চার বছরেও রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানো যায়নি | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 25.08.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

চার বছরেও রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানো যায়নি

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লাখো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আটকে থাকা এবং তাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে বিরোধের মধ্যে শরণার্থী ঢলের আরেক বছর পার করছে বাংলাদেশ৷

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

চলতি বছরের শুরুতে চীনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রক্রিয়ায় আশার আলো দেখা গেলেও ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে সেটি থমকে যায়৷ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির টালমাটাল অবস্থা এবং করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেই আলোচনাও আর সামনে এগোয়নি৷

গত চার বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরাতে না পারার হতাশার কথা সম্প্রতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন৷ তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গারা নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত জনগণ, আমরা কিছুদিনের জন্য তাদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি৷ আমাদের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে তারা ফিরে যাবে৷ ‘‘প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারও বলেছে, তাদেরকে নিয়ে যাবে৷ চার বছর হল যায় নাই, তারা কিন্তু কখনও বলে নাই, নেবে না৷''

বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা চাইছে৷ তবে জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থা ও দেশ তেমন উদ্যোগ নিচ্ছে না৷

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট থেকে অল্প কয়েকদিনে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী৷

আগে থেকে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাসহ মোট শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখের বেশি ফলে কুতুপালং পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে৷

রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই নির্যাতনকে তখন ‘জাতিগত নিধনের ধ্রুপদী' উদাহরণ হিসাবে বর্ণনা করেছিল জাতিসংঘ৷ বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠার মধ্যে অনেকে একে ‘জেনোসাইড' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন৷ 

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সই করে মিয়ানমারের অং সান সু চি সরকার৷  ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়৷

গত ফেব্রুয়ারিতে সু চির সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সামরিক জান্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং৷ সামরিক সরকার ক্ষমতা থাকার মধ্যেও দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগোনো সম্ভব বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা৷

কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নোয়াখালীর ভাসানচর দ্বীপে স্থানান্তর করেছে৷

গত এক বছরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের শিরোনামজুড়ে ছিল কক্সবাজার ও ভাসানচর থেকে এই শরণার্থীদের পালানোর চেষ্টা, কক্সবাজারের ক্যাম্পে আগুন এবং ক্যাম্পকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড৷

আটকে আছে প্রত্যাবাসন

২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ঢলের পাঁচ মাসের মাথায় তাদেরকে দুই বছরের মধ্যে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চুক্তি সই করে৷

চুক্তির আলোকে ২০১৯ সালে দু'দফায় ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ না থাকার কথা তুলে যেতে রাজি হননি রোহিঙ্গা শরণার্থীরা৷

গত ১৯ জানুয়ারি চীনের মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সঙ্গে বৈঠকের পর চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর আশা প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ৷

চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুও জাওহুইয়ের সভাপতিত্বে বৈঠকে মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উপমন্ত্রী হাউ দো সুয়ান৷

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তিন দেশের মধ্যে ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক করার সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের ডিজি পর্যায়ে হটলাইন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়৷

সে সময় বাংলাদেশ সরকার জানায়, ছয় দফায় মোট ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৪২ হাজারের ভেরিফিকেশন করেছে মিয়ানমার৷

মিয়ানমারে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেয়নি সামরিক জান্তার সরকার৷

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেছিলেন, ‘‘আগে যখন মিয়ানমারে সামরিক সরকার ছিল, '৭৮ বা '৯২ সালে, সামরিক সরকারের সময়ে প্রত্যাবাসনটা হয়েছে, এখন কেন নয়? ''

মিয়ানমারে অস্থিতিশীলতা থাকলেও প্রত্যাবাসনের জন্য সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির৷

ডয়চে ভেলের কনটেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ‘‘মিয়ানমারের সরকার যেহেতু অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল, আন্তর্জাতিক কমিউনিটি যদি বলে যে, আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাব, তোমরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে আসো৷

‘‘বাংলাদেশের সরকার, মিডিয়া ও নাগরিকদের সব মাধ্যমে চাপটা বজায় রাখতে হবে, যাতে আলোচনা হারিয়ে না যায়৷ মহামারির কারণে হয়ত বড় আকারে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে পারছি না৷''

‘‘দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক , বহুপাক্ষিক সব আলোচনা থমকে আছে৷ তবে আমরা যদি বন্ধু দেশের সঙ্গে কন্টিনিউয়াস অ্যাংগেজমেন্ট রাখি, যখনই মিয়ানমারের পরিবেশ অনুকূল হবে, তখনই যেন চাপটা বজায় রাখতে পারি৷''

প্রত্যাবাসন আটকে থাকার মধ্যে রোহিঙ্গাদের জীবনমান নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রস্তাব সম্প্রতি নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ৷

কী বলছে ইউএনএইচসিআর

প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এক প্রশ্নে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র হান্নাহ ম্যাকডনাল্ড বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরতে চায় রোহিঙ্গা শরণার্থীরা৷ এটা সম্ভব করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই উদ্যোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা অন্য কোথাও সুরক্ষা ও নিরাপত্তা চাইতে বাধ্য না হয়৷

ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে 'গঠনমূলকভাবে' কাজ করছে জাতিসংঘ৷

সেপ্টেম্বরে ভাসানচরেসম্পৃক্ত হচ্ছে' জাতিসংঘ

প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে ভাসানচরে দ্বীপে নিয়ে যাওয়ার যে কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে, অবশেষে তাতে যুক্ত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘ৷

পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এ প্রসঙ্গে রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "বর্তমানে ভাসানচর নিয়ে জাতিসংঘের চুক্তিটি আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে৷ আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এটি সই হওয়ার জন্য চূড়ান্ত হয়ে যাবে৷

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিরোধিতার মধ্যে গত ৪ ডিসেম্বরে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা শুরু হয়৷ স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরুর সাড়ে তিন মাস পর ১৭ মার্চ প্রথমবারের মতো ভাসানচর পরিদর্শনে যায় জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধি দল৷

পরে ১০ বিদেশি দূতকে ভাসানচরে ঘুরিয়ে আনে সরকার৷ এই দুদলের বাইরে কেবল ওআইসির সহকারী মহাসচিবের নেতৃত্বে সংস্থার একটি প্রতিনিধি দল ভাসানচর পরিদর্শনে গিয়েছিল৷ 

চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ সফরে এসে ভাসানচরের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সহকারী কমিশনার গিলিয়ান ট্রিগস (সুরক্ষা) ও সহকারী কমিশনার (অপারেশনস) রাউফ মাজৌ৷

এ বিষয়ে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, "ভাসানচরের বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্বিমত থাকলেও এখন সেটা গ্রহণ করেছে৷ এখন তাদের সেখানে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি ৷''

রোহিঙ্গাদের পালানো ঠেকাতে

চলতি মাসে ভাসানচরে থেকে পালানোর চেষ্টাকালে সলিল সমাধি হয়েছে অন্তত ১১ জন রোহিঙ্গার৷ এছাড়া সেখান থেকে গত ১০ মাসে পালানোর চেষ্টা করে আটক হয়েছেন কয়েকশ জন ৷ 

ভাসানচর থেকে পালানো ঠেকাতে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রোহিঙ্গাদের আশা জিইয়ে রাখতে চাষবাস, মাছ ধরাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখা জরুরি ৷ যখনই সময় আসবে তাদেরকে দ্রুত সময়ের মধ্যে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাব ৷”

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পালাক্রমে প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ৷ তিনি বলেন, ‘‘ তাদেরকে যদি কর্মসংস্থানে নিয়ে আসা যায়, তাহলে তাদের দিয়ে খরচ মেটানো যাবে৷”

এনএস/কেএম (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম) 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়