‘ক্ষমতাসীন আর প্রভাবশালী থাকলে সব সহজ হয়ে যায়′ | আলাপ | DW | 28.11.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘ক্ষমতাসীন আর প্রভাবশালী থাকলে সব সহজ হয়ে যায়'

ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফরিদপুরের আসলাম ফকির এখন রাজনীতির মাঠে৷ কীভাবে আসলাম কারাগার থেকে মুক্ত হলেন ও রাজনীতি শুরু করলেন, তা দৈনিক প্রথম আলোতে তুলে ধরেছেন প্রতিবেদক রোজিনা ইসলাম৷ এই আলাপচারিতা তাঁর সঙ্গেই৷

ডয়চে ভেলে: আসলাম ফকিরকে আপনি কী কারণে অনুসরণ করতে উৎসাহিত হয়েছিলেন?

রোজিনা ইসলাম: আসলাম ফকিরের প্রাণভিক্ষার আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছিল৷ যাদের আবেদন সাধারণত এ পর্যন্ত আসে, ধরেই নিতে হয় যে নিশ্চয়ই এর পেছনে ক্ষমতাবান কেউ আছে৷ আর অনেক বড় কোনো অপরাধ করলেই সাধারণত ফাঁসির আদেশ হয়৷ এই আসলাম ফকিরের ঘটনাতে দেখা গেল যে তিনি আরেক জনপ্রিয় ইউপি সদস্যকে খুন করেছিলেন বলে তার ফাঁসির দণ্ড হয়েছিল৷ ২০১৬ সালে একদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে জানতে পারলাম, এক ফাঁসির আসামীর রাতে ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি৷ বরং অসুস্থ বলে সে মুক্তি পেতে যাচ্ছে৷ এরপর থেকে আমি নিয়মিত খোঁজ নিতে থাকলাম৷ কবে মুক্তি পান সে ব্যাপারে৷ এরপর তিনি মুক্তি পেলেন৷ এলাকায় গেলেন৷ আমরা ‘ফলো' করতে থাকলাম৷ দেখলাম, ক'দিনের মাথাতেই তিনি রাজনীতি শুরু করেছেন৷ এখানে বলে রাখা ভালো যে, ২০১৩ সালে প্রথম তিনি প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিলেন৷ কিন্তু তখন তা মওকুফ হয়নি৷ তবে এবার মুক্ত হয়েই তিনি জানান যে, তার অসুস্থতার খবর একেবারেই সত্যি ছিল না৷ তাছাড়া ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সাংসদ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ ও তাঁর স্ত্রী সাংসদ নিলুফার জাফর উল্যাহর সঙ্গে এলাকার নানা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছিল, যাচ্ছে আসলাম ফকিরকে৷ এমনকি প্রকাশ্য মঞ্চেও তাঁরা এ কথা স্বীকার করেছেন৷

অডিও শুনুন 13:31

‘ক্ষমতাসীন আর প্রভাবশালী থাকলে সবকিছু সহজ হয়ে যায়’

এই ধরনের উদাহরণ কি আপনার আরও জানা আছে বলেই আপনি এই ঘটনা পর্যবেক্ষণের উৎসাহ পেয়েছিলন? 

ফাঁসির আসামিদের নিয়ে আমি আরও অনেক কাজ করেছি৷ যেমন লক্ষীপুরের তাহের হত্যার একটা ঘটনা আছে৷ সেটা ফলো করতে গিয়েই মূলত আমি এ ধরনের ঘটনার পেছনে লেগে থাকা শুরু করি৷ যতবারই যত আসামি প্রাণভিক্ষার আবেদন করত, ততবারই আমি লিখতাম৷ বরিশালের আলোচিত চাপা হত্যা, জয়ন্তী রেজা হত্যা – এই ঘটনাগুলের পেছনে অনেক প্রভাবশালী ছিল৷ আমাদের রিপোর্টের কারণে শেষ পর্যন্ত আর প্রাণভিক্ষা পাননি তারা৷ সর্বশেষ উদাহরণ শীর্ষ সন্ত্রাসী যোসেফ৷ তার সাজা মওকুফ করতে অনেক তোড়জোড় হয়েছে৷ তবে আসলাম ফকিরের ঘটনা তো খুবই ‘ইন্টারেস্টিং'৷ কারণ ২০১৩ সালে একবার তার আবেদন নাকচ করা হয়েছিল৷ এরপর আবারও তিনি কীভাবে ছাড়া পেলেন, তাও আবার ফাঁসির আদেশ কার্যকরের দিন? আইনের শাসনে এ রকম ঘটনা আসলে দু'বার ঘটে না৷ এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশে আসলে আইনের ফাঁকফোকরটা কোথায়!

এ ধরনের প্রতিবেদন করতে গিয়ে আপনার কি মনে হয় যে আইনের গলদ নয়, আইন ঠিকই আছে৷ কিন্তু প্রভাবশালীদের কারণে অপরাধীরা ফাঁক গলে বের হয়ে যাচ্ছে?

আইনে তো আসলেই ফাঁসির আসামিরও সাজা মওকুফ করার বিধান আছে৷ রাষ্ট্রপতি তা করতে পারেন৷ যাদের ফাঁসির আদেশ হয়, তারা নিশ্চয় সবাই এই আবেদন করেন৷ কিন্তু সবারটা কি মওকুফ হয়? হয় না৷ পেছনে প্রভাবশালী কেউ না থাকলে সেই আবেদন কি কারা অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়? মন্ত্রণালয় কি সেটা ফাইল করে? আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত লাগে৷ তারপর সেটা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যায়৷ তারও পরে যায় রাষ্ট্রপতির কাছে৷ এটা তো একটা লম্বা প্রক্রিয়া৷ এতকিছু তখনি সম্ভব, যখন পেছনে কোনো ক্ষমতাবান থাকে৷ অন্যথায় নয়৷

অর্থাৎ প্রভাবশালীতের কারণেই আইনের দুর্বলতার সুযোগ নেয়া যাচ্ছে?

হ্যাঁ৷ যদি ক্ষমতাসীন দল পাশে থাকে তাহলে সবকিছু একটু সহজ হয়ে যায়৷ আমি এতদিন ধরে কাজ করতে গিয়ে দেখছি, যে সব আবেদন ফাইল করা হয়, সেগুলোর পেছনে প্রভাবশালী কেউ আছেন৷ এর পেছনে দৌড়াদৌড়ি করছেন৷

কোন প্রক্রিয়ায় গিয়ে খবরগুলো বের করেন?

আমাদের পত্রিকার নির্দেশ আছে, যখন যে বিষয় নিয়ে কাজ করব, তখন সে সংক্রান্ত সব ধরনের তথ্য-প্রমাণসাথে নিয়ে এগোতে হবে৷ সরেজমিন করতে হবে৷ সবগুলো দিক থাকতে হবে৷ প্রতিটি ঘটনার ‘ফলোআপ' করতে চেষ্টা করি৷ ফলোআপ না করলে হয়ত আসলাম ফকিরের এই ঘটনাও আমি পেতাম না৷ কাজেই ফলোআপ করা খুব জরুরি৷

ফলোআপের এ ধরনের আর কোনো অভিজ্ঞতা?

একটা রিপোর্টের কথা মনে করতে পারি....চাকুরির শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেয়ার হিড়িক৷ তখন ছ'জন সচিব মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদ নিয়েছিলেন৷ পরে তাঁদের সনদ বাতিল করা হয়৷ তাঁদেরকে চাকুরি ছাড়তেও বাধ্য করা হয়েছিল৷ সেই ধারাবাহিকতায় আমি ফলোআপ করে গেছি এবং বহু অমুক্তিযোদ্ধাদের সনদ বাতিল করা হয়েছে৷ এরপর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বর্ণের ক্রেস্ট দেয়ার ওপর একটা রিপোর্ট করেছিলাম৷ যে ক্রেস্টে কোনো স্বর্ণই ছিল না৷ আমি এখনও সেই ঘটনা ফলোআপ করি৷ একটা করতে গিয়ে আরেকটার খোঁজ পাই৷ কিছু মানুষ আছেন যাঁরা চান যে এই অপরাধগুলো যেন না হয়, তাঁরাই সাহায্য করে তথ্য দিয়ে৷

এ ধরনের ঘটনা তুলে ধরা গণমাধ্যমের জন্য কতটা জরুরি?

খুবই জরুরি৷ আমার মনে আছে, ২০১৩ সাল বা তার কিছু আগে-পরে নতুন সরকার এসে একটা কমিটি গঠন করে৷ যাতে দেখা যায় যে অসংখ্য মানুষকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে৷ আমি প্রথমদিকে দেখলাম, প্রায় ১ হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যেগুলো আসলে রাজনৈতিক মামলা না৷ খুন, ডাকাতি, শীর্ষ সন্ত্রাসী, ধর্ষণের মামলা, শিশু হত্যা....কী নেই! আমি মনে হয় এ নিয়ে শতাধিক রিপোর্ট করেছি৷ একটা সময় রাজনৈতিক দলের লোকজনই এসে বলেছেন যে, তাঁদের মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে না৷ চোর-ডাকাতদের মামলা টাকা-পয়সার বিনিময়ে তুলে নেয়া হচ্ছে৷ পরে সেই কমিটিই বাতিল করা হয৷ সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখলাম, জেলাখানায় থাকা প্রভাবশালীরা ২০ মাস, ২৫ মাস ধরে হাসপাতালে থাকে৷ হাসপাতালের এসি রুম, ফোনে কথা বলা সবই তারা করছে৷ শীর্ষ সন্ত্রাসী যোসেফ, ইয়াবা ব্যবসায়ী আমিন হুদা – এদের ব্যাপারে আমি রিপোর্ট করি৷ এ সব লেখার পর তিন দিনের মধ্যে সবাইকে আবার কারাগারে নেয়া হয়৷

ঠিক কতগুলো রিপোর্ট আপনি নিজে করেছেন?

আইনের ফাঁকফোকর বলেন আর অনিয়ম বলেন – এ ধরনের রিপোর্ট তো আমি নিজেই শতাধিক করেছি৷ সঠিক সংখ্যা হয়ত বলা সম্ভব হবে না৷ করেছি, করে যাচ্ছি৷ এটাই আমার কাজ৷

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ৷

ডয়চে ভেলেকেও ধন্যবাদ৷

প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের সাক্ষাৎকারটি কেমন লাগলো? জানান আমাদের, লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন