1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

‘জাতীয় নিরাপত্তা’ রক্ষায় কি গুমের সুযোগ চায় বিএনপি সরকার?

১২ এপ্রিল ২০২৬

গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন না দেয়ায় গুম পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান৷ তবে সরকারের দিক থেকে নতুন আইন করার কথা বলা হয়েছে৷

https://p.dw.com/p/5C3aL
গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ নিয়ে আপত্তি তুলে তা অনুমোদন দেয়নি বিএনপি সরকার৷
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের অনেকে গুমের শিকার হয়েছেন (ফাইল ফটো)ছবি: Arafatul Islam/DW

শেখ হাসিনার শাসনামলে গুমের শিকার পরিবারগুলোর সদস্যের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘‘মায়ের ডাকের'' প্রধান সানজিদা ইসলাম তুলি ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের ওই অধ্যাদেশ সবার সঙ্গে আলোচনা করে করা হয়নি৷ ফলে এখন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে৷ নতুন আইন হলে তা সবার সঙ্গে আলোচনা করেই করতে হবে৷ গুমের বিচার পাওয়া নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামবোনা৷''

তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এই বিষয়ে বলেন, ‘‘মানবাধিকার কমিশন এবং গুম অধ্যাদেশ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ছয় শতাধিক দেশি-বিদেশি অংশীজনের মতামত নেয়া হয়েছিল যার মধ্যে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ছিলেন৷ এমন বিস্তৃত অংশগ্রহণ এবং সবার অন্তর্ভুক্তিতে খসড়া প্রণয়ন করার প্রক্রিয়াটি ছিল নজিরবিহীন৷''

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গত বছরের পহেলা ডিসেম্বর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করা হয়৷ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে৷ ১২ মার্চ এই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়৷ বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে উত্থাপিত অধ্যাদেশটি অনুমোদন বা পাস করতে হয়৷ এই সময়ের মধ্যে পাস না হলে বা সংসদ অনুমোদন না দিলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা বাতিল বা তামাদি হয়ে যায়৷

ব়্যাব যেভাবে মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখছে

কিন্তু বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ ওই সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন দেয়া হয়নি৷ ফলে সেগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে৷

গুম অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপি সরকারের আপত্তি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করতে বিরোধী দলসহ সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়৷ তাতে গুম অধ্যাদেশের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া আপত্তিতে বলা হয় ‘‘জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে৷ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্ব অনুমতি নিতে হবে৷''

অন্তর্বতী সরকারের অধ্যাদেশে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘‘গুমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অথবা অন্য কোনো ধরনের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়৷ আরো বলা হয়েছে, গুম একটি চলামান অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে৷ অধ্যাদেশে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড৷ আর গুমের সঙ্গে জড়িত, নির্দেশদাতা ও ষড়যন্ত্রকারী সবাই শাস্তির আওতায় আসবে৷ আর গুমের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি সেটা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলেও তাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রয়োজনে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন৷ এই অধ্যাদেশে গুমের বিচারের জন্য আলাদা ট্রাবুন্যাল ও আলাদা গুম কমিশনের কথা বলা হয়েছে৷ আর ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথাও বলা হয়েছে৷''

‘আমরা আগের অবস্থানে ফিরে গেছি'

মানবাধিকার কর্মী নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আসলে এই গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আসলে আমরা আগের অবস্থায় ফিরে গেছি৷ আগেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে আমরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে গুম করতে দেখেছি৷ এখনো যেন অবস্থা ফিরে এল৷ আর যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা বলাই হয় তাহলে সেটা সুনির্দিষ্ট করতে হবে৷ আর সেই অজুহাতে তো গুম করা যায়না৷ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়৷ এবং যার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বা আটক করে হবে তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হবে৷ আমাদের বুঝতে হবে গুম একটি অপরাধ কোনো অজুহাতেই গুমকে বৈধতা দেয়ার সুযোগ নেই৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আসলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং তাদের নিয়েজিত ব্যক্তিরাই গুমের সঙ্গে জড়িত বলে আমাদের অনুসন্ধান বলছে৷ আগে আইনে ছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রেপ্তার করতে হবে৷ এখন সরকার বলছে সরকারের পূর্বানুমতি নিয়ে প্রেপ্তার করতে হবে৷ সেটা হলে তো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকলো না৷ সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লো৷''

‘মায়ের ডাকে'র সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘‘আসলে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ করার সময় সবার সঙ্গে কথা বলেনি৷ ফলে এটা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে৷ অনেক লুপহোলও আছে৷ সেটা তারা কেন করল তা আমরা বুঝতে পারছিনা৷ এখন সরকার নতুন আইনের কথা বলছে৷ সেটা করতে হলেও সবার সঙ্গে আলোচনা করেই করতে হবে৷ তবে আমরা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের সময়ের আইন ও গুমের কালচারে ফিরতে চাই না৷ আমরা এর অবসান চাই৷ আমরা গুমের বিচার চাই৷''

জাতীয় নিরাপত্তা ও গুম

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আটককে গুম বলা যাবে না-এটা আমরা মানবো না৷ গুমের অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সরকারের অনুমতি ছাড়া গ্রেপ্তার করা যাবেনা এটাও মানবো না৷ আমরা পরিবারগুলো এর শিকার৷ আমরা এগুলো নিয়ে কথা বলব৷ নতুন আইন করার আগে আমাদের সাথে কথা বলতে হবে৷ আমাদের মতামত নিতে হবে৷''

"তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে গুম নিয়ে শুধু কথাই হয়েছে, কোনো কাজ হয়নি৷ গুম কমিশনও কোনো কাজ করেনি৷ আমরা স্বাক্ষ্য দিয়েছি, তালিকা দিয়েছি৷ কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি,'' অভিযোগ তার৷

তার কথা, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকার অনেক কাজই করেছে কাউকে না জানিয়ে৷ নির্বাচনের মাত্র দুইদিন আগে মানবাধিকার কমিশন করা হয়েছে৷ আগে কেন করা হলোনা৷''

নূর খান বলেন, ‘‘মানবাধিকার কমিশন, জুলাই অভ্যুত্থান এবং গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ তিনটাই একটার সঙ্গে  আরেকটা জড়িত৷ গুম প্রতিরোধের ব্যাপারে মানবাধিকার কমিশনকেও যুক্ত করা হয়েছিল৷ এখন কী হবে জানিনা৷''

গুম কমিশনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘আমরা মোট এক হাজার ৮০০ গুমের অভিযোগ গ্রহণ করেছি৷ তার মধ্যে ওভার ল্যাপিং বাদ দিল হবে এক হাজার ৬০০৷ আমরা কিছু তদন্ত শেষ করেছি৷ কিছু হাফডান আছে৷ সরকারকে প্রতিবেদন দিয়েছি৷''

জোরপূর্বক গুমের শিকার মাইকেল চাকমা বিচার চান

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এখন গুম কমিশন আছে কী নাই তা নিয়ে আমরা ধোঁয়াশার মধ্যে আছি৷ আমরা কমিশন সদস্যরা আছি কী নাই তাও জানিনা৷ দুই-এক দিনের মধ্যে স্পষ্ট  হবে৷''

‘নতুন আইন করবে সরকার'

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল হলো মানে সরকার ওই অধ্যাদেশ সংসদে তোলেনি৷ ফলে সেটিসহ ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা এখন আর নাই৷ কিন্তু সরকার এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে নতুন আইন করবে৷ সেটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে৷''

গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে সরকারের দুইটি আপত্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘ওটা সরকারের অবজারভেশন৷ সরকার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক যাতে না হয় সেই বিবেচনা করে আইন করবে৷''

অন্যদিকে রবিবার বিকালে সচিবালয়ে এক ব্রিফিং-এ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি, সেগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন৷ তাই সেগুলো এখনো উপস্থাপন করা হয়নি৷''

তার কথা, ‘‘কিছু মহল সরকার এসব ‘অধ্যাদেশ বাদ দিয়েছে' বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে৷ আইনগুলোর প্রস্তাবনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও অনেকে তা উপেক্ষা করছেন৷''

এ বিষয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী৷ তবে গুম প্রতিরোধে নতুন আইন করার উদ্যোগ কবে নেয়া হবে সে সম্পর্কে কিছু জানাননি তিনি৷

ইলিয়াস আলী গুমের সঙ্গে কি ব়্যাব জড়িত?