গরিবের হক ‘বিত্তবান′ আর ‘চোরেরা′ লুটে নিচ্ছে কেন? | বিশ্ব | DW | 12.09.2016
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

গরিবের হক ‘বিত্তবান' আর ‘চোরেরা' লুটে নিচ্ছে কেন?

সাংবাদিক শফিক রেহমান ‘সমালোচনাপ্রিয়' মানুষদের নিয়ে একটি গল্প লিখেছিলেন৷ গল্পটা সবারই মনে রাখা উচিত৷ সরকার অবশেষে গরিবদের ১০ টাকায় চাল দিতে শুরু করেছে৷ এর সমালোচনা না করে প্রশংসাই করতে চাই৷ তবে...

সম্প্রতি সাংবাদিক শফিক রেহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন৷ গত ১৬ এপ্রিল তাঁর ইস্কাটন গার্ডেন রোডের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ পরে সজীব ওয়াজেদ জয়কে যুক্তরাষ্ট্রে অপহরণ করে হত্যাচেষ্টা পরিকল্পনার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়৷ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দু'দফায় ১০ দিনের রিমান্ডেও নেয়া হয় শফিক রেহমানকে৷ অবশেষে গত সপ্তাহেই তিনি জামিনে মুক্তি পেলেন৷

ছাত্রজীবনে তাঁর একটি মজার গল্প পড়েছিলাম৷ শফিক রেহমানের ‘যায় যায় দিন' তখন তুমুল জনপ্রিয় সাপ্তাহিক৷ সেখানে ‘দিনের পর দিন' – এ মজার সব গল্পের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের নানা অসংগতি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতেন তিনি৷ একটা গল্পের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছিলেন, সব কিছুতে খুঁত ধরার স্বভাব যাদের, যাদের উদ্দেশ্যই শুধু বিরোধিতা বা সমালোচনা করা, তাদের সমালোচনা বা বিরোধিতা কখনো কখনো কতটা যুক্তিহীন, কতটা হাস্যকর এবং নিষ্ঠুর হতে পারে৷

আশীষ চক্রবর্ত্তী

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

সেই গল্পে এক ব্যক্তি ধান ক্ষেতের ‘আল' ধরে হাঁটছিলেন৷ আরেকজন তাকে থামিয়ে বললেন, ‘‘তোমার সাহস তো কম নয়, আমার জমির আল ধরে হাঁটছো?'' ভদ্রলোক সভয়ে বললেন, ‘‘আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি ফিরে যাচ্ছি৷'' তাতেও আপত্তি, লোকটি আরো রেগেমেগে বলে ওঠে, ‘‘আমার আল ধরে তুমি ফিরেও যেতে পারবে না৷'' প্রথম ব্যক্তি তো বিস্ময়ে বিমূঢ়৷ বিস্ময় নিয়েই জানতে চাইলেন, ‘‘আপনার জমির আল ধরে গন্তব্যে যেতে পারবো না, ফিরেও যেতে পারবো না৷ তাহলে আমি কী করব? '' গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধানো লোকটি তখন আরো জোরে চেঁচিয়ে বলে, ‘‘আমার জমিতে তুমি কী-ও করতে পারবে না৷'’

সম্প্রতি বাংলাদেশে শফিক রেহমানের জামিনে মুক্তির পাশাপাশি আরেকটি ঘটনাও ঘটেছে৷ ঘটনাটির সঙ্গে অবশ্য গ্রেপ্তার-গুমের কোনো সম্পর্ক নেই৷ তারপরও কেন শফিক রেহমানের গল্পটি স্মরণ করছি, তার কারণ একটু পরে বলছি৷ আগে বরং ঘটনাটির কথাই বলি৷

গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় হতদরিদ্রদের মাঝে নির্ধারিত মূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ এই কর্মসূচির আওতায় দেশের সব হতদরিদ্রের মাঝে মাত্র ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ শুরু করেছে সরকার৷

২০০৮ সাল থেকেই ‘১০ টাকার চাল' বাংলাদেশে বেশ বড় ইস্যু৷ সে বছর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতলে ১০ টাকা দরে চাল খাওয়ানোর অঙ্গীকার করেছিলেন, সরকার যেন খুব তাড়াতাড়ি সেই অঙ্গীকার পূরণ করে৷ সরকারসংশ্লিষ্ট সকলেই তখন তেমন কোনো অঙ্গীকারের কথা অস্বীকার করেছেন৷

কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর ১০ টাকা দরে চাল বিতরণ শুরুর পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের সুর পুরোপুরি উল্টো৷ এখন বলা হচ্ছে শেখ হাসিনা তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন৷

অঙ্গীকার করা হয়েছিল কিনা বা করে থাকলেও আট বছর পর সেই অঙ্গীকার রক্ষা করা নিতান্তই রাজনৈতিক কৌশল কিনা, সেই সমালোচনায় আমি যাবো না৷ অমন সমালোচনা আমি করব না, কারণ, করলে শফিক রেহমানের সেই গল্প স্মরণ করে কেউ কেউ আমাকেও স্রেফ ‘সমালোচনাপ্রিয়' ভেবে বসতে পারেন৷

যে দেশে কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপিরা সদম্ভে যুগ যুগ ধরে শাসন-শোষন করে যায়, সে দেশে গরিব মানুষ সরকারি ভরতুকিতে কম পয়সায় তিন বেলা দু'মুঠো অন্ন মুখে তোলার সুযোগ পাবে – এতে তো দোষের কিছু নেই৷ এটা যদি দোষের হয়, আমি তো বলব, আজ আওয়ামী লীগ করছে, আগামীতে বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তারাও গরিবের মুখে এভাবে বারবার হাসি ফোটাক৷ তাদেরও শুধু প্রশংসাই করব আমি৷

তবে ‘১০ টাকার চাল' মোটাদাগে শুভ উদ্যোগ হলেও বিষয়টিকে সমালোচনার ঊর্ধে রাখতে সরকারই কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে৷

দেখা যাচ্ছে, বিতরণ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই দুঃস্থ ব্যক্তিদের ১০ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল দেয়ার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও দেয়া হচ্ছে মাত্র ১৫ কেজি৷

আবার কোথাও কোথাও দরিদ্রের মুখের অন্ন কেড়ে নিচ্ছে দুর্নীতিবাজ এবং বিত্তবানদের ‘সিন্ডিকেট'৷ দুঃস্থদের বঞ্চিত করে বিত্তবানদের একাধিক কার্ড দেওয়ার অভিযোগও ইতিমধ্যে আসতে শুরু করেছে৷

দুর্নীতিপরায়ণ বিতরণকারী এবং লোভী অবস্থাপন্নদের যোগসাজশে দরিদ্ররা যখন নানা জায়গায় বঞ্চিত হচ্ছেন, তখনই খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলছেন, দরিদ্রদের তালিকা তৈরি ও চাল বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো দুর্নীতি ছাড় দেয়া হবে না৷ তাঁর এই মুখের কথার প্রতি অবশ্য একটুও ভরসা রাখতে পারছি না৷

শুনেছি একাত্তরের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এমনই এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ রিলিফের কম্বলও দেদার লোপাট করতে শুরু করেছিল৷ তখন বঙ্গবন্ধু নাকি সখেদে জানতে চেয়েছিলেন, ‘‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের কম্বল এলো, আমার কম্বল গেল কই? '' বঙ্গবন্ধুর কথায় কিন্তু তখন কম্বল চুরি বন্ধ হয়নি৷

দেশের জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি থেকে বাড়তে বাড়তে এখন ১৬ কোটি ছাড়িয়েছে৷ দুর্নীতিপরায়ণের সংখ্যাও সেই হারেই বেড়েছে৷ সুতরাং শুধু জনসভায় হাততালি আর মিডিয়ায় ‘কাভারেজ' পাওয়ার জন্য মুখে ‘কোনো দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেয়া হবে না' বললেই নব্য দুর্নীতিপরায়ণরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না৷

গরিবের হক, ‘বিত্তবান' আর চোরেরা যাতে লুটে না নিতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে সরকারকে এখনই কঠোর হতে হবে৷

বন্ধু, আপনি কি আশীষ চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে একমত? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন