গৃহশ্রমিক নির্যাতনের বিচার হয় না | আলাপ | DW | 10.07.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

গৃহশ্রমিক নির্যাতনের বিচার হয় না

বাংলাদেশের গৃহশ্রমিকদের শতকরা ৫০ ভাগ ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন৷ তবে খুব কম ক্ষেত্রেই বিচার হয়৷ মামলা হলেও পরে চাপের মুখে সমঝোতা বা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে মামলাগুলো আর কার্যকর থাকে না৷ তাহলে এই নির্যাতন কি বন্ধ হবে না?

default

প্রতীকী ছবি

এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার একটি উদাহরণই এখন পর্যন্ত আলোচিত৷ আর তা হলো গৃহকর্মী আদুরি নির্যাতনের বিচার৷

২০১৩ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী আদুরিকে নির্যাতন করে  ঢাকার পল্লবীর ডিওএইচএস এলাকার একটি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়৷ এ ঘটনায় গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান ও তার মা ইসরাত জাহানকে তখন গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ আদালতে অভিযোগ প্রমাণ হলে ঘটনার চার বছর পর গত বছরের ১৮ জুলাই নওরীন জাহানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করেন আদালত৷ নওরীন জাহান এখন কারাগারে দণ্ড ভোগ করছেন৷ বাংলাদেশ ইন্সটিউট অব লেবার স্ট্যাডিজ (বিলস)-এর সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতানউদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার জানা মতে এই একটি ঘটনায়ই এ পর্যন্ত বিচার পাওয়া গেছে৷''

এই ঘটনায় মামলা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়৷ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তখনকার কমিশনার বেনজীর আহমেদ নিজে উদ্যোগ নিয়ে আদুরির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন৷ তার পুনর্বাসনেরও উদ্যোগ নেন৷ কিন্তু অন্য নির্যাতেনের ঘটনাগুলো শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে গেছে৷ হয় সমঝোতা হয়েছে অথবা মামলা প্রমাণ করা যায়নি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

২০১৫ সালে ঢাকায় ১১ বছর বয়সি গৃহকর্মী মাহফুজা আক্তার হ্যাপিকে মারাত্মকভাবে নির্যাতনের অভিযোগে ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন রাজীব ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহানকে গ্রেফতার করে পুলিশ৷ কিন্তু পরের বছর ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আদালত মাহফুজা নির্যাতনের মামলায় ক্রিকেটার শাহাদাত ও জেসমিন জাহানকে বেকসুর খালাস দেন৷ এই দম্পতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে জানানো হয়৷

চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে রাজধানীর শ্যামপুরে লাবনী নামের এক গৃহকর্মীর গায়ে গরম ভাতের মাড় ঢেলে নির্যাতন চালানোর অভিযোগে গৃহকর্ত্রী মারিয়া সুলতানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ৷ কিন্তু আদালতে দেয়া কদমতলী থানার চার্জশিটে ওই গৃহকর্মী ছাড়া আর কোনো সাক্ষীর নাম নেই বলে জানা গেছে৷

২৭ মার্চ রাতে রাজধানীর শাহআলী থানা এলাকার প্রিয়াঙ্কা হাউজিংয়ের একটি বাসায় নির্যাতনের শিকার হন গৃহকর্মী বুলি৷ ওই ঘটনায় গৃহকর্তা এ বি এম হাসানুজ্জামান ও গৃহকর্ত্রী রেহেনা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ পরে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ওই দু'জনকে আসামি করে ২০১৭ সালের ৪ জুলাই আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে শাহআলী থানা পুলিশ৷ কিন্তু পরে আসামিপক্ষ দুই লাখ টাকার বিনিময়ে বাদীপক্ষের সঙ্গে আপোশ করে ফেলে৷ তবে বুলির পরিবারকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও বাকিটা এখনও দেয়নি আসামিপক্ষ৷

একই মাসে পল্লবী এলাকা থেকে  নির্যাতনের শিকার হয়সাবিনা আক্তার নামের ১১ বছর বয়সি এক শিশু গৃহকর্মী৷ মেয়েটিকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়৷ মেয়েটির শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল৷ তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)-এ এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা সিএমএইচে ভর্তি করা হয়৷ সাবিনার অভিযোগের ভিত্তিতে এক সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা নিলেও পরে আর এই মামলার তদন্ত এগোয়নি৷ দায়ী কেউ গ্রেপ্তারও হননি৷

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৪৯টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও মাত্র ৬২টি ঘটনায় বিভিন্ন থানায় নির্যাতন ও অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে৷ বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ-এর ২০১৭ সাল পর্যন্ত হিসাবে গত ১০ বছরে ৯৭৫ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে৷ ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫১, যার মধ্যে ঢাকায় নির্যাতনের শিকার হয় ৩৪ জন৷ বিলস-এর গবেষণায় বলা হয় শতকরা ৫০ ভাগ গৃহপরিচারিকা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার৷ তাদের ৬০ শতাংশই শিশু৷ আর গত ১২ বছরে অস্বাভাবিক মৃত্যু  হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬০০ গৃহকর্মীর৷ বিপুলসংখ্যক গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছেন৷ এই আত্মহত্যার বিষয়টি স্বাভাবিক আত্মহত্যা মনে করার কোনো কারণ নেই৷

ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে এখন ২৫ লাখ গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমিক আছেন৷ তাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু৷ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ-২০১০ অনুযায়ী দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে এমন শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার, যাদের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর৷ আর এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই মেয়েশিশু৷  সৈয়দ সুলতান উদ্দিন জানান,‘‘ আইএলও-র  কয়েক বছর আগের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকায় গৃহশ্রমিকের সংখ্যা সাড়ে চার লাখেরও বেশি৷''

অডিও শুনুন 01:58

‘গৃহকর্মীদের নিয়ে আইনে সরকারের অনীহা আছে’

বাংলাদেশে বিলস-এর উদ্যোগে বেশ কিছু এনজিও গৃহকর্মী সুরক্ষা আইনের দাবি জানিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে৷ ২০১৫ সাল গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালা করা হলেও আইন হয়নি৷ সরকারের আইনে গৃকর্মীদের নিয়োগ, মজুরি, কর্মঘণ্টা, বয়স, চিকিৎসা, বিশ্রাম, প্রশিক্ষণসহ তাদের নানা অধিকার এবং তাদের দায়িত্বের কথাসহ আরো অনেক কিছু থাকলেও বাস্তবে এগুলো কাজে আসছে না৷ এগুলো আইন করা ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়৷ বিলস-এর সৈয়দ সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘‘সরকারের আইনে অনীহা আছে৷ তারা মনে করে, গৃহশ্রমিকরা ঘরে কাজ করে, ঘরে ঘরে গিয়ে আইনের প্রয়োগ করা সম্ভব নয়৷ এতে নানা জটিলতা সৃষ্টি হবে৷ বাংলাদেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে বহুদিন ধরে গৃহশ্রমিকরা কাজ করে আসছেন৷ এটা হঠাৎ করে পরিবর্তন সম্ভব নয়৷''

বাংলাদেশে গৃহশ্রমিকদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নাই৷ ফলে তারা সংগঠিত হওয়ার  সুযোগ পান না৷ দাবি-দাওয়া আদায়ে তারা আন্দোলন বা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না৷'' সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আরো বলেন, ‘‘আমাদের দাবির মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন অন্যতম৷ তাদের আইনগতভাবে শ্রমিক হিসেবে ঘোষণা করতে হবে৷ তাহলে তারা শ্রম আইনে সব সুবিধা পেত৷''

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে গৃহশ্রমিকরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হন৷ কিন্তু দুই-একটি ছাড়া বিচার পাওয়ার নজীর নেই৷ এর প্রধান কারণ গৃহকর্মীদের আর্থিক দুর্বলতা এবং সমাজে দুর্বল অবস্থান৷ ফলে নির্যাতনের ঘটনাগুলো চাপ দিয়ে অথবা অর্থের বিনময়ে প্রভাবশালীরা সমঝোতা করে ফেলেন৷ আবার সাক্ষীও পাওয়া যায় না৷ বিচার-ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকের পক্ষেই মামলা পরিচালনা সম্ভব হয় না৷ এছাড়া গৃহকর্মীরা প্রভাবশালীদের গ্রামের বাড়ির আশপাশের৷ তাই সামাজিক অবস্থানের কারণেই নির্যাতনের পর তারা সমঝোতায় বাধ্য হন৷''

গৃহকর্মীদের অধিকার আদায় এবং তাদের ট্রেড ইউনিয়নের জন্য ‘গৃহশ্রমিক নেটওয়ার্ক' নামে একটি সংগঠনে সোচ্চার যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে জাতীয় শ্রমিক জোট-এর যুগ্ম সম্পাদক কাজী সিদ্দিকুর রহমান একজন৷ তিনি বলেন, ‘‘গৃহশ্রমিকদের সংগঠিত করা কঠিন৷ তাঁরা বাসায় বাসায় কাজ করেন৷  কেন্দ্রীয়ভাবে তাঁদের কোনো তালিকা বা ঠিবানা নেই৷ ফলে তাঁরা সম্মিলিতভাবে কোনো কিছুর প্রতিবাদ বা দাবি আদায়ে কাজ করতে পারেন না৷''

অডিও শুনুন 03:34

‘সংগঠিত না হওয়ায় তাঁরা প্রতিবাদ করতে পারেন না’

তিনি বলেন, ‘‘তাঁরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া থেকে ধর্ষণ ও নানা রকম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন৷ এছাড়া ঠিকমতো মজুরি না দেয়া, অধিক পরিশ্রম করানো তো আছেই৷ আর এইসব নির্যাতনের কোনো প্রতিকারও পান না তাঁরা৷ কখনো কখনো সমঝোতার ভিত্তিতে নামমাত্র ক্ষতিপুরণ পান৷''

ঢাকা শহরে স্বল্প পরিসরে হলেও গৃহকর্মীদের নিয়োগ এবং কাজ দেয়ার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠান আছে৷ তারা কোনো বাসায় গৃহকর্মী দেয়ার আগে তাদের প্রশিক্ষণ, আইন-কানুন সম্পর্কে ধারণা দেয়৷ আর কোনো বাসায় নিয়োগ দেয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়৷ তাতে বেতন, দায়- দায়িত্বসহ আরো কিছু শর্তের উল্লেখ থাকে৷ গৃহশ্রমিক ডটকম নামে এরকম একটি প্রতষ্ঠিানের সাবেক ম্যানেজার আনোয়ার হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যখন গৃহকর্মী নেয়া হয়, তখন নির্যাতনের আশঙ্কা কম থাকে৷ আমরা তেমন অভিযোগ পাই না৷ গৃহকর্মীর ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র আমাদের কাছে থাকে, আমরা তার এক কপি থানায় জমা দেই৷ আবার যিনি গৃহকর্মী নেন, তাঁরও ছবিসহ বিস্তারিত পরিচয় আমাদের কাছে থাকে৷''

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন,‘‘সাধারণত কর্মঘণ্টা বেঁধে দেয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি৷ তবে কোনো সমস্যা হলে আমরা তা দেখি৷ তিন মাসের মধ্যে কোনো গৃহকর্মী চলে গেলে রিপ্লেসমেন্ট দেয়া হয়৷ তিন মাসের বেশি হলে নয়৷ আর আমরা মাঝখানে থাকায় নির্যাতনের আশঙ্কা কম থাকে৷''

অডিও শুনুন 04:01

‘কর্মঘণ্টা বেঁধে দেয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়নি’

সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় গৃহকর্মী নিতে খরচ বেশি পড়ে৷ এজেন্সিকে এককালীন পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়৷ ফলে সাধারণ বাসা-বাড়ির কাজের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে এখানকার গৃহকর্মীর চাহিদা বেশি৷

গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতিমালায় বলা আছে, ‘‘আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে গৃহকর্মীর মজুরি নির্ধারণ হবে৷ পূর্ণকালীন গৃহকর্মীর মজুরি যাতে তাঁর পরিবারসহ সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপনের উপযোগী হয়, নিয়োগকারীকে তা নিশ্চিত করতে হবে৷ কমপক্ষে ১৪ বছর বয়সের কাউকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে৷ তবে ১২ বছর বয়সের কাউকে গৃহকর্মী রাখতে হলে তার আইনানুগ অভিভাবকের সঙ্গে তৃতীয় কোনো পক্ষের উপস্থিতিতে নিয়োগকারীকে আলোচনা করতে হবে৷''

যদি ১২ বছরের শিশুকে নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে যে হালকা কাজ করবে বলা আছে, নীতিমালায় বলা আছে৷ নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে যে কোনো ধরনের নির্যাতনের ঘটনায় বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিচার হবে৷

তবে আইন না হওয়ায় এই নীতিমালার বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না৷ সৈয়দ সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘‘গৃহকর্মী নির্যাতনের প্রতিকারের ব্যাপারে ঢাকা শহরের পুলিশের ভূমিকা প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশংসনীয়৷ মামলা দায়ের, আসামি আটকে তৎপর থাকে পুলিশ৷ কিন্তু তদন্ত থেকে পরবর্তী পর্যায়ে আর এগোয় না৷''

এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন