জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ বিতর্ক | আলাপ | DW | 17.08.2016
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ বিতর্ক

তর্ক বা বিতর্ক জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ করা, না করা নিয়ে৷ ফ্রান্সের একটি পত্রিকা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, তারা জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ করবে না৷ ছবি প্রকাশে জঙ্গিরা উৎসাহিত হয়৷

Syrien IS Kämpfer Symbolbild

প্রতীকী ছবি

জঙ্গিদের অন্যতম টার্গেট থাকে যে কোনো উপায়ে আলোচনায় আসা৷ হামলা পরবর্তী ছবি প্রকাশ করলে এতে জঙ্গিদের উদ্দেশ্যকে সফল করে দেয়া হয়৷ ছবি প্রকাশ করা না করা নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশেও আছে৷ যদিও ইউরোপ বা অন্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশের বিষয়টি আলাদা৷

ছবি প্রকাশ বা ইউরোপের জঙ্গিদের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের কিছু মিল থাকলেও, সম্পূর্ণ এক করে দেখার অবকাশ নেই৷ জঙ্গিদের ছবি প্রকাশের বিষয়টিও বিচার করতে হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ইউরোপ বা অন্য দেশের প্রেক্ষাপটে নয়৷ জঙ্গিবাদের ছবি প্রকাশ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা৷

১. গুলশানের হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির পর জঙ্গিদের লাশের ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে৷ হামলার আগে আইএসের পোশাক পরা জঙ্গিদের হাস্যোজ্জ্বল ছবিও ছাপা হয়েছে৷ এই ছবি যদি ছাপা না হতো, তবে কী ঘটত বা ঘটতে পারত? হয়তো জঙ্গিদের আসল পরিচয় জানাই যেত না৷ লাশের ছবি এবং অকাশ, বিকাশ... নাম পুলিশ যা দিয়েছিল, তাই বিশ্বাস করতে হতো৷ অসত্য বিশ্বাস করতে হতো৷

জঙ্গিদের হামলার আগের ছবি প্রকাশিত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই আসল পরিচিতি প্রকাশিত হয়েছে৷ জানা গেছে, এই জঙ্গিরা আসলে কারা, তাদের সামাজিক অবস্থান কেমন৷ ফলে এক্ষেত্রে ছবি প্রকাশের অপকারিতা বা ক্ষতির চেয়ে উপকারিতাই বেশি বলে ধারণা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে৷

২. কল্যাণপুরে পুলিশি অভিযানে নিহত জঙ্গিদের লাশের ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ৷ পুলিশের সূত্র ধরেই জঙ্গিদের হামলার আগের হাস্যোজ্জ্বল ছবি প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে৷ লাশের ছবিগুলো ছিল বীভৎস৷ ছবিগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য৷ হাস্যোজ্জ্বল ছবিগুলো ছাপা হয়েছে, হামলার পরে এই ছবি প্রকাশ করে আইএস দায় স্বীকার করতো, তা বোঝানোর জন্য৷

হামলার আগের ছবি প্রকাশ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে এভাবে যে, জঙ্গিদের এসব হিরোইজমের ছবি দেখে অনেকে উৎসাহিত হতে পারে, সুতরাং এমন ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া উচিত নয়৷ কথাটা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়৷ গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে, একটি ছবি প্রকাশ করে, কোনোভাবে জঙ্গিবাদ উৎসাহিত করা হচ্ছে কিনা৷ পুলিশ যে লাশের বীভৎস ছবি প্রকাশ করেছে তার আদৌ দরকার ছিল কিনা৷ এক্ষেত্রে অধিকাংশ জঙ্গির পরিচয় কিন্তু পুলিশ জেনেছে আঙুলের ছাপের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা আঙ্গুলের ছাপ মিলিয়ে৷ এই কাজটি ছবি প্রকাশের আগেও বা ছবি প্রকাশ না প্রকাশ করেও করা যেতো৷ আঙুলের ছাপ মিলিয়ে যদি কাউকে শনাক্ত করা না যেতো, তখন হয়ত ছবি প্রকাশের প্রসঙ্গ আসতে পারত৷

সুতরাং ছবি প্রকাশ নিয়ে গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবারই নতুন করে চিন্তা করে দেখার সুযোগ আছে৷

৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ করা বা না করার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি জনআস্থা অর্জনের পদক্ষেপ নেয়া৷ আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুধু খারাপ কাজই করেন না, অনেক ভালোও কাজ করেন৷ যোগ্যতা দক্ষতা নিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশ্ন নেই৷ তারপরও জনআস্থায় ঘাটতি প্রবল৷ পুলিশ যা করে, যা বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জনগণ পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না৷ ‘সত্যিই কি এমন হয়েছে'- প্রশ্ন জাগে জনমনে৷

সাদা চোখে দেখলে কয়েকটি কারণে এই সন্দেহ তৈরি হয়-

ক. বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বাধ্য হয়ে অনেকে সমর্থন করলেও, ক্রসফায়ারের গল্প বাংলাদেশের একজন মানুষও বিশ্বাস করেন না৷

খ. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক নীতি নৈতিকতাহীন কাজ করে৷ তাদের অনেকেই অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত৷

গ. যোগ্যতা-দক্ষতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ভালো কাজ করে৷ এসব কাজের প্রেক্ষিতে যতটা প্রশংসিত হওয়ার কথা, জনআস্থা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, বাস্তবে তা হয় না৷ এর কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাস্তবে যা করে, তার সঙ্গে আরও কিছু গল্প তৈরি করে৷ এতে জনআস্থা বৃদ্ধি না পেয়ে আরও কমে যায়৷

৪. জঙ্গিবাদ ইস্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম, দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার৷ গণমাধ্যমের সঙ্গে বৈরিতার পরিবর্তে, হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন অতি জরুরি৷ গণমাধ্যম কোন ছবি প্রকাশ করবে, কোন ছবি প্রকাশ করবে না- চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না৷ দেশ ও জনগণের স্বার্থে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক দিয়ে তা করতে হবে৷ হাসনাত করিম, তাহমিদ হাসিব ও জঙ্গির ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তদন্তে প্রভাব পড়া কোনোভাবেই উচিত নয়৷ ছবি প্রকাশ না করলেই যে তদন্ত সম্পূর্ণ সঠিক পথে চলত বা চলবে, সেই বিশ্বাসও জনগণের নেই৷ প্রশাসনের ওপর যেহেতু আস্থা কম, জনগণ আস্থা রাখতে চায় গণমাধ্যমের ওপর৷ জনগণের চাওয়া গণমাধ্যম সব প্রকাশ করে দিক, যাতে কিছু গোপন করা না যায়৷ জনআস্থার প্রতিফলন যে গণমাধ্যমে সব সময় ঘটে, তা-ও নয়৷

Bangladesh Journalist Golam Mortoza

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

৫. বর্তমান পৃথিবীর জঙ্গি তত্ত্বে ছবি একটি ছোট বিতর্ক৷ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ জঙ্গিবাদে আক্রান্ত, তাদের গতানুগতিক ধারার বাইরে নতুন করে নীতিনির্ধারণ করতে হবে৷ ফ্রান্সের গণমাধ্যম ছবি প্রকাশ না করলেও জঙ্গি সংকট থেকে মুক্ত হতে পারবেনা৷ অ্যামেরিকার ভুল যুদ্ধ নীতিকে অন্ধভাবে সমর্থন করতে গিয়ে জঙ্গিবাদের থাবায় ধরা পড়েছে ইউরোপ৷ জঙ্গি নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধার রাজনীতি করতে গিয়ে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ৷

ছবি প্রকাশ বা বিক্ষিপ্তভাবে একেক সময় একেকটি বিষয় সামনে না এনে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির মূল্যায়ন জরুরি৷ জঙ্গিবাদের জন্ম ও বিস্তাররোধ করণীয় নির্ধারণ না করে, জঙ্গিবাদের থাবা থেকে মুক্তি মিলবে না৷

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন