ছাড় দিতে দিতে নাজুক হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক | আলাপ | DW | 06.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

ছাড় দিতে দিতে নাজুক হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অবস্থান বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্বলতার কারণে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে৷ ব্যাংক খাতে একের পর এক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির ঘটনা গত এক দশকে নতুন মাত্রা পেয়েছে৷

ব্যাংক খাতের অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক গত একদশকে অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির নানা ঘটনার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে যথেষ্ট দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে৷ এই দুর্বলতা নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাতেও ফুটে উঠেছে৷ আর তাই বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২-এর মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আর্থিক ও মুদ্রা ব্যবস্থার শীর্ষ নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভবিষ্যত অনেককেই ভাবাচ্ছে৷

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের ধারাবাহিকতায় '৯০-র দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী, সুদক্ষ ও স্বাধীন করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়৷ নানামুখী সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্ষমতা জোরদার করা হয়, আর্থিক খাত বিশেষত ব্যাংক খাত তদারকিকে অধিকতর ক্ষমতাবান করা হয় এবং অনেকটা স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি প্রণয়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয়৷ সন্দেহ নেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সমঝোতার আওতায় এসব সংস্কার ত্বরান্বিত হয় চলতি শতকের প্রথম ভাগে৷ ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট স্বাধীনতা না পেলেও অন্তত কিছুটা স্বাধীনতা পায়৷

তবে এক দশক আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ খোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ করার পথে একটি বড় ধরনের বাধা তৈরি করা হয়৷ এরপর থেকে নানামুখী চাপের মুখে নানাভাবে পিছু হটে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব ক্ষমতা ও স্বাধীনতাকে অনেকটাই বিসর্জন দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে৷ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায় থেকেও নিজস্ব স্বাধীনতা ও ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ ছাড় দেওয়ার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এমন নয় যে ব্যাংকিং তথা আর্থিকখাতের সমস্যা বাংলাদেশে সম্প্রতি মাথা চাড়া দিয়েছে৷ স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি দশকেই আর্থিকখাত নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে৷ ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট আর বড় অংকের ঋণখেলাপি হওয়ার অনেক ঘটনাই আছে৷ তবে অর্থনীতির আয়তন বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সব অর্থ লোপাট আর খেলাপি ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়েছে৷ পাশাপাশি নতুন ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে পরিস্থিতিকে জটিলতর করেছে৷ স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও সনাতনী ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন কৌশল ও অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনার দিকে অগ্রসর হতে হয়েছে৷ কিন্তু এই কাজে যথেষ্ট সফলতা আসেনি বা আসতে পারেনি৷

২০১০-১১ সময়কালে দেশের পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক উত্থান ও কৃত্রিম স্ফীতি ঘটে, যার অনিবার্য পরিণতিতে পরবর্তীতে বাজারে বিরাট পতন ঘটে, লাখ লাখ কারবারি ও বিনিয়োগকারী তাঁদের পুঁজি খুইয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন৷ যদিও কৃত্রিমভাবে এই স্ফীতি তৈরির জন্য শেয়ারবাজার বিশেষত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্রোকার-ডিলার-কারবারি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তারপরও আর্থিকখাতের সার্বিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান বাজারকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলতে সহায়তা করেছে৷ বাজার যখন ক্রমেই উঠছিল, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও বাজারে বিনিয়োগ করা বা টাকা ঢালার জন্য নানাভাবে চাপ ও প্রলুব্ধ করা হয়৷

ব্যাংকগুলো যখন বিনিয়োগ বাড়াতে লাগল তখন স্বাভাবিকভাবেই বাজারে পুঁজির প্রবাহ বেড়ে বাড়তি ও কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হলো, যা বিভিন্ন শেয়ারের দর বাড়াতে লাগল অস্বাভাবিক হারে৷ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধা করছিল, অথচ বিপদের আভাস ঠিকই পাচ্ছিল৷ হস্তক্ষেপ না করার জন্য নেপথ্যে রাজনৈতিক চাপ ছিল৷ তাও দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি৷ অবশেষে ফাটকার বেলুন ফুলতে ফুলতে ফেটে যাওয়ার পর্যায়ে যখন উপনীত হলো, তখন পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগে রাশ টানতে নগদ জমা সংরক্ষণের আবশ্যকতার হার (সিআরআর) বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক৷ এতে করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ বাজার থেকে তুলে নেয়, যা বাজারের অনিবার্য ধসকে ত্বরান্বিত করে৷ যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিল, তবুও  তা ছিল প্রলম্বিত ও দ্বিধান্বিত৷

শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক ধকল সামলে উঠতে না উঠতেই ব্যাংকখাতে হলমার্ক কেলেংকারির ঘটনা প্রকাশ পায়৷ সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে হলমার্ক শিল্পগোষ্ঠী চিহ্নিত হয় ২০১২ সালে৷ যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন থেকেই এক পর্যায়ে হলমার্ক কেলেংকারি ধরা পড়ে, তারপরও অভিযোগ রয়েছে যে পরিদর্শন কাজে বাধা তৈরি হওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যত নিশ্চুপ ছিল৷ হলমার্ক কেলেঙ্কারির দায় অনেকটা এড়াতে পারলেও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের থাকেনি৷ বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিশেষত সাবেক চেয়ারম্যান একের পর এক অনিয়ম করে গেছেন যা বারবারই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে এসেছে৷ তারপরও ব্যাংকটিতে নজরদারি বাড়াতে ও ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা আনতে চাপ দিতে সক্ষম হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক৷ ফলে বেসিক ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে৷ ২০১৩ সালে এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়৷

হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেংকারির পাশাপাশি বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ আরো কয়েকটি ছোট-বড় অনিয়মের ঘটনাও সম্প্রতি বছরগুলোতে ঘটেছে৷ সেগুলোতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির ঘাটতির কথা জানা যায়৷ যেমন: বেসরকারিখাতের ফারমার্স ব্যাংক৷ ব্যাংকটি অনেক আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছিল যদিও এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে৷

তবে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সাইবার হ্যাকিং-য়ের মাধ্যমে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যাবতীয় নিরাপত্তা ও দক্ষতাকে বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়৷ নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত হিসাব থেকে এই অর্থ উত্তোলনের জন্য ঢাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জাল নির্দেশনা জারি করা হয়৷ এর মধ্যে দুই কোটি ডলার শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করা হলেও তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে৷ বাকি আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ ডলার ফিলিপাইন্স থেকে উদ্ধার করা গেলেও বাকিটা ফিলিপাইন্সের রিজাল ব্যাংকের মাধ্যমে জুয়াড়িরা নগদায়ন করে নিয়েছে যা এখনো ফেরত আনা সম্ভব হয়নি৷ এই  ঘটনার জের ধরে গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন, দু'জন ডেপুটি গভর্নরকেও অপসারণ করা হয়৷ অভিযোগ রয়েছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় হ্যাকাররা এই কাজ করেছে৷ এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেমনি নিয়ন্ত্রক হিসেবে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর তদারকির নৈতিক অবস্থানও ক্ষুণ্ণ হয়েছে৷ রিজার্ভ কেলেঙ্কারির দু'বছরের মাথায় ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত সোনার মানে অসঙ্গতি ধরা পড়ে, যা আবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আরেকদফা অনাস্থা তৈরি করে৷

উল্লিখিত ঘটনাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার প্রকাশ ঘটিয়েছে৷ পাশাপাশি এমন কিছু ঘটনাও ঘটেছে, যা মুদ্রানীতি নির্ধারণী ভূমিকাকে ভীষণভাবে খর্ব করেছে৷  ৩০ মার্চ ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বিএবি (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকস) নেতারা অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে বৈঠক করে সিআরআর ৬.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.০ শতাংশ কমানোর দাবি জানান৷ এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক তা কমিয়ে ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করে, যা ১৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়৷ আবার ২০ জুন বিএবি বৈঠক করে সকল ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়৷ অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বিএবি-র এই ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানান৷

অথচ সিআরআর নির্ধারণের পূর্ণ এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের৷ মুদ্রা সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মুদ্রানীতির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার এই সিআরআর প্রয়োগ করা হয়৷ ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের দাবি বা চাপে এটি কমানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিজেদের ক্ষমতার সঙ্গে স্পষ্টতই আপোস করেছে৷ অন্যদিকে সুদের হার বাজারের গতি-প্রকৃতির ও প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল৷ জোর করে এই হার বেঁধে দেয়ার মাধ্যমে আর্থিক বাজারের গতিশীলতাকে বিনষ্ট করা হচ্ছে৷

সার্বিকভাবে বিগত এক দশকের এরকম বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু রাজনৈতিক চাপ নয়, বরং আর্থিকখাতের সুবিধাভোগী ও স্বার্থান্বেষী মহলের চাপের কাছেও অনেকটা নাজুক হয়ে পড়েছে৷ নিজস্ব সীমিত স্বাধীনতা ও ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের বদলে ক্রমাগত ছাড় দিয়ে চলায় এই নাজুকতা বেড়ে চলেছে৷

লেখাটি কেমন লাগলো জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন