ঘরবন্দি করার আগে দরকার খাদ্যের নিশ্চয়তা | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 27.06.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

ঘরবন্দি করার আগে দরকার খাদ্যের নিশ্চয়তা

লকডাউনে প্রায় দেড় কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার৷ তারপরও ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই এর আওতায় আসবেন না৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের ক্ষুধা দূর করা না গেলে ভয় দেখিয়ে লকডাউন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়৷

লকডাউনের খবরে পরিবার নিয়ে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন অনেক কর্মজীবীরা৷ ছবিটি ২৫ মার্চ সদরঘাটের৷

লকডাউনের খবরে পরিবার নিয়ে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন অনেক কর্মজীবীরা৷ ছবিটি ২৫ মার্চ সদরঘাটের৷

ঢাকার শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সলিম উদ্দিন সামাদ (৩৮) কাজ করেন রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে৷ দুই মেয়ে, স্ত্রী আর মাকে নিয়ে তার টানাটানির সংসার চলে প্রতিদিনের রোজগার দিয়ে৷ গত বছরের মার্চে করোনা শুরুর পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়৷ পরে আবার নির্মাণকাজ শুরু হলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন৷ কিন্তু আবার ‘কঠোর লকডাউনের' ঘোষণায় সামাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে৷

রবিবার দুপুরে ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপকালে সামাদ বলছিলেন, ‘‘গেল বছরের ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারিনি৷ আত্মীয় আর মালিকের কাছ থেকে যে ধার করেছিলাম সেটা এখনও শোধ হয়নি৷ এখন আবার সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হলে কীভাবে চলব? ভোলার চরফ্যাশন থেকে ঢাকায় এসেছি৷ গ্রামের বাড়ি বলতেও কিছু নেই৷ নদীগর্ভে চলে গেছে বাড়িঘর৷’’ কোন সহায়তা পেয়েছেন কীনা এমন প্রশ্নে বলেন, ‘‘আমি যে বিল্ডিংয়ে কাজ করি সেটার মালিক গত বছরের এপ্রিলে ১০ কেজি চাল আর ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন৷ এর বাইরে কেউ একটি পয়সাও দেয়নি৷’’ সামনের দিনগুলো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এখন সামাদ৷

অডিও শুনুন 09:35

‘আমরা প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে কমিটি করেছি’

শুধু সামাদ নন, এমন অসংখ্য মানুষ ‘কঠোর লকডাউনের’ ঘোষণায় দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন৷ কাজ বন্ধ হয়ে গেলে কীভাবে খাবার জুটবে সেটা নিয়েই রাজ্যের চিন্তা তাদের৷ খাদ্যের নিশ্চয়তা না দিয়ে কি মানুষকে ঘরে বন্দি রাখা যাবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনভাবেই সম্ভব নয়৷ করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগে, না খেয়ে মরতে চাইবে না কেউ৷ ফলে এই লোকগুলো বের হবেই৷ তাদের ঘরে রাখতে গেলে আগে খাবার পৌঁছাতে হবে৷

তবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে এখন তো আর কেউ না খেয়ে মারা যায় না৷ আমরা প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে কমিটি করেছি৷ তাদের মাধ্যমে যারা দারিদ্রসীমার নিচে আছেন তাদের ২০ কেজি চালসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র ও পাঁচ-সাতশো টাকাও পৌঁছে দেওয়া হবে৷ সবার তো এই সহযোগিতার প্রয়োজন নেই৷ লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আড়াই লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসকদের কাছে ৩৬ লাখ টাকা করে পৌঁছে দিয়েছি৷ পাশাপাশি চাল-ডালসহ যা যা দেওয়া দরকার তার সবই পাঠানো হয়েছে৷’’ প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, গ্রামে এই ব্যবস্থাপনা করা হলেও শহরে সেটা কঠিন৷ বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই ব্যবস্থাপনাটা এখনও করা যায়নি৷

২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করেন প্রায় সোয়া তিনি কোটি মানুষ৷ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে করোনার প্রভাবে নতুন করে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছেন৷ সমস্যা হল সরকারের কাছে দারিদ্রসীমার নিচে থাকা এই নতুনদের কোন তালিকা নেই৷ তাই সহায়তা পাবেন পুরনোরাই৷ তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন লকডাউন কার্যকর করতে হলে সব মানুষের কথাই চিন্তা করা প্রয়োজন৷ স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সনাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মানুষকে ঘরে বন্দি করার আগে তাদের খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে৷ সরকারের মন্ত্রীরা যত কথাই বলুন না কেন, সবাইকে খাবার পৌঁছানোর নেটওয়ার্ক এখনও তৈরী হয়নি৷’’

এর মধ্যেও সরকার দরিদ্রদের জন্য যে খাদ্য বা অর্থ বিতরণ করে সেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে৷ যে কারণে জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে৷ এতে কোন সুফল মিলবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আর্সনাল বলেন, ‘‘কত শতাংশ জনপ্রতিনিধি এই দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছে? পারসেনটেজ করলে দেখা যাবে খুবই সামান্য? এলআর ফান্ডসহ তাদের যে খরচের হিসাব সেটা পরীক্ষা করলে দেখা যাবে জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে তাদের দুর্নীতি কয়েক হাজারগুন বেশি৷ আমরা দেখেছি, কোন সরকার একটু দুর্বল অবস্থানে থাকলে আমলারা তাদের উপর চেপে বসে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন৷ এখন কোভিডের এই সময়ে তারা নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার ঘটানোর সময় হিসেবে বেছে নিয়েছেন৷ এখন তো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আমলারা৷ ফলে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে জনপ্রতিনিধিদের চরিত্র হনন করার সহায়তার মধ্য দিয়ে মানুষের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করার মধ্য দিয়ে তারা তাদের ক্ষমতায়নের জায়গাটা সুসংহত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন৷’’

অডিও শুনুন 03:32

‘সবার কাছে খাদ্য সরবরাহের চেইন তৈরী হয়নি’

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও স্বীকার করেছেন, ৫৮ হাজার জনপ্রতিনিধির মধ্যে একশ'র কিছু বেশি মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে৷ তার দাবি অনেক ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝির কারণে তাদের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট এসেছে৷ তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষকে যে অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে সেটা জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে ইউএনওরা বিতরণ করবেন৷ চাল-ডাল বিতরণসহ অন্য কাজগুলো জনপ্রতিনিধিরা করবেন৷ 

গত রোজার ঈদের আগে ৩৬ লাখ পরিবারকে নগদ আড়াই হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দিয়েছে সরকার৷ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবারের লকডাউনে দেশের প্রায় দেড় কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার৷ প্রত্যেক পরিবারকে ২০ কেজি চাল, পাঁচ কেজি ডাল, দুই কেজি পেঁয়াজ, এক কেজি সয়াবিন তেল, এক কেজি লবণ, পাঁচ কেজি আলু এবং নগদ পাঁচ থেকে সাতশ টাকা দেওয়া হবে৷ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইতোমধ্যে পাঠানো শুরু হয়েছে৷ তবে এই সাহায্যের আওতার বাইরে থেকে যাবেন নির্মাণ শ্রমিক সামাদের মতো অনেকেই, যারা সারা বছর দরিদ্র না থাকলেও লকডাউনের কারণে কাজ হারিয়ে দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে আসেন৷   

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সরকার যত কথাই বলুক সবার কাছে খাদ্য সরবরাহের চেইনটা আমাদের দেশে তৈরী হয়নি৷ এক্ষেত্রে সরকার চাইলেই প্রতিটি ওয়ার্ডে নানা শ্রেণী পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে কমিটি করতে পারে৷ শুধু সরকারের দিকে চেয়ে থাকলেই হবে না, অন্যান্য মানুষ যাদের সামর্থ্য আছে তাদেরকে সামনে আনতে হবে৷ বেসরকারি উদ্যোগ ছাড়া সব দরিদ্র মানুষের কাছে খাবার পৌঁছানো যাবে না৷ আর এটা না পারলে কোনভাবেই লকডাউন বাস্তবায়ন হবে না৷ যার পেটে ক্ষুধা সে খাবার না পেলে বাস্তায় বের হবেই৷ কোন ভয় দেখিয়েই তাকে আটকে রাখা যাবে না৷ এখন আমাদের দেশে যেভাবে সংক্রমন বাড়ছে তাতে সর্বাত্মক এই লকডাউনটাও জরুরি৷ সরকারকে পুরো সাপ্লাই চেইনটা তৈরী করেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে৷’’

ভিডিও দেখুন 15:21

ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট ও করোনা টিকা

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়