জম্মু ও কাশ্মীর এখন বিজেপির তুরুপের তাস | বিশ্ব | DW | 25.06.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

জম্মু ও কাশ্মীর এখন বিজেপির তুরুপের তাস

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কংগ্রেস-‌মুক্ত ভারত গড়ার স্বপ্ন সফল করতে কাশ্মীর ছিল মোদীর ‘‌মাস্টার স্ট্রোক'‌৷ এখন জোট সরকার ভেঙে দিয়ে গায়ের জোরে শান্তি ফেরাতে বদ্ধপরিকর তাঁর সরকার৷

নির্বাচনোত্তর দু'টি রাজনৈতিক দলের জোট আরেকটি নির্বাচন আসার আগেই ভেঙে ফেলতে হয়৷ তা না হলে একক শক্তি বৃদ্ধি হবে কী করে?‌ কাশ্মীরে আফজল গুরুর ফাঁসি হওয়ার সময় যে সূত্রটি ছেড়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, সেটিকেই সম্বল করলেন তাঁর উত্তরসূরি নরেন্দ্র মোদী৷ কাশ্মীরে পিডিপি এবং জম্মুতে বিজেপি‌র জমি হারানোর হতাশা যখন এক বিন্দুতে এসে মিলল, সেই মুহূর্তেই প্রখ্যাত সাংবাদিক সুজাত বুখারির রক্তে ভিজল শ্রীনগরের রাজপথ৷ ‘‌পাথরপন্থি কাশ্মীরীদের'‌ মুখে দাঁড়িয়ে কড়া বার্তা দিলেন নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহরা৷ দলকে গাঁটছড়া কেটে বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দিলেন তাঁরা৷

রমজান মাসের পর কাশ্মীর উপত্যকায় সন্ত্রাস-‌বিরোধী অভিযান পুণরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কেন্দ্র সরকার৷ তারপর থেকেই মেহবুবা মুফতির পিডিপি এবং বিজেপির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়৷ মুফতি চেয়েছিলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে আলোচনায় বসুক সরকার৷ এরপর ঘটনাক্রম যেদিকে গড়িয়েছে তাতে কাশ্মীরে আপাত শান্তি ফিরে এলেও তা যে বেশি দিন স্থায়ী হবে না, তা বলার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না৷ দু'‌দিন আগে সাংবাদিক সুজাত বুখারি ও নিরীহ জনতার হত্যার প্রতিবাদে বনধ ডেকে ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন জম্মু-‌কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট৷ বনধ শুরু হওয়ার আগেই গ্রেপ্তার করে নেওয়া হয় জেকেএএফ প্রধান ৫২ বছরের ইয়াসিন মালিককে৷ ইয়াসিন দীর্ঘদিন সশস্ত্র লড়াই চালালেও ১৯৯৪ সালে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনু্প্রাণিত হয়ে বন্দুক ছেড়ে, হিংসার পথ ছেড়ে শান্তির পথ ধরেছেন৷ কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য লড়ছেন ইয়াসিন৷ তিনিই একমাত্র নেতা যিনি কাশ্মীরের ভারত কিংবা পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি চান না৷ বলে রাখা ভালো, তাঁর হাত ধরেই কাশ্মীরে সশস্ত্র আন্দোলন ভয়ানক আকার ধারণ করেছিল৷ এ পর্যন্ত ৩০০ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি৷ বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি থেকে আবার ইয়াসিন মালিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ৷ তাঁকে কোঠিবাগ থানায় রাখা হয়েছে৷ ওদিকে, গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে হুরিয়ত নেতা মিরওয়াইজ, হুরিয়ত কনফারেন্সের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলি শাহ গিলানিকে৷

১৯৬৬ সালে শ্রীনগরে জন্মানোর পর থেকেই কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের হিংসার সাক্ষী থেকেছেন তিনি৷ চূড়ান্ত ক্ষোভ থেকে ১৯৮০ তে দল গড়েন৷ নাম দেন ‘‌তালা পার্টি'‌৷ তারপর একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে বিতর্কিত নানা বিষয় ছাপিয়ে বিলি করতে থাকেন৷ তার ফলে ক্রমশ অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে কাশ্মীরে৷ ১৯‌৮৩ সালে কাশ্মীরের শের-‌ই কাশ্মীর স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ম্যাচ ভেস্তে যায় তাঁর কারণেই৷ ওই সময় একের পর এক ঘটনায় ঘটাতে থাকেন তিনি৷ সেবারই প্রথম চার মাসের জন্য গ্রেপ্তার হন ইয়াসিন৷ তারপর ‘‌তালা পার্টি'‌-র নাম বদলে রাখেন ‘‌ইসলামিক স্টুডেন্টস লিগ'‌৷ ওই সংগঠন কাশ্মীরে যুব আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠে৷ ‘‌আজাদ কাশ্মীর'‌-‌এর দাবিতে সরব হতে থাকেন ইয়াসিন মালিক৷ পাকিস্তানে গিয়ে রীতিমতো অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্রমে সশস্ত্র আন্দোলনকারী হয়ে ওঠেন৷ তারপর ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে ফিরে আসেন জেকেএলএফ-‌এর সদস্য হয়ে৷ কাশ্মীরের স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন৷

প্রায় তিন দশক ধরে কাশ্মীরের সংবাদ পরিবেশন করছেন প্রবীন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানালেন, ‘‌‘‘১৯৯০ থেকে দেখছি, সরকার মাঝে মধ্যে এমন কড়া ভূমিকা নেয়৷ কিছু দিন পর আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে আসে৷ এটা দু'টো জিনিসের ওপর নির্ভর করে৷ এক, কাশ্মীরের অভ্যন্তরে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলি ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে আলোচনা৷ এবং দুই, প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা৷ বেশ কিছুদিন ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা বহুদিন বন্ধ হয়ে রয়েছে৷ এখন কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কীভাবে ভালো করা যায়, তা ভাবা প্রয়োজন৷'‌'‌

স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথম কাশ্মীরে পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের হাত ধরে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি৷ নেহাৎ ক্ষমতার লোভেই, নীতি আদর্শে একেবারে দুই মেরুর দু'টি দল হাত মিলিয়েছিল৷ এমন প্রমাণ দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়৷ আগামী কিছু দিন আরও ধরপাকড় হতে পারে৷ আরও বেশি সেনা সক্রিয়তা দেখা যেতে পারে৷

রাজ্যপালের শাসন চলছে৷ কাশ্মীরে এবার ভোট হবে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের দাবিতে৷ এই ধারায় জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া রয়েছে৷ ৩৭০ বাতিলের দাবিতে মুখর হয়ে বিজেপি থাকবে এক মেরুতে৷ একা৷ অন্য মেরুতে থাকবে কংগ্রেস, ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিডিপি, এমনকি হুরিয়ত-‌সহ আরও কট্টরপন্থি ইসলামিক শক্তি৷ মেরুকরণের এমন অস্ত্রে কাশ্মীরে যাই হোক, জম্মুতে কিন্তু নিরঙ্কুশ করার লক্ষ্য বিজেপি‌র৷ আর একঘরে মেহবুবার পিডিপি-‌কে দেখিয়ে কাশ্মীরের জনজোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর ওমর আবদুল্লাহ৷ তা সে সংগঠনের জোরে হোক বা গত ৩ বছর কাশ্মীরে ‘‌ম্লেচ্ছ'-দের সঙ্গে ঘর করার দরুন বিজেপির সমর্থন ধসে যাওয়ার তোড়ে জম্মুতে কংগ্রেস আগামী কয়েক মাসে গুছিয়ে নিতে পারে কিনা সেদিকে নজর সবার৷

অডিও শুনুন 08:44
এখন লাইভ
08:44 মিনিট

‘ভারতের কাশ্মীর নীতির জন্য সেখানকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি’

সৌম্যর মতে, ‘‌‘‌গত ২৫-‌৩০ বছরে ভারতের কাশ্মীর নীতির জন্য সেখানকার পরিস্থিতি খুব একটা পরিবর্তন হয়নি৷ অশান্তি মেটার নাম নেই৷ বরং জটিলতর হয়েছে৷ দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে৷ সে কংগ্রেসের আমলে হোক বা ভারতীয় জনতা পার্টির সময়ে হোক বা জোট সরকারের আমলেই হোক না কেন৷'‌'‌ এখন যে যুক্তি দেখিয়ে পিডিপি-‌র সঙ্গ ছেড়ে সরকার ভেঙে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে বিজেপি, সেই যুক্তিকে সঠিক বলে প্রমান করা বিজেপির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন৷ তবে বছরখানেক পরে ভারতে সাধারণ নির্বাচন৷ সেক্ষেত্রে বিজেপি সরকারের ক্ষমতায় ফেরার কতকগুলি সিঁড়ির মধ্যে একটি সিঁড়ি হতে পারে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি৷

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বা ধর্মীয় মেরুকরণ তাকে এমন একটা জায়গায় ফলপ্রসূ করতে হবে যেখানে সংখ্যালঘুরাই সংখ্যাগুরু৷ কাশ্মীর হলো আদর্শ স্থান৷ তাই মেহবুবার হাত ধরে সরকার চালানোর পাশাপাশি সেই রাস্তা খুলে রেখেছিল বিজেপি৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং দলের ‘‌নরম মুখ' হিসেবে পরিচিত৷ তাঁকে দিয়ে বলানো হলো ‘কোর ইস্যু'-র কথা৷ তিনি বললেন, ‘‌‘কাশ্মীরে স্থায়ী সমাধান চাই৷ সেই পথে এগোতে হবে৷'‌' সেই পথ ধরেই ক্ষমতায় এলেন সেনা প্রধান বিপিন রাওয়াত৷ কাশ্মীরে সব দলের সর্বসম্মত পদ ছেড়ে বিজেপি শেষমেষ আঁকড়ে ধরল কট্টরপন্থাকেই৷

প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ১৯৯৮-‌৯৯ সালে যখন ভারতে ক্ষমতায় এলেন, তখন সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের বিষয়টি দূরে সরিয়ে রেখেছিল বিজেপি৷ কারণ ৩৭০ ধারায় কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি আঁকড়ে থাকলে সেসময় সরকার গড়া যে মোটেই সহজ হতো না, তা তারা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন৷ বাস্তবতার চাপে প্রধানমন্ত্রী পদে স্বয়ংসেবককে বসানোর তাগিদে বিজেপির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কট্টরপন্থি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানির মতো নেতাকেও দলের কোর ইস্যুগুলিকে সরিয়ে রাখার ‘‌বাজপেয়ী লাইন'‌ মেনে নিতে হয়েছিল৷ সেই থেকে বিজেপির ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার শুরু৷ যদিও সেই অঙ্কে মোটেই ভুল ছিল না৷ কারণ ওই লাইনে ভর করেই কাশ্মীরের নরমপন্থি ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লাহ ও ওমর আবদুল্লাহদের এনডিএ-‌তে টেনে আনতে পেরেছিল বিজেপি৷ বাজপেয়ীর কাজ ফুরোয় ২০০৪-‌এর ভোটে পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে৷ ভারতের জনগণ আদবানিকে খারিজ করল ২০০৯ সালে৷ এরপর দশ বছর ইউপিএ-‌র উদারপন্থি মনমোহন সরকারের অবসান হলো৷ তখন আদবানিকে দিয়েই নরেন্দ্র মোদীকে সামনের সারিতে নিয়ে এল সংঘ৷ ৩০ বছর পর মোদীর হাত ধরে সংসদে এল নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা৷ বিজেপি‌র একক শক্তিতে বলিয়ান হয়েও চরম পদক্ষেপ কিন্তু নিলেন না মোদী৷ কারণ হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখানো তখনও বাকি৷ যদিও একদিকে সংবিধানের ৩৭০ ধারা, রামমন্দির গড়া, কমন সিভিল কোড ইত্যাদি নিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়েছে মোদী সরকার৷ এরপর হিন্দুরাষ্ট্রের চেহারা দেখালেন উত্তর প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে সন্যাসী যোগী আদিত্যনাথকে ক্ষমতায় বসিয়ে৷ ঠিক একইসময়ে একদিকে গরু নিয়ে গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর পারিকর মুখ বুঁজে রইলেন৷ তেমনি উদারতার আর এক নিদর্শন দেখানো হলো কাশ্মীরে৷ মেহবুবা মুফতির হাত ধরলেন মোদী৷ এবার ভোটের মুখে মুফতির হাত ছেড়ে দিয়ে ঝুলি থেকে বেড়াল বের করতে চাইছে বিজেপি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়