‘জেল হত্যার পর পাঁচ বছর দেশে আসতে পারিনি’ | আলাপ | DW | 29.01.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘জেল হত্যার পর পাঁচ বছর দেশে আসতে পারিনি’

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়৷ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ধরে নিয়ে জেলে পুরে হত্যা করা চার নেতার একজন এ এইচ এম কামরুজ্জামান৷

এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন

কারাগারে নিহত জাতীয় নেতা এ এইচ এম কামরুজ্জামানের ছেলে খায়রুজ্জামান লিটন

প্রয়াত নেতার বড় ছেলে রাজশাহীর মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন কথা বলেছেন জেল হত্যা এবং দেশের জেলগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে...  

ডয়চে ভেলে : ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের এবারের সাপ্তাহিক বিশেষ আয়োজনের বিষয় বাংলাদেশের কারাগার৷ সেখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালোদিন জেলহত্যা দিবসকেও তুলে ধরা হচ্ছে৷ আপনি,আপনার পরিবারও তো সেদিনের জঘন্যতম বর্বরতার শিকার৷ আপনার বাবা, বাংলাদেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামরুজ্জামানসহ চার জাতীয় নেতাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়৷ বাবাকে হারানোর খবর কিভাবে পেয়েছিলেন সেদিন?

 এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন : আসলে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর যখন হত্যাকাণ্ডটি হয়, তার অনেক আগে থেকেই, ১৯৭২ সাল থেকে আমি এবং আমার ছোট ভাই ভারতের কলকাতার কাছে একটি মিশনারী স্কুলে পড়তাম৷ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন জাতির জনক পরিবারের অনেককে নিয়েই হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন, তখন আমরা ওখান থেকেই খবরটি পেয়েছি৷ এরপর ৩ নভেম্বর যখন আমার বাবাসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় সে খবরও আমরা ওখান থেকেই পেয়েছি৷ 

অডিও শুনুন 09:11

‘স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়াই যেন আমার পিতার একটা অপরাধ ছিল’

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা এবং তার তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে কারাগারে নিয়ে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর সংবাদমাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করা, নিহতদের স্বজনদের কথা প্রচার করা যায়নি৷ ওই অধ্যায়ের কথা প্রথমে কি অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ আ লিগেসি অব ব্লাড’ গ্রন্থেই প্রথম তুলে ধরা হয়েছিল?

পুস্তক আকারে বা সাক্ষাৎকার হিসেবে সেখান থেকেই প্রথম প্রকাশ করা হয়৷ তবে আমরা খবরগুলো পেয়েছিলাম কলকাতা বা ভারতের বিখ্যাত সব পত্রিকা যেমন আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, যুগান্তর বা হিন্দুস্থান টাইমস থেকেই৷

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি হওয়া খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান এবং লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার কথা উঠে এসেছে গোলাম মুরশিদের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ গ্রন্থে৷ তো জেল হত্যার পরিকল্পনাকারীর শাসনামল এবং তারপরের বৈরি সময়ে আপনার পরিবার কিভাবে অস্তিত্ব রক্ষা করেছে? শাসকদের কোপানলে পড়তে হয়েছিল?

এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও তার পরিবার

এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী জাহানারা জামানের সঙ্গে বড় মেয়ে ফেরদৌস মমতাজ পলি, ছোট মেয়ে কবিতা জামান এবং জাহানারা জামানের ছোট বোন হোসনে আরা ইসলাম (পেছনে ডানে)

আমরা দুই ভাই তো তখন ভারতে ছিলাম৷ আমরা ৫ বছর দেশে ফিরতে পারিনি৷ ১৭৭৫ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত৷ তখন অনেকেই আমাদের বলেছেন, ফেরাটা ঠিক হবে না৷ আর আমার মা ও চার বোন তখন ঢাকা থেকে রাজশাহীতে ফিরে আসেন৷ আমার বাবার মৃতদেহও রাজশাহীতে নিয়ে এসে দাফন করা হয়৷ এই পটবদলের সময় বিএনপির আগে বিভিন্ন নাম দিয়ে যে দলগুলো হচ্ছিল, তারা আমাদের পরিবারের উপর নিদারুণ মানসিক অত্যাচার করেছে৷ কটু কথা বলা, বাড়িতে আমার বোনরা ছিল, আমরা দুই ভাই ছিলাম না৷ সেখানে তাদের যাতায়াতে নানা ধরনের বাজে উক্তি করা, মাঝে মধ্যেই আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন দ্রব্যাদি নিক্ষেপ করা, এ সমস্ত অসামাজিক কাজ তারা করে গেছে৷ এরপর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যখন বিএনপি হয়, তখন দেখলাম তারাই রাজশাহীতে বিএনপির সম্মুখ সারিতে আছেন৷  ওই সময়গুলো আমাদের খুব খারাপ গেছে৷ আমাদের পরিবারকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া তো দূরের কথা, আমার বোনদের স্কুল-কলেজে যাওয়াও খুব অসুবিধাজনক হয়ে পড়েছিল৷ বলা যেতে পারে, স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়াই যেন আমার পিতার একটা অপরাধ ছিল! আমাদের মতো অন্য পরিবারগুলোও একই রকম কষ্ট পেয়েছে৷ সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা মনে হলে আমার অনেক খারাপ লাগে৷ আমার মা অনেক কষ্ট নিয়ে, বেদনা নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন৷ পরে যা-ই হোক তিনি বিচারকার্য দেখে যেতে পেরেছেন৷

এ এইচ এম কামরুজ্জামানের সঙ্গে তার ছোট মেয়ে কবিতা জামান

এ এইচ এম কামরুজ্জামানের সঙ্গে তার ছোট মেয়ে কবিতা জামান

আপনারা দুই ভাই দেশে ফিরলেন কবে

আমরা ফিরেছি, ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে৷

দেশে ফিরে কি আপনাদের কোনো ধরনের সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে?

আমার ভাই ফিরে এসে বুয়েটে ভর্তি হয়৷ সেখানে পড়াশোনা করেই সে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়৷ আর আমি ফিরে আসি এক বছর পর৷ আমি ফিরে এসে রাজশাহীতে ল'-তে ভর্তি হই৷ সেখানেও আমি যেন কোনো কিছুতে জড়িত না হই, আওয়ামী লীগ বা এর কোনো অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনে জড়িত না হই এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়৷ আমাদের বাড়িতে কারা আসবে-যাবে সেটাও ঠিক করে দিতো তৎকালীন বিএনপির মাসেলম্যান যারা ছিল, তারা৷ তারা এগুলো মনিটর করতো এবং দিক নির্দেশনা দিতো৷ তৎকালীন থানা পুলিশও তাদের কথাতে চলতো৷

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছর পর লন্ডনে হত্যাকাণ্ড দুটোর  হোতাদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার কারণ জানতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল৷ কিন্তু স্যার  টোমাস উইলিয়ামস, কিউ. সি. এমপি'র নেতৃত্বে গড়া ওই কমিশনকে তখন দেশে আসতে দেয়া হয়নি৷ হত্যাকাণ্ডের ৩৮ বছর পর বিচার হলেও তা কার্যকর করা যায়নি৷ এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন...

আইনি নানা জটিলতায় হোক, বলা যেতে পারে নানা অসহযোগিতার কারণে এ বিষয়টিতে দেরি হচ্ছে৷ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর কোনো স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল করেননি৷ এমনকি সামরিক আদালতও না৷ সাধারণভাবে হত্যাকাণ্ডের যেভাবে বিচার হয়, সেভাবেই বিচার করেছেন৷ সেখানে আমরা দেখলাম বেশ সময়ও লাগলো৷ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রাথমিক রায়টি পাওয়া গেলেও বাস্তবায়ন করা গেল না৷ কারণ, ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসে সবকিছু আবার এলোমেলো করে দিয়েছিল৷ চার দলীয় জোট ক্ষমতায় থাকার সময় চার নেতা হত্যার যে রায় তারা দিয়েছিল, সেটিও একটা ‘প্রহসনমূলক’ বলে আমরা বলেছিলাম৷ যেটা আমরা মেনে নিতে পারি না৷  পরবর্তীতে রায় হলেও সবাইকে পাওয়া যাচ্ছিল না, যাচ্ছে না৷ বিদেশে যারা আছে তাদের নিয়ে আসতে আন্তর্জাতিকভাবেও চেষ্টা করা হচ্ছে৷ এখন অপেক্ষার পালা৷ দেখা যাক৷  

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও দেশের বিভিন্ন কারাগারে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে৷ সুস্থ অবস্থায় কারাগারে নেওয়া হয়, কারারুদ্ধ ব্যক্তি ফিরে আসে লাশ হয়ে৷ কারাগারে মানুষ কি এখনো নিরাপদ?

আমি মনে করি, ১৯৭৫ সালের জেল হত্যার সময়টি খুবই খারাপ সময় গেছে৷ তবে আমাদের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয় এবং সেরকম ঘটনা ইদানিং কালে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই৷

দেশের অনেক কারাগারই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট৷ রাজশাহী কারাগারও এর ব্যতিক্রম নয়৷ সেখানে এত গাদাগাদি অবস্থা যে করোনাকালে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে একাধিকবার বন্দি মুক্তি দিতে হয়েছে৷ কবে রাজশাহী কারাগারকে সুপরিসর আধুনিক কারাগার হিসেবে দেখা যাবে?

এটা আসলেই সময়োপযোগী একটা প্রশ্ন৷ আসলেই বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি৷ বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি৷ এই কারণে খুবই গাদাগাদি করে সবাইকে থাকতে হয়৷ সেটা সবদিক দিয়েই খারাপ৷ রাজশাহী কারাগারটি অনেক পুরনো এবং স্যাঁতস্যাঁতে একটি ভবন৷ সেটি ভেঙে বা সেটি রেখেই ঢাকায় কাশিমপুরে যেমন একটি কারাগার করা হয়েছে তেমনি শহরের উপকন্ঠে বা একটু বাইরে বড় আকারের কারাগার করবার জন্য আমরা প্রস্তাব দিয়েছি৷ এটি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে৷ বর্তমানে কারাগারটি যেখানে আছে, সেখানে কারা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করার অবকাঠামো ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে৷ কাজেই এখানে আর হবে না, নতুন জায়গাতেই আমাদের যেতে হবে৷ সেটি সময়ের ব্যাপার এখন৷

রাজশাহীর দুইবারের মেয়র হিসেবে আপনি কি এমন কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন?

আমি এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে একাধিকবার বলেছি৷ উনি রাজশাহীতে এলেও বলেছি৷ উনি সারদাতে প্রায়ই আসেন৷ সেখানেও বলেছি৷ যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই৷ শুধু প্রক্রিয়ার বিষয়টি৷ এটি হবে, হয়ে যাবে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন