জার্মানির অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি শ্রম আইন | আলাপ | DW | 30.04.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

জার্মানির অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি শ্রম আইন

এদেশে প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠানে ‘শ্রমিক পরিষদ' থাকে৷ সেই পরিষদ ও শেয়ারহোল্ডাররা প্রতিষ্ঠানের নীতি ‘সহ-নির্ধারণ' করতে পারেন, যার ফলে শিল্পক্ষেত্রে শান্তি বিরাজ করে, যা কিনা একটি দেশের আর্থ-সামাজিক সাফল্যের পূর্বশর্ত৷

জার্মানিতে শ্রমিক ধর্মঘট হয় বৈকি৷ খুবই ব্যাপকভাবে হয়৷ তবে ঘন ঘন নয়৷ এখানে শ্রমিক ধর্মঘট মানে মালিকপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করার একটি পন্থা৷ অপরদিকে শ্রমিক-মালিক দু'পক্ষই জানে যে, বিরোধটাকে সংঘাত হয়ে উঠতে দেওয়া চলবে না৷ তাই ধর্মঘট চলাকালীন দু'পক্ষের মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কথাবার্তা চলে, দরকার হলে নামকরা মধ্যস্থতাকারীদের ডেকে আপোশের ব্যবস্থা করা হয়৷ মূল কথা হলো, দু'তরফেই এবং গোড়া থেকেই আপোশের প্রস্তুতি থাকে৷

প্রক্রিয়াটা চলে এইভাবে: প্রথমে আসে শ্রমিকপক্ষের দাবি ও মালিকপক্ষের মনোভাব৷ প্রাথমিক পরিস্থিতি হয় এই যে, যে কোনো শিল্পে শ্রমিকপক্ষ ও মালিকপক্ষের মধ্যে বেতনবৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবি-দাওয়া নিয়ে দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি চুক্তি করা হয়৷ সেই চুক্তির মেয়াদ যখন শেষ হতে চলেছে, তখন আবার শ্রমিকপক্ষ, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠন ও মালিকপক্ষের মধ্যে চুক্তির পরবর্তী মেয়াদ নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয় এবং স্বভাবতই নতুন দাবিদাওয়া উত্থাপিত হয়৷ এই পর্যায়ে সাময়িক বা স্বল্পমেয়াদি, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি ধর্মঘট শ্রমিকপক্ষের হাতে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে৷

মনে রাখতে হবে, অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্রের মতো ধর্মঘটেরও খরচ আছে – যেমন ধর্মঘটীদের বেতন, শ্রমিক সংগঠন যা তাঁদের নিজেদের ‘ধর্মঘট তহবিল' থেকে বহণ করে৷ অপরদিকে কারখানা বন্ধ হলে মালিকপক্ষের লোকসান ছাড়া লাভ নেই, কাজেই কোনোপক্ষই বেশিদিন ধর্মঘট চালিয়ে যেতে আগ্রহী নয়৷ বাকি থাকলো সরকার আর ধর্মঘটের ভুক্তভোগী সাধারণ জনতা: তাঁদের কী কর্তব্য?

আপাতত জার্মানির সরকারি কর্মচারীরা বিভিন্ন শহরে, বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন সেবায় সীমিত মেয়াদের হুমকিমূলক ধর্মঘট করে তাঁদের ছয় শতাংশ বেতনবৃদ্ধির দাবিকে জানান দিচ্ছেন, কেননা সরকার, অর্থাৎ মালিকপক্ষ, দুই শতাংশের ওপরে উঠতে রাজি নন৷ ওদিকে শ্রমিক সংগঠন পেশ করেছে ছয় শতাংশ অথবা ন্যূনতম ২০০ ইউরো বেতনবৃদ্ধির দাবি৷ এসব ধর্মঘট কিন্তু ‘ওয়াইল্ডক্যাট' বা বুনোবেড়াল ধর্মঘট নয়, যে না-জানিয়ে না-শুনিয়ে ঘটবে৷ রীতিমতো নোটিশ দিয়ে ধর্মঘট৷ যদিও তাতে সাধারণ মানুষদের ভোগান্তি কিছু কম হয় না৷ অফিস যাবার সময় বাস বা লোকাল ট্রেন চলবে না জানা থাকলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?

মজার কথা হলো এই যে, শ্রমিক-মালিক বিরোধে সরকারের নাক গলানোর উপায় নেই৷ যেমন, শ্রমিকদের রাজনৈতিক ধর্মঘট করার অধিকার নেই৷

মোদ্দা কথা, শ্রমিক পরিষদ ও সহনির্ধারণ নীতির মাধ্যমে কোম্পানির পরিচালনায় শ্রমিকপক্ষের ব্যাপক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে৷ জার্মানিতে কোম্পানিগুলির আবার একটি নয়, দু'টি করে ‘বোর্ড অফ ডাইরেক্টর্স' বা পরিচালকমণ্ডলী থাকে: তাদের একটি হলো তত্ত্বাবধায়ক, অন্যটি কার্যনির্বাহী৷ তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডের অর্ধেকের কিছু কম সদস্য হন শ্রমিক প্রতিনিধি৷ ম্যানেজমেন্ট বা কার্যনির্বাহী বোর্ডেও একজন ‘শ্রম পরিচালক' নামের শ্রমিক প্রতিনিধি থাকেন৷

নাম সহনির্ধারণ হলেও, জার্মানিতে শিল্পক্ষেত্রে যে বস্তুটি কাজ করছে, তাকে স্বচ্ছন্দে সহযোগিতা বা সহযোগিতার সংস্কৃতি বলা চলে৷ যেমন, জার্মানিতে মালিকপক্ষ যে দক্ষ শ্রমিকদের কাছ থেকে কর্মপদ্ধতি বা উৎপাদন বাড়ানো সংক্রান্ত প্রস্তাব ও শলাপরামর্শ চেয়ে থাকেন, সেটা শুধু আইন করা আছে বলে নয়৷ এখানে মালিকপক্ষ জানেন যে, প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের জন্য শ্রমিকদের অবদান অপরিহার্য; অপরদিকে শ্রমিকরাও সব ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাবে বেঁকে বসেন না – এমনকি তাতে কিছু চাকরি ছাঁটাই হলেও নয়৷ দু'পক্ষেরই এই বাস্তববুদ্ধি আছে বলেই বারংবার কোনো না কোনো ধরনের ঐকমত্যে আসা সম্ভব হয়৷

Deutsche Welle DW Arun Chowdhury

অরুণ শঙ্কর চৌধুরী, ডয়চে ভেলে

যারা রেল বা বিমান চালান

বিষয়টি আলাদা করে উল্লেখ করার কারণ হলো, জিডিএল নামধারী ইঞ্জিন ড্রাইভারদের শ্রমিক সংগঠন ও সেই সঙ্গে ‘ককপিট' নামের বিমানচালক বা পাইলটদের শ্রমিক সংগঠন৷ জানি না কবে, সম্ভবত ২০১৪ সালের আশেপাশে, এই দু'টি বিশেষ পেশার কর্মীরা একের পর এক ধর্মঘট করে মালিকপক্ষ, সাধারণ মানুষ, এমনকি খোদ ফেডারাল সরকারকেও নাজেহাল করে তোলেন৷ বিপদে পড়ে একদিকে ‘ডয়চে বান' বা জার্মান রেল, অন্যদিকে লুফৎহানসার মতো সুবৃহৎ পরিবহণ সংস্থা৷

মনে আছে, ২০১৫ সালে লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকা একটি প্রতিবেদনে লিখেছিল, ‘‘ব্রিটেনে শ্রমিক আন্দোলন, ফরাসি একগুঁয়েমি, গ্রিক আলসেমো আর ইটালিয়ান ডামাডোলের বিক্ষুব্ধ ইউরোপীয় সাগরে জার্মানিকে ঐকমত্যভিত্তিক, জনকল্যাণমুখী শ্রম সম্পর্কের অটল শিলা হিসেবে দেখানোটা বোধহয় আর ঠিক নয়৷''

জার্মান রেলে রেলচালকদের সংখ্যা যেমন অন্যান্য শ্রমিক-কর্মচারীদের তুলনায় নগণ্য, তেমনি লুফৎহানসার শ্রমিক-কর্মচারী মহলেও বিমানচালকদের সংখ্যা নগণ্য৷ কিন্তু তাঁদের গুরুত্ব কম নয়৷ ২০১০ সালে ফেডারাল শ্রম আদালত একটি ঐতিহাসিক রায়ে এ ধরনের বিশেষ পেশার শ্রমিকদের তাঁদের নিজস্ব শ্রমিক সংগঠন গঠন ও পরিচালনার অধিকার মেনে নেওয়ার পর, এই ছোট শ্রমিক সংগঠনগুলিরও বড় শ্রমিক সংগঠনগুলির মতো মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে নিজেদের সদস্যদের জন্য পৃথক শ্রম চুক্তি করার পথে আর কোনো বাধা থাকে না৷ ২০১৫ সালে ফেডারাল সরকার ‘একটি কোম্পানি, একটি ইউনিয়ন' আইন করার প্রচেষ্টা করে অসফল হয়৷ কাজেই যে বড় বড় শ্রমিক সংগঠন, সেইসব শ্রমিক সংগঠনের আরো বড় বড় সমিতি এবং মালিকপক্ষেও অনুরূপ বড় আকারের সমিতি থাকার ফলে জার্মানিতে বিভিন্ন শিল্পে চুক্তি করে শ্রমশান্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল, ক্রমেই আরো বেশি বিশেষ স্বার্থের এই ছোটখাট শ্রমিকসংগঠনগুলি তা ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে পারে৷

তাতেও বিশেষ কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না বলে আমার ধারণা৷ কেননা, একটি সমৃদ্ধ, শিল্পোন্নত দেশের প্রথম ও প্রধান লক্ষণ হলো আইনের শাসন৷ এদেশে শ্রমিক-মালিক-সমিতি-সংগঠন সকলেই চেষ্টা করে আইনের গণ্ডির মধ্যেই তাঁদের ঝগড়া-কাজিয়া-রেষারেষি মিটিয়ে ফেলতে৷ এই মনোভাবটা যতদিন থাকবে, সমাজ ও সমাজজীবনের অন্যান্য এলাকার মতো শ্রমক্ষেত্রেও তা কার্যকরি হবে৷

এমন পরিস্থিতি কি বাংলাদেশে বা পশ্চিমবঙ্গে তৈরি করা সম্ভব? মতামত দিন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়