জেলেটিন হালাল না হারাম? | বিশ্ব | DW | 26.07.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

জেলেটিন

জেলেটিন হালাল না হারাম?

খাদ্য, ঔষধ, স্বাস্থ্যসেবা ও সৌন্দর্যপণ্যে প্রচুর ‘জেলেটিন' ব্যবহার হয়৷ জেল ধরনের এই বস্তুটির ব্যবহার হালাল না হারাম, তা নিয়ে বিতর্ক আছে৷ এ নিয়ে দুই ধরনের মত পাওয়া যায়৷

নানা লাংইয়াহর একজন ইন্দোনেশিয়ান মুসলিম নারী৷ পরিবার নিয়ে বেশ কয়েক বছর হলো থাকেন জার্মানিতে৷ তাঁর সন্তানরা ‘গামি বেয়ার'  খুব পছন্দ করে৷ তাঁর ধারণা, এই পণ্যগুলো ইসলামে নিষিদ্ধ৷ কিন্তু বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মেনে নিচ্ছেন৷ 

‘‘ওরা গামি বেয়ার খুব ভালোবাসে৷ আমার স্বামীও খুব পছন্দ করেন,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন তিনি৷ ‘‘আসলে হারিবো (গামি বেয়ার প্রস্তুতকারী একটি কোম্পানি) শূকরের ত্বক থেকে জেলেটিন বানায়৷ তাই এটা হারাম৷ কিন্তু আমাদের আর উপায় কী বলেন? মুসলিম হিসেবে আমি অনুশোচনায় ভুগি৷ কিন্তু ঐ পর্যন্তই৷''

নানার মতো অনেকেরই ধারণা জেলেটিন পণ্যগুলো শুধু বরাহজাত আমিষ থেকে তৈরি হয়৷ অনেকে অবশ্য হালাল পণ্যও যে আছে তাও জানেন৷ যেমন লেনি মার্টিনি৷ তিনিও আরেক মুসলিম নারী৷

‘‘জার্মানিতে গামি বেয়ার নিয়ে এত চিন্তিত হবার কিছু নেই৷ হারিবো হালাল জেলেটিনও তৈরি করে,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন লেনি৷

জেলেটিন ও এর পণ্য

জেলেটিন হলো বিভিন্ন প্রাণীর ত্বক, চামড়া ও হাড় থেকে তৈরি এক ধরনের জেল, যা গামি বেয়ার ছাড়াও নানা খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত হয়৷ এছাড়া সিউইডস থেকেও তৈরি হয়৷

ইউরোপের জেলেটিন উৎপাদকদের সংগঠন জেলেটিন ম্যানুফ্যাকচারার্স অফ ইউরোপ বা জিএমইর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৯% জেলেটিন ব্যবহৃত হয় খাদ্যপণ্যে৷ ৩১% ব্যবহৃত হয় ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যে, ২% ছবি প্রক্রিয়াকরণে ও আরো বিভিন্ন কাজে ৮% ব্যবহৃত হয়৷

Orchideenfächer in Deutschland Körperpflege

অনেক বার্ধ্যক্য রোধক মাস্কেও থাকে জেলেটিন

খাদ্যপণ্য ছাড়াও ক্রিম, লোশন ও বার্ধ্যক্য রোধে ব্যবহৃত মাস্কে এটি ব্যবহৃত হয়৷ শাওয়ার জেল, শ্যাম্পু ও চুলের স্প্রেতে ছাড়াও জেলেটিন থাকে অনেক রকমের ক্যাপসুল ও ট্যাবলেটে ৷ এছাড়া খেলোয়াড়দের পুষ্টিবর্ধনে বা গবাদিপশুর খাদ্যেও এর ব্যবহার প্রচলিত৷

কোনো কোনো গবেষণা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শূকরের ত্বক থেকে প্রক্রিয়াজাত জেলেটিন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়৷ তবে ফ্রান্স ও ব্রিটেনে এর যোগানদাতা মূলত গরু ও অন্যান্য গবাদি পশু৷ তবে পুরো ইউরোপের চিত্র এমন নয়৷

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের এ বছরের বাৎসরিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘‘২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে শূকরের ত্বকের জেলেটিন থেকে৷ আগামী কয়েক বছরেও এই ধারা বজায় থাকবে৷ শূকরের ত্বকের জেলেটিন উৎপাদনে ইউরোপই সবচেয়ে এগিয়ে এবং এই ধারাও অব্যাহত থাকবে৷''

তবে তারা বলছে, গরু ও অন্যান্য গবাদি পশুর হাড় ও চামড়া থেকে তৈরি জেলেটিন তৈরির হার বছরে সাড়ে পাঁচ শতাংশ করে বাড়ছে৷ কাঁচামাল ব্যবহারের হিসেবে শূকরের ত্বকের চেয়ে অন্য উপাদানগুলো মোট হিসেবে এগিয়ে আছে৷ 

ধর্মীয় ও খাদ্যাভ্যাসের বিধিনিষেধ

কোনো কোনো ধর্মে বিশেষ প্রাণীর শরীরের অংশ খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে৷ যেমন মুসলিমদের ক্ষেত্রে শূকরের মাংস হারাম৷ তাই শূকরের ত্বকের জেলেটিনও হারাম, বলে ধরা হয়৷ ইহুদিদের মধ্যেও এমন নিয়ম আছে৷ 

ভেগান ও ভেজিটারিয়ানরা কোনো প্রাণিজ প্রোটিন খাবার বিপক্ষে৷ শিখ, হিন্দু ও জৈনদের অনেকে শুধু সিউইডস থেকে তৈরি জেলেটিন গ্রহণের পক্ষপাতী৷

তাই অনেক কোম্পানি হালাল ব্র্যান্ডিং করে জেলেটিনের পণ্য বাজারে ছাড়ে৷ ইউরোপে জিএমই হালাল সার্টিফিকেট দেয়৷ তারা খাদ্যপণ্য ও ওষুধে এই সনদ দেয়৷ ইসলামিক স্কলার বা ইমামদের পরামর্শ নিয়ে তারা এ সিদ্ধান্ত দেয়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

হালাল জেলেটিন কি কোনো মিথ?

বেশ অনেক বছর ধরে জেলেটিন হালাল না হারাম এই বিতর্ক চলছে মুসলিম সমাজে৷ বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ ও অনেক আলেম ওলামারা শূকরের ত্বক থেকে তৈরি জেলেটিনকে হারাম বলে মানেন৷

মালয়েশিয়াভিত্তিক হালাল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এইচডিসি) মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফতোয়াকে ভিত্তি করে শূকরের আমিষের জেলেটিনকে হারাম ঘোষণা করেছে৷

সেখানে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সু'আদ সালিহের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘‘জেলেটিন যেহেতু হাড়, ক্ষুর ও প্রাণীর টিস্যু সিদ্ধ করে তৈরি করা হয়, তাই এটা প্রাণীটির বৈশিষ্ট্যই ধারণ করে৷ যদি সেই প্রাণীর মাংস হালাল হয়, যেমন গরু, উট, ভেড়া ও অন্যান্য, তাহলে জেলেটিনও হালাল হবে, এবং এই প্রাণী থেকে তৈরি অন্যান্য খাদ্যপণ্যও৷ কিন্তু তা যদি হারাম হয়, যেমন শূকর, তাহলে তার জেলেটিনও হারাম হবে৷''

প্রাণীর মাংস হালাল হলেও তা হত্যা করতে ইসলামিক উপায় অবলম্বন করা হয়েছে কি না, তাও দেখতে হবে বলে আরেকটি ফতোয়ায় বলা হয়েছে৷ সেখানে অবশ্য জানা না থাকলে তা গ্রহণযোগ্য এমনটি বলা হয়েছে৷

তবে অনেক ফতোয়া (ফিকহ) কাউন্সিল বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখে৷ তাদের মতে, জেলেটিন এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয় যে তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারায়৷ সেখানে নির্দিষ্ট প্রাণীর কোনো বৈশিষ্ট্য থাকে না৷ তাই তা হারাম নয়৷ ক্যারিবয়ার দেশ টোবাগো ভিত্তিক মুওয়াহহিদিন পাবলিকেশন্সে বিশ্লেষক শায়খ মুহাম্মদ ইবনে উমর বাজমুল যে ফতোয়া দিয়েছেন তাতে বলা হচ্ছে, যখন জেলেটিন প্রক্রিয়া করা হয়, তখন সে তার প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য হারায়৷ আর তাই সে অবৈধ থেকে বৈধ হয়ে যায়৷

যারা এই ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাসী তারা আঙ্গুরের উদাহরণ দেন৷ তারা বলেন, আঙ্গুর হালাল, কিন্তু তা থেকে নির্মিত অ্যালকোহল হারাম৷ আবার অ্যালকোহল যখন ভিনেগারে পরিণত হয়, তখন তা হালাল৷ এই রাসায়নিক পরিবর্তনকে আরবি ভাষায় ‘ইসতিহালাহ' বলা হয়৷

ইন্দোনেশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড প্লুরালিজমের পরিচালক শফিক হাসিম এ বিষয়ে ডয়চে ভেলের কাছে এই দু'টি ‘স্কুল অফ থট'-কে ব্যাখ্যা করেন৷

‘‘ইন্দোনেশিয়াতে শূকরের জেলেটিন নিষিদ্ধ৷ কারণ ইন্দোনেশিয়ার উলামা কাউন্সিল শাফেয়ি মাযহাবের,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন হাসিম৷

‘‘কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এটা নিষিদ্ধ নয়৷ কারণ তারা মনে করেন যে প্রক্রিয়াজাত জেলেটিনে শূকরের ত্বক বা মাংসের কোনো বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট নেই৷ এটি ‘পিউরিফায়েড' হয়৷ তারা হানাফি মাযহাবকে সমর্থন করেন,'' যোগ করেন তিনি৷

তিনি জানান যে, বিশ্ব এখনো শূকরের জেলেটিনের ওপর অনেক নির্ভরশীল৷ ঔষধ শিল্পে যেসব জেলেটিন ব্যবহৃত হয় তার ৮০ ভাগ শূকর থেকে আসে৷ তাই ব্যবসায়ীদের জন্যও যত বেশি দেশ এটি অনুমোদন দেবে তত সুবিধা৷

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আ্য়ু পুর্বানিংসিহ ও ইউসুফ পামুনচাক৷

বিজ্ঞাপন