‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’ | আলাপ | DW | 09.08.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’

জাতীয়তাবাদ আর ফ্যাসিবাদের মধ্যে যে চুল পরিমাণ ফারাক, সেটা ইদানিং বেশ ভাবিয়ে তুলছে৷ একইসঙ্গে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জাতীয়তাবাদ আসলে কী? এর আদৌ কোনো প্রয়োজন রয়েছে?

জাতীয়তাবাদের নামে আমাদের কিছু মানতে জোর করে বাধ্য করা হলে, সেটা ফ্যাসিবাদী আচরণ কেনো নয়?

ভারতের এক গানের প্রতিযোগিতায় ভালো পারফরম করে বেশ নাম কামিয়েছেন বাংলাদেশের ছেলে নোবেল৷ আড্ডার ছলে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা'র চেয়ে প্রিন্স মাহমুদের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা' বাংলাদেশকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বেশি ফুটিয়ে তোলে বলে মনে করেন৷

এটা তার ব্যক্তি মত৷ তিনি দেশের, রাষ্ট্রের, সরকারের, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এমনকি জাতীয় সঙ্গীতেরও কোনো অপমান করেননি৷ নিজেও আগে থেকেই বলে নিয়েছেন, এজন্য তাকে হয়তো কথাও শুনতে হতে পারে৷ কিন্তু সেটা যে এতো মারাত্মক আকার ধারণ করবে, তা হয়তো তিনিও ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি৷

একপক্ষ তাকে তুলোধুনা করলো জাতীয় সঙ্গীত ‘অপমানের' অভিযোগে৷ অন্যপক্ষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘হিন্দু' বলে এবং ‘বাংলাদেশের নাগরিক না' বলে তার পক্ষে নেমে গেলেন৷ অথচ, নোবেল এর কোনোটাই করেননি৷ 

প্রশ্ন হলো, কেউ যদি সাম্প্রদায়িক ধোয়া তুলে জাতীয় সঙ্গীত পালটানোর কথা বলে থাকেন, সেটা সেভাবেই মোকাবেলা করা হোক৷ কিন্তু নোবেলের মতো করে কেউ যদি শুধু তার পছন্দ অপছন্দের কথা জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কেনো কথা বলা যাবে না? কেনো না?

পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে জাতীয় সঙ্গীত নানা কারণে পরিবর্তন হয়েছে৷ গত বছরই তো ক্যানাডার সিনেট লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে জাতীয় সঙ্গীতের একটা বাক্য পরিবর্তন অনুমোদন করে৷ ওদের জাতীয় সঙ্গীতের দ্বিতীয় বাক্যে ছিল "in all thy sons command”৷ এটাকে পালটে করা হয়েছে "in all of us command”৷

জার্মানিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-প্রতিবাদ চলছে Fatherland বদলে Homeland করার দাবিতে৷ অস্ট্রেলিয়ায় ‘We are young and free' পালটে 'Strong and free' করার দাবি জানাচ্ছেন আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানরা৷

জার্মানি, সাউথ আফ্রিকা, নেপালের মতো অনেক দেশ তাদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন করেছে৷ এর বেশিরভাগই অবশ্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে৷ বাংলাদেশের এখন এমন কোনো কারণ তৈরি হয়নি৷ কিন্তু আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়?

শুধু জাতীয় সঙ্গীত কেনো, চলুন আলোচনা করি অন্য সব জাতীয় প্রতীক নিয়েও৷ ধরুন জাতীয় পতাকার কথাই৷ কয়েক বছর আগে হইহই রইরই করে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবপতাকা তৈরি করে গিনিজ বুকস অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখালাম৷ কদিন পরই ভারত সে রেকর্ড ভেঙে নিজেদের করে নিল৷

এখন ধরুন, চীন যদি এই রেকর্ড করতে চেয়ে রাষ্ট্রীয় ঘোষণা দিয়ে দেয়, সে রেকর্ড আর কখনও কারো পক্ষে ভাঙা সম্ভব হবে? চীনের জনসংখ্যা জানেন তো? কিন্তু এই যে আমাদের জাতীয় পতাকার রেকর্ড আরেক দেশ ভেঙে ফেললো, তাতে কী আমাদের সম্মান বাড়লো, নাকি কমলো? আমি মনে করি জাতীয় পতাকা নিয়ে প্রতিযোগিতাটাই একটা সম্মানহীনতার কাজ৷

এবার আসুন জাতীয় পশুর প্রসঙ্গে৷ পাকিস্তানের জাতীয় পশু মারখোর নামের এক প্রজাতির ছাগল৷ এ নিয়ে আমাদের কতো হাসাহাসি৷ কিন্তু আমাদের জাতীয় পশু বেঙ্গল টাইগার নিয়ে আমরা এতো গর্বিত, জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতীক এবং খেলোয়াড়দেরও আমরা টাইগার বানিয়ে দিয়েছি৷

আমাদের জাতীয় খেলা কী জানেন তো? হাডুডু৷ অথচ, আমরা নিজেরাও সেই খেলা কখনও খেলি না, কোথাও খেলা আয়োজন করা হলেও তার খোঁজও রাখি না৷ অথচ, পাশের দেশ ভারতে দেখুন৷ কাবাডি ফেডারেশন কাবাডি লিগের আয়োজন করে খেলাটিকে কতো জনপ্রিয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে৷

টাইগার যদি জাতীয় পশু হয়, সে প্রতীক তো ক্রিকেটারদের নয় হাডুডু খেলোয়াড়দেরই হওয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত, তাই না?

কিন্তু যাদের নিয়ে আমাদের গর্ব, সেই সত্যিকার বেঙ্গল টাইগারদের কী অবস্থা সে নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা নেই৷ সংখ্যা কমতে কমতে বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে বেঙ্গল টাইগার৷ আমরা একদিকে তার বাসস্থান নষ্ট করি, অন্যদিকে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে প্রবেশ করলে পিটিয়ে মারি৷ এখন যদি আমি জাতীয় পশু ‘গরু' করার প্রস্তাব করি, নিশ্চয়ই সবাই মারতে আসবে, কিন্তু তাতে টাইগারদের ভাগ্যের কোনো উন্নতি হবে না৷

চলুন কথা বলি জাতীয় ফল আর গাছ নিয়ে৷ কাঁঠাল কেনো হবে জাতীয় ফল? আকারে বড় বলে? তাহলে দেশের প্রধানমন্ত্রী কেনো কাউকে রাষ্ট্রীয় উপহার পাঠালে কাঁঠাল না পাঠিয়ে আম পাঠান? এটা কি কাঁঠাল অবমাননার পর্যায়ে পড়ে, এটা কি দেশদ্রোহ? আমার কাছে কাঁঠালের চেয়ে আম বাংলাদেশকে বেশি রিপ্রেজেন্ট করে বলে মনে হয়৷ এর কারণে আমাকে শূলে চড়াবেন? 

সাহিত্য পড়ে দেখুন৷ কতো যুগ যুগ ধরে পথিকদের ছায়া দিয়ে প্রশান্তি এনে দিয়েছে বটগাছ৷ আর আজ জাতীয় ফলের প্রতিযোগিতায় কাঠালের কাছে হেরে যাওয়ায় জাতীয় গাছের সান্ত্বনা পুরস্কার পাবে আম গাছ? এটা অন্যায়, এ অন্যায় মানি না৷

আবার ফিরে আসি জাতীয় সঙ্গীত প্রসঙ্গে৷ ১৯৪৭ সালের তো আমাদের পূর্বপুরুষেরা ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ' জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন৷ এখন এই গান কেউ বাংলাদেশে কোনো অনুষ্ঠানে গাইলে তার তো বেঁচে থাকাই মুশকিল হবে৷ এক যুদ্ধে জাতীয়তাবাদ পরিবর্তন হয়ে গেলো, আর জাতীয় প্রতীক পারবে না? কোনো কিছুই চিরন্তন নয়, পরিবর্তনশীল৷ 

HA Asien | Anupam Deb Kanunjna

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

জাতীয় প্রতীককে যে যার মতো করে সম্মান দিক না৷ এতে প্রতীকের কী আসে যায়? জোর করে কাউকে যদি জাতীয়তায়অনুপ্রাণিত করতে চান, সেটা আপনাকে দেশপ্রেমিক হিসেবে না, বরং ফ্যাসিবাদি হিটলার হিসেবে উপস্থাপন করে৷

সিনেমা হলে কেনোই বা জাতীয় সঙ্গীত বাজাতে হবে? গিয়েছি হলিউডে তৈরি ‘স্পাইডারম্যান' দেখতে, এর শুরুতে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেশকে সম্মান জানানো প্রক্রিয়াটা আমার কাছে দেশের জন্য খুব একটা ‘সম্মানজনক' বলে মনে হয় না৷ এর চেয়ে বরং ঢালিউডে যদি আমরা সমমানের ‘ডেঙ্গুম্যান'ও বানাতে পারি, সেটাতে দেশ অনেক বেশি সম্মানিত হবে৷

যদি মানুষটাকে সম্মান দিতে না পারি, তার ছবি পকেটে থাকলো, না টেবিলে, নাকি দেয়ালে, তাতে কী আসে যায়? দেশটাকে, দেশের সম্পদকে, দেশের মানুষকে সম্মান দিন, জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা, পশু-পাখি তো কেবল প্রতীক৷ উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে ফ্যাসিবাদি হয়ে উঠবেন না, সম্মানটা মন থেকে আসতে দিন৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলতে চান? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন