জার্মানরা কেন টাকা জমায়? | বিশ্ব | DW | 11.11.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

জার্মানি

জার্মানরা কেন টাকা জমায়?

সাশ্রয়ী, না কিপটে? কীভাবে দেখবেন জার্মানদের? ডয়চে ভেলে-র সাংবাদিক কেট ফার্গুসন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছেন ইউরোপের এই জাতি সম্পর্কে বেশ কিছু অভিনব তথ্য৷

কয়েক শতাব্দী ধরেই জার্মানদের নামের সাথে জুড়েছে টাকা জমানোর (বদ)-অভ্যেস৷ জার্মানির ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বিয়ার, কারিভ্যুর্স্টের মতো এই অভ্যেসটিও এ দেশের মানুষের মজ্জায় মজ্জায় গেঁথে গেছে

কিন্তু ঠিক কেন এই অভ্যেস? উত্তর খুঁজতে ডয়চে ভেলে-র সাংবাদিক কেট ফার্গুসন পৌঁছে গেলেন বার্লিনের ‘জার্মান হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়াম', অর্থাৎ জার্মানির ঐতিহাসিক জাদুঘরে৷ সেখানে তিনি দেখা করেন ‘সেভিং– হিস্টি অফ এ জার্মান ভার্চু' (অর্থাৎ, সাশ্রয়– একটি জার্মান বৈশিষ্টের ইতিহাস) শিরোনামের একটি প্রদর্শনীর তত্ত্বাবধায়ক রবার্ট মুশালা'র সাথে৷

প্রদর্শনীর এমন নাম দেখে স্বাভাবিকভাবেই গুরুগম্ভীর অর্থনৈতিক আলোচনা আশা করেছিলেন কেট৷ সেরকম প্রস্তুতিও নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি৷অর্থনীতি, সাশ্রয় ইত্যাদি ভাবার কারণে তাঁর মাথায় ঘুরছিল বিভিন্ন সংখ্যার হিসাব৷ তাঁর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘুরছিল ‘২৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার' সংখ্যাটি৷

চলতি বছরের শেষে এই ২৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের অর্থ বাড়তি রয়ে গেছে জার্মানির কারেন্ট অ্যাকাউন্টে, যা বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি৷

কিন্তু মুশালার সাথে দেখা হবার পর প্রথমেই কেট শিখলেন যে, জার্মানদের সাশ্রয়ী হবার সাথে সংখ্যার সম্পর্ক আসলে খুবই কম৷ বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ধারা, যা সময়ের সাথে সাথে জার্মান সংস্কৃতির মধ্যে মিশে গেছে৷

রবার্টের মতে, জার্মানদের কাছে সাশ্রয় এক ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কৌশল৷ এই প্রদর্শনীটিও তিনি এই বিশ্বাসেই সাজিয়েছেন৷

প্রদর্শনী দেখা হলে কেট বুঝতে পারেন যে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খরচ কমানোর এই জার্মান অভ্যেসের উৎস ইউরোপে শিল্পায়নের ইতিহাসে রয়েছে৷

ইউরোপে শিল্পায়নের গোড়ার দিকে জনসংখ্যা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দারিদ্র্য৷ এই সময়ে ব্যাংকগুলিকে এই সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়৷ শুরু হয় শ্রমিকদের নিজেদের উপার্জনের একটি অংশ আলাদা সরিয়ে রাখার অভ্যেস৷

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অভ্যেসের ফলে শ্রমিকদের মধ্যে নৈতিক উন্নতি দেখা দেয় ও তাঁদের বিদ্রোহের সম্ভাবনাও কমতে থাকে৷

শুনতে বাড়াবাড়ি মনে হলেও, রবার্ট বিশ্বাস করেন যে, এই ইতিহাসই জার্মানদের সামাজিক শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতি আকর্ষণের কারণ৷

যুক্তি হিসাবে তিনি জার্মান শ্রমিকদের সাথে ফ্রান্সের শ্রমিকদের তুলনা করে বলেন, ‘‘ফ্রান্সে শ্রমিক মানেই বিদ্রোহী, অথচ জার্মানিতে রয়েছে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রবণতা৷ এক দল হাতে অস্ত্র তুলে নেয়, বিপরীতে আরেক দল ব্যাংকে টাকা জমায়৷''

রবার্টের কাছে এই ভিন্ন রুচি আসলে এক ধরনের ‘জাতীয় অভ্যেস', যা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না৷

কেটের মতো একজন বাণিজ্য-বিষয়ক সাংবাদিকের কাছে এমন যুক্তি একদম নতুন হলেও ফেলনা নয়৷ সাশ্রয় ‘জাতীয় অভ্যেস'-এর পর্যায়ে গেলেও কেট মনে করেন, প্রয়োজন রয়েছে জার্মানির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময়কে স্মরণ করার৷

১৯২০ সালের পর থেকে ব্যাপক হারে মুদ্রাস্ফীতির ফলে পকেটে টান পড়ার জন্য তৎকালীন জার্মান সমাজ যুক্তিহীনভাবে দায়ী করে ইহুদি মহাজনদের৷ স্কুল-কলেজে সর্বত্র সাশ্রয়কে মহান বৈশিষ্ট্য হিসাবে তুলে ধরা হয়৷ উল্টোদিকে, টাকা ধার দেওয়াকে বোঝানো হয় বোকামো বা ধূর্ততার লক্ষণ হিসাবে৷ এভাবেই আস্তে আস্তে ইহুদি-বিদ্বেষ দানা বাঁধতে থাকে সমাজে৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের বছরগুলিও সাশ্রয়ের জন্য তেমন ভালো ছিল না৷ ‘ফোলকসভাগেন'-এর মতো নামকরা কোম্পানি যখন ভেঙে পড়ে ও তাদের শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ যুদ্ধে লড়তে চলে যায়, কয়েক দিনের মধ্যেই ধসে পড়ে কোম্পানিটি৷ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, যাঁরা সেই কোম্পানির শেয়ার কিনেছিলেন, হারিয়ে ফেলেন তাঁদের জমানো টাকার অনেকটাই৷

রবার্টের এই প্রদর্শনীটি প্রশংসিত হলেও তাঁর ফোন বেজেই চলেছে আর্জেন্টিনা বা ক্যানাডা থেকে আসা মানুষের বার্তার আওয়াজে৷ অনেকে এই প্রদর্শনীর বক্তব্যের সাথে একমত হলেও কেউ কেউ সাশ্রয়ের সাথে ইহুদী-বিদ্বেষের যোগসূত্রকে ভালো চোখে দেখছেন না৷

মুশালা অবশ্য তাতে বিচলিত নন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘কেঠো অর্থনৈতিক তত্ত্বের বাইরে বেরিয়ে সমস্যাকে বুঝতে গেলে নিজেদের দিকেও আঙুল তুলতে হয়৷''

কেট মনে করেন যে, ঠিক এখানেই রয়েছে অর্থনীতিকে সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারার দ্বন্দ্ব৷ টাকার সাথে মানুষের সম্পর্ক আসলে শেষ পর্যন্ত মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কেরই প্রতিরূপ৷ এবং সে কারণেই, এই সম্পর্কটিও পৃথিবীর অন্য সব সম্পর্কের মতোই বেশ জটিল৷

কেট ফার্গুসন/এসএস

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন