টাকা থাকলে জেলেও আরাম, নইলে লবডঙ্কা | আলাপ | DW | 29.01.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

টাকা থাকলে জেলেও আরাম, নইলে লবডঙ্কা

ভারতের জেল উপচে পড়ছে বন্দির ভিড়ে৷ টাকা থাকলে আরাম মেলে৷ নইলে কাটাতে হয় অসহনীয় পরিবেশে৷

দিল্লির তিহার জেল

দিল্লির তিহার জেল

পশ্চিমবঙ্গের এক বিশিষ্ট আইনজীবী আড্ডায় ক্রিমিনাল প্র্যাকটিসের গপ্পো শোনাচ্ছিলেন৷ এক ধনী ব্যবসায়ী আর্থিক কেলেঙ্কারি করে তার কাছে এসেছিলেন আইনি সাহায্য নিতে৷ অনেক চেষ্টা করেও আইনজীবী ওই ব্যবসায়ীর জেলযাত্রা আটকাতে পারেননি৷ পরে ওই ব্যবসায়ীর কাছেই শুনেছিলেন প্রথম দিনের জেলের অভিজ্ঞতা৷

ভারতের জেলে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারের ভিতর বিশেষ বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়৷ নতুন বন্দি এলে ওই সাজাপ্রাপ্ত আসামিদেরই দায়িত্ব পড়ে নতুন ব্যক্তিকে জেলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার, সব কিছু চিনিয়ে দেওয়ার৷ তেমনই এক সাজাপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গে জেলে ঢোকার পরেই নতুন অতিথিকে জানিয়ে দেওয়া হয়, নগদ ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে৷ যদি না দেওয়া হয়-- বুম... কথায় নয়, হাতেকলম উদাহরণ দেওয়া হয়েছিল নাকের ডগায় সপাটে ঘুঁসি মেরে৷ নাক থেকে যখন গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে, নতুন অতিথিকে বলা হয়, টাকা দিয়ে দিলে রাজার হালে থাকা যাবে৷ ভালো খাবার, ধোলাইহীন রাত, সিগারেটের ব্যবস্থা, এমনকি, মাসে একরাত বাড়িতে কাটানো৷ রাতে জেল থেকে গাড়ি নিয়ে যাবে, সকালে গুনতি শুরু হওয়ার আগে ফের সেই গাড়ি জেলে পৌঁছে দেবে৷ কেউ কিছু বলবে না৷ বলাই বাহুল্য, ওই ব্যবসায়ী টাকা দিয়েছিলেন৷ সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ঠিকানা দিয়েছিলেন৷ ব্যবসায়ীর ছেলেরা সেখানে গিয়ে টাকার ব্যাগ রেখে এসেছিলেন৷

ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই মোটের উপর এটাই জেলের সার্বিক ছবি৷ খরচ করলে অঢেল সুযোগ, না করলে লবডঙ্কা৷ গরিব মানুষের হাজতবাস নরকেরও অধম৷ কেমন?

দীর্ঘদিন ভারতের জেল ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন স্মিতা চক্রবর্তী৷ ওপেন প্রিজন নিয়ে তার বক্তব্য, আদালতে বিচারপতি উদ্ধৃত করেছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানিয়েছেন, ‘‘ভারতের জেলে সাধারণত একজন বন্দির ৩৬ বর্গফুট জায়গা পাওয়ার কথা৷ নয় বাই চার ফুট বরাদ্দ৷ অর্থাৎ, একটি সাধারণ সিঙ্গল চৌকির চেয়ে দৈর্ঘ্যে সামান্য বেশি৷ কিন্তু বাস্তবে গরিব বন্দিরা সেটুকু জায়গাও পান না৷’’ কতটুকু পান? স্মিতার মতে, একেক জেলে একেক রকম পরিস্থিতি৷ তবে গড়ে বলতে গেলে, ওইটুকু জায়গায় আড়াইজনকে থাকতে হয়৷

সাধারণত দিনের পনেরো ঘণ্টা সেলে বন্দি থাকতে হয় বন্দিদের৷ ৩৬ বর্গফুট জায়গায় আড়াই জন মানুষ যদি দিনের পনেরো ঘণ্টা কাটান, তাহলে তাদের মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা ঠিক কেমন হতে পারে, তা আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন হয় না৷ এর সঙ্গে অকথ্য খাবার, ভয়াবহ বাথরুমের অবস্থা উপরি পাওনা৷

এই খাবারের গল্পই বলেছিলেন সত্তরের দশকের এক জেলা বিচারক৷ জেলার কারাগার দেখতে যাওয়ার ডিউটি থাকতো তাদের৷ কাউকে না জানিয়ে আচমকা জেল পরিদর্শনের কথা থাকলেও খবর বেরিয়ে যেতো৷ বিচারক জেলে পৌঁছে দেখতেন সবই ঠিক আছে৷ অথচ বন্দিদের ভূরি ভূরি অভিযোগ৷

পরিসংখ্যান আসলে সেই অভিযোগকেই মান্যতা দেয়৷ জেল নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠনগুলির তথ্য বলছে, কোনো কোনো রাজ্যে ৪০০ শতাংশ ওভারক্রাউডেড জেল৷ রাজস্থানের ফালৌদি জেলে যেখানে একটি উইংয়ে ১৭ জনের থাকার কথা, সেখানে রয়েছেন ৭৪ জন বন্দি৷ সামগ্রিকভাবে এটাই ভারতের জেলের ছবি৷ সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলায় জানিয়েছিল ভারতের জেলগুলিতে গড়ে ১৫০ শতাংশ অতিরিক্ত বন্দি রয়েছে৷ আর এই অতিরিক্ত বন্দি থাকার কারণেই জেল ঘিরে গড়ে উঠেছে নানান চক্র৷ সামান্য সুবিধা পাওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকা ঘুস দিতে হয়৷ সেই টাকা ঘুরে বেড়ায় জেলের বাইরে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার জগতে৷ বাইরে থেকেই যারা জেলের অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে৷

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

আর এর ঠিক বিপরীত দিকে রয়েছে বিত্তবান বন্দিদের দল৷ সম্প্রতি তথ্য জানার অধিকার আইনে জানা গেছে, রাজনৈতিক নেতা, বড় ব্যবসায়ী, ফিল্মস্টাররা জেলে গেলে যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্য পান৷ দক্ষিণের রাজনীতিবিদ শশীকলা জেলের ভিতর বাড়ি থেকে পাঠানো শাড়ি পরতেন৷ তার জন্য আলাদা রান্নাঘরের ব্যবস্থা ছিল৷ টেলিভিশন সেট পর্যন্ত ছিল তাঁর সেলে৷ সঞ্জয় দত্ত, কানিমোঝি থেকে শুরু করে টু-জি স্পেকট্রাম স্ক্যামে অভিযুক্ত এ রাজা সকলেই এই সুবিধা পেয়েছেন৷ স্মিতার অবশ্য বক্তব্য, রাজনৈতিক বন্দি এবং বড় বড় ব্যবসায়ীদের জন্য কখনো কখনো এমন ব্যবস্থা করতেই হয়৷ নিরাপত্তার স্বার্থে৷ কিন্তু তা কতদূর পর্যন্ত করা হচ্ছে, সেটাই দেখার৷ অনেক সময়েই দেখা যায়, রাজনৈতিক চাপে এবং টাকার খেলায় অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে যান তারা৷ কেউ কেউ আবার জেলে না গিয়ে সরকারি হাসপাতালে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন৷ পশ্চিমবঙ্গের একাধিক রাজনীতিবিদ সাম্প্রতিক সময়ে সে সুবিধা নিয়েছেন৷

পৃথিবীটাই চলে শ্রেণিভেদে৷ উচ্চশ্রেণি বরাবরই সুবিধাভোগী৷ ভারতের জেলও তার ব্যতিক্রম নয়৷ যার যত ক্ষমতা, জেলেও তার সুযোগ তত বেশি৷ ট্যাঁক ফুটো হলে বিপুল যন্ত্রণা৷ আর স্বাভাবিকভাবেই সেই টাকার খেলায় জুড়ে আছে বিশাল অন্ধকার জগৎ৷ রাজনীতি, প্রশাসন কেউই তার বাইরে নয়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়