ডিজিটাল আইনের চারটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ | বিশ্ব | DW | 27.03.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

ডিজিটাল আইনের চারটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ

প্রস্তাবিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের চারটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ১০টি দেশ৷ তারা মনে করে, ওই চারটি ধারা বাকস্বাধীনতা এবং স্বাধীন মত প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে৷

রবিবার মন্ত্রনালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে দেখা করেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ক্যানাডা, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতরা৷ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. টোমাস প্রিন্স৷ আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জার্মান রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাবিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ধারা ২১, ধারা ২৫, ধারা ২৮ এবং ধারা ৩৫ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি৷  ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের এই ধারাগুলো জনগণের বাকস্বাধীনতা ও মুক্তমত প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে আমরা মনে করি৷ এই আইনের শাস্তি, জামিন অযোগ্য ধারা এবং এই আইনের অপব্যবহার এই তিনটি বিষয় নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন৷''

এদিকে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘তাঁরা বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই এই বিষয়ে কথা বলার জন্য সময় চেয়েছিলেন৷ সেই কারণে আজ (রবিবার) এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ আমাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে৷ এখন আমরা নিজেরা বসে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো৷''

কী আছে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ৪টি ধারায়

গত ২৯ জানুয়ারি জেল জরিমানার বিধান রেখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিপরিষদ৷ আইনটি সংসদে পাস হলে আইসিটি অ্যাক্টের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হবে৷

অডিও শুনুন 01:46
এখন লাইভ
01:46 মিনিট

‘মুক্ত আলোচনা ও মুক্ত মত প্রকাশে যে কোনোরকম বাধার বিরুদ্ধেই আমার অবস্থান’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারা:

যদি কোনো ব্যাক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ  বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারনা চালায় বা উহাতে মদত প্রদান করেন, তাহলে অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

যদি কেউ এই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পূনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন  কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা:

 যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রিক বিন্যাসে,- (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য প্রেরণ করেন যা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক, (খ) এমন কোনো তথ্য সম্প্রচার বা প্রকাশ করেন, যা কোনো ব্যক্তিকে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ করিতে পারে (গ) মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয় প্রতিপন্ন করবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, বা (ঘ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করবার,  বা  বিভ্রান্তি ছড়াবার উদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্বেও কোনো তথ্য সম্পূর্ন বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, প্রচার বা সম্প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাথ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷ এই অপরাধ যদি দ্বিতীয় বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড  বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

অডিও শুনুন 02:01
এখন লাইভ
02:01 মিনিট

‘এটা মুক্ত সমাজ, গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৮ ধারা:

ওয়েবসাইটে বা কোনো ইলেকট্রিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি৷

 (১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করবার উদ্দেশ্যে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহলে তিনি সাত বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷ এই অপরাধ যদি একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহলে  দশ বছরের কারাদণ্ড  বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩৫ ধারা:

যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেন, তাহলে সেটাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে৷ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করার অপরাধের  ক্ষেত্রে মূল অপরাধটির জন্য যে দণ্ড নির্ধারিত রয়েছে, সহয়তাকারী ব্যক্তি সেই একই দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

বিশ্লেষদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া:

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের এই চারটি ধারা নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করেন 

  মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রেরসাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মুক্ত আলোচনা ও মুক্ত মত প্রকাশে যে কোনোরকম বাধার বিরুদ্ধেই আমার অবস্থান৷ ধর্ম বা কোনো ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে আলোচনার বিষয় যদি আসে আর সেই আলোচনা করার সুযোগ যদি সীমিত করে দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে এর প্রভাব অন্যান্য আলোচনায়ও পড়ে৷ আসলে কোনো কিছুই আলোচনার ঊর্ধে থাকা উচিত না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘ধর্ম নিয়েও অনেকের অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে৷ দেশে অনেক ধর্মাবলম্বী আছেন৷ আর বিভিন্ন বিষয় আলোচনার সময়ে এক ধর্মের অনুসারী অন্য ধর্ম নিয়ে অথবা নিজ ধর্ম নিয়ে সেই ধর্মের  মানুষের মধ্যেই জানার আগ্রহ থাকতে পারে, প্রশ্ন থাকতে পারে, যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য থাকতে পারে৷ সেটিকে থামিয়ে দেয়া বা দমিয়ে দেয়া যৌক্তিক না৷ঠিক তেমনি জাতির জনক অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে জানার আগ্রহ থাকে, কিছু বলার থাকে অথবা সেই জানা বলার মধ্যে সে যদি কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হয় অথবা চেষ্টা করে সেটাকে থামিয়ে দেয়াকে আমি মনে করি কন্ঠরোধ করার শামিল৷''

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘অনুভূতির সীমানা কী? অনুভূতি, আলোচনা বা সমালোচনার সীমানা কী? কতটুকু অতিক্রম করলে তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে? বা কী ধরনের শব্দ ব্যবহার করলে এক্ষেত্রে অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, সেটা যতক্ষন না পর্যন্ত চিহ্নিত করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আইনের মিসইউজের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে৷''

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন একই প্রসঙ্গে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘কোনো আইনের যদি অপব্যহার হয়, তাহলে তাদের উদ্বেগটা আমলে নেয়া যেতে পারে৷ তবে এই অইনে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপপ্রচার, প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে যে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে, তাকে আমি যথার্থ মনে করি৷ এটাতে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করার কী কারণ থাকতে পারে, আমি জানি না৷''

তিনি বলেন, ‘‘একটা দেশ তার মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাপারে আইন করতে পারে, সুরক্ষারও ব্যবস্থা নিতে পারে৷  মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই দেশটির জন্ম হয়েছে৷ এতে তো কোনো সমস্যা আমি দেখি না৷ এ ব্যাপারে তাঁদের উদ্বেগ আমার কাছে যথার্থ মনে হয় না৷

 তবে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি বা মুক্ত সংবাদপত্রকে বাধাগ্রস্ত করারব্যাপারে তাঁরা কোনো উদ্বেগ জানালে  সেটাকে আমি যথেষ্ট যুক্তিসংগত মনে করি৷ কারণ, সংবাদমাধ্যম বা সংবাদপত্র তো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ফোর্থ স্টেট৷ এটা মুক্ত সমাজ , গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত৷ সেটার  ব্যাপারে তাঁরা উদ্বেগ জানালে আমি যথেষ্ট যৌক্তিক মনে করি৷ আইনের অপব্যবহার যাতে না হয়৷ কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা বন্ধের আইনকে আমি যথেষ্ট বিবেচনাপ্রসূত মনে করি৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘ধর্ম প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়৷আপনি আপনার ধর্ম পালন করবেন৷ গণতান্ত্রিক দেশ যে নীতিমালায় পরিচালিত হয় যে রাষ্ট্র ও ধর্ম পৃথক থাকবে, ব্যক্তি তার ধর্ম পালন করবেন, অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করবে না- এগুলো হলো বেসিক প্রিন্সিপাল৷ এর ভিত্তিতেই সবকিছু পরিচালিত হওয়া উচিত৷''

তিনি বলেন, ‘‘ইউরোপীয় দেশের বাস্তবতা আর বাংলাদেশের বাস্তবতা তো এক নয়৷ সেই বাস্তবাতার নিরিখেও অনেক কিছু দেখতে হবে৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন