‘ডালে বসে গাছ কাটা পর্যটন′ বন্ধ করুন | আলাপ | DW | 13.11.2020

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

‘ডালে বসে গাছ কাটা পর্যটন' বন্ধ করুন

বিদেশি পর্যটক তেমন একটা বাংলাদেশে না এলেও অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাংলাদেশে দিন দিন অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে৷ কিন্তু সে পর্যটন টেকসই না হলে একদিন মুখথুবড়ে পড়বে, একে আর ফেরানো যাবে না৷

পর্যটকেরা নিজেদের আনন্দের জন্য স্থানীয় মানুষের সাধারণ জীবনযাপন ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত করে চলেছেন৷

পর্যটকেরা নিজেদের আনন্দের জন্য স্থানীয় মানুষের সাধারণ জীবনযাপন ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত করে চলেছেন৷

বার্লিন প্রাচীরের কথা নিশ্চয়ই সবাই জানেন৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি হয়েছিল দুই ভাগ- পূর্ব আর পশ্চিম৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশের তত্ত্বাবধানে কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানি আর অ্যামেরিকা ও অন্য পুঁজিবাদী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলছিল ক্যাপিটালিস্ট পশ্চিম জার্মানি৷ ঐক্যবদ্ধ জার্মানির রাজধানী বার্লিনকেও সেসময় দুই ভাগ করা হয়৷ ঠিক শহরের মাঝখান দিয়ে তুলে দেয়া হয় এক দেয়াল৷

১৯৬১ সালে নির্মাণ শুরু হওয়া সাড়ে তিন মিটার উঁচু সে দেয়ালের পতন ঘটে দীর্ঘ তিন দশক পর ১৯৮৯ সালে৷ দুই দেশের জনতা সেই দেয়াল ভেঙে ফেলে জার্মানিকে আবার এক দেশে পরিণত করে৷ এই সময়ে অন্তত ১৪০ জন মানুষ সে দেয়াল পেরোতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন৷ কিন্তু জনগণ যে দেয়াল চায়নি, অস্ত্র দিয়েও সে দেয়াল রক্ষা করা যায়নি৷

পর্যটনের কথা বলতে গিয়ে বার্লিন প্রাচীরের গল্প অনেকটা ‘ধান ভানতে শিবের গীত' মনে হতে পারে৷ সেটাই ব্যাখ্যা করি৷ বার্লিন দেয়াল পুরোটা ভেঙে ফেলা হলেও কিছু অংশ এখনও ঠিক আগের জায়গায় রেখে দেয়া হয়েছে মানুষের দেখার জন্য৷ এখন জার্মানির তো বটেই, বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক পর্যটন স্থানগুলোর একটি এই প্রাচীর৷

জার্মানিতে বসবাসের সুযোগে আমারও সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল৷ পুরো শহরের পর্যটন স্পটগুলোতে গড়ে উঠেছে স্যুভেনির শপ৷ আর সেগুলোতে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বার্লিন প্রাচীরের ভাঙা অংশ৷ ছোটছোট কৌটায় ভরে দেয়ার টুকরো কয়েক ইউরোতে বিক্রি করছেন দোকানিরা, অনেক পর্যটকই আগ্রহ ভরে তা কিনছেনও৷ কিন্তু এইসব স্যুভেনিরের কোনোটিই আসল নয়, হওয়ার কথাও না৷ যত বড় দেয়ালই থাকুক, এত বছর ধরে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করলে সেটা আর অবশিষ্ট থাকার কথা না৷

কিন্তু তাই বলে কি দেয়ালের যে অংশটা এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেটা ভেঙে নিয়ে আসবেন? এটা কোনো মানসিক সুস্থতার কাজ হবে? না, এবং সেটা আইনতও দণ্ডনীয় অপরাধ৷

বার্সেলোনা এবং রেয়াল মাদ্রিদ দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল ক্লাব৷ সেই ক্লাবগুলোতে নিজেদের মাঠের ঘাস বিক্রি হয়৷ কিন্তু আপনাকে মাঠে ঢুকে নিজ হাতে ঘাস ছিঁড়তে দেয়া হবে না, আপনার কাছে বিক্রি করার জন্য মাঠের সব ঘাস তুলেও ফেলা হবে না৷

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

ভেনিসে যেবার প্রথম গেলাম অসাধারণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি নানা দেশের পর্যটকদের প্রচণ্ড ভিড় আর চিৎকার-চেঁচামেচি কান ঝালাপালা করে দিয়েছে৷ ভেনিসে বাইরের লোকসমাগম এতটাই বেড়েছে যে স্থানীয় মানুষ এখন নিজেদের বাসা ভাড়া দিয়ে অন্য শহরে গিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন৷ কদিন পরপরই বিক্ষোভ হয় ভেনিসে, অনেক বাসাতেই ব্যানার ঝুলতে দেখেছি, ‘ব্যান টুরিস্টস' অর্থাৎ ‘পর্যটক নিষিদ্ধ করো'৷ এর কারণ পর্যটকেরা নিজেদের আনন্দের জন্য স্থানীয় মানুষের সাধারণ জীবনযাপন ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত করে চলেছেন৷

আমরা কি বাংলাদেশেও এমন অবস্থা চাই? অন্যকে সম্মান করেন, এমন কোনো মানুষই এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি করতে চাইবেন না৷

আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্যে বিমোহিত৷ অসাধারণ এ সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হওয়াটাই পাপ৷ কিন্তু একটা সহজ বিষয় আমাদের বুঝতে হবে, সে সৌন্দর্যটা টিকে আছে সেখানকার মানুষের প্রকৃতিবান্ধব জীবনব্যবস্থার জন্য৷ আমরা একদিকে চাই প্রকৃতির কোলে শুয়ে থাকতে, পাশাপাশি নিজেদের শহরের টিভি-এসি-ফ্রিজসহ যাবতীয় বিলাসিতাও সেখানে নিয়ে যেতে চাই৷ আমরা চাই দুর্গম এক ঝরনার দৃশ্য দেখতে দেখতে সুইমিং পুলে শুয়ে থাকতে৷ কি অদ্ভুত, তাই না?

আমাদের এই চাহিদার কারণে পাহাড়ের আনাচেকানাচে গড়ে উঠছে তিন-চার-পাঁচ তারকা হোটেল৷ সেই হোটেলে বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে পৌঁছানোর জন্য রাস্তা তৈরিতে কাটা হচ্ছে পাহাড়৷ হোটেল কেন্দ্র করে জল-গ্যাসসহ নানা অবকাঠামোও গড়ে উঠছে৷ আপাতদৃষ্টিতে এটাকে উন্নয়ন বলে মনে হতে পারে৷ কিন্তু আসলেই কি তাই? যে অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এই পর্যটন গড়ে উঠছে সেখানকার মানুষের কি তাতে উন্নয়ন হচ্ছে? সে অঞ্চলের সংস্কৃতিকে কি ধারণ করা হচ্ছে?

সাজেকে গিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি৷ অনেক আদিবাসী পরিবার সে অঞ্চল ছেড়ে আরো গহীন বনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন কেবল এই পর্যটন নামের এই অসম উন্নয়নের শিকার হয়ে৷ চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের সঙ্গেও একই কাজ হতে চলেছে৷

নিজেকে দিয়েই চিন্তা করুন৷ আপনার বাসা (সেটা ভাড়া করা হলেও) যদি দর্শনীয় স্থান হয়, বাসিন্দা হিসেবে আপনি অন্তত পর্যাপ্ত সম্মানটা চাইবেন, নাকি আপনার বাসা দেখতে আসা মানুষ আপনাকে পর্যাপ্ত টাকা দিলেই নিজের মর্যাদা, প্রাইভেসি, বাসার পরিবেশ, সব বিসর্জন দিয়ে তাদের যা ইচ্ছা করতে দিবেন? আপনি যখন কারও বাসায় বেড়াতে যান, গৃহস্থের যেমন আপনার ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব থাকে অতিথি হিসেবে আপনারও দায়িত্ব থাকে সম্মানটা ফিরিয়ে দেয়ার৷

কেবল টাকা উপার্জনই যদি অর্থনৈতিক উন্নতি হয়, তাহলে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইও এক ধরনের উন্নয়ন৷ এভাবে চলতে থাকলে দ্রুতই আমাদের এই শিল্প চালু হতে না হতেই ধ্বংসের মুখে পড়বে, তখন?