টিসিবির ট্রাক রাস্তায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেন ঘুমায় | বাংলাদেশ | DW | 25.03.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

টিসিবির ট্রাক রাস্তায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেন ঘুমায়

করোনাকে আমি বলতাম সমাজতান্ত্রিক ভাইরাস৷ ২০১৯ সালের শেষ দিনের চীনের উহান প্রদেশে ধরা পড়া ভাইরাসটি প্রথম ধাক্কায় গোটা বিশ্বকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল৷

ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র- কোথাও কোনো ছাড় নেই, করোনার সামনে সবাই অসহায়৷ মৃত্যুর মিছিল কামপালায় যেমন ছিল, নিউইয়র্কেও তেমনি৷ যেভাবে মাসের পর মাস, দেশে দেশে লকডাউন ছিল; অর্থনৈতিক স্থবিরতা ছিল; আমার আশঙ্কা ছিল বিশ্বের সবারই অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে বড় ওলটপালট হবে৷ তা হয়নি৷ বরং আমার ধারণা ওলটপালট হয়ে গেছে৷ করোনা বিশ্বকে বৈষম্যমুক্ত তো করেইনি, বরং বৈষম্য আরো বাড়িয়েছে৷ করোনায়ও বিশ্বে মিলিওনিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে, গরিব আরো গরিব হয়েছে৷ বিশ্ব অর্থনীতি যখন করোনার প্রভাব কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম করছে, তখন ইউক্রেন যুদ্ধ আবার নতুন পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে৷ করোনার মতো যুদ্ধের অভিঘাত থেকেও মুক্ত নয় কেউই৷

বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষেরাও করোনা আর যুদ্ধের জোড়া আঘাতে বিপর্যস্ত৷ সরকারের নানা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমে এসেছিল৷ কিন্তু করোনার ধাক্কা আবার সে হার বাড়িয়ে দিয়েছে৷ এ যেন বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার মতো৷ বিশ্বের অন্য কোথাও শ্রেণিবৈষম্য না ঘুচলেও বাংলাদেশে করোনা শ্রেণির সংজ্ঞায় বড় ধরনের ওলটপালট ঘটিয়ে দিয়েছে৷ বাংলাদেশে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তের কোনো সমস্যা নেই৷ উচ্চবিত্তের অর্থের কমতি নেই৷ বাজারে কী হলো না হলো, তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথাও নেই৷ তাদের ভাবনা গাড়ির মডেল বদলানো নিয়ে৷ আর নিম্নবিত্তের পেট ছাড়া কোনো ভাবনা নেই৷ তাদের ‘দিন আনি দিন খাই’ পরিস্থিতি, তাই তাদের কোনো লজ্জাও নেই৷ বিপদে পড়লে হাত পাততে দ্বিধা করেন না তারা৷ চেয়ে-চিন্তে কেটে যায় তাদের দিন৷ যত সমস্যা মধ্যবিত্তের৷ তাদের পেটে ক্ষুধা, মুখে লাজ৷ না খেয়ে মরে গেলেও তারা হাত পাতবে না৷ মধ্যবিত্তের পদে পদে লজ্জার বাধা৷ তবে এবারের করোনা, যুদ্ধ আর মূল্যস্ফীতি মনে হয় মধ্যবিত্তের চোখের লজ্জার পর্দাটা সরিয়ে দিচ্ছে৷ বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবি খোলা ট্রাকে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করে৷ সাধারণত বস্তিবাসী, রিকশাচালক, নিম্নবিত্তের মানুষের জন্যই সরকারের এই ট্রাক সেল৷ এতদিন টিসিবির ট্রাকের পেছনে লাইন দিতেন নিম্নবিত্তের মানুষেরাই৷ করোনা আসার পর টিসিবির ট্রাকের পেছনে লাইন আস্তে আস্তে লম্বা হতে থাকে৷ নিম্নবিত্তের সাথে অল্প-স্বল্প মধ্যবিত্তও লাইনে দাঁড়িয়ে যান৷ দ্রব্যমূল্যের প্রবল চাপে মধ্যবিত্তের লজ্জার দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে৷ এখন তারাও নিম্নবিত্তের মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির ট্রাক থেকে কম দামে পণ্য কিনছেন৷ তবে সব মধ্যবিত্তের লজ্জার দেয়াল এখনও পুরোপুরি ভাঙেনি৷ তাই অনেকে বাসা থেকে অনেক দূরে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান বা ক্যামেরা দেখলে মুখ লুকিয়ে ফেলেন, যাতে আত্মীয়-স্বজনরা দেখে না ফেলেন৷

টিসিবির ট্রাক এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ, কারো কারো কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন৷ একসময় সরকারি কর্মচারিদের জন্য রেশন কার্ডে ন্যায্যমূল্যে নিত্যপণ্য কেনার সুযোগ ছিল৷ রেশন কার্ড নিয়ে বাবার সাথে পণ্য কিনতে যাওয়ার স্মৃতি আমাদের অনেকেরই আছে৷ রেশন কার্ডের জায়গা নিয়েছে এখন টিসিবির ট্রাক এবং ফ্যামিলি কার্ড৷ রমজানকে সামনে রেখে সরকার এক কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিত্য পণ্য দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে৷ পাশাপাশি চলছে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি৷ টিসিবির ট্রাকে এতদিন তেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ মিলতো৷ রমজানকে সামনে রেখে ছোলা ও খেজুরও যুক্ত হয়েছে৷ কম দামে কেনার আশায় মানুষ টিসিবির ট্রাকের পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে৷ লাইন প্রতিদিনই লম্বা থেকে আরো লম্বা হচ্ছে৷ প্রতিদিনই পত্রিকায় টিসিবির ট্রাকের খবর৷ ট্রাক প্রতিদিন নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে না৷ গরিব মানুষকে রীতিমতো গোয়েন্দাগিরি করে ট্রাক ট্র্যাক করতে হয়৷ সাংবাদিকরাও ট্রাকের পেছনে ছোটেন, ট্রাকের লাইনেই থাকে মানবিক রিপোর্ট৷ টিসিবির ট্রাকের পেছনে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষের একেকটি গল্প আছে৷

টিসিবির ট্রাকের পেছনে মানুষের লম্বা লাইন দেখে কেউ কেউ ভাবতে পারেন, ওখানে বুঝি বিনামূল্যে পণ্য দেয়া হয়৷ টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত পণ্য পাওয়া কারো কারো জন্য লটারি পাওয়ার মতো আনন্দের৷ কিন্তু টিসিবির ট্রাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ন্যায্যমূল্যে দেয়া হয়৷ খোলাবাজারের তুলনায় টিসিবির ট্রাকে একবার পণ্য পেলে কত টাকা বাঁচে জানেন? সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা! এই ২৫০ টাকা বাঁচানোর জন্য ৫/৬ ঘণ্টার যুদ্ধ, লাইন, ধাক্কাধাক্কি৷ সরকারের অভিযোগ, অনেকে টিসিবি থেকে পণ্য কিনে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন৷ দামের পার্থক্য যদি ২৫০ টাকা হয়, তাহলে খোলাবাজারে বিক্রি করলে বড় জোর ১৫০ টাকা লাভ হবে৷ এই ১৫০ টাকার জন্য মানুষ ৫/৬ ঘণ্টা রোদে পুড়ে লাইনে দাড়িয়ে থাকে, এতেই বোঝা যায়, গরিব মানুষ পিঠ ঠেকানোর মতো দেয়ালও নেই পেছনে৷ খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচার মতো মরিয়া মানুষ৷ দিনমজুরদের সমস্যা আরো জটিল৷ টিসিবির লাইনে দাড়ালে শ্রম বিক্রির সুযোগ থাকে না৷ টাকা না পেলে তিনি কী দিয়ে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনবেন? আবার ট্রাকের লাইনে না দাড়িয়ে রিকশা চালালে সেই টাকায় বাজার হয় না৷ পা ঢাকতে গেলে মাথা উদোম হয়ে যায়৷

একটি দেশের সব মানুষের সামর্থ্য সমান হবে না, সবার আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা একরকম হবে না৷ কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, কোনো না কোনো উপায়ে গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানো৷ ন্যায্যমূল্যে, প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে জরুরি সেবা নিশ্চিত করা৷ বাংলাদেশেও সামাজিক নিরাপত্তার নানা উদ্যোগ আছে৷ টিসিবির ট্রাকও সেই নিম্নবিত্ত মানুষের জন্যই করা৷ কিন্তু এখন যখন নিম্ন মধ্যবিত্তও সামাজিক লাজলজ্জা ভুলে লাইনে দাঁড়িয়ে যান, তখন কি তিনি কোনো একজন গরিব মানুষকে বঞ্চিত করছেন না? হয়ত করছেন৷ পেছনের মানুষটির চাহিদা হয়ত তার চেয়ে বেশি৷ কিন্তু লাইনে দাড়ানো সেই মানুষটিরও নিশ্চয়ই কিছু করার নেই৷ তাকেও তো খেয়ে পড়ে বাঁচতে হবে৷ টিসিবির ট্রাকের এমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠাটা সরকারের সাফল্য না ব্যর্থতা? নিত্যপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিকোনোর এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়৷ আর বাণিজ্যমন্ত্রী তো টিসিবির ট্রাকের লাইনে ভালো পোশাক পরা মানুষদের দাঁড়ানোকে সাফল্য হিসেবেই দেখছেন৷ সরকার ভালো পোশাক পড়া মধ্যবিত্তকেও টিসিবির লাইনে টেনে আনতে পেরেছে, এটা অবশ্যই সাফল্য৷ টিসিবির একটি ট্রাকে ২৫০ জনের কাছে বিক্রি করার মতো পণ্য থাকে৷ কিন্তু লাইনে যদি ৩০০ লোক থাকে৷ তাহলে ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো শেষ ৫০ জন পাবেন না৷ বাণিজ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ, গণমাধ্যম শুধু না পাওয়া ৫০ জনকে দেখায়, যে ২৫০ জন পেলো, তাদের উচ্ছ্বাসটা দেখায় না৷ শ্রেণি ভেঙে দেয়া টিসিবির লাইনে মধ্যবিত্তের দাঁড়ানো নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সাফল্যের আভাস মেলে৷ তার কথা শুনে আমার ছেলেবেলায় পড়া একটি ছড়া মনে পরে গেল- ভোলানাথ লিখেছিল/তিন-চারে নব্বই/গণিতের মার্কায়/কাটা গেল সর্বই/তিন-চারে বারো হয়,/মাস্টার তারে কয়/লিখেছিনু ঢের বেশি/এই তার গর্বই৷

কয়েকদিন আগে দুবাই সফরকালে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মায়ের মমতায় দেশ চালালে সমর্থন মিলবেই৷ খুব সত্যি কথা৷ কিন্তু শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সবার কথায় সেই মমতার ছোঁয়া থাকে না৷ আকাশ ছোঁয়া দ্রব্যমূল্য নিয়ে যখন জনগণের নাভিশ্বাস, তখনো মন্ত্রীরা উন্নয়ন নিয়ে গর্ব করেন৷ বাসা-বাড়ির গ্যাসের দাম বাড়ানোর দায়ও অর্থমন্ত্রী চাপিয়েছেন ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর৷ তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, মানুষের আয় বেড়েছে৷ বাণিজ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও পণ্যের দাম বাড়বে, এখানে সরকারের কিছু করার নেই৷ ধরে নিচ্ছি সবার কথাই সত্য৷ কিন্তু এই তিক্ত সত্য মানার মতো মানসিক অবস্থা এখন সাধারণ মানুষের নেই৷ এই কথাগুলোই তারা যদি আরেকটু মমতা মিশিয়ে বলতে পারতেন, তাহলে মানুষের বেদনা কিছুটা প্রশমিত হতো৷

মানুষের আয় বেড়েছে- পরিসংখ্যানের হিসাবে এটা সত্য৷ গত এক যুগে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় তিন গুণ বেড়েছে৷ কিন্তু গড় আয়ের শুভঙ্করের ফাঁকিতে তো সাধারণ মানুষের পেট ভরবে না৷ এই গড় আয়ে কোটি টাকা আয়ের সালমান রহমান যেমন আছেন, হাজার টাকা আয়ের রিকশাচালক সলিমউদ্দিনও তো আছেন৷ আয় বেড়েছে, এটা যেমন ঠিক, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে তারচেয়ে দ্রুত গতিতে৷ আয়-ব্যয়ের এই হিসাব মেধাবী চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট আ হ ম মোস্তফা কামালও মিলিয়ে দিতে পারবেন না৷ মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকারের কিছু করার নেই, এটা শুনতে সত্যি মনে হলেও আসলে সত্যি নয়৷ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজই হলো, দেশে-বিদেশে পণ্যমূল্য মনিটর করা, প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করা৷ কিন্তু তারা মনে হয় ঘুমিয়ে থাকেন৷ বাজারে যখন আগুন লেগে যায়, তখন নানাকিছু করে আর তা নেভাতে পারেন না৷ শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়৷ কিন্তু সেটা করতে হয় সঠিক সময়ে৷ ভোজ্য তেল নিয়ে তেলেসমাতি শেষ হওয়ার পর সরকার শুল্ক কমিয়েছে৷ এর আগে চাল-পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল৷ সময়মতো শুল্কহার পুনর্বিন্যাস করতে পারলে অনেক কিছু সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়৷ সংকট যখন চূড়ায় ওঠে তখন উদ্যোগ নিলেও বাজারে তার প্রভাব পড়ার আগেই সংকট কেটে যায়৷ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সাথে সাথে তার প্রভাব পড়ে বাজারে৷ আর দাম কমলে বা শুল্ক কমালে তার প্রভাব পড়তে মাস পেরিয়ে যায়৷ এই চক্করে লাভবান হয় ব্যবসায়ীরা, আর ভোগান্তির পুরোটাই জনগণের৷ ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা কমেছে, তাতে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন৷ কিন্তু এই দাম কমাটা হলো বাংলাদেশের দোকানে ‘বিশাল ডিসকাউন্ট'-এর মতো৷ রোজার আগে গোপনে ২০০ টাকা বাড়িয়ে ঈদের আগে ১০০ টাকা দাম কমানোর মতো৷ ভোজ্যতেলের দাম কমেছে বটে, কিন্তু সেটা কি আর কখনোই আগের দামে যাবে?

প্রভাষ আমিন, সাংবাদিক ও লেখক

প্রভাষ আমিন, সাংবাদিক ও লেখক

নিত্যপণ্যের মূল্য তো আকাশ ছুঁয়েছে অনেক আগেই৷ পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দামের চাপ তো আছেই৷ অল্প অল্প চাপই আস্তে আস্তে অসহনীয় হয়ে যায়৷ অনেকে বলতে পারেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও মানুষ তো কিনে খেতে পারছে৷ খুব খাঁটি কথা৷ না খেয়ে আছেন, এমন কথা তো কেউ বলেননি৷ কিন্তু একটি মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবনযাত্রা যেমন হওয়া উচিত, তেমনটা কি পারছে দেশের মানুষ? একটা পরিবারের মাসের আয় যেমন নির্দিষ্ট, কিছু ব্যয়ও নির্দিষ্ট৷ বাসা ভাড়া, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডিশ, ইন্টারনেট, পত্রিকা, ময়লা ফেলার বিল তো নির্দিষ্ট৷ যাতায়াত, সন্তানের পড়ার খরচও নির্ধারিত৷ বাকি থাকে বাজার খরচ৷ ব্যয় বেড়ে গেলে বাজারখরচে চাপ পরে৷ সেটা কীভা্বে মানুষ ম্যানেজ করে? শহরের উঠতি মধ্যবিত্তরা হয়তো মাসে একবার সপরিবারে রেস্টুরেন্টে যায়৷ প্রথমে কোপ পরে এখানে৷ তারপর আস্তে আস্তে দুধ, ডিম, ফল, মাছ, মাংসের ভাগ কমতে থাকে বা একেবারেই বাদ পরে যায়৷ মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না, এই বলে হয়তো নিজেকে সান্তনা দেন৷ চিকন চাল থেকে মোটা চালে নামে, ময়দা থেকে আটায় নামে৷ নামতে নামতে কোনোরকমে নাক ভাসিয়ে বেঁচে থাকার মতো মধ্যবিত্তরাও টিকে থাকে৷

টিসিবির ট্রাকে বিনামূল্যে নয়, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি হয়৷ কিন্তু ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাওয়ার অধিকার তো সব মানুষেরই আছে৷ সরকার যদি কঠোরভাবে বাজার মনিটর করতে পারতো, অপচয়-দুর্নীতি বন্ধ করতে পারতো, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারতো, মজুদদারদের আইনের আওতায় আনতে পারতো, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে পারতো, সময়মতো শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যিাস করতে পারতো, সামগ্রিকভাবে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারতো; তাহলে এমনিতেই পণ্যমূল্য আরো কম থাকতো৷ তারপর একটু মমতা নিয়ে মানুষের পাশে দাড়ালে, অবশ্যই মানুষ তাদের সমর্থন করবে৷

বাজারদর নিয়ে কথা বললেই সরকারি দলের লোকজন আয় বাড়ার গল্প, উন্নয়নের গল্প শোনান৷ উন্নয়নের ধারায় সর্বশেষ সংযোজন শতভাগ বিদ্যুতায়ন৷ মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দেশ মধ্যম আয়ের হয়েছে, উন্নয়নশীল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে- এসবই সত্যি৷ পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, টানেল, ফ্লাইওভার তো দৃশ্যমান৷ কিন্তু উন্নয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জিনিসপতেোর দাম, টিসিবির ট্রাকের লাইন৷ সবকিছু ঠিক আছে৷ কিন্তু পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া বা প্রান্ত থেকে ছিটকে যাওয়ার অবস্থায় দাড়ানো মানুষের তাতে কিছু যায় আসে না৷ মানুষ ন্যায্যমূল্যে ঠিকমত খাবার কিনতে না পারলে অনেক উন্নয়ন, অর্জন বিসর্জনে পরিণত হতে পারে৷ আবুল হাসানের কবিতা থেকে ভাব ধার নিয়ে বলতে মন চায়- অতটুকু চায়নি গরিব মানুষ/অত সূচক, অত উন্নয়ন/চেয়েছিল আরো কিছু কম/দুবেলা দুমুঠো পেট ভরে খাওয়া৷’

সংশ্লিষ্ট বিষয়