ডাকসুর আলোচনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত | আলাপ | DW | 09.10.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

ডাকসুর আলোচনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

কয়েক দিন ধরে ফেসবুকের ওয়ালে একটি ছবি ভাসছে৷ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির ডজনখানেকের বেশি পানির বোতল কাঁধে করে নেওয়ার ছবি৷ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের এমন ছবি এর আগে চোখে পড়েনি৷

বরং গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছি তাদের দাপট৷ হলের ছাত্রনেতারাও ছিলেন বিরাট কিছু৷ ‘ভাই' এলে সারবেঁধে সালাম দেওয়া হতো৷ আর মিছিলসহ মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সালাম দেওয়াটা ছিল অনেকটা বাধ্যতামূলক৷ এখনো সেই প্র্যাকট্রিসগুলো চলছে বলেই মনে হয়৷ তার মধ্যে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতাদের একজনকে এমন চেহারায় দেখা কিছুটা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে৷

তাই ওই ছবির পেছনের কারণ কী থাকতে পারে, সেই প্রশ্ন জাগছিল৷ পরে মাথায় এলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি৷ ২০১৯ সালের প্রথম দিকেই নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে তারা৷ যদি ওই নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই ছাত্রলীগ নেতারা পানির বোতল কাঁধে তোলেন, তাহলে বিষয়টি সুখকরই৷ অন্তত ডাকসু নির্বাচনে জয় পেতে হলেও ছাত্রদের শাসন নয়, তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে ‘ক্ষমতাধর' ছাত্রনেতারা৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশনসহ বামধারার সংগঠনগুলো দীর্ঘ দিন ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানিয়ে এলেও তাতে ‘গা' করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন৷ শিক্ষকরা নিজেদের সমিতির নির্বাচনের পাশাপাশি নীল-সাদা নানা রং মাখিয়ে রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত থাকলেও ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা বলতে তাঁদের দেখা যায়নি, যদিও যে অধ্যাদেশের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়, সেখানে ছাত্রদের প্রতিনিধি থাকার কথা বলা রয়েছে৷ ডাকসুর জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছর বছর ফি-ও নেওয়া হচ্ছে৷ কিন্তু ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছে না '৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক আমলে৷ স্বৈরাচারী এরশাদকে হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন৷ তারও আগে যদি দেখি, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতাসহ প্রতিটি আন্দোলনেই ডাকসুর নেতারা ভূমিকা রেখেছিলেন৷ তো সেই গণতন্ত্র যখন এলো, তখন আর ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন হয় না কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে৷ হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে একটি বিষয়ই বেরিয়ে আসতো– ক্ষমতাসীনদের দাপটে টান পড়বে বলেই তাঁরা ওমুখো হন না৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় ও হল ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা কী ভূমিকা রাখতেন, তা দেখার সুযোগ হয়নি, কেননা আমাদের সময়ে এর অস্তিত্বই ছিল না৷ তবে বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শোনা নানা গল্প ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটি বিষয় বুঝতে পারতাম – যেহেতু শিক্ষার্থীদের ভোটে নেতা নির্বাচিত হতে হবে, সে কারণে ভোটের জন্য হলেও ছাত্র সংগঠনের নেতাদের অনেকের মতো দুর্বৃত্তপনা তাঁরা করবেন না৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে যেটা বুঝেছি, হলে একটু থাকার সুবিধার জন্য শিক্ষার্থীদের জিম্মি করা হয়৷ তাঁদের বাধ্য করা হয় মিছিলে যেতে, যে আদর্শের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ নেই, তার নামে স্লোগান দিতে৷ যেন মানব অস্তিত্ব হারিয়ে গরু-মহিষের পালে ঢুকে ছুটে চলা ছাত্রনেতা নামধারী কিছু নেশাখোর, চাঁদাবাজের পেছনে৷ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সবাই যে এ রকম, তা নয়, তবে আমার সময়ের পরিচিত ছাত্রদল নেতাদের অনেকেই ছিলেন ওই ধরনের, তাঁদের বিশেষ কদর ছিল ভালো ‘ক্যাডার' বলে৷

হলের সিট বণ্টনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি৷ এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রই নন, হলে ছাত্রদল নেতার সঙ্গে থেকে নেতা পরিচয় পাওয়া একজনকে সেখানে দেখেছিলাম বিরাট প্রভাবশালী হিসেবে৷ হাউজ টিউটররা তাঁদের কথাই শুনতেন৷ সেখানে ডাকসু সচল হয়ে সব পর্যায়ে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হলে তাঁদের মতামতের গুরুত্ব দিতে বাধ্য হতেন শিক্ষকরা৷ হলে নিম্নমানের খাবার, লাইব্রেরি, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চা কোনো ক্ষেত্রেই সে সময়ের প্রভাবশালী ওই ‘নেতাদের' কথা বলতে শুনিনি৷ সেখানে ছাত্র সংসদ চালু হলে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রকাশ্যে ছাত্র প্রতিনিধি, ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের এক জায়গায় বসতে হলে, ছাত্রদের নানা সমস্যা এবং সেগুলো থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনাটা হওয়ারই কথা৷ এখনকার ছাত্র সংসদের নেতাদের হয়ত জাতীয় রাজনীতিতে ততেটা ভূমিকা রাখার সুযোগ না-ও হতে পারে৷ তবে ছাত্র সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার লোক তো থাকবে৷ আর ওই পদপ্রত্যাশী দাপুটে ছাত্রনেতারাও চেহারা বদলে বন্ধু, ভাই হওয়ার চেষ্টা করবেন শিক্ষার্থীদের৷

Aziz Hashan

আজিজ হাসান, ডয়চে ভেলে

আর তাতেই ভবিষ্যতে স্বার্থলিপ্সু ও ব্যবসায়ী মানসিকতার বদলে জনগণের ভালো-মন্দ বিবেচনা করার মতো নেতৃত্ব আসতে পারে জাতীয় রাজনীতিতে৷ ষাট-সত্তরের দশকের জাতিগত অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা নেতৃত্বের সুফল এখনো কিছুটা হলেও পাচ্ছে বাংলাদেশ৷ সেই নেতাদেরই একজন বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিতে ডাকসু সচল করতে বলেছিলেন তিনি৷ ‘‘ডাকসু ইলেকশন ইজ আ মাস্ট৷ ডাকসু নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে,'' – তাঁর এই সতর্কবার্তা কি এখনো আমলে নেওয়ার সময় হয়নি?

দাপট দেখানো, ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ততার বদলে শিক্ষার্থীদের ভালো করার চেষ্টা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টতা তাঁদের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতারই বিকাশ ঘটাবে৷ আর তার মধ্য দিয়েই সৎ, দেশপ্রেমিক ও জনকল্যাণমুখী নেতৃত্ব তৈরি হওয়া সম্ভব৷ ইতিহাসের পাঠ বলে, জাতির যে কোনো দুর্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছেন ডাকসুর নেতারা৷ বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রাণ নিয়ে ছুটেছেন তাঁরা৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করেছেন সাংস্কৃতিক উৎসবের৷

জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা অপসারণে সরকারের মন্ত্রীরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিলেও সুস্থ ধারার সেই সংস্কৃতি বিকাশে তাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ চালু করা হচ্ছে না কেন? ছাত্রজীবনে গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে উদার মানসিকতা তৈরিতে এর বিকল্প আছে বলে মনে হয় না৷

সে কারণে তরুণদের উগ্রপন্থা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস থেকে সরিয়ে একটি সুস্থ বিকাশের ধারায় আনতে ডাকসুসহ সব ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালুতে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আন্তরিক হবেন বলেই প্রত্যাশা করি৷ দীর্ঘ দিনের আন্দোলনের ফলে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে তাকে যেন মেরে না ফেলি৷ তবে শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই হবে না৷ ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর সমান সুযোগ সৃষ্টি করে ছাত্রদের নির্বিঘ্নে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে৷ এর মধ্য দিয়েই যেন গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রস্তুত হয় তরুণ প্রজন্ম৷