জেগে উঠুক মানুষ, খসে পড়ুক ট্যাবু | আলাপ | DW | 12.07.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

জেগে উঠুক মানুষ, খসে পড়ুক ট্যাবু

তখন স্কুলবেলা৷ তখন নবম শ্রেণি৷ ঘণ্টা বাজার শব্দ শুনে বুঝি ফুরালো টিফিন পিরিয়ড৷ এক ছুটে ক্লাশরুম৷ মিনিট না পেরোতেই স্যার চলে এলেন৷ বিষয় জীববিজ্ঞান৷

মেয়ে জন্মের দায় কার—মা নাকি বাবার? বোঝাতে গিয়ে লজ্জায় লাল স্যার! কি সব বলে টলে 'বাবা'র ঘাড়ে দায় চাপিয়ে চলে গেলেন শিক্ষক! গোটা ক্লাশ রুমে ছড়িয়ে পড়ে লজ্জা, কেউ কেউ আড় চোখে হাসাহাসি৷ কেন ‘বাবা' দায়ি সেদিনের ক্লাশে বিষয়টি মোটেও পরিস্কার হয়নি৷ কারণ তারও আগে থেকে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় যৌনতা যেন নিষিদ্ধ কোনো বিষয়৷ খোলামেলা আলোচনায় বাধা, বোঝাতে ব্যর্থ শিক্ষক৷

প্রকৃতির খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যৌনতা৷ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই৷ তবু কি এক বাধার দেয়াল তুলে অন্ধকারে রাখা হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে৷ ফলে আজকের দিনে এসে ধর্ষণের মতো কদাকার ঘটনা আর ধর্ষকদের মতো নরপিশাচরা তৈরি হয়েছে সমাজের এই অচলায়তন থেকে৷

সমাজের এই অচলায়তন ভাঙতে পারলেই অনেক কিছু সহজ৷ বয়সন্ধিক্ষণে যে মেয়েটি হঠাৎ রক্তের উপস্থিতি টের পেয়ে আতঙ্কিত হয়, বাড়ির কাউকে বলতে গিয়ে তাঁকে পড়তে হয় দ্বিগুণ ভয়ের মুখে৷ এতো কঠোর গোপনীয়তা আর রাখঢাকে মেয়েটি হারিয়ে ফেলে নিজের স্বত:স্ফূর্ততা৷ অথচ মাসিক রক্তস্রাবও স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া৷ পৃথিবীর প্রতিটি নারীকে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়৷ তবুও স্বাভাবিক একটা বিষয় নিয়ে এতো লুকোচুরির কি আছে?

সব পরিবারের চিত্র প্রায় একইরকম৷ শরীরবৃত্তীয় সবকিছু থাকবে গোপন৷ যেন কিশোরী মেয়েটিকে বোবা বানাতে পারলেই খুশি পরিবার৷ ফলে কিশোরী যখন তাঁর শরীরে কাছের-দূরের মানুষের দ্বারা অপ্রত্যাশিত স্পর্শ টের পায়, কিংবা হয়রানির শিকার হয় তখনো লোকলজ্জার ভয়ে আড়াল খোঁজে৷ নিজের ভেতর মরে যায়, কিন্তু মুখ ফোটে বলতে পারে না কিছু৷ পরিবারের কারো সঙ্গে শেয়ার করলে, চেপে যাওয়ার পরামর্শটিই আসে৷ ছেলেদের বেলাতেও কিন্তু গল্পটার ভিন্নতা নেই৷ কিন্তু চুপ না থেকে  যদি প্রতিবাদী হতো, তাহলে বাস্তবটাতা ভিন্ন হতে পারতো৷

ধর্ষণ কোনো সমাজেই কাম্য নয়৷ যারা ধর্ষক তাদের চিহ্নিত করার কোনো বিকল্প নেই৷ সামাজিকভাবে ধর্ষণকে প্রতিরোধ করতে হবে৷ নতুন ধর্ষক তৈরি হওয়ার আগে ভেঙে ফেলতে হবে বিষদাঁত৷ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মধ্য দিয়ে অপরাধীর বিচার সম্পন্ন করতে হবে৷ সেই বিচারের রায় নিশ্চয় পৌঁছে যাবে কামলোলুপ পুরুষের কানে৷ তাহলে নিজের এবং তাঁর অবদমিত যৌনবাসনার লাগাম টেনে ধরতে পারবে সে৷

কিন্তু বিচার না থাকায় ধর্ষকরা মেতেছে পৈশাচিকতায়। কতোটা অধপতন আর নৈতিক স্খলন হলে, শিশুরাও বাদ পড়েনা তাঁদের ছোবল থেকে। বিকৃত যৌনাচারের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে যেন গোটা দেশ৷

নির্মম হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে ভিকটিমের কারণেই পার পেয়ে যাচ্ছে ধর্ষকরা৷ আদালতে অভিযোগ করতে পিছপা হচ্ছেন ধর্ষিতারা৷ নিজেই নষ্ট করছেন অনেক আলামত৷ কারণ আর কিছুই নয়—সমাজ কাঠামো৷ আর ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে নষ্ট লোকটা। যে কাপুরুষ ধর্ষণ করে, লজ্জায় মাথা নোয়াবার কথা তাঁর৷ কিন্তু আমাদের সমাজে চিত্রটা উল্টো৷ লোকচক্ষুর আড়ালে নেয়া হয় ধর্ষিতা মেয়েটাকে৷ আর মানুষের মতো দেখতে জানোয়ারটা হাঁটে বীরদর্পে৷

কাপুরুষের দ্বারা একটা মেয়ে ধর্ষিত হলে, মেয়েটিকে কেন বলা হবে তাঁর সব শেষ? তাঁর সম্মানহানি হবে কেন? তাঁকে অপয়া, কুলটা বলে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে? একটা বেপরোয়া লোক অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাঁর শরীরের হামলে পড়েছে বলে কি সে পঁচে গেছে?—এসব প্রশ্ন সামনে আসা খুব প্রয়োজন৷ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা এসব ট্যাবু না ভাঙলে, এ অবস্থা বন্ধ করা কঠিন হবে৷ এসব প্রশ্নের মীমাংসা নেই বলে, অনেকে বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ৷ তাতে তো নিস্তার পাচ্ছে ধর্ষকেরা৷

একটা শ্রেণির কথা না বললেই তো নয়৷ প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনায় ভিকটিম নারীকে তুলোধুনো করে ছাড়ে তাঁরা৷ প্রশ্ন তোলে নারীর পোশাক, চলন নিয়ে। যার আড়ালে তাঁরা আসলে ধর্ষকের সপক্ষে দাঁড়ায়৷ আর ধর্মীয় গোঁড়ামি দিয়ে নারীর পায়ে শেকল পড়ানোর প্রাণান্ত চেষ্টাও নতুন কিছু নয়৷ সেই শ্রেণিকে সামাজিকভাবে বয়কট করাও প্রয়োজন৷ তবে মানবিক সমাজ গঠিত না হলে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মোকাবেলা করাটা কঠিন৷ মুক্তবুদ্ধির চর্চা নিশ্চিত করতেই হবে৷

Tanjir Mohammad Mehedi Chowdhury DW Praktikant aus Bangladesch

তানজীর মেহেদী, ডয়চে ভেলে

আবার একথাও সত্য সমাজে ভারসাম্য রক্ষা করাটা প্রয়োজন৷ পৃথিবীর অনেক দেশেই পতিতাবৃত্তি আছে৷ আমাদের দেশে পতিতাবৃত্তির পরিসর আরেকটু বড় করলে, আহামরি কোনো ক্ষতি নেই৷ কারণ আড়ালে আবডালে এটা সমাজে বিদ্যমান৷ ঠেকিয়ে রাখার চেয়ে ছক কষে তা উন্মুক্ত করে দিলে সমাজের ভারসাম্য কিছুটা রক্ষা হবে বলে আমার মনে হয়৷ 

তবে মূল পরিবর্তন শুরু হতে হবে পরিবার থেকে৷ সন্তানের বেড়ে উঠার সঙ্গে তাঁর ইচ্ছে অনিচ্ছে শোনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ বন্ধু হয়েই তাঁর ভালো-মন্দের খবরটা নিতে হবে, জানতে হবে তাঁর অস্বস্তির জায়গাটা৷ পরিবারের পাশাপাশি স্কুল থেকেও যৌনতার শিক্ষা দেয়াটা দরকার৷ তা হলে, বয়সন্ধিক্ষণের সময়টা নিঃসংকোচে পার করবে কিশোর-কিশোরীরা৷ স্বাভাবিক বিকাশ হবে তাঁদের৷ শয়তানের মুখোশ উন্মোচিত হবে তাঁদের হাত ধরে৷

সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে হাঁক-ডাকের চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ আশা করাটা—খুব বেশি চাওয়া নিশ্চয় নয়। তবে মানুষকেই জেগে উঠতে হবে৷ কারণ সবশেষ মানুষই ভরসা৷ কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে উদ্ধৃত করে বলতে চাই, ‘‘তবু আমি মানুষের কাছেই প্রার্থনা জানাইব৷ কারণ মানুষই মানুষের গা ঘেঁষিয়া বসিয়া থাকে৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন