জার্মানদের শেকড় জানতে চাওয়ার প্রবণতা কি বর্ণবাদ? | বিশ্ব | DW | 22.03.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

জার্মানি

জার্মানদের শেকড় জানতে চাওয়ার প্রবণতা কি বর্ণবাদ?

শেকড় অন্য দেশে হলেও তাঁরা জার্মান নাগরিক৷ অথচ এরপরও নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের৷ এটি কি শুধুই কৌতূহলের কারণে, নাকি তা বর্ণবাদের বহিঃপ্রকাশ? সম্প্রতি দেশটিতে নতুন করে এমনই এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে৷

তাহির দেলার জন্ম ১৯৬২ সালে জার্মানির মিউনিখ শহরে৷ দু'বছর আগে বার্লিনে স্থানান্তর হলেও সেখানকার অনেক কিছুই তিনি ভুলতে পারেননি৷ কেউ যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন যে দেলা কোথা থেকে এসেছেন, দেলা অবলীলায় জবাব দেন তিনি মিউনিখ থেকে এসেছেন৷ কিন্তু অনেক বেয়াড়া মানুষই সেই উত্তরে সন্তুষ্ট হন না৷ তাঁরা একের পর এক প্রশ্ন করে যান, দেলার আসল দেশ কোনটি, কোথা থেকে তাঁর বাবা-মা কিংবা তাঁদের বাবা-মায়েরা এসেছেন? ‘‘কারো সাথে পরিচয় হলে এগুলোই হয় প্রথম প্রশ্ন,'' বলছিলেন দেলা৷ তাঁর মতে, ‘‘শ্বেতাঙ্গ জার্মানদের নিজেদের মধ্যে যখন দেখা হয় তাঁরা কখনোই শুরুতে একে-অন্যকে এমন প্রশ্ন করেন না৷ হয়ত পরিচয়ের কিছুক্ষণ পর এ সব বিষয় জানতে চাইলেও চাইতে পারেন৷’’

কৃষ্ণাঙ্গ এবং জার্মান

দেলার কাছে সব সময়ই এ সব প্রশ্ন আপত্তিকর মনে হয়৷ তাঁর মতে, এটা বর্ণবাদেরই বহিঃপ্রকাশ৷ ‘‘মানুষজন আমার আদি অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন৷ মানুষের মধ্যে আসলে প্রশ্ন হলো – কীভাবে এবং কেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ এখানে এসেছেন৷ সেই ব্যাখ্যাটি তাঁরা শুনতে চান৷’’ এমনকি কেউ যখন অসম্মান করার জন্য নয়, নিতান্ত কৌতূহলবশত এই প্রশ্ন করেন, ‘‘তখনও বিষয়টি আমাকে অপ্রস্তুত করে'', বলছিলেন দেলা৷ তাঁর মতে, শেকড় নিয়ে এমন অনবরত প্রশ্ন আসলে বর্ণবাদেরই একটি ধরণ৷

বলা বাহুল্য জার্মান হলেও তাঁর চুলের রং স্বর্ণালী নয়, কিংবা ত্বক শ্বেত নয়৷ যার কারণে শেকড় নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নে দেলা রীতিমত অসুস্থ বোধ করেন৷

কয়েক সপ্তাহ আগে, টু্ইটার ব্যবহারকারীরা হ্যাশট্যাগ #ফনহিয়ার (#vonhier, অর্থাৎ এখানথেকে) দিয়ে নিজেদের এমন অভিজ্ঞতা জানাতে শুরু করেন৷

পরিচয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ

আলোচনাটি উসকে দেন বাভেরিয়ান সাংবাদিক ম্যালকম ওহানভে৷ তিনি অনলাইনে জার্মান সংগীতজ্ঞ ডিয়ার বোলেন-এর একটি অনুষ্ঠানের ভিডিও দেন৷ যেখানে বহলেন পাঁচ বছর বয়সি এক প্রতিযোগীকে অনবরত তার জাতিগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন৷ শিশুটি তাকে প্রথমে জবাব দিল যে সে উত্তর রাইন ওয়েস্টফেলিয়া রাজ্যের হার্নে শহর থেকে এসেছে৷ কিন্তু বোলেন এরপরও জোরাজুরি করছিলেন, ‘‘তোমার বাবা-মা কোথা থেকে এসেছে, ফিলিপাইন্স থেকে?’’ শিশুটি জবাব দিল, ‘‘না, তারাও হার্ন থেকেই এসেছে৷’’ তারপর বোলেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তাদের জন্ম কোথায় হয়েছে?’’ সবশেষে মেয়েটির মা এসে বোলেনকে সন্তুষ্ট করলেন৷ জানালেন, তাদের থাই শেকড় রয়েছে৷   

দেলা বলেন, বোলেন-এর একের পর এক প্রশ্ন থেকে বোঝা যায় যে মানুষ শিশুদেরও তার শেকড় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ছাড়েন না৷ তাঁর বিশ্বাস, বোলেন মেয়েটির পারিবারিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন, কেননা তাঁর এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে মেয়েটি জার্মান৷ ‘‘জার্মানরা হয়ত এ সত্যটিকে অস্বীকার করতে চান যে জার্মানিতে এমন একটি সমাজ তৈরি হয়েছে, যা বিভিন্ন জায়গা আর ঐতিহ্য থেকে আসা শরণার্থীদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে,’’ বলছিলেন দেলা৷

অতিমাত্রায় সংবেদনশীলতা?

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাউকে তাঁর শেকড় সম্পর্কে জানতে চাওয়ার মানেই কি প্রশ্নকর্তা বর্ণবাদী? সাংবাদিক ড্যুৎসেন টেকাল তেমনটা মনে করেন না৷ ‘‘আমি আসলেই বুঝতে পারি না যে কাউকে ‘কোথা থেকে এসেছেন’, এই প্রশ্নটি করা হলে কেন তিনি বিব্রত হবেন৷ আমি বহুবার এমন প্রশ্ন শুনেছি, কিন্তু কখনই বৈষম্য বোধ করিনি৷’’ প্রসঙ্গত, ড্যুৎসেন টেকালের বাবা-মায়ের কুর্দি ও ইয়াজিদি শেকড় রয়েছে৷ তাঁরা তুরস্ক থেকে জার্মানিতে এসেছেন৷ 

টুইটারে শুরু হওয়া হ্যাশট্যাগ বিতর্কটির মাধ্যমে কেউ বর্ণবাদের শিকার হয়েছে – এমনটা ভাবতে উৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও মনে করেন টেকাল৷ তিনি বলেন, একজন যখন তাঁর শেকড়ের কারণে অবহেলিত হন, তখনই একে প্রকৃতপক্ষে বর্ণবাদ হিসেবে অভিহিত করা যায়৷ তাই অতিমাত্রার সংবেদনশীলতা বাদ দিয়ে প্রকৃত সমস্যায় মনযোগী হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি৷ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘যাঁদের বিদেশি নাম রয়েছে কিংবা বাবা-মা অন্য কোনো দেশ থেকে জার্মানিতে এসেছেন, তাঁদের বাড়ি খুঁজে পেতে খুবই সমস্যায় পড়তে হয়৷’’

জার্মানিকে সময়ের সাথে এগোতে হবে

তবে দেলা মনে করেন সমস্যাগুলো একটি কয়েনের দু'টি পাশের মতো৷ একজন বড়ির মালিক যে কারণে একজন ভাড়াটিয়াকে বাড়িভাড়া দিতে চান না, সেই একই কারণে তিনি একজন ব্যক্তির শেকড়ের খোঁজ নেন৷ তাঁর কথায়, ‘‘এর কারণ বর্ণবাদ সংক্রান্ত মনোভাব৷ তাঁরা বিশ্বাসই করেন যে এই মানুষগুলোর এই দেশে কিংবা এই সমাজে থাকার কোনো অধিকার নেই৷’’ তাঁর মতে, আবাসন খাতের বর্ণবাদ নিয়ে যেমন লড়াই করতে হবে তেমনি প্রতিদিনের জীবনের সাধারণ বর্ণবাদগুলোকেও একই গুরুত্ব দিতে হবে৷  

তিনি আরো জানান যে, জার্মানিতে বসবাস করা সত্ত্বেও তাঁকে ইংরেজিতে সম্বোধন করা হয়৷ অথচ ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন কিংবা ইটালি যেখানেই গেছেন, সেখানে কিন্তু সকলে তাঁকে স্থানীয় ভাষাতেই সম্বোধন করেছেন৷ তাঁর মতে, এটিও বর্ণবাদেরই প্রকাশ৷ ‘‘কাজেই এই প্রেক্ষাপটে বললে জার্মানি এখনও সময়ের সাথে তাল মেলাতে পারেনি,’’ বলছিলেন দেলা৷

টেকাল অবশ্য আশাবাদী৷ তিনি মনে করেন, আগামীতে বিদেশি শেকড় নেই আর আছে – এমন জার্মানদের সম্পর্কে জটিলতা কমে যাবে৷ খোলামেলা আলোচনা আর কুসংস্কার দূর করার মাধ্যমে এই ব্যবধান ঘোচানোর সুযোগ তৈরি করে দিতেই তো ২১ মার্চ পালিত হয়ে গেল আন্তর্জাতিক বর্ণবাদ বৈষম্য দূরীকরণ দিবস৷  

পেটার হিলে/এফএস

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন