ট্যাংকার হামলা: তথ্য গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র! | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 22.06.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ইরান

ট্যাংকার হামলা: তথ্য গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ওমান উপসাগরে দুটি ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণের জন্য ইরানই দায়ী৷ এর প্রমাণস্বরূপ একটি ভিডিও এবং ১৩টি ছবিও প্রকাশ করেছে তারা৷ কিন্তু সেগুলোতে কী দেখা যাচ্ছে? ডয়চে ভেলের অনুসন্ধান পড়ুন৷

ভিডিওর শুরুতে লাইফ জ্যাকেট পড়া কয়েকজনকে দেখা যায়, যাদের একজনকে ট্যাঙ্কারের পাশে যেতে দেখা গেছে৷

ভিডিওর শুরুতে লাইফ জ্যাকেট পড়া কয়েকজনকে দেখা যায়, যাদের একজনকে ট্যাঙ্কারের পাশে যেতে দেখা গেছে৷

মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিতের পর উপসাগরীয় এলাকার পরিস্থিতি কতোটা ভয়াবহ, তার একটা ধারণা মিলছে৷ ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প৷

১৩ জুন হরমুজ প্রণালীর ঠিক বাইরে ওমান উপসাগরে দুটি ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণের পর থেকে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে৷ ট্যাঙ্কারগুলোর একটি নরওয়ের ফ্রন্ট আল্টএয়ার এবং আরেকটি জাপানের কোকুকা কারেজিয়াস৷ একই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে মাইন পেতে রাখার অভিযোগ আনে৷ ইরান অবশ্য বরাবরই এ অভিয়োগ অস্বীকার করে আসছে৷

১২ মে হরমুজ প্রণালীর কাছে চারটি জাহাজ বিস্ফোরণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ তখনও যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব বিশ্বে দেশটির বন্ধুরা ইরানের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনে৷ বিশ্বের তেল সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশই হয়ে থাকে এই প্রণালী দিয়ে৷

তথ্যগোপন?

সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন কোনো একটি জাহাজে লিম্পেট মাইন বসানো বা সরানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এবং এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ জ্ঞান৷ বিস্ফোরকগুলো চুম্বকের সহায়তায় জাহাজে বসাতে হয়৷ সাধারণত পানির নীচে এগুলো বসানো হয়, যাতে খালিচোখে না দেখা যায়৷ কিন্তু কোকুকা কারেজিয়াস জাহাজে বিস্ফোরণ হয়েছে পানির প্রায় এক মিটার ওপরে

তবে জাহাজটি জাপানের যে প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছে, সে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছ থেকে পাওয়া গেছে একটু ভিন্নরকমের বক্তব্য৷ ইয়ুটাকা কাতাদা ১৪ জুন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিস্ফোরণের ঠিক আগে জাহাজের কর্মীরা কিছু একটা উড়ে আসতে দেখেছেন৷

এই বক্তব্যের কোনো ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি৷ তদন্ত গবেষণা সংস্থা বেলিংকাটের এলিয়ট ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই ঘটনায় আরো কিছু রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্র সবাইকে জানাচ্ছে না৷ মনে হচ্ছে তারা কিছু একটা লুকাচ্ছে৷''

জার্মান রাজনীতিবিদরাও ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের কথা ভুলে যাননি৷ এর আগেও এবারের মতোই উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া একই ধরনের অভিযোগ এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র৷

একটিভিডিও, দুইটিছবি

১৩ জুন বিকেলে ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড- সেন্টকম এক বিবৃতি দেয়৷ একই সঙ্গে সংস্থাটি একটি সাদাকালো, অল্প রেজোল্যুশনের ভিডিও নিজেদের ওয়েবসাইট, ইউটিউব এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রকাশ করে৷

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এক মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে ইরানের রিভোল্যুশনারি গার্ডের সদস্যদের কোকুকা কারেজিয়াসের গা থেকে মাইন সরাতে দেখা যাচ্ছে৷

ভিডিওর শুরুতে লাইফ জ্যাকেট পড়া কয়েকজনকে দেখা যায়, যাদের একজনকে ট্যাঙ্কারের পাশে যেতে দেখা গেছে৷ কিন্তু ভিডিওটি একেবারেই অস্পষ্ট, কয়েকটি ক্লিপ থেকে কেটে জোড়া লাগানো এবং বিভিন্ন অবস্থান থেকে ধারণ করা৷ কিন্তু ভিডিওটি কিভাবে এবং কখন ধারণ করা হলো, সে বিষয়ে কিছুই জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র৷

ভিডিওর পাশাপাশি সেন্ডকমের পক্ষ থেকে দুটি এডিট করা ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে৷ দূর থেকে তোলা ছবিটিতে জাহাজটির একপাশে লাল তীর দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে একটি বড় আকারের গর্ত এবং মাঝ বরাবর একটি কালো ছায়া৷

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে ছায়া সদৃশ বস্তুটিই বিস্ফোরিত না হওয়া মাইন৷ ইউএসএস ব্রেইনব্রিজের সূত্র দিয়ে প্রকাশ করা হয় ছবি দু'টো৷ মার্কিন নৌবাহিনীর এই ডেস্ট্রয়ারটি কোকুনা কারেজিয়াসের ২১ ক্রুকে উদ্ধার করে৷ এরপর স্বাভাবিকভাবেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি৷

অভিযোগেরবিশ্লেষণ

মেরিন ট্রাফিক ট্র্যাকারের মতো কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব৷ এটি ব্যবহার করে ট্যাঙ্কারের গতিপথও জানা যায়৷ বিস্ফোরণের ঠিক আগে আগে ইরানের উপকূলেই অবস্থান করছিল ট্যাঙ্কারটি৷ আগের কয়েকটি ছবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভিডিও ফুটেজে দেখানো জাহাজটি আসলেই কোকুকা কারেজিয়াস৷

ছবি বিশ্লেষণ করলে এটাও বোঝা যায়, তেলবহনকারী ট্যাঙ্কারটির পাশের ছোট নৌযানটি এক ধরনের স্পিডবোট যা ইরানে ব্যাবহার হয়৷ তবে নৌযানে কারা ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়৷ ফুটেজটি বিশ্লেষণ করে এর ধারণের সময় এবং স্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি৷

বেলিংকাটের তদন্তকারী হিগিনস সন্দেহ করছেন, ইচ্ছে করেই কিছু জিনিস সরিয়ে ফেলা হয়েছে৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘একটা জিনিস আমার কাছে অবাক লাগছে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের যে ছবিগুলো দেখাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ইরানিরা নৌযান থেকে কিছু একটা সরাচ্ছেন৷ কিন্তু একটি ছবিতেও জিনিসটা কী, তা স্পষ্ট বোঝার উপায় নেই৷''

হিগিনস বলেন, ‘‘ভিডিওটিও এমন সময়ে শুরু হয়েছে যখন ইরানীরা জিনিসটা সরাচ্ছেন, এবং তাদের কারণে জিনিসটাকে ভালোমতো দেখাও যাচ্ছে না৷ আমার প্রশ্ন হলো, তাহলে ভিডিওটা আরো আগের সময় থেকে কেনো দেখানো হচ্ছে না, যখন জিনিসটা স্পষ্ট বোঝার সম্ভাবনা ছিল৷''

অভিযোগের পুনর্মূল্যায়ন

একটি ভিডিও এবং ১৩টি ছবিতে এক ধরনের মত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র৷ এর পরিপ্রেক্ষিতে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে৷ তিনি বলেছেন, ‘‘এই অভিযোগকে আমরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি৷ এই প্রমাণগুলোও বেশ শক্তিশালী৷''

কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাজির করা কোনো প্রমাণেই লিম্পেট মাইন দেখা যায়নি৷ এমনকি ইরানি সৈনিকরাই যে মাইন স্থাপন করছে, সে ব্যাপারেও সন্দেহমুক্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই৷ ফলে ১৩ জুনের ঘটনায় দুই ট্যাঙ্কারে যে লিমপেট মাইন দিয়েই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে এবং এর জন্য যে ইরানই দায়ী, তাও জোরের সঙ্গে বলা কখনই সম্ভব নয়৷

১৩ জুন সকালে বিস্ফোরণের সময় দুটি ট্যাঙ্কারের মধ্যে দূরত্ব ছিল ১০ নটিক্যাল মাইল৷ নরওয়ের ফ্রন্ট আল্টএয়ারে প্রথম আগুনের ঘটনা ঘটে এবং জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য চেয়ে সংবাদ পাঠানো হয়৷ কিন্তু এই ঘটনাতেও ইরানকে দায়ী করা হলেও কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি৷

ইরানের বেশকটি নৌযান বিস্ফোরণের সময় আশেপাশেই অবস্থান করছিল৷ তবে ইরানও নিজেদের নির্দোষ দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করেনি৷ টুইটারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সাবোটাজের কূটনীতির' অভিযোগ তুলেছেন৷ তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধ ‘উসকে দেয়ার' চেষ্টা চালাচ্ছে৷

ফলে এখন পর্যন্ত কোনোকিছু সুস্পষ্ট প্রমাণ না হলেও কথার লড়াই ঠিকই চলছে৷ এই ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সঠিক কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়৷ ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়ে চলেছে৷ জাহাজ দু'টির নাবিকদের জবানবন্দির ওপর এই মুহূর্তে অনেক কিছুই নির্ভর করছে৷

সান্দ্রা পেটার্সমান/এডিকে

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন