘বে-আইনি প্রবেশ' বলতে আইনে উল্লেখিত অফিসগুলোতে‘অনুমতি ছাড়া প্রবেশ'-কে বোঝানো হয়েছে৷ পুরো আইনটি পড়ে জানা গেল, ‘অনুমতি ছাড়া অফিসে প্রবেশ নয়, ‘বে-আইনি' প্রবেশ বলতে ‘কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে বা উক্তরূপ অনুমতির শর্ত লঙ্ঘনক্রমে কোনো কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইস বা ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থায় প্রবেশ' বোঝানো হয়েছে৷

এবার আরও একটু সুনির্দিষ্ট করে  বোঝার চেষ্টা করি৷

ক. জনতা ব্যাংক সকল আইন উপেক্ষা করে একজন গ্রাহককে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দিয়েছে৷ এই তথ্য ডিজিটালি, অর্থাৎ কম্পিউটারে সংরক্ষিত ছিল৷ প্রথম আলোর সাংবাদিক তা গোপণে সংগ্রহ করেছেন, যা কম্পিউটারের ‘বে-আইনি' প্রবেশের সংজ্ঞায় পড়ে৷ যিনি এই তথ্য সাংবাদিককে দিয়েছেন বা যার মাধ্যমে পেয়েছেন, তিনি ‘সহায়তাকারী' হিসেবে অপরাধী৷ প্রশ্ন আসবে, এ সব তথ্য ‘অতি গোপণীয় বা গোপণীয়' হিসেবে প্রমাণ করা যাবে কিনা৷ ধরে নিলাম, হয়ত যাবে না৷ কিন্তু এই ধারায় মামলা হলে তা কতটা হয়রানি বা নাজেহালমূলক, নিপীড়নমূলক হবে, তা বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিবেচনায় নিতে হবে৷

খ. বেসিক ব্যাংকের মতো মহা দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহের জন্যে শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর কাছে গিয়ে বলতে হবে, আপনি যে দুর্নীতি করেছেন, সেই তথ্য-প্রমাণগুলো দেন৷ আমরা রিপোর্ট করব৷

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, সাংবাদিকতা এভাবেই করতে হবে৷

হলমার্ক, রিজার্ভ চুরি,মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি অতিথিদের স্বর্ণপদকে ভেজাল,বেসিক ব্যাংক ডাকাতির তথ্য গোপণে সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ করলে, তা গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত হবে৷

গ. এই আইন দ্বারা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে৷ গণমাধ্যম বা গণমাধ্যম কর্মীরা এ সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের  দুর্নীতির সংবাদ তখনই প্রকাশ করতে পারবেন, যখন তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের করা দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ নিজেরা সরবারাহ করবে৷ আর গণমাধ্যম কর্মীরা তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে, মানে গোপনে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করলে, গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত হবেন৷

ফলে দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হবে না৷ টিআইবি দুর্নীতির সূচক প্রস্তুতের জন্যে গণমাধ্যম থেকে দুর্নীতির তথ্য পাবে না৷ বাংলাদেশ বলতে পারবে ‘দেশে আর কোনো দুর্নীতি নাই'৷ আছে শুধু ‘উন্নয়ন আর উন্নয়ন'৷

ঘ. এই প্রক্রিয়ায় আর যা-ই হোক, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো দূরের কথা, সাধারণ সাংবাদিকতাও সম্ভব নয়৷ প্রেস রিলিজ জাতীয় ‘উন্নয়ন সাংবাদিকতা' সম্ভব৷ হয়ত আইনের উদ্দেশ্য তেমনই৷

৩. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর থাকলে, বেসিক ব্যাংক বা হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ বা প্রকাশ করা যাবে কিনা, তা যদি কেউ বুঝতে না পারেন, কিছু বলার নেই৷ ৫ থেকে ১৪ লাখ টাকা ঘুস নিয়ে সংসদ সদস্যরা চাকরি দিচ্ছেন, এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাদের ‘মান-ইজ্জত' থাকে না৷ সুতরাং আইনটি ‘মান-ইজ্জত' ঠেকানো নিশ্চিত করবে৷ যে কোনো পর্যায়ের দুর্নীতিবাজরা, ইয়াবা সম্রাটরা তাদের কর্ম আইনি প্রটেকশনের ভেতরে থেকে চালিয়ে যেতে পারবেন৷

৪. আইনমন্ত্রীর ‘মনে হয়' ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না৷ ৫৭ ধারা বিষয়ে এখন আইনমন্ত্রীর উপলব্ধি হয়েছে ‘বাকস্বাধীনতা হরণের' অনেক কিছু তার মধ্যে ছিল৷ আগে তেমন কিছু ‘মনে হয়নি'৷ এখন যেভাবে মনে হচ্ছে না, ৩২ ধারার ক্ষেত্রে৷ ৫৭ ধারার চেয়ে ৩২ ধারা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর এবং নিপীড়নমূলক৷ সাংবাদিকের একটি তথ্য সংগ্রহকে গুপ্তচরবৃত্তির মতো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন' নামক ‘কালো' আইনটিতে৷

৫. সমালোচনার প্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী বলছেন, গণমাধ্যম বা সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না – প্রয়োজনে এমন উপধারা সংযোজন করা যেতে পারে৷ জানি না সাংবাদিকরা আইনমন্ত্রীর প্রস্তাব সমর্থন করার মতো ভুল করে বসবেন কিনা৷ কারণ এই আইনটি শুধু গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের জন্যেই ক্ষতিকর নয়৷ দেশের সব অঙ্গণের, বিশেষ করে সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার জন্যে ক্ষতিকর৷ প্রতিবাদ করার সুযোগ আছে বলে সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের বিষয়টি বেশি করে সামনে এসেছে৷ যাদের কথা বলার সুযোগ নেই বা সুযোগ কম, তাদের পক্ষে কথা বলা গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের দায়িত্ব- কর্তব্য৷

আশা করি তা গণমাধ্যম ভুলে যাবে না৷

ভিডিও দেখুন 01:24
এখন লাইভ
01:24 মিনিট

ছাড়া পেলেন জার্মান-তুর্কি সাংবাদিক

এই মতামতের সঙ্গে আপনি কতটা একমত? লিখুন নিচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়