জার্মানির সমস্যা শিশুমৃত্যুর হার নয়, শিশুর জন্মের হার | আলাপ | DW | 13.03.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

জার্মানির সমস্যা শিশুমৃত্যুর হার নয়, শিশুর জন্মের হার

বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলিতে শিশুর জন্মের হার যেরকম বেশি, শিশুমৃত্যুর হারও সেই পরিমাণে বেশি; উভয় ক্ষেত্রেই দারিদ্র্য তার ভূমিকা রাখে৷ জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশে স্বভাবতই এ দু'টি পরিসংখ্যান নীচের দিকে, কিন্তু চমক অন্যত্র৷

বিশ্বব্যাংকের তথ্য থেকে আমরা তথাকথিত ‘ক্রুড বার্থ রেট'  বা ‘কাঁচা জন্মের হার' ও ‘চাইল্ড মর্টালিটি রেট' বা শিশুমৃত্যুর হার বেছে নিতে পারি৷

‘ক্রুড বার্থ রেট' বলতে বোঝায় একটি দেশ বা ভৌগোলিক এলাকায় জনসংখ্যার প্রতি হাজার জন পিছু বছরে ক'টি শিশু জীবিত অবস্থায় জন্ম নেয়৷ ১৯৬০ সালে বাংলাদেশ, অর্থাৎ সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি ১,০০০ অধিবাসী পিছু ৪৯টি শিশু জন্ম নিয়েছিল, ২০১৫ সালে যা কমে দাঁড়ায় ১৯টি শিশুতে৷

ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান হলো, ১৯৬০ সালে জনসংখ্যার প্রতি হাজার জনে ৪২টি শিশুর জন্ম, ২০১৫ সালে ১৯টি শিশু৷

১৯৬০ সালে সাবেক পশ্চিম পাকিস্তানে জনসংখ্যার প্রতি হাজার জনে ৪৪টি শিশু জন্ম নেয়, ২০১৫ সালে ২৯টি শিশু৷

১৯৬০ সালে জার্মানিতে জনসংখ্যার প্রতি হাজার জনের জন্য শিশুর জন্মের হার ছিল ১৭টি শিশু, ২০১৫-য় যা কমে দাঁড়ায় ৯টি শিশুতে৷

শিশুমৃত্যুর হার

প্রতি হাজার জন নবজাতকের মধ্যে ক'জনের পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগে মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা আছে, সেই পরিসংখ্যানকে শিশুমৃত্যুর হার বলে ধরে নেওয়া হয় – যেমন বিশ্বব্যাংকের ১৯৬০ ও ২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে৷

১৯৬০-এ বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান), ভারত, পাকিস্তান ও জার্মানিতে শিশুমৃত্যুর হার ছিল জীবিত অবস্থায় জাত প্রতি ১,০০০ শিশু অনুযায়ী যথাক্রমে ২৬২, ২৪৬, ২৬০ ও ৭৯৷ অর্থাৎ আজ থেকে ৫৮ বছর আগে উপমহাদেশের দেশগুলিতে যখন প্রতি হাজার জন নবজাতকের মধ্যে আড়াইশ' জনের বেশি পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগেই প্রাণ হারাত, জার্মানিতে সেখানে পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগে প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা ছিল ৭৯ জন শিশুর – যা কিনা উপমহাদেশের পরিসংখ্যানের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ৷

এবার আসা যাক ২০১৬ সালের শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যানে৷ তাহলে আমরা দেখব যে, বাংলাদেশে ঐ পরিসংখ্যান প্রতি ১,০০০ জন নবজাতক পিছু কমে ৩৪-এ দাঁড়িয়েছে, এক আশ্চর্য প্রগতি! ভারতেও তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩-এ৷ ২০১৬ সালে শুধু পাকিস্তানেই শিশুমৃত্যুর হার ছিল হাজার প্রতি ৭৯ – অর্থাৎ জার্মানিতে প্রায় ছয় দশক আগে আমরা যে পরিসংখ্যান দেখেছি৷

আর জার্মানিতে? এ দেশে ২০১৬ সালে শিশুমৃত্যুর হার কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি ১,০০০ জন নবজাতক অনুয়ায়ী চারে, চারও নয়, ৩ দশমিক ৮-এ৷

এক কথায়, দুনিয়া জুড়ে শিশুমৃত্যুর হার কমছে৷ বলতে কি, প্রতিরোধ করা সম্ভব, এমন সব কারণে ১৯৯০ সালে সারা বিশ্বে এক কোটি সাতাশ লাখ শিশু প্রাণ হারায়; তার মাত্র ২৫ বছরের মধ্যেই কিন্তু সে ধরনের শিশুমৃত্যুর সংখ্যা কমে ৫৯ লাখ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

সারা বিশ্ব, কিন্তু এক বিশ্ব নয়

শিশুমৃত্যুর সুপরিচিত কারণগুলি পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে, কেন উন্নয়নশীল দেশগুলিতেই শিশুমৃত্যুর হার বেশি৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডাব্লিউএইচও ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার বিবরণ অনুযায়ী দুনিয়া জুড়ে পাঁচ বছরের নীচে শিশুমৃত্যুর প্রতিরোধ্য কারণগুলির মধ্যে প্রথম ছ'টি হলো:

-    গর্ভধারণের ৩৮ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্ম (১৮ শতাংশ);

-    নিউমোনিয়া (১৬ শতাংশ);

-    জন্মগত খুঁত (১৩ শতাংশ);

-    জন্মের পর পরই কোনো ইনফেকশন, সেই সঙ্গে ম্যালেরিয়া, সেপসিস ও হাম (১৩ শতাংশ);

-    প্রসব সংক্রান্ত জটিলতা (১১ শতাংশ);

-    পেটের রোগ (৯ শতাংশ)৷

এছাড়া ডাব্লিউএইচও-র মতে পাঁচ বছরের নীচে ৪৫ শতাংশ শিশুমৃত্যুর মূল কারণ হলো অপুষ্টি৷ জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশে সন্তানসম্ভবা মহিলা ও পরে প্রসূতি, নবজাতক বা শিশু, ও মায়েদের যে ধরনের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, পরিচর্যা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, তাতে এ দেশে রোগ বা অপুষ্টিতে শিশুমৃত্যু প্রায় ঘটে না বলেই ধরে নেওয়া যায়৷ সে তুলনায় কিন্তু প্রথম কারণটি – অর্থাৎ গর্ভধারণের ৩৮ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্ম –বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে৷ এর প্রধান কারণ সম্ভবত মায়েদের বেশি বয়সে সন্তানের জন্ম দেওয়া৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

অপূর্ণকালিক শিশু

খোদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম সন্তান ধারণের সময় মায়েদের গড় বয়স ছিল ১৮ দশমিক ৫ বছর; সে তুলনায় ২০১৫ সালে জার্মানিতে প্রথম সন্তান ধারণের সময় মায়েদের গড় বয়স ছিল ২৯ দশমিক ৪ বছর৷ অপরদিকে সেবছর জার্মানিতে তথাকথিত ‘ফার্টিলিট রেট' বা মহিলাদের সারাজীবনে মোট সন্তান ধারণের সম্ভাবনা ছিল ১ দশমিক ৫০ – যা কিনা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় উর্বরতার হারের চেয়ে কম৷ এর সঙ্গে যোগ করা যাক একটি তৃতীয় পরিসংখ্যান: জার্মানিতে শিশুদের ‘প্রিম্যাচিওর বার্থ', অর্থাৎ গর্ভধারণের ৩৮ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুর জন্মের ঘটনা ইউরোপে সর্বোচ্চ৷

অপূর্ণকালিক শিশুদের জন্য ‘ডাস ফ্র্যুগেবোরেনে কিন্ড' নামে জার্মানিতে যে ফেডারাল সমিতি আছে, তাদের বিবৃতি অনুযায়ী ২০১৬ সালে জার্মানিতে ৬৬,৮৫১টি শিশু গর্ভধারণের ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে জন্মগ্রহণ করে, যা কিনা নবজাতকদের মোট ৮ দশমিক ৬ শতাংশ৷ তাদের মধ্যে ১১,০০০ আবার গর্ভধারণের ৩২ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্মগ্রহণ করে৷

জার্মানিতে এই পরিমাণ অপূর্ণকালিক শিশুর জন্মের জন্য মায়েদের গর্ভবতী অবস্থায় মদ্য বা ধূমপান ও মাদক সেবনকে দায়ী করা হয়ে থাকে; এছাড়া অপর তিনটি কারণ হলো মেদবহুলতা, বেশি বয়সে সন্তানধারণ ও ইতিপূর্বে অকালে শিশুর জন্মদান৷ সেই সঙ্গে আরেকটি কারণও লক্ষ্য করার মতো: দৃশ্যত যে সব বিদেশি-বহিরাগত মায়েরা কোনো সংকটপীড়িত দেশ থেকে এসেছেন, জার্মানিতে বহুবছর বাসের পরও নাকি তাদের অকালে সন্তানের জন্মদানের ঝুঁকি থাকে৷

আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র যেখানে পৌঁছেছে, সেখানে অপূর্ণকালিক শিশুদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে৷ এমনকি ১,০০০ গ্রামের কম ওজন নিয়ে যে সব শিশু পৃথিবীর মুখ দেখে, তাদেরও ৮০ শতাংশ আজ বেঁচে থাকে৷ তবুও মনে রাখতে হবে যে, অকালে জন্মের কিছু ঝুঁকি জার্মানির মতো সমৃদ্ধ ও শিল্পোন্নত দেশেও থেকে যায়৷

২০০৪ সালে নিম্ন স্যাক্সনি রাজ্যে পাঁচ বছর বয়সের অপূর্ণকালিক শিশুদের একটি জরিপ থেকে দেখা যায় যে, তাদের প্রায় ১৪ শতাংশ মানসিক প্রতিবন্ধী ও ১৭ শতাংশ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী – ‘ডাস ফ্র্যুগেবোরেনে কিন্ড' সমিতি এ খবর দিয়েছে৷ এছাড়া সংশ্লিষ্ট অপূর্ণকালিক শিশুদের প্রায় ৩৩ শতাংশের আচরণে কোনো না কোনো গোলমাল ছিল, যেমন তাদের ৪০ শতাংশের কথা বলায় কোনো না কোনো আড়ষ্টতা ছিল৷ কাজেই অপূর্ণকালিক শিশুদের উপর নজর রাখা ও প্রয়োজনে ‘থেরাপি'-র ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ‘ডাস ফ্র্যুগেবোরেনে কিন্ড'৷

সব সত্ত্বেও অধিকাংশ অপূর্ণকালিক শিশু কালে ঠিকমতোই বেড়ে ওঠে৷ ১৯৮৭ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে জাত অপূর্ণকালিক শিশুদের নয় বছর বয়সে জরিপ করে দেখা গেছে যে, পূর্ণকালে জন্ম শিশুদের সঙ্গে তাদের কোনো পার্থক্য নেই৷

শিশুমৃত্যু হার রোধে জার্মানি ও ইউরোপ কেন এগিয়ে আছে বলে মনে হয়? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন