চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের অস্তিত্বের লড়াই | আলাপ | DW | 13.11.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের অস্তিত্বের লড়াই

বান্দরবানে চিম্বুক পাহাড়ের কোলে ম্রো জনগোষ্ঠী এবার অস্তিত্বের এক কঠিন সংকটে পড়েছে৷ ম্রো একটি অজানিত বা অল্প পরিচিত পাহাড়ি জাতি বাংলাদেশে৷ ওরা সংখ্যালঘু জাতি৷

আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের সংস্কৃতিতে সকলের সম্মান করতে হবে

আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের সংস্কৃতিতে সকলের সম্মান করতে হবে

সরকারি হিসাবে ১৯৯১ সালে ওদের জনসংখ্যা মাত্র ২২ হাজার ১৭৮ জন এবং তাদের বসবাস শুধু বান্দরবানের পাহাড়ী অঞ্চলে৷ লোকগণনার এই হিসাবের পরে ওদের জনসংখ্যা আলাদাভাবে আর জানাই যায় না৷ এতটাই অবহেলিত ও উপেক্ষিত জাতি এই ম্রো৷

বহু আগে থেকেই এই ম্রো পাহাড়ী জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি হারাতে বসেছে৷ তাদের জুম জমি কখনো উন্নয়নের নামে, কখনো পর্যটন সম্প্রসারণের নামে, কখনো সরকারি নানা স্থাপনার নামে কেড়ে নেওয়া হয়েছে৷ এবার প্রথমবারের মতো এই অজানিত ম্রো জনগোষ্ঠী প্রতিবাদে মুখর হয়েছে৷ তারা তাদের চিরায়ত পাহাড়, প্রথাগত ভূমি ও অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে নেমেছে৷  জাতীয় পত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়েছে৷ নাগরিক সমাজসহ অনেকে তাদের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে৷ আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস, পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশন ও আদিবাসী ফোরামসহ অনেকে তাদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়েছে৷

আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে প্রথম আলোতে আমার ‘দেশহীন মানুষের কথা' কলামে ‘ধরিত্রী আমার নয়, আমিই ধরিত্রীর' শিরোনামে আমি লিখেছিলাম, ‘‘ম্রোদের পাড়া থেকে যখন ফিরি তখন পশ্চিমে সূর্য ডুবে যাচ্ছে৷ ওরা বললো, ওদের জুম বাগানভূমি, বিচরণক্ষেত্র, পূর্বপুরুষের অবারিত রেখে যাওয়া বিস্তীর্ণ বন ও পাহাড় বেদখলে চলে যাচ্ছে৷ কেড়ে নেয়া হয়েছে৷ ওদের অনুমতি তো দূরে থাক, ওদের কেউ জিজ্ঞেসও করেনি৷ শক্তিহীন, ক্ষমতাহীন, অর্থহীন এমনকি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এক পাহাড়ি সমাজ, যারা ধরিত্রী ও প্রকৃতিকে, বনকে, পাহাড়ের বুকে বয়ে চলা নদী ও জলধারাকে, পরিবেশকে এতকাল রক্ষা করে এসেছে সবার জন্য, তারা এখন উপেক্ষিত বিলুপ্তপ্রায় অসহায় জাতি৷ এ ধারায় চললে একদিন ওরা হারিয়ে যাবে৷ প্রকৃতিকে ভালোবাসার যে শিক্ষা ওদের আছে, তা এই শহরে কোথায় পাবো আমরা? ওরা হারিয়ে গেলে শুধু ওদের না, আমাদের দেশের ও পৃথিবীর অপূরণীয় ক্ষতি হবে৷’’ এ বিষয়ে মহাশ্বেতা দেবী তার টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা উপন্যাসের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘‘আদিবাসীদের সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতিচেতনা, সভ্যতা, সব মিলিয়ে যেন নানা সম্পদে শোভিত এক মহাদেশ৷ আমরা, মূলস্রোতের মানুষেরা, সে মহাদেশকে জানার চেষ্টা না করেই ধ্বংস করে ফেলেছি, তা অস্বীকার করার পথ নেই৷ মূলস্রোতের ধাক্কায় এদের বারবার দেশান্তরী হতে হয়েছে৷ ফলে অনেক কিছু গেছে হারিয়ে৷ মূলস্রোত এই বিষয়ে যে অপরাধে অপরাধী তার ক্ষমা নেই৷’’

প্রথম আলো'তে দেখলাম (৯ নভেম্বর) চিম্বুক পাহাড়ে সিকদার গ্রুপের ভূমি দখল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ম্রো জনগণ৷ তারা বাঁশি বাজিয়ে, ঢোল বাজিয়ে চিম্বুক পাহাড়ে হোটেল নির্মাণের প্রতিবাদ জানিয়েছে৷ শত শত ম্রো নারী-পুরুষ এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে৷ ম্রো বলেছেন, নাইতং পাহাড়ের নামও বদলে দিয়েছেন ভূমিলোভী চক্র৷ এই সব প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত জমিতে কাপ্রত্নপাড়া, দোলাপাড়া, ইরাপাড়া ও কলাইপাড়ার শতাধিক ম্রো পরিবার জুম চাষ করে আসছে৷ তারা বলছেন, এই হোটেল ও পর্যটন প্রতিষ্ঠা করা হলে চারটি পাড়া সরাসরি উচ্ছেদ হবে৷ আর ৭০ থেকে ৮০টি পাড়ার ম্রোরা উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়বে৷ দোলাপাড়ার কারবারী লঙনাং ম্রো বলেছেন, তাদের পাড়ার শ্মশানভূমি ও পানির উৎস দখল করে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে৷

আমাদের কথা হলো, কেন ম্রোদের ঐতিহ্যগত ভূমিতে এই হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা করতে হবে? পাহাড়ে হাজার হাজার একর ভূমি দখল হয়ে গেছে, বন উজাড় হয়ে গেছে অনেক আগে৷ এখানে বন, প্রকৃতি, নদী, জীববৈচিত্র্য সব মানুষের অত্যাচারে মুমূর্ষু৷ রাবার বাগান ও অন্যান্য প্রকল্পের নামে কত জমি দখল হয়ে গেছে৷ সেই সব জায়গায় এই সব স্থাপনা করা হোক, যেখানে পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমি কেড়ে নিতে হবে না৷

আমি আমার মানবাধিকার আন্দোলনের দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময়ে যে প্রশ্নের মুখোমুখি বার বার হয়েছি, তা হলো, কেন পাহাড়ি বনবাসী মানুষের ভূমির কাগজ বা দলিল নেই? এই প্রশ্নের উত্তর আমি বহুবার দিয়েছি৷ জাতিসংঘ নিজেও তার স্থায়ী ফোরামের মাধ্যমে উত্তর দিয়েছে যে, ঐতিহাসিক কারণে আধুনিক রাষ্ট্রসমূহে এই সব মানুষেরা অবিচার ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে৷ তারা যুগ যুগ ধরে এই সব ভূমিতে বসবাসের পরও রাষ্ট্রসমূহ তাদের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করেনি৷ তাই জাতিসংঘ এই প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত বা এনসেস্ট্রাল ভূমি অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে৷ এই বিষয়ে জাতিসংঘের কয়েকটি ঘোষণাপত্রও আছে৷ আইএলও ইনডিজিনাস ও ট্রাইবাল পপুলেশন কনভেনশন ১০৭, যা ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার র‌্যাটিফাই করেছে, তার ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "আদিবাসীদের ঐতিহ্যগতভাবে অধিকৃত ভূমির উপর যৌথ কিংবা ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার স্বীকার করতে হবে৷” আবার জাতিসংঘ ইনডিজিনাস পিপলস্ ঘোষণাপত্রের ২৬ ধারায় বলা হয়েছে, যে সব ভূমি, অঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ আদিবাসীরা বংশপরম্পরায় ঐতিহ্যগতভাবে ভোগদখল করে আসছে বা কোনরকম ব্যবহার করে আসছে, তার উপর তাদের অধিকার রয়েছে৷ রাষ্ট্র তাদের রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও ভূমি মালিকানা প্রথাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে এই সব ভূমি, অঞ্চল ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করবে৷ আমি মনে করি আন্তর্জাতিক এই চেতনা, ঘোষণাপত্র ও স্বীকৃতিই ম্রোদের আন্দোলনে শক্তি ও প্রেরণা যোগাবে৷ তাদের অধিকার আছে ‘না' বলবার৷ আদিবাসীদের ভূমির অধিকার হলো মানবাধিকার৷

সঞ্জীব দ্রং, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

সঞ্জীব দ্রং, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

আমি এক যুগ আগেই চিম্বুক নিয়ে লিখেছিলাম৷ তখন আমি পাহাড়ের কোলে, বাগানপাড়ায় মেননিয়াম ম্রোর বাড়ি গিয়েলিাম৷  সেদিন এম্পুপাড়ার পথে যেতে যেতে বাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম৷ বৃষ্টি শেষে রোদ উঠেছিল তখন৷ সামনে, পেছনে, দূরে, কাছে সব পাহাড়, অপরূপ সুন্দর এক বাংলাদেশ৷ নীচে মেঘমালা আর আর ছোট ছোট ম্রো গ্রাম৷ বাড়িগুলো বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি৷ মাচাং ধরনের৷ এখানে ধরিত্রী, প্রকৃতি ও মানুষ পরিপূরক, একাকার৷ মানুষ ধরিত্রীর, ধরিত্রী মানুষের নয়৷ বাঙালিরা বলেন, পৃথিবী আমার, ভূমি আমার৷ আমরা বলি, পৃথিবী আমার নয়, আমিই পৃথিবীর৷ এই ভূমি আমার নয়, আমিই ভূমির৷ এই ধরিত্রী ও ভূমি কেনাবেচা করার জন্য নয়৷ একে নষ্ট করার, ধ্বংস করার অধিকার মানুষের নেই৷ মানুষ ধরিত্রী ও ভূমির মালিক নয়, যত্নকারী ও লালনকারী মাত্র এবং এ ধরিত্রীকে অনাগত শিশুদের জন্য সুন্দর করে রেখে যাওয়া তার দায়িত্ব৷

বান্দরবানে এইসব পাহাড় ও ভূমি ছিল পাহাড়িদের, এই ম্রো, বম, লুসাই, ত্রিপুরা, মারমা, খিয়াং, খুমি ও পাংখুদের৷ দূরের মানুষেরা তো জানেই না ‘ম্রো' শব্দের অর্থ মানুষ৷ গারোদের ‘মান্দি' মানেও মানুষ৷ সাঁওতালদের ‘হড়' মানেও মানুষ৷ জেনেছিলাম বম জাতি নিজেদের লাই বা লাইমী বলতো৷ এর অর্থও মানুষ৷ আজ অপরিনামদর্শী উন্নয়নের আগ্রাসনে এই সব মানুষদের জীবন ছারখার হতে চলেছে৷

জাতিসংঘ আদিবাসীদের জন্য ফ্রি, প্রাওর এন্ড ইনফর্মড কনসেন্ট বলে একটি পলিসি গ্রহণ করেছে৷ এই পলিসির মূল কথা হলো, আদিবাসীদের জীবনধারাকে প্রভাবিত করবে এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীন পূর্বনুমতি নিতে হবে৷ অর্থাৎ আদিবাসীদের সাথে অর্থপূর্ণ সংলাপ ও আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তাদের সম্মতি নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে৷ জোর করে কোনো প্রকল্প আদিবাসী অঞ্চলে গ্রহণ করা যাবে না৷ এই চিম্বুকের ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য এই আন্তর্জাতিক নীতি প্রযোজ্য৷ আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ম্রো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংলাপ করবে৷ কেন ওরা এই প্রকল্প চায় না? কেন ওরা হোটেল বা পর্যটন শিল্প গ্রহণ করতে ভয় পায়, তার উত্তর খুঁজে বের করতে হবে৷ আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের সংস্কৃতিতে সকলের সম্মান করতে হবে৷

আমি আশা করবো, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলে এই ম্রোদের কথা শুনবে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়