‘ঝুঁকি নিয়ে পাইলটদের ফ্লাই করতে বাধ্য করা হয়′ | আলাপ | DW | 03.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সাক্ষাৎকার

‘ঝুঁকি নিয়ে পাইলটদের ফ্লাই করতে বাধ্য করা হয়'

কী পরিস্থিতিতে বিমান চালাতে হয় বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর পাইলটদের? সুযোগ-সুবিধা কেমন? চাকরিতে কতটা সন্তুষ্ট তাঁরা? ডয়চে ভেলেকে বিস্তারিত জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত পাইলট সৈয়দ মাহবুব হেলাল৷

বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)-র সাবেক সভাপতি গত বছর ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইন্স পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন (ইফাআলপা)-র ‘আজীবন সম্মাননা' পেয়েছেন৷ এশিয়া মহাদেশের প্রথম বৈমানিক হিসেবে এ সম্মাননা পাওয়া সৈয়দ মাহবুব হেলালের এ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো সম্পর্কে অজানা অনেক কথা৷

ডয়চে ভেলে : একজন পাইলটকে বিমান ছাড়ার আগে কী কী বিষয়ে নজর দিতে হয়?

ক্যাপ্টেন সৈয়দ মাহবুব হেলাল : একজন বৈমানিককে ফ্লাইট বুঝে নেওয়ার পর কতগুলো দিক অবশ্যই দেখতে হবে৷ তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের সুস্থতা৷ এই সুস্থতার দু'টো দিক আছে৷ একটা শারীরিক ও আরেকটা মানসিক৷ দ্বিতীয়ত হলো, তিনি কত টাইম লিমিটের মধ্যে ফ্লাই করতে যাচ্ছেন এবং কোন এয়ার ফিল্ডে ফ্লাই করতে যাচ্ছেন৷ আরেকটা জিনিস হলো কো-কর্ডিনেশন৷ উনি ক্যাপ্টেন হোন আর ফাষ্ট অফিসারই হোন, দুই জন ক্রু মিলে একটা টিম ওয়ার্ক হয়৷ এখানে দেখতে হবে উনার কী অভিজ্ঞতা আছে৷ আমার সঙ্গে যাওয়ার আগে তিনি আরো কোনো ফ্লাইট করেছেন কিনা৷ তার অভ্যাসগত কোনো সমস্যা আছে কিনা৷ তিনি সব ধরনের রুল মানেন কিনা৷ এই জিনিসগুলোই মূলত ফ্লাই করার আগে আমাদের মাথায় থাকে৷    

অডিও শুনুন 10:45
এখন লাইভ
10:45 মিনিট

‘সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে মালিকদের আন্ডার হ্যান্ড ডিলিং আছে’

বিমানে কোনো ত্রুটি আছে কিনা সেটা কারা দেখে?

একজন পাইলট যখন একটা ফ্লাইট বুঝে নেন এবং ককপিটে যান, সর্বপ্রথম তাঁর কাছে আসে টেকনিক্যাল লগ বই৷ ওই বইয়ে লেখা থাকে জাহাজে কী কী ত্রুটি আছে, এই ত্রুটিগুলো কিভাবে ঠিক করা হয়েছে, কারা ঠিক করেছেন৷ যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের সবার সেখানে স্বাক্ষর থাকে৷ এগুলো দেখে পাইলট যদি মনে করেন জাহাজটা অ্যাকসেপ্ট করবেন, তাহলে তিনি করতে পারেন৷ অন্যথায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা থাকলে পাইলট বলতে পারেন তিনি ফ্লাই করবেন না৷ এই স্বাধীনতা তাঁর আছে৷ তবে হ্যাঁ, ছোটখাট কিছু সমস্যা থাকতে পারে, যেগুলো পরেও ঠিক করা যাবে৷ সেক্ষেত্রে পাইলট ফ্লাইট অ্যাকসেপ্ট করে নিতে পারেন৷  

বিমানে কোনো ত্রুটি থাকলেও কি পাইলট ফ্লাই করেন? ইউএস -বাংলার দুর্ঘটনার পর বলা হচ্ছে এয়ারলাইন্সগুলোর মালিকদের চাপে পড়ে ত্রুটি নিয়েই তাঁরা ফ্লাই করতে বাধ্য হচ্ছেন?  

সবকিছুই খাতা কলমে থাকে না৷ কিছু বিষয় হিডেন থাকে৷ কিন্তু সেগুলো সত্য৷ বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো যেটা করছে, সেটা মারাত্মক ভয়াবহ৷ যেমন ধরেন, ফ্লাইট ছাড়ার আগে পাইলট দেখছেন আবহাওয়া রাডার নষ্ট হয়ে গেছে৷ তখন ওটা ঠিক করতে বললে মালিকরা বলছেন, তাঁদের এটার স্পেয়ার নেই বা এটা এখন ঠিক করতে গেলে ফ্লাইটের টাইম এলোমেলো হয়ে যাবে৷ তখন পাইলট কিছু বললে তাঁকে চাপ দেয়া হচ্ছে৷ এমনকি উপর থেকে তাঁর কাছে ফোনও যাচ্ছে৷ পাইলটকে যখন তাঁর মতের বিরুদ্ধে ফ্লাইট অ্যাকসেপ্ট করানো হচ্ছে তখনই দেখা যাচ্ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়৷ পাইলটও তখন ওই প্রতিষ্ঠানের ফ্লাইট করার ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না৷ আমি বলবো, তাঁকে বাধ্য করা হয়, যেটা অবৈধ ও অনিরাপদ৷    

অনেক সময় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পাইলটদের ফ্লাই করতে বাধ্য করা হচ্ছে?

আমি বলবো, কোম্পানি যদি পাইলটদের মতামতকে গুরুত্ব দেন, তাহলে ঝুঁকি অনেক কমে যাবে৷ আমি এত বছর বিমানে কাজ করেছি, বিমান কর্তৃপক্ষ কখনোই আমাদের এই ধরনের অনৈতিক চাপ দেয়নি৷ এখন যা শুনছি, ডিক্টেটরদের মতো করে তাঁদের পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে৷ তারা পাইলটকে বলছে, তুমি ফ্লাই করতে না চাইলে বাড়ি চলে যাও৷ আমরা কালই বিকল্প পাইলট নিয়ে আসব৷ বাংলাদেশে পাইলটের চাকরি সহজলভ্য না, ফলে তাঁদের অনেক কিছুই চিন্তা করতে হয়৷ কোম্পানির উচিত অনিরাপদ অবস্থায় কোনোভাবেই একটা জাহাজ না পাঠানো৷ এর খেসারত আমরা তো দেখতেই পাচ্ছি৷ 

বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর অনৈতিক চাপ দেখার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ আছে?

অবশ্যই আছে৷ আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি, আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের আন্ডারে প্রতিটি দেশেই এই ব্যবস্থা আছে৷ আমাদের দেশে যেমন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা সিভিল এভিয়েশন আছে৷ তাদের দেখার দায়িত্ব হলো সরকারি বা বেসরকারি কোনো এয়ারলাইন্স যা ইচ্ছে তাই করার সুযোগ পাবে না৷ সবকিছুই তাদের নিয়ম বা প্রসিডিওরের মধ্যে থেকে করতে হবে৷ এটা করার জন্য চার্জগুলো বেসরকারি এয়ারলাইন্স থেকে তারা নিচ্ছে৷ সিভিল এভিয়েশনের ব্যর্থতা হবে যদি কোনো এয়ারলাইন্স এই ধরনের প্র্যাকটিস করে থাকে, এটা বন্ধ করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশনের৷

আপনাদের তো একটা সংগঠন আছে বাপা, তারা কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে? 

অবশ্যই তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে৷ এটা তো আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম৷ বাপার ভূমিকার কারণেই তো এতদিন এত ফ্লাইট করার পরও কোনো অসুবিধা হয়নি৷ যাত্রীরাও নিরাপদ বোধ করে৷ পাইলটরাও সুস্থভাবে ফ্লাইট পরিচালনা করছে৷ আমি যদিও অনেকদিন আগে বাপা থেকে চলে এসেছি, আমি বলবো, এই মুহুর্তে বাপার একটা বিরাট দায়িত্ব আছে এগুলো নিয়ে কথা বলার৷ এখন তারাই পারবে সরকারের সঙ্গে কথা বলে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সগুলোর সমস্যা তুলে ধরতে৷ কারণ, আরেকটা ডিজাস্টার হয়ে গেলে এভিয়েশন সেক্টরে আমরা

অনেক বছর পিছিয়ে যাবো এবং সেটা রিকভার করা আদৌ সম্ভব হবে কিনা আমি জানি না৷ 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে যাঁরা পাইলট হিসেবে আসছেন, তাঁরা কি দক্ষতার সঙ্গে বিমান পরিচালনা করছেন?

আমি বলবো যে, বাংলাদেশে বেসরকারি ফ্লাইং ক্লাব দুটো বা তিনটে আছে৷ এর মধ্যে দুটোর নাম বেশ ভালোই আছে৷ আর যারা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে আসছেন, তাঁরা তো ভালোই করছেন৷ আগের থেকে বর্তমানে যাঁরা আসছেন, তাঁরা অনেক ভালো করছেন৷ আমি এটাতে সন্তুষ্ট বলতে পারি৷ 

একজন পাইলট দিনে কত ঘন্টা ফ্লাই করতে পারেন? এর স্টান্ডার্ডই বা কী?

আইকাও থেকে যে নির্দেশনা আছে সেটা অনেকটা লিবারেল৷ অভ্যন্তরীণ রুটে আমাদের পাইলটদের প্রায় প্রতিদিনই ফ্লাই করতে হচ্ছে৷ যেটা সপ্তাহে ৫ বা ৬ দিন৷ আবহাওয়াসহ সবকিছু মিলিয়ে এশিয়াতে সর্বোচ্চ ৬ সেক্টর ফ্লাই করতে পারি৷ তবে কোনো অকারেন্স বা অন্য কোনো কারণে ১১ ঘন্টা পর্যন্ত ফ্লাই করা যায়৷ এটা রুটিন না৷ এখানে প্রতিদিন একজন পাইলটকে ১১ ঘন্টা খাটানো যাবে না৷ শারীরিক ও মানসিক দিক বিবেচনা করে অভ্যন্তরীণ রুটে ৪ থেকে ৬ সেক্টর ফ্লাই করাই শ্রেয়৷ একটা ফ্লাইট ৩৫ থেকে ৪০ মিনিট৷ এটাকে এক সেক্টর বলা হয়৷

ইউএস-বাংলা বিধ্বস্ত হওয়ার পর সামনে এসেছে পাইলটের অবসাদ বা জোর করে ফ্লাই করানোর বিষয়টি৷ এতদিন কেন আপনারা এগুলো বলেননি?

আসলে এটা গুরুতর একটা অভিযোগ৷ ভেতরে ভেতরে আমরা জানি যে, বাংলাদেশে এভিয়েশনের যে বাজার, তাতে কোনো পাইলটই চাকরি হারাতে চান না৷ এখন যেটা হচ্ছে, কোনো ফাষ্ট অফিসার যদি বলেন, প্রতিটি যাত্রীর সিটবেল্ট থাকা বাধ্যতামূলক৷ কিন্তু তাঁর ফ্লাইটে কয়েকটি সিটে সিটবেল্ট নেই, তাই তিনি ফ্লাই করবেন না, তাহলে তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং পরের দিন নতুন একজন পাইলটকে নিয়ে আসা হচ্ছে৷ এই অনৈতিক কাজের কারণে পাইলটরা ভয় পেয়ে যান৷ এ কারণে তাঁরা এতদিন কিছু বলতে পারেননি৷ আরেকটা জিনিস হলো, সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর মালিকদের ‘আন্ডার হ্যান্ড ডিলিং' আছে৷ ফলে পাইলটরা তাদের ভয় পেতেন এবং কিছু বলতে পারতেন না৷ তাদের কথা না শুনলে সিভিল এভিয়েশন লাইসেন্স নিয়ে আমাদের বিপদে ফেলবে বা কোম্পানি আমাকে কোর্ট কাচারিতে নিয়ে যাবে৷ 

বাংলাদেশে এখন পাইলটের সংখ্যা কত? এর মধ্যে নারী কতজন?

সর্বশেষ হিসেব আমি বলতে পারবো না৷ তবে ভালো খবর হলো, আমাদের বাংলাদেশ বিমানে প্রচুর নারী আসছেন৷ অন্তত ১২ জন নারী পাইলট আছেন৷ ৭৭৭-এর পাইলট হিসেবেও নারীরা আছেন৷ আর বেসরকারিতে সংখ্যাটা বলতে পারব না৷ তবে যেভাবে নারীরা আসছেন, সেটা আশাবাদী হওয়ার মতো৷ তাঁরা দক্ষতার সঙ্গেই ফ্লাই করছেন৷ 

ইউরোপের কোনো একজন পাইলটের সঙ্গে যদি বাংলাদেশের একজন পাইলটের তুলনা করি, আপনি কী বলবেন?

আমি যদি বাংলাদেশ বিমানের কথা বলি, তাহলে বলবো যে, ইউরোপের যে কোনো পাইলটের চেয়ে আমাদের স্ট্যান্ডার্ড অনেক হাই৷ কাতার ও এমিরেটস এয়ারলাইন্সের পাইলটদের ব্রিফিং দেয়া হয় যে, বাংলাদেশের পাইলটরা ব্র্যান্ড নিউ জাহাজ চালানোর সুযোগ তেমন একটা পান না, পুরনো জাহাজ নিয়েই তাঁরা কত সুন্দর ফ্লাইট করছেন, অথচ তাঁদের দুর্ঘটনার সংখ্যা তোমাদের চেয়ে তাদের অনেক কম৷ 

ইউএস-বাংলার দুর্ঘটনা কতটা প্রভাব ফেলবে বেসরকারি বিমান পরিচালনায়?

আমি বলবো যে, বাংলাদেশের উন্নয়নের যে ধারা সেটা বাধাগ্রস্থ হতে পারে৷ শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে ইন্ড্রাষ্টি হচ্ছিলো, সেটা বাধাগ্রস্থ হতে পারে৷ যেখানে সকালের ফ্লাইটে একজন যাচ্ছেন, কাজ শেষ করে বিকেলের ফ্লাইটে ফিরে আসছেন৷ এই কাজগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ফ্যাক্টরিগুলো এখানে আর বাড়বে না৷ ইতিমধ্যে অনেক বড় ধরনের যাত্রী সংকট শুরু হয়ে গেছে৷ এখন ভেতরের খবরগুলো পাওয়ার পর যাঁরা সেনসিটিভ তাঁরা আর বেসরকারি এয়ারলাইনে ফ্লাই করতে চাইবেন না৷ এই সংকট কাটাতে বেসরকারি এয়ারলাইনগুলোকে নতুন করে ভাবতে হবে এবং সরকারকেও উদ্যোগ নিতে হবে যে তারা যেন কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ করতে না পারে৷ এভাবেই জনগনের মধ্যে আস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে৷

 

পাইলটদের এই সুবিধা অসুবিধাগুলো নিয়ে আপনাদের কী মত? লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন