ছাত্র রাজনীতি করা বা না করার ‘অপবাদ’ | আলাপ | DW | 18.10.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

ছাত্র রাজনীতি করা বা না করার ‘অপবাদ’

ছাত্র রাজনীতি কী? পরিচিত যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্র সংগঠনের সদস্য হওয়াই কি ছাত্র রাজনীতি? নাকি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বাইরে থেকেও ছাত্ররাজনীতি করা যায়?

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বুয়েটের ঘটনার পরে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবির প্রেক্ষাপটে গত কয়েকদিন ধরে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল মনে৷ পরিচিত রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে ভিড়িনি, তাই আপাত দৃষ্টিতে শিক্ষাজীবনে ছাত্র রাজনীতি করিনি৷ কিন্তু প্রচলিত এই ধারণা মেনে নিতেও আপত্তি আছে৷ খুব জোর দিয়েই দাবি করতে পারি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রাজনীতি সচেতনতা অন্য ছাত্রদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না৷ একজন ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রের ভাল মন্দ, অধিকারবোধ নিয়ে যতটুকু সংবেদনশীল থাকা প্রয়োজন, গড়পড়তা তারও কোনো কমতি ছিল না৷ 

তখন ক্লাস এইটে৷ ইংরেজি ক্লাসের শিক্ষক হোমওয়ার্ক দিলেন, ‘এইম ইন লাইফ' রচনা লিখতে হবে৷ কী মনে করে যেন লিখেছিলাম ‘আই ওয়ান্ট টু বি এ লিডার'৷ যদ্দুর মনে করতে পারি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে নিয়ে লেখা কোনো একটি প্রবন্ধ পড়েই এই বাসনা হয়েছিল৷ শিক্ষক ক্লাসে সেই রচনা পড়লেন৷ খাতা ফেরৎ দেয়ার সময় চশমার উপর দিয়ে তাকালেন৷ দুই দিকে ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘‘তোকে দিয়ে হবে না৷'' শিক্ষকের এই উপলব্ধির কারণ ঠিক বোধগম্য হয়নি তখন৷

স্কুল শেষে মফস্বল থেকে ঢাকায় আসা৷ উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হতে হলো একটি সরকারি কলেজে, যেটি তখন রেজাল্টের বিবেচনায় দেশের প্রথম ৫টি কলেজের মধ্যে পড়ে৷ ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে চাক্ষুস পরিচয়টা হয় ঠিক তখনই৷ লাল অক্ষরের দেয়াল লিখন পড়ে হৃদয়ে কম্পন বোধ করেছি৷ আবার একই সাথে ছাত্র রাজনীতির কালো চেহারার সাথে পরিচিত হয়েছি৷ দেখেছি কাছের বন্ধুদের রাতারাতি বদলে যেতে৷ এসএসসির ফলাফলের বিবেচনায় এরা প্রত্যেকেই মেধাবী, অথচ তারাই তখন জড়িয়ে পড়ল ছিনতাই-চাঁদাবাজির মত ঘটনাতে৷  মহানগরীর সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা আমি যথেষ্ট সাহসের অভাবে তখন কোনো পক্ষেই ভিড়তে পারিনি৷ মনে মনে প্রবোধ দিচ্ছি রাজনীতির পাঠটা না হয় তোলা থাক বিশ্ববিদ্যালয় পর্বের জন্যেই৷

বাসনা হাতের মুঠোয় নেয়ার পালা আসল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর৷ রাজনীতি দিয়ে দিন বদলের স্বপ্নও পেয়ে বসেছে ততদিনে৷ ক্ষমতায় তখন বিএনপি৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিশ্বর এখনকার ছাত্রলীগের মতো ছাত্রদল৷ হলে মাথা গুঁজবার জায়গা পাওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে তাদের মিছিল, শোডাউনে যোগ দেয় বন্ধুরা৷ হলে না থাকায় তার প্রয়োজন হয়নি আমার৷

ছাত্রদল যখন হাজারো ছাত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রদর্শনী দিয়ে চলে, তখন বাম ধারার সংগঠনগুলো হাতে গোনা কয়েকজনকে নিয়ে মিছিল করছে৷ গলার সবটুকু জোর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন বৃদ্ধি, বাণিজ্যিকীকরণ কর্পোরেট আগ্রাসন, সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের দাবিতে স্লোগান দেয়৷ এই ছাত্ররাই আমার কাছে তখন নায়ক৷ বাম রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাথে উঠা-বসার শুরু৷ বুঝেছি রাজনীতি করতে হলে এমন কোন না কোন সংগঠন করতেই হবে৷ কিন্তু সেটিও ঠিক হয়ে উঠলো না৷  মত, দ্বন্দ্ব আর তত্ত্বের জটিলতায় ততদিনে বুঝে গেছি সরাসরি বাম রাজনীতি করা ছাত্র সংগঠনেও ঠিক ভেড়া হবে না৷ শেষ পর্যন্ত বাম ধারারই একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়া৷

এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যত আন্দোলন হয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে তার প্রায় সবগুলোর সাথেই যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়েছে৷ কখনও সংগঠনের হয়ে, কখনও স্বাধীনভাবে৷ ক্ষমতাসীন  ছাত্র সংগঠনগুলো বরাবরই সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে৷ পেশিশক্তি, দুর্বৃত্তপনা দিয়ে ছাত্ররাজনীতির এক ভিন্ন সংজ্ঞা তারা দাড় করিয়েছে৷ সেই সংজ্ঞায় বিভ্রান্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বরাবরই রাজনীতি বিমুখ থেকেছে৷ অন্যদিকে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো তার বিপরীত দাঁড়িয়ে একটি ভিন্ন ধারা দাড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছে৷ কিন্তু  ব্যাপক মাত্রায় সাধারণ ছাত্রদের কাছে পৌছাতে তারাও ব্যর্থ হয়েছে৷

DW-Mitarbeiter Porträt Faisal Ahmed

ফয়সাল শোভন, ডয়চে ভেলে

 

ছাত্র সংগঠন, হোক ডান বা বাম তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা মূল রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়া৷ এই সংগঠনগুলো কোনো না কোনো অর্থে প্রত্যেকেই তাদের মাতৃ রাজনৈতিক সংগঠনের আদর্শের ধারক-বাহক৷ ছাত্রদল বা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব কারা দিবেন সেটি যখন তাদের মূল দল বিএনপি আওয়ামী লীগ ঠিক করে দেয় তখন সেই দলের ছাত্ররা সত্যিকারের রাজনীতির চর্চা করবে সেই আশা কোনোভাবেই করা যায় না৷ আবার বাম ধারার কিছু ছাত্র সংগঠন কাউন্সিলের মাধ্যমে তাদের নেতৃত্ব বেছে নিলেও তারাও চূড়ান্ত অর্থে স্বাধীন এমনটা মনে হয় না৷ আদর্শগত দিক থেকে তারাও কোনো না কোনোভাবে মূল সংগঠনেরই লেজুড়বৃত্তি করে৷ সত্যিকার ছাত্ররাজনীতি চর্চায় এটি একটি বড় বাধা৷ আমার কাছে মনে হয়েছে ছাত্রদের যে নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবনা থাকে, তাদের চিন্তার যে স্বাধীনতা থাকে সেটি সংগঠনগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়৷ ছাত্ররা তাই একটা পর্যায়ে নিজেদের মতো করে ভাবতে ভুলে যায়৷ যার মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর দেশের রাজনীতিতেও একই ধারা আর ব্যবস্থা টিকে থাকে৷

সেই সিস্টেমটিকেই ছাত্রদের ভাঙতে হবে৷ আমার কাছে ছাত্র রাজনীতির মানেটাও সেখানে৷ ছাত্ররা নিজেরাই তাদের ভাল-মন্দ বুঝে নিবে৷ এজন্য সংগঠন করবার কোনো বিকল্প নেই৷ তবে সেগুলো কোন রাজনৈতিক দলের ছায়া হবে না৷ বরং ছাত্রদের চর্চা দেখে রাজনৈতিক দলগুলোই উল্টো তাদের কাছ থেকে শিখতে বাধ্য হবে৷ আর এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সব ছাত্রই সাংগঠনিক রাজনীতিতে যুক্ত হবে৷ শিক্ষার্থীদের ছাত্র রাজনীতি করা বা না করার অপবাদটাও নিতে হবে না পরবর্তীতে৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন