চিংড়ি চাষ বৃদ্ধিতে মানুষ কর্মহীন ও উদ্বাস্তু হচ্ছে | বিশ্ব | DW | 14.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

চিংড়ি চাষ বৃদ্ধিতে মানুষ কর্মহীন ও উদ্বাস্তু হচ্ছে

বাংলাদেশে চিংড়িকে বলা হয় সাদা সোনা৷ অথচ রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত ডলারের পেছনে যে কত কান্না, তার কোনো ইয়ত্তা নেই৷ ৩৫ বছর ধরে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছেন জালাল উদ্দীন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান উপকূলের মানুষের সুখ-দুঃখের কথা৷

ডয়চে ভেলে: দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষের ফলে জমিতে কী ধরনের ক্ষতি হয়?

জালাল উদ্দীন: দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষ হলে জমিতে কৃষিকাজ আর হয় না৷ জমির উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়৷ একনাগাড়ে চিংড়ি চাষ হলে এক সময় সেখানে চিংড়িও হয় না৷ ওই জমি বিরানভূমিতে পরিণত হয়৷ প্রথম যেখানে চিংড়ি চাষ শুরু হয়েছিল সেই সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ, দেবহাটাসহ আশপাশের বহু এলাকা এখন বিরানভূমি৷

ওই এলাকায় প্রকৃতির উপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সহসাই যেটা চোখে পড়ে সেটা হলো ওই এলাকায় গাছ নেই বললেই চলে৷ দেশি জাতের যেসব মাছ ছিল সেগুলো শূন্য হয়ে গেছে৷ যেসব শাক-লতাপাতা হতো সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে৷ খরার সময় যদি ওই এলাকায় যান তাহলে দেখবেন আপনার গায়ে আগুন ধরে গেছে৷ কোনো যানবাহনে যদি আপনি চড়েন, তাহলে দেখবেন আপনার গায়ে একটা লবণের প্রলেপ পড়েছে৷  হাত দিলে দেখবেন চটচটে হয়ে গেছে৷ তার মানে বাতাস দূষিত হয়ে যায়, গাছ শূন্য হয়ে যায়, মাছ শূন্য হয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি ঘটে৷

নদ-নদীতে কি কোনো প্রভাব পড়ে?

নদীর পানি নিষ্কাশনের জন্য যে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছিল সেই গেটগুলো বেআইনিভাবে দখল করে চিংড়ি চাষীরা লবণ পানি উঠানোর কাজ করে৷ এর ফলে গেটের মুখ উঁচু হয়ে যায়৷ সে কারণে নদীর পানি আর নামতে পারে না৷ এর ফলে ওই নদী দখল করে চিংড়ি ঘের করে এবং সেখানে আর উজানের পানি আসতে পারে না৷ ফলে নদী তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলে এবং পলি পরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়৷ ভবদহের জলাবদ্ধতা বলেন আর বিলডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা বলেন সবই এই কারণে হয়েছে৷ উপকূলের মানুষ মাছ দিয়ে ভাত খেতে অভ্যস্ত৷  কিন্তু এখন আর খাল বিলে কোনো মাছ নেই৷ যা দু-একটা আছে তাও মানুষ আর ধরতে পারে না৷ ১৯৮৯ সালের একটা ঘটনা বলি৷ মওলা বক্স নামে এক ক্ষেতমজুর কাজ শেষে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় নদীতে মাছ ধরতে গেছে৷ পাশের ঘেরের লোকজন তাকে চিংড়ি চুরির অপবাদ দিয়ে মারধোর করে আটকে রাখে৷ পরে রাতে তাকে হত্যার পর শরীর টুকরো টুকরো করে সিদ্ধ করার পর নদীতে ফেলে দেয়৷ ওই ঘটনার পর আর কেউ মাছ ধরতেও যায় না৷

সুন্দরবনের উপর এর প্রভাব কী? বলা হচ্ছে, সুন্দরবন সংকুচিত হচ্ছে৷ এ কথা কি ঠিক?

আমি একজন সমাজকর্মী হিসেবে দীর্ঘ সময় উপকূলীয় অঞ্চলে কাজ করেছি৷ ফলে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি, আমি নিজেও ওই এলাকা ঘুরে দেখেছি যে সুন্দরবনের মধ্যে মাছের অভয়াশ্রম, মাছের ভাণ্ডার৷ বছরের একটা সময় উজানের মিষ্টি পানি এবং বর্ষার কারণে সাগরের পানি নদীর পানিতে লবণাক্ততা একটু কম হয় তখন সুন্দরবনের মধ্যে মাছেরা ডিম ছাড়ে৷ নদী ভরাটের কারণে উজানের মিষ্টি পানি আর আসতে পারে না৷ সে কারণে লবণাক্ততা একটুও কমে না ফলে মাছেরাও আর ডিম দেয় না৷ মাছও এখন আর পাওয়া যায় না৷ আর মিষ্টি পানি আর লবণ পানির প্রভাবে সুন্দরবন অনেক সতেজ থাকে৷ এখন মিষ্টি পানি না আসায় সুন্দরবনও ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে৷

নোনা পানির আধিপত্য বাড়লে কী ধরনের ক্ষতি হয়?

আশির দশকে বানিজ্যিক চিংড়ি চাষের আগে মানুষ ছ'মাস মেয়াদি বাঁধ তৈরি করত যাতে নোনা পানি তাদের জমিতে না ঢুকতে পারে৷ তখন ওই এলাকায় জমিতে ধান হতো৷ আর ওই ধানের জমিতে একটু পানির মধ্যে নানা প্রজাতির মাছ হতো৷ নদীতেও প্রচুর মাছ পাওয়া যেত৷ নোনা পানির প্রভাব বাড়ার কারণে জমি তার উৎপাদন ক্ষমতা হারালো৷ মানুষের খাদ্যের অভ্যাস বদল হয়ে গেল৷ এই এলাকায় এক সময় প্রচুর গরু পালন করত৷ নিজেরা দুধ খেয়ে বাইরেও বিক্রি করত৷ এখন এই এলাকায় একটা শিশুকে দুধের রং কী জানতে চাইলে সে বলতে পারবে না৷ কারণ সে দুধ দেখেনি৷ গোসম্পদ ধ্বংস, খাদ্যের অভ্যাস বদল, জমির উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস, নারকেল-সুপারি গাছ দিয়ে খুলনা এলাকাকে মানুষ চিনত এখন সেই গাছও নেই, কোন সবজি হয় না, বাড়িতে ছগল, হাঁস-মুরগি পালন কোনোটাই এখন আর সম্ভব হয় না৷

অডিও শুনুন 13:18

‘চিংড়ি ঘের প্রতিষ্ঠিত সন্ত্রাসী শক্তির উপর ভিত্তি করে’

খাবার পানির প্রকৃতির আধারগুলো কি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?

ওই এলাকার মানুষ পুকুরের পানি আর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে খাবারের পানির চাহিদা পূরণ করত৷ যেখানে লবণ পানি চলে আসে তখন ওই এলাকার পানির স্তরেও লবণ পানি চলে আসে৷ ফলে মানুষের খাবার পানির আধারগুলোও নষ্ট হয়ে যায়৷

ওই এলাকায় দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে? এটা কি চিংড়ির প্রকোপের কারণেই?

লবণ পানি প্রধানত দায়ী৷ আর সারাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে৷ খুলনা এলাকাতেও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে৷ এ কারণে দেশীয় মাছ এসব নদী নালা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে৷

ঘের দখল-পাল্টা দখল নিয়ে ওই এলাকায় সামাজিক অস্থিরতারও সৃষ্টি হচ্ছে, আপনি কী বলেন?

আমি মনে করি না, আমি প্রত্যক্ষ করেছি, চিংড়ি ঘের প্রতিষ্ঠিত হয় এক ধরনের মারাত্মক সন্ত্রাসী শক্তির উপর ভিত্তি করে৷ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সহযোগিতা নিয়ে৷ দখল-পালটা দখল নিয়েই এসব চিংড়ি ঘের প্রতিষ্ঠিত৷ খুলনার উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপকভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে৷ এখানে বটিয়াঘাটায় ঝালবাড়ি একটা বাজারে সেখানে অনুকুল নামে এক ভদ্রলোক চায়ের দোকানে বসে বলছিলেন এভাবে বাইরের লোক এসে জমি দখল করে চিংড়ি ঘের করছে এটা কি সহ্য করা যায়৷ এটা কোন ধরনের দেশ৷ উনি চায়ের দোকান থেকে উঠতেও পারেননি, এর মধ্যে চিংড়ি ঘেরের লোকজন এসে উনার হাঁটুতে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে৷ তাতে উনার পা কেটে ফেলতে হয়৷ এমন অসংখ্য উদাহরণ আমি দিতে পারব৷

চিংড়ি চাষের কারণে অন্য পেশাগুলো বিলুপ্ত হয়ে বহু মানুষ কর্মহীন ও উদ্বাস্তু হয়েছে? এ ব্যাপারে যদি বলেন?

আপনি যদি এই এলাকার উপজেলা সদরগুলো যান তাহলে দেখবেন সেখানে বস্তি গড়ে উঠেছে৷ তাদের কাছে যদি শোনেন তারা বলবে চিংড়ি ঘের এলাকার কোন গ্রামের বাসিন্দা তারা ছিল৷ যেহেতু চারদিকে লবণ পানি ছেয়ে গেছে সাগরের মধ্যে ছোট্ট একটা ঘরে তাদের পক্ষে আর বসবাস করা সম্ভব না তাই তারা জীবন বাঁচাতে শহরে এসে নানা পেশায় যুক্ত হচ্ছেন৷ চিংড়ি চাষ যে এলাকায় হয় সেখানে কৃষকের কোনো কাজ থাকে না৷ ক্ষেতমজুরদের কোনো কাজ থাকে না৷ ফলে তারা বাধ্য হয়েই এলাকা ছেড়ে দেন৷

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণে আপনার পরামর্শ কী?

আইলা-সিডরের পর সরকারের লোকজন ওই এলাকা সফর করেছিল৷ আমরাও এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলাম৷ তখন তারা সরকারি লোকজনকে কয়েকটি বিষয় জানিয়েছিলেন৷ আমার মনে হয় ওই বিষয়গুলো ঠিকই ছিল৷ সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – এক, বিদেশি ডলার আয় করতে যদি চিংড়ি চাষ করতেই হয় তাহলে একটা বিশেষ জোন করে দিতে হবে৷ শুধুমাত্র সেখানেই চিংড়ি চাষ হবে৷ এবং সেখানে মানুষের জানমাল ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে৷ দুই, পানি উন্নয়ন বোর্ডের যে বাঁধগুলো আছে সেগুলো আইনি দিক মেনেই রক্ষা করার ব্যবস্থা করা৷ তাহলে মানুষের জান মালের কোনো সমস্যা হবে না৷ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষ বেঁচে থাকবে৷ তিন, যারা ছোট ছোট জমির মালিক তারা চিংড়ির কোনো সুফল পায় না৷ বিদেশে চিংড়ি রপ্তানি করে উৎপাদিত অর্থ তাদের মধ্যেও সম বণ্টন করে দিতে হবে৷ যাতে এলাকার উন্নয়নে কাজে লাগে৷ চার, আমরা কৃষিতে ফিরে যেতে চাই৷ পূর্ব পুরুষ যেভাবে কৃষিতে স্বনির্ভর ছিল, গরু ছাগল পালন করত আমরা সেগুলো করতে চাই৷ সরকার কৃষিতে যেভাবে জোর দিচ্ছে আমরা সরকারের ইচ্ছের বাস্তবায়ন করতে চাই৷

জালাল উদ্দীনের সাক্ষাৎকারটি কেমন লাগলো জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷