টার্গেট সাংবাদিক না সাংবাদিকতা | আলাপ | DW | 24.09.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

টার্গেট সাংবাদিক না সাংবাদিকতা

পেশাগত কারণে একসময় প্রায় নিয়মিত প্রেসক্লাব, তোপখানা, পল্টন, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, মতিঝিল এলাকায় যেতে হত৷ আসলে বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদ উৎস এসব এলাকায়৷

বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অফিস বঙ্গবন্ধু এভিনিউ আর নয়াপল্টনে৷ অধিকাংশ বাম দলের অফিস তোপখানা এলাকায়৷ খেলার অধিকাংশ খবর মেলে স্টেডিয়ামে৷ আর ব্যবসা-বাণিজ্য-অর্থনীতির খবরের জন্য যেতে হয় মতিঝিলে৷ প্রেসক্লাবের সামনে বছরজুড়ে চলে দাবি-দাওয়ার সমাবেশ৷ এখন তো মাঠে রাজনীতি নেই৷ যখন ছিল, তখন পল্টন ময়দান, মুক্তাঙ্গন, জিরো পয়েন্ট, পল্টন, তোপখানা এলাকা সবসময় মুখরিত থাকত৷ লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সব মিলে জমজমাট এলাকা৷ তখন নিয়মিত যেতে হতো৷ কিন্তু তখন প্রেসক্লাব থাকলেও রিপোর্টার্স ইউনিটি ছিল না৷ ১৯৯৬ সালে রিপোর্টার্স ইউনিটি শুরু হলেও আজকের মত জমজমাট হয়নি৷ তাই মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমাদের নানা ঝামেলায় পরতে হতো৷ রাস্তার পাশের সস্তা হোটেলে খেতে হতো৷ তবে সবচেয়ে বেশি বিপদে পরতাম ঝড়-বৃষ্টিতে আর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে৷ তখন আমরা ‘অসভ্য’ ছিলাম, তাই প্রেসক্লাবে ঢুকতে পারতাম না, এমনকি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার মত জরুরি কাজেও না৷ রাস্তার উল্টোপাশে আরেক পেশাজীবী সংগঠনের কার্যালয় বিএমএ ভবনে তবু যাওয়া যেতো, প্রেসক্লাবে নয়৷ শুধু প্রেসক্লাবে ঢোকা নয়, সভ্য হওয়ার পথটিও রুদ্ধ ছিল ‘ব্ল্যাক বল’ নামের এক কালো আইনে৷ সেই দিন আর এখন নেই৷ প্রেসক্লাবের সভ্য হয়েছি, তাও অনেক বছর আগে৷ কিন্তু এখন আর প্রেসক্লাব বা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাওয়ার সময় পাই না৷ 

শুরুর দিকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি সংগঠন করারও খুব আগ্রহ ছিল৷ নব্বই দশকের শুরুর দিকে বাংলাবাজার পত্রিকার ইউনিটে খুব সক্রিয় ছিলাম৷ বিএফইউজে, ডিইউজের সব কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতাম৷ প্রেসক্লাবের সদস্যপদ উন্মুক্ত করার দাবির আন্দোলনেও অংশ নিয়েছি৷ একবার রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে অংশ নিয়ে সদস্যও হয়েছিলাম৷ কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততায় সেই রাজনীতি আর করা হয়নি৷ তবে আমি সারাবছর যেতে পরি আর না পারি, নির্বাচনের সময় অবশ্যই ভোট দিতে যাই৷ প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি, বিএফইউজে, ডিইউজে মিলে ভোট দিতে যেতে হয় ৪/৫ বার, তাতে অনেকের সাথে দেখা হয়ে যায়৷ তবে দেখা হওয়ার জন্য নয়, আমি আসলে যাই সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা যাতে নির্বাচিত হতে পারে৷ সবসময় যে আমার পছন্দের প্রার্থীই জয় পান, তা নয়; তবে আমি আমার বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকি যে আমি একজন সৎ মানুষকে ভোট দিয়েছি৷ নিশ্চিত হারবেন জেনেও আমি সৎ ও যোগ্য মানুষকে ভোট দেই৷ তবে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নিয়ে যেসব কাণ্ডকারখানা হয়, তাতে আমার অনেক প্রশ্নের জবাব পাই না৷ সাংবাদিকদের নেতৃত্ব দৃশ্যত কোনো লাভজনক পদ নয়৷ কিন্তু বড় বড় পদে নির্বাচনের ব্যয় সম্পর্কে যা শুনি, তা আমার কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়৷ কারো কারো একবারের নির্বাচনের যত ব্যয় শুনি, তা থাকলে আমার সারাজীবনের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যেত৷ এত পরিশ্রম করে, এত ব্যয় করে তারা কেন নেতা নির্বাচিত হতে চান? এই প্রশ্নের জবাব আমি জানি না৷ 

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচন হয় প্রতিবছর ৩০ নভেম্বর৷ ২০১৭ সালের নির্বাচিত কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম৷ ‘নেতা চাই, চাঁদা আদায়কারী নয়’ শিরোনামের লেখাটি থেকে একটু উদ্ধৃতি দিচ্ছি, ‘রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নিয়মিত যাওয়া আসা করেন, এমন একজন জানালেন, রিপোর্টার্স ইউনিটির বছরে খরচ প্লাস মাইনাস তিন কোটি টাকা৷ ক্যান্টিনে সাবসিডি রেটে খাওয়া, পিকনিক ইত্যাদিতে বড় খরচ হয়৷ হল ভাড়া থেকে আয় হয় এক কোটি টাকা৷ বাকি টাকাটা আসে কোত্থেকে?

তিনি জানালেন, বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুদান থেকে৷ তিনি অনুদান বললেন বটে, তবে আমি শুনলাম চাঁদা৷ আসলে চাঁদাই তো৷ নইলে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেন বছরের পর বছর রিপোর্টার্স ইউনিটিকে অনুদান দেবে৷ মানুষ মসজিদে বা মাদ্রাসায় টাকা দেয় সওয়াবের আশায়৷ রিপোর্টার্স ইউনিটিকে টাকা দিয়ে তো অশেষ নেকি হাসিল হবে না৷ সহজ কথা হলো, এসব প্রতিষ্ঠান রিপোর্টারদের হাতে রাখতে চায় বলেই তাদের টাকা দেয়৷ অনুদান কত হবে, সেটা নির্ভর করে রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারির দক্ষতার ওপর৷ যিনি যত বেশি অনুদান বা চাঁদা আনতে পারবেন, তিনি তত সফল৷ আমরা আসলে ভোট দিয়ে চাঁদাবাজ নির্বাচিত করি৷ তবে তিনি দাবি করলেন, এখন অনুদান নেওয়া হয় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, চেকের মাধ্যমে৷ ধরে নিচ্ছি, আমরা যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছি, তারা ব্যক্তিগতভাবে সৎ৷ কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিআরইউর সততা কিন্তু আমরাই প্রতিদিন প্রশ্নের মুখে ফেলছি৷ নেতাদের সততা নিয়ে সন্দেহ নেই৷ তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়, এত টাকা খরচ করে তারা নেতা হতে চান কেন?’

জাতীয় প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনেও ভর্তুকি মূল্যে খাবার পাওয়া যায়, বড় আয়োজনের পিকনিক হয়; তারমানে প্রেসক্লাবকেও অনুদানের নামে চাঁদার টাকায় ঘাটতি পোষাতে হয়৷ আমি সত্যিই জানি না, এত অর্থ ব্যয় করে ঘাটতিতে থাকা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কেন আসতে চান সবাই৷ নেতৃত্বের আকাঙ্খা, সামাজিক মর্যাদা নাকি অন্য কিছু?

আগে সমাজে সাংবাদিকদের উচ্চ মর্যাদা ছিল৷ সাংবাদিকদের সবাই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা মেশানো সমীহ করতো৷ গত কয়েক বছরে সামাজিক পারসেপশনটা পাল্টে গেছে৷ এখনও সাধারন মানুষ সাংবাদিকদের সমীহ করে বটে, তবে তাতে ভালোবাসা-শ্রদ্ধার চেয়ে ভয় মেশানো থাকে বেশি৷ মনে করা হয়, সাংবাদিকদের মানুষের ক্ষতি করার ক্ষমতা আছে৷ এ কারণে অনেক বাড়িওয়ালা সাংবাদিকদের বাড়ি ভাড়া দিতে চান না৷ সাধারণভাবে সাংবাদিকদের নৈতিকতা এবং সততা প্রশ্নবিদ্ধ৷ সাধারণ মানুষ মনে করে, সাংবাদিকেরা বেতনকড়ি পায় না৷ তারা ধান্ধাবাজি বা চাঁদাবাজি করেন৷ তাদের ধারণা, সাংবাদিকরা সরকারের দালালি করে এবং বিনিময়ে সরকার তাদের সুযোগ-সুবিধা দেয়৷ প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশের সব খাতই এখন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত৷ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে৷ সাংবাদিকরাও এই সমাজেই বাস করে৷ তাই সাংবাদিকদের কারো কারো আয়ের সাথে ব্যয় নাও মিলতে পারে৷ বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, শান শওকত দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না; শুধু সাংবাদিকতায় সম্ভব নয় এতকিছু৷ তবে সাংবাদিকদের সম্পর্কে সামাজিক পারসেপশনে একটা বড় রকমের গলদ আছে৷ মানুষের সাথে কথা বললেই মনে হয়, সৎ সাংবাদিক মানেই তিনি বস্তিতে থাকবেন, রিকশায় চড়বেন৷ কদিন আগে আমি অফিসে যাওয়ার সময় মেসেঞ্জারে একজন কল দিলেন৷ ধরে বললাম, আমি গাড়ি চালাচ্ছি, পরে ফোন দেবো৷ আমি গাড়ি চালাচ্ছি শুনে ভদ্রলোক যেন আকাশ থেকে পরলেন৷ তার প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হলো, গাড়িটি আমি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কোনো শোরুম থেকে এইমাত্র ডাকাতি করে এনেছি৷ অথচ গত ২০ বছর ধরেই আমি অফিস থেকে চালকসহ সার্বক্ষণিক গাড়ি সুবিধা পেয়ে আসছি৷ শুধু আমি নই, ঢাকায় এমন শখানেক সাংবাদিক আছেন, যারা অফিসের দেয়া গাড়ি ব্যবহার করেন৷ লাখ টাকার ওপর বেতন পান, এমন সাংবাদিকের সংখ্যাও অনেক যাবে৷ কোনো সাংবাদিকের গাড়ি-বাড়ি আছে শুনলেই, তাকে অসৎ মনে করার কোনো কারণ নেই৷ ২৫/৩০ বছর ভালো প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা করলে, একটু হিসাব করে চললে; ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একটা ফ্ল্যাট বা গাড়ি কেনা সম্ভব৷ সাংবাদিকদের সম্পর্কে এই ভুল পারসেপশনে সুকৌশলে ঘি ঢেলেছে সরকার৷ সম্প্রতি সরকারের একটি সংস্থার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বাংলাদেশের ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়ে ১১ সাংবাদিক নেতার বিস্তারিত হিসাব চেয়েছে৷ চিঠিতে বিস্তারিত হিসাব মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে৷ বিএফআইইউ প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি এবং দুইভাগে বিভক্ত বিএফইউজে এবং ডিইউজের শীর্ষ নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে৷ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন এ সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার দাবি জানাচ্ছেন৷ তবে যাদের হিসাব চাওয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন৷ যদিও এখন তারা সে অবস্থান থেকে সরে এসেছেন৷ সবাই এখন এর বিরোধিতাই করছেন৷

আমি অবশ্য সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলবের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগতই জানাই৷ সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়াদেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, সাংবাদিকদের হিসাব চাইলে আপত্তি কোথায়, তাদের হিসাব দিতে সমস্যা কোথায়, তারা কি আইনের উর্ধ্বে? আমি তাদের সাথে একমত৷ সাংবাদিকেরা কখনোই আইনের উর্ধ্বে নন৷ সরকার চাইলে যে কারো হিসাব তলব করতে পারে, আয়-ব্যয় না মিললে মামলা করতে পারে৷ আর বিএফআইইউ সরাসরি নেতাদের কাছে হিসাব চায়নি, চেয়েছে ব্যাংকগুলোর কাছে৷ তাই এখানে নেতাদের চাওয়া না চাওয়া, হিসাব দেয়া না দেয়ার কোনো বিষয় নেই৷

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে৷ স্বাগত জানালেও বিএফআইইউ এর এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য নিয়ে আমার সংশয় আছে৷ প্রথম সংশয় হলো, ১১ সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলব সমাজে সাংবাদিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক পারসেপশনে প্রায় বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি দেবে৷ লোকজন বলাবলি করছে, আগেই বলেছিলাম, সাংবাদিকেরা ভালো নয়৷ এবার তো প্রমাণ হল৷ যদিও এখনও কিছুই প্রমাণিত হয়নি৷ মাত্র হিসাব চাওয়া হয়েছে৷ বাংলাদেশে কারো হিসাব তলব করা মানেই, সবাই ধরে নেবেন, ডালমে কুছ কালা হ্যায়৷ কোনোকিছু প্রমাণের আগেই ১১ সাংবাদিক নেতাকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা হলো৷ আর শুধু ১১ নেতা নয়, এ সিদ্ধান্ত গোটা সাংবাদিক সমাজ সম্পর্কেই বাজে ধারণার স্রোতকে আরো প্রবল করবে৷ বাংলাদেশে ভালো বেতন পায়, এমন সাংবাদিক যেমন আছেন; আবার নামমাত্র বেতন, তাও মাসের পর মাস বকেয়া, এমন সাংবাদিকও আছেন৷ অল্প সময়েই টাকার পাহাড় বানিয়ে অসৎ সাংবাদিক যেমন আছেন, আবার সুযোগ সত্ত্বেও দুর্নীতির ফাঁদে পা না দিয়ে কষ্টে-সৃষ্টে জীবনযাপন করছেন, এমন সাংবাদিকও আছেন৷ এই সিদ্ধান্ত সবাইকেই কমবেশি হেয় করবে৷ তবে হেয় হতেও আমার আপত্তি নেই৷ যদি সরকার দুর্নীতিবাজ সাংবাদিকদের চিহ্নিত করতে কোনো চিরুনি অভিযান চালায়, আমি আরো বেশি স্বাগত জানাব৷ সরকার তালিকা করে ৫০০ বা এক হাজার সাংবাদিকের হিসাব তলব করুক৷ সমস্যা নেই৷  কিন্তু এ তলবকে তেমন কোনো অভিযান মনে হচ্ছে না৷ বিএফআইইউ ঢালাওভাবে ছয়টি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে৷ এটা সত্যি বিস্ময়কর৷ দুর্নীতিবাজ সাংবাদিক নেতা হতেও পারেন, নাও হতে পারেন৷ দুর্নীতি করাটা নেতা হওয়ার পূর্বশর্তও নয়, সমান্তরালও নয়৷ সরকারের কাছে যদি সাংবাদিক নেতাদের কারো ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকতো, যদি তেমন কারো হিসাব তলব করতো; তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না৷ কিন্তু ঢালাও নেতাদের হিসাব তলব পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট করে দিয়েছে৷ যাদের হিসাব তলব করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সরকার সমর্থক যেমন আছেন, সরকার বিরোধীরাও আছেন৷ দুইপক্ষ মিলে কোনো দুর্নীতি করেছে, সেটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়৷ যদি এমন হতো, দেশের সকল পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের হিসাব তলব করা হচ্ছে৷ তাহলে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো আলোচনারই সুযোগ থাকতো না৷ আবার সাংবাদিক নেতাদের হিসাব চাইতে হলে, আগে অন্য সংগঠনের নেতাদেরও হিসাব তলব করতে হবে; তেমন অন্যায় আবদারও করছি না আমি৷ খালি বলতে চাই, সন্দেহ করার মত সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকার যে কারো হিসাব চাইতে পারে৷ কিন্তু সন্দেহ করার মত তথ্যটা কী সেটাই আমরা জানতে পারছি না৷ 

আরেকটা ভয়ংকর বিষয় হলো, যে ইউনিট হিসাব তলব করেছে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অস্ত্রের বিস্তার রোধকল্পে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ব্যাংকিং হিসাব–নিকাশের অনুসন্ধান করে এবং প্রাপ্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জানায়৷ তাহলে বিএফআইউ বা যে সংস্থা তথ্য চেয়েছে, তারা কি সন্দেহ করছেন, সাংবাদিক নেতাদের কেউ মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মত অস্ত্রের বিস্তারের সাথে জড়িত৷ তেমন গুরুতর কিছু হলে সেই সংস্থার উচিত প্রাথমিক তদন্ত শেষে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করে শুধু তাদের হিসাব তলব করা, তিনি নেতা হোন আর না হোন৷ ঢালাওভাবে নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলব করে, পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিতর্কিত করা হচ্ছে; তাতে সত্যিই কোনো অপরাধী থাকলে তিনিও পার পেয়ে যেতে পারেন৷

এমনিতে বাংলাদেশে এখন সরকার সমর্থিত বা স্বেচ্ছা সমর্পিত সাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি৷ করে নাকো ফোসফাস, মারে নাকো ঢুসঢাস মার্কা সব৷ তারপরও সরকার বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে নানা আইন করে৷ ১১ নেতার ব্যাংক হিসাব তলবকেও অনেকে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন৷ তবে তথ্যমন্ত্রী, সেতুমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ নীতিনির্ধারকদের কথায় মনে হচ্ছে, তারা কিছুই জানেন না৷ তাহলে বিএফআইইউ কার নির্দেশে এত বড় সিদ্ধান্ত নিলো৷ আবার কারো ব্যাংক হিসাব তলব করতে মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, তেমনও নয়৷ বারবার যেটা বলতে চাইছি, ব্যাংক হিসাব তলব করার আগে প্রাথিমক তদন্ত এবং সন্দেহ করার মত তথ্য থাকতে হবে৷ বিএফআইইউ যদি একমাস পর জানায়, কারো একাউন্টে কোনো সমস্যা নেই৷ তাহলেই কি মিটে যাবে বিষয়টা? সবকিছু এত সরল নয়৷ ১১ নেতা যদি তখন বলেন, এই একমাস যে আমাদের সামাজিকভাকে হেয় করা হলো, তার জবাব কী? অতীতে অনেক ব্যক্তি বিচারের আগেই সামাজিক পারসেপশন আর মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়েছেন৷ এবার সাংবাদিক নেতারা পরলেন সেই গাড্ডায়৷

প্রভাষ আমিন, সাংবাদিক ও লেখক

প্রভাষ আমিন, সাংবাদিক ও লেখক

বাংলাদেশের সব সমস্যা সমাধানের ভার আমরা একজনের কাছেই ঠেলে দিই৷ সাংবাদিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব তলবের বিষয়টি মেটানোর বলও প্রধানমন্ত্রীর কোর্টে ঠেলে দেয়া হয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখবেন, এই আশ্বাসে আপাতত সাংবাদিকরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত রেখেছেন৷ কিন্তু আমার কৌতূহল, প্রধানমন্ত্রী কী সমাধান দেবেন৷ যে বা যারা সিদ্ধান্তটি নিয়েছেনন, তারা খুব কৌশলে নিয়েছেন৷ সাংবাদিকদের দাবি মেনে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্তটি স্থগিত বা প্রত্যাহার করলেন; তাতেই কি সব মিটে যাবে? বিষয়টা কিন্তু অত সরল নয়৷ তখন সবাই বলবে, নিশ্চয়ই সাংবাদিক নেতাদের মধ্যে কোনো ঘাপলা ছিল, নইলে হিসাব দিতে তাদের সমস্যা কোথায়? 

ব্যাংক হিসাব তলবের সিদ্ধান্ত স্থগিত বা প্রত্যাহার নয়; আমি বরং দাবি করছি তলব করা ব্যাংক হিসাব প্রকাশ করা হোক৷ আমরা দেখতে চাই, আমাদের নেতারা কতটা সৎ? আমরা তাদের নিয়ে গর্ব করতে চাই৷ পাশাপাশি দাবি করছি, প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি, বিএফইউজে, ডিইউজেসহ সাংবাদিকদের সকল প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে নির্বাচন করতে হলে, সবাইকে তার সম্পদের হিসাব জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা হোক৷ অন্য মানুষের দুর্নীতি, নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে৷ সাংবাদিক মানেই ধান্ধাবাজ, চাঁদাবাজ এই পারসেপশন বদলে আমরা উচ্চ নৈতিকতা নিয়ে মাথা উচু করে নিজেদের পেশায় মনোনিবেশ করতে চাই৷ সাংবাদিকরা হবে উচ্চ নৈতিকতার আর সাংবাদিক নেতারা হবেন সুউচ্চ নৈতিকতার, যেন কেউ আর আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়