চাপা দেওয়ার নীতিই জনঅসন্তোষের মূল কারণ | আলাপ | DW | 21.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

সংবাদভাষ্য

চাপা দেওয়ার নীতিই জনঅসন্তোষের মূল কারণ

শুধু কাজ করলে মানুষ তা মনে রাখে না, কাজের কথা মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হয়৷ ‘উন্নয়ন' করছি, একথা বারবার বলতে হয়৷ এটা বর্তমান সরকারের নীতি৷

সরকার এই নীতি অনুসরণ করছে প্রথম থেকেই৷ সমস্যা হচ্ছে, তাতেও মানুষকে মনে রাখানো যাচ্ছে না৷ মুখে স্বীকার না করলেও সরকারের ভেতরের ভাবনাটা এমন যে, ‘‘এত উন্নয়ন করলাম, তবুও মানুষ খুশি নয় কেন ?''

কেন মানুষের ভেতরে এত অসন্তোষ? ভেতরে ভেতরে বিশ্লেষণও আছে সরকারের৷ তবে সেই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দিক নির্দেশনা নেই৷ সরকারের ভেতরের সিদ্ধান্তটি সম্ভবত এমন যে, মানুষের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে কাজ (উন্নয়ন) করে যেতে হবে৷

এরফলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সরকার জনগণ থেকে আলাদা হয়ে গেছে৷ মানুষের অসন্তোষ সুযোগ পেলেই প্রকাশ হয়ে পড়ছে৷ যতবার প্রকাশিত হচ্ছে, সরকার ততবার চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে৷ চাপা দেওয়ার নীতিতে তাৎক্ষণিক ফল মিললেও, দীর্ঘমেয়াদে বড় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে৷

সম্প্রতিক দু'টি ইস্যুর প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে৷

১. কোটা সংস্কার আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না৷ দাবি যৌক্তিক হওয়ায় এ আন্দোলন প্রায় সব শিক্ষার্থীর সমর্থন পেয়েছে৷ শিক্ষার্থীরা এটা তাদের নিজেদের দাবি মনে করেছে৷ দেশের অধিকাংশ মানুষ তা সমর্থন করেছে৷

জনসমর্থিত এই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে ছাত্রলীগ৷ ছাত্রসমাজের বিপক্ষে ছাত্রলীগের অবস্থান, যদি কোনোদিন নিজেরা মূল্যায়ন করে, নিঃসন্দেহে ‘মহাভুল' হিসেবে তা নিহ্নিত হবে৷

ছাত্রলীগ শুধু ছাত্র সমাজের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়নি, দমন-পীড়ন করেছে দানবীয়ভাবে৷ সরকার পুলিশ দিয়ে ছাত্রলীগের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে৷

আবার আন্দোলনের জনসমর্থন দেখে সরকার দাবির যৌক্তিকতাও স্বীকার করেছে৷ এক পর্যায়ে বলেছে, ‘কোটাই থাকবে না', ‘কোটা বাতিল হয়ে গেছে'৷

বাস্তবে কোটা সংস্কার বা বাতিলের কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে আদালতের প্রসঙ্গ সামনে এনেছে৷‘বাতিল হয়ে গেছে'- বলার পর, আবার বলেছে ‘বাতিল করা যাবে না'৷ আদালতের নির্দেশনার কথা বললেও, বাস্তবে আদালতের এমন কোনো নির্দেশনার অস্তিত্ব নেই৷

২. স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোরদের প্রতিবাদ তো ইতিহাসের অংশ হয়ে রইল৷ এই প্রতিবাদ-আন্দোলনও সরকারবিরোধী ছিল না৷ কিন্তু সরকার ছাত্রলীগ এবং পুলিশি কর্মকাণ্ড দিয়ে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত করেছিল৷ ‘‘দাবি মেনে নিলাম, ঘরে ফিরে যাও''- সরকারের এ কথা শিশু-কিশোররা বিশ্বাস করেনি৷

নির্যাতন-নিপীড়নের এক পর্যায়ে শিশুরা ঘরে ফিরে গেছে৷ কিন্তু পুলিশ-হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব তাদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে৷ তারা সরকারের প্রতি অখুশি হয়েই রাস্তা ছেড়েছে৷ এই আন্দোলনটির সঙ্গে দেশের প্রায় সব মানুষ একমত পোষণ করেছে৷ সরকারের দমণ-পীড়ন নীতিতে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অভিভাবকরাও অসন্তুষ্ট হয়েছে৷

৩. এই দুটি আন্দোলন ও তা দমন করার ধরনের দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া থাক৷

ক. সরকার প্রথমে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, সব কিছু ঠিক আছে৷ আন্দোলনের দরকার নেই৷ আন্দোলন যখন বেগবান হয় তখনকার কৌশল, ঠিক আছে দাবি মেনে নিলাম৷

খ. আন্দোলন থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্য এর মধ্যে জামায়াত-শিবির-বিএনপি ঢুকে গেছে,এমন রাজনৈতিক বক্তব্য জোরদার করতে থাকে সরকারের মন্ত্রী ও দলের নেতারা৷

গ. জামায়াত-বিএনপি ছাত্রদের ব্যবহার করে সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা করছে৷ ছাত্রদের ভুলভাবে বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে৷ এমন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্যে উঠে-পড়ে লেগে যায় সরকার৷ পুলিশ এবং নিজেদের ছাত্র সংগঠন দিয়ে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালানো হয়৷ একটা সহিংস অবস্থা তৈরি করা হয়৷

Bangladesh Journalist Golam Mortoza (Golam Mortoza)

গোলাম মোর্তোজা, সাংবাদিক

ঘ. সহিংসতা করে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে জামায়াত- বিএনপি৷ তারা একটি ভালো আন্দোলন নষ্ট করে দিলো৷এসব কথা একনাগারে সরকারের সবাই মিলে এমনভাবে বলতে থাকে যে, ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যেন পুরো আন্দোলনটি করেছে জামায়াত-বিএনপি৷ সাধারণ ছাত্রদের তারা ভুল বুঝিয়ে আন্দোলন করিয়েছে, দায় চাপাতে গিয়ে কৃতিত্ব পুরোটা জামায়াত-বিএনপিকে দিয়ে দেয়৷ এতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়৷

৪. কোটা সংস্কার এবং স্কুল-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করেছে সরকার৷ সহিংসতা করেছে ছাত্রলীগ, সরকার দায় জামায়াত-বিএনপির উপর চাপিয়ে আন্দোলনটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে৷ বাস্তবে মানুষের মনোভাবে তা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে৷ গুম-গ্রেপ্তার নির্যাতন-নিপীড়ন করে আন্দোলন চাপা দেওয়ার নীতি নিয়েছে৷

৫. সাময়িক সাফল্য পেয়েছে সরকার৷ কিন্তু এর প্রেক্ষিতে জনআন্দোলনের মাত্রা বেড়েছে৷ মানুষের ভেতরে এই ধারণা স্থায়ী হয়ে গেছে যে, সরকারের কাছে কোনো ন্যায্যতা নেই৷ সরকার কথা দিয়ে কোনো কথা রাখে না৷ কৌশলের অংশ হিসেবে কথা দেয়৷ বিপদ কেটে গেলে সেই কথার জায়গা থেকে সরে আসে৷

৬. সরকারের ‘উন্নয়ন'র গল্প মানুষের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি৷ দুর্নীতি বা আর্থিক খাতের অনিয়ম-জালিয়াতির সংবাদে মানুষ বিচলিত হয়েছে৷ নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে না পারায় মানুষ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছে৷ আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে, এই বিশ্বাস মানুষের মনে নেই৷

সব সময় দৃশ্যমান না হলেও একটা তীব্র জনঅসন্তোষ বিরাজ করছে৷ সুযোগ পেলেই তার প্রকাশ ঘটছে৷ জনঅসন্তোষ দূর করার কোনো চেষ্টা সরকারের নীতিতে আছে, তা দৃশ্যমান নয়৷ বল প্রয়োগ করে দাবিয়ে রাখার নীতি দৃশ্যমান৷ এমন পরিস্থিতি সামনে আসছে জাতীয় নির্বাচন৷ বিরাজমান জনঅসন্তোষ নিয়ে সরকারের ভেতরে ভয় কাজ করছে৷ মুখে তা স্বীকার না করলেও, নানা রকমের শঙ্কা সরকারের ভেতরে-বাইরে সর্বত্রই আছে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন