কোয়াড-চীন বিতর্ক: সংকটে বাংলাদেশ, দরকার ভারসাম্য | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 28.05.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

কোয়াড-চীন বিতর্ক: সংকটে বাংলাদেশ, দরকার ভারসাম্য

ঐতিহাসিক সীমান্ত বিরোধ আর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও চীন৷ ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে এ দুই দেশ এখন বিপরীত মেরুতে৷

২০১৪ সালে চীন সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

২০১৪ সালে চীন সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

তারা চায়, দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ গোটা পৃথিবীতে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে৷ সেক্ষেত্রে ভারত পাশে পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে৷

ভারত-চীনের দ্বন্দ্বকে এভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘চীন এবং ভারতের মধ্যে একদিকে সীমানার লড়াই আছে, অন্যদিকে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আছে৷ ভারত চায় এশিয়াসহ পুরো বিশ্বে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে, প্রভাব বৃদ্ধি করতে৷ চীনও সেটা আরও বেশি করে চায়৷ চীন মনে করে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি, তাদের অনেক ইকোনোমিক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে৷ তাদের সামরিক শক্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে৷’’

এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে শুরু হয়েছে টানাটানি৷ পররাষ্ট্র বিশ্লেষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘দুটো দেশই যখন প্রভাব বিস্তার করতে চায়, শুধু বাংলাদেশ কেন তারা পুরো পৃথিবী নিয়ে খেলছে৷ এটা তো শুধু বাংলাদেশের প্রবলেম না, এই সংকটে আছে মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, নেপাল৷ সেই সিচুয়েশনে কোনো কোনো দেশ অনেক বেশি চীনমুখী হয়ে পড়ছে৷ কোন কোন দেশ ভারত বা কোয়াডমুখি হচ্ছে৷’’

বাংলাদেশকে নিয়ে টানা হেঁচড়ার বিষয়টি সম্প্রতি বেশ জোরালো হয়েছে৷ চলছে নানা আলোচনা, বিশ্লেষণ৷

কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ বা কোয়াডে যোগ দিতে বাংলাদেশকে কাছে টানার চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র আর ভারত৷ চলছে নানা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা৷ বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন কোয়াডে যোগ দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতিসহ উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে চীন৷

আর এ পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য ‘ডিলেমা' বা ‘উভয় সংকট’ বলছেন কূটনীতি বিশ্লেষকেরা৷ তাদের দাবি, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নকে গতিশীল রাখা আর রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে চীনের বিকল্প নেই বাংলাদেশের সামনে৷ আর বিশ্ব রাজনীতি, পশ্চিমা বাণিজ্য সবদিক মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও পথ নেই বাংলাদেশের৷

এমন বাস্তবতায় কূটনীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও, তারা বলছেন, ভারসাম্য রক্ষা করাটা হবে সবচেয়ে জরুরি৷ কোনো বলয়ের মধ্যে আটকে না থেকে, ভূরাজনৈতিক অবস্থানের যে কৌশলগত সুবিধা বাংলাদেশের হাতে আছে, সেটাকে করতে হবে পুঁজি, বানাতে হবে ‘বার্গেইনিং টুল৷’

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌ চলাচল ‘অবাধ ও স্বাধীন’ রাখার উপায় খোঁজার যুক্তিতে ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধ্যে ‘কোয়াড' (কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ) সংলাপের সূচনা হয়৷

আর ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড-ওবোর’ বাস্তবায়ন করে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ৭০টি দেশের সঙ্গে সড়ক, নৌ ও রেল সংযোগ করতে চাওয়া চীনের দাবিটা ঠিক উল্টো৷ তারা বলছে, কোয়াড নিজেকে অর্থনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত বলে দাবি করলেও সেটা সত্য নয়৷ কোয়াড একটি সামরিক জোট এবং মূলত এটা করা হয়েছে চীনের বিরোধিতার জন্য৷

চীনের দাবির সঙ্গে একমত হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক তৌহিদ হোসেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘চীন একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছে৷ চীন বলেছে যে অ্যাডভান্সলি এফেকটেড হবে আমাদের বাইলেটারেল রিলেশনশিপ৷ হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ কারণ কোয়াড হচ্ছে একেবারেই চীনকে সামলানোর জন্য একটা সংস্থা৷ যদিও এটি এখনও ফরমাল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়নি৷’’

গত ১০ মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, ‘‘এই চার সদস্যের ক্লাবে যোগ দেয়াটা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে না৷ কারণ এর ফলে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷’’

ওই বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকা৷ তার দুদিন পর অর্থাৎ ১২ মে পিছু হটে চীন৷ হুমকির বিষয়টিকে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার অভাব দাবি করে নিজের সুর পাল্টান রাষ্ট্রদূত লি জিমিং৷ যদিও বেইজিং তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার করেনি৷

ঢাকায় চীনা দূতের হুমকির বিষয়টি নজর এড়ায়নি যুক্তরাষ্ট্রের৷ ১২ মে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন তারা৷

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেন, ‘‘ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে যে মন্তব্য এসেছে সেটি আমরা জেনেছি৷ আমরা বলতে চাই, আমরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাই৷ পররাষ্ট্র নীতি ঠিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অধিকারকেও আমরা সম্মান জানাই৷’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন খান মনে করেন বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনকে এড়িয়ে চলার সাধ্য নেই বাংলাদেশের৷

নিজের অবস্থানের প্রতি যুক্তি তুলে ধরে তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা যদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেখি, বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক থেকে নিশ্চিতভাবে চীন হচ্ছে শক্তিশালী৷ আমাদের যদি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টগুলো দেখি, চীনের অংশীদারত্ব দেখি, আমাদের অর্থনীতিতে তারা খুবই শক্তিশালী৷ এমনকি আমাদের শেয়ার মার্কেটেও৷ ডেভলপমেন্ট প্রজেক্টগুলোর জন্য চীনের ওপর আমাদের এক ধরনের অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেক বেশি৷’’

২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় হওয়া বিভিন্ন চুক্তির মধ্য দিয়ে ওবোরের অন্তর্ভূক্ত হয় বাংলাদেশ৷ ওই সময় বাংলাদেশকে মোট ৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের ঋণ সহায়তায় প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়৷ যার মধ্যে ২৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার বরাদ্দ করা হয় ওবোর সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে৷ এগুলোর মধ্যে অন্যতম, পদ্মা রেলসেতু, বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী পায়রা সমুদ্র বন্দর স্থাপনে৷

তানজীমউদ্দীন খানের দাবি, ‘‘যদি আমরা ভবিষ্যত চিন্তা করি, আগামী ১০ বা ২০ বছর পর যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে অপশন হিসেবে চীনকে ইগনোর করার মতো অবস্থায় আমরা নেই৷’’

অবশ্য মুদ্রার উল্টোপিঠও তুলে ধরলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক তানজীম৷ তিনি বলেন, ‘ঠিক একইভাবে ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র৷ তার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক৷ সবকিছু মিলিয়ে, বিশেষ করে কৌশলগত দিক থেকে এদেরকেও যে আমরা খুব সহজে ইগনোর করতে পারব, চীনের বলয়ে প্রবেশ করতে পারব সেটাও কিন্তু সহজ না৷ যার ফলে এটা একটা ডিলেমা৷’’

বাংলাদেশের করণীয় কী?

এই উভয় সংকট মোকাবিলা করতে হলে কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, জানতে চাওয়া হয় কূটনীতিক তৌহিদ হোসেনের কাছে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি, এই মুহূর্তে কোয়াডে আমাদের যোগ দেয়া উচিত না৷ চাপ যতই থাকুক না কেন৷ তাদের বলতে হবে যে, আমাদের বিকল্প তোমরা দাও, তাহলে আমরা যোগ দিতে পারি৷’’

চীনের বিকল্প কোয়াড নয় দাবি করে এই সাবেক পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘‘আমাদের চীনের কাছে যে প্রয়োজন  সেটা মেটাবে কে? ভারতের কি সাধ্য আছে সেটা মেটানোর? এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও সেটা পারবে না৷ ফলে তাদেরকে বোঝাতে হবে৷ আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিতে হবে৷ আমাদের পক্ষে সেটা সম্ভব হচ্ছে না৷ কারণ আমাদের উন্নয়ন সহযোগিতায় করাপশন থাকুক আর যা-ই থাকুক টাকাতো আলটিমেটলি আসে চীন থেকেই৷’’

দেশের এমন একটা পরিস্থিতির জন্য গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবকে দায়ী করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন খান৷ তার পরামর্শ, ভারসাম্য রক্ষা করাটা এখন জরুরি৷

তার মতে, ‘‘যেকোনো সময়ের চেয়ে আমাদের জন্য এই সংকটটা খুব গভীর৷ এক্ষেত্রে প্রফেশনালিজমকে যদি অনেক গুরুত্ব দিয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে স্বাধীনতা দেয়া হয়, তাহলে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়াটা তাদের জন্য সহজ হবে৷ ফলে রাষ্ট্র কিংবা সরকারের এই পরিস্থিতিটা অনুধাবন করা জরুরি৷’’

সবশেষ সাবেকের খাতায় নাম লেখানো পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকও বলছেন ভারসাম্য বজায় রাখার কথা৷ তিনি বলেন, ‘‘দুই দিকে ম্যানেজ করে চলতে হবে আমাদের৷ একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে থাকতে হবে৷’’

দেশের ইতিহাসের ২৫তম পররাষ্ট্র সচিব বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করছেন ভিন্ন চোখে৷ তার মতে, ‘‘আমাদের নীতি ঠিক আছে, প্রধানমন্ত্রী যে নীতি দিয়েছেন দ্যাটস অল রাইট৷ সেখানে কোনো চেঞ্জ হয়নি৷’’

কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবেন, তখন তাদের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কৌশলী ভূমিকায় থাকতে হবে বলে অভিমত তার৷

শহীদুল হক বলেন, ‘‘খুব সাবধানে যেতে হবে৷ ন্যারেটিভ ঠিক রাখতে হবে৷ পররাষ্ট্রনীতির অনেক কিছুই পাবলিকলি বলা ঠিক না৷ ওই দিকটা খেয়াল রাখতে হবে৷

কোহেরেন্ট পলিসি থাকতে হবে৷ আজকে এক কথা কালকে আরেক কথা যেন আমরা না বলি৷ যখন আমরা একটা কথা বলি, তখন আমাদের খেয়াল রাখতে হবে তার আরেকটা দিক আছে৷ দুদিন পর সেটাও আবার আসবে৷ বায়াসড কোন কথা বলা যাবে না৷ খুব সাবধানে কথা বলতে হবে এ সময়৷ আগেও সাবধানে কথা বলা হয়েছে৷’’

কোয়াডের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার পরিণতি কী?

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-জাপান-অস্ট্রেলিয়ার জোট কোয়াডে যোগ না দেয়াকে তাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া মানতে নারাজ তৌহিদ হোসেন৷

তিনি বলেন, ‘‘আমরা তো তাদের বিপক্ষে যাচ্ছি না৷ ইন্দো প্যাসিফিক যে প্রোগ্রাম ওটাতে তো আমরা যোগ দিয়েছি৷ আমাদের তো কোনো আপত্তি নেই যে তাদের সঙ্গে কো-অপারেট করতে ইন কমিউনিকেশন, ইন ট্রান্সপোর্টেশন, ইন বিজনেস- এক্ষেত্রে তো আমাদের কোনো আপত্তি নেই৷’’

সংকট কোথায় জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘‘সম্ভাব্য মিলিটারি কমপোনেন্ট যেটা, সিকিউরিটি কমপোনেন্ট যেটা, সেটা থেকে আমরা দূরে থাকতে চাই৷ কারণ সরাসরি চীনকে অ্যান্টাগোনাইজ করার মত সামর্থ্য আমাদের নাই৷’’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘‘চীনকে অ্যান্টাগোনাইজ করলে আমাদের যে সমস্যা হবে, সে সমস্যা সমাধানের যোগ্যতাও এই কোয়াডের নাই৷’’

তার যুক্তি, ‘‘আমাদেরকে মাঝেমাঝি পথে যেতে হবে৷ নীতির প্রশ্নে অবিচল থাকতে হবে৷ দ্যাট উইল বি আওয়ার ডিফেন্ড৷ কোন দেশের বিরুদ্ধে কোনো জোটে যোগ দেয়ার আমাদের দরকার নেই৷’’

কোয়াডে যোগ না দিলে, যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্ট হওয়ার আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না তৌহিদ হোসেন৷ তার ধারনা, এই জোটে বাংলাদেশ না গেলে অসন্তোষের মাত্রাটা খুব একটা তীব্র হবে না৷

কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র-চীন) তো সরাসরি কোন যুদ্ধে লিপ্ত নয়৷ যদি এমন হত যে যুদ্ধ লেগে গেছে, তখন ইউ আর আইদার উইথ আস অর ইউ আর অ্যাগেনেস্ট আস৷ আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে যেটা বলেছিল, পাকিস্তানকে৷’’

ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘‘তখন কিন্তু আমরা একটা স্টেজে গিয়ে, যেহেতু ইউএন স্যাঙ্কশন ছিল, কাজেই আমরা কিন্তু ইরাক বিরোধী যে যুদ্ধ সেটাতে সরাসরি না হলেও পেরিফেরাল হলেও ভূমিকা নিয়েছিলাম৷ কারণ ইউএন বলেছিল সেটা করতে হবে, যেহেতু তারা কুয়েত দখল করে নিয়েছে৷ কিন্তু এখানে সেরকম কোন কম্পালশন নেই৷’’

অধ্যাপক তানজীম অবশ্য মনে করেন ভারসাম্যের সঙ্গে কৌশলগত যে সুবিধা আছে, সেটাকে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ৷ করতে পারে দর কষাকষি৷

তিনি বলেন, ‘‘আমরা যদি আমাদের নিজেদের শক্তি বিবেচনা করি, আমাদের কিছু কৌশলগত সুবিধা আছে৷ সেটা ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেরকম অংশীদারত্ব তৈরি করে সেটা চীনের জন্যও৷ এখনই এটাকে বার্গেনিং টুল হিসেবে ব্যবহার করে ভারসাম্য তৈরি করা উচিত আমাদের৷’’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক তানজীমউদ্দীন খানের মতে, ‘‘কোথাও একপক্ষীয় সমর্থন দেয়া কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করার চাইতে বরং একটা মিডল পথ অনুসরণ করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে৷’’

নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘চীনকে ইগনোর করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করা যাবে না৷ এটা একেবারে সুনিশ্চিত৷ কারণ রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে জাতিসংঘের ভূমিকা আমরা দেখছি৷’’

বাংলাদেশের কৌশলগত সুবিধা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এই বিশ্লেষক বলেন, ‘‘কৌশলগত সুবিধাটি হচ্ছে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে৷ ইন্দো-প্যাসিফিক ঘিরে যে প্রতিযোগিতা সেই প্রতিযোগিতায় বঙ্গোপসাগর কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ কোস্টাল এরিয়াতে যে আমাদের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো হচ্ছে, যত না বিদ্যুতের জন্য তার চাইতে কিন্তু কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে এগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে৷’’

উপকূলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কারা তৎপরতা দেখাচ্ছে, সেখান থেকেই চিত্রটা বোঝা বলেও দাবি তার৷ তিনি বলেন, ‘‘এটা খুব স্পষ্ট জাপান মূলত এখানে প্রক্সি হিসেবে আছে, এখানে ইউনাইটেড স্টেটস এর জন্য জাপান মাতারবাড়িতে এ প্রজেক্টে ইনভলবড হয়েছে৷ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হচ্ছে জিওপলিটিকাল আকাঙ্ক্ষা থেকে করা হচ্ছে৷ যেহেতু ইন্দো-প্যাসিফিকে এই দুই জোটের মধ্যে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের৷ বে অফ বেঙ্গল সাউথ এশিয়া থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক এরিয়ার প্রবেশমুখ৷’’

কোয়াড-চীন বিতর্ককে সংকট হিসেবে নয়, বরং সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন৷ তার দাবি, এমন অবস্থা বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়৷

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ কখনো এমন অবস্থায় পড়েনি, বিষয়টি এমন নয়৷ এ ধরনের সিচুয়েশন কোল্ড ওয়ার পিরিয়ডে কিছুটা শুরু থেকে ছিল৷ বাংলাদেশের সামনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল, বাংলাদেশের সামনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল৷ এর চেয়ে বড় বাস্তবতা তো হতেই পারে না৷ তখন থেকে বাংলাদেশে নন অ্যালায়েন্স নীতি নিয়ে, দুই পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিষয় ছিল৷’’

বিশ্বের দুই পরাশক্তি বলয় বাংলাদেশ নিয়ে যে টানাটানি শুরু করেছে সেটাকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন এই বিশ্লেষক৷ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের জিও-পলিটিক্যাল অবস্থানটা আমাদের শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করছে৷ আমাদের বার্গেনিং পাওয়ারকে আরও বাড়াচ্ছে৷ দুটি বড় পরাশক্তি আমাদের পাশে আছে সেটা আমাদের জন্য একটা বিশাল অ্যাডভান্টেজ৷’’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির স্বাধীন সত্ত্বা ও ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘এই অবস্থায় আমি যদি আমার স্বাধীন নীতি মেইনটেইন করি, চীনেরও কিছু বলার নেই, ভারতেরও কিছু বলার নেই৷ বরং তারা এসে চাইবে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে৷ কারণ এখানে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে৷ যদি আজকে চীন আমাদেরকে দূরে ঠেলে দেয় তাহলে বাংলাদেশের সামনে অনেক অপশন আছে৷ একইভাবে ভারত যদি আমাদেরকে দূরে ঠেলে দেয় আমাদেরও অপশন আছে৷ ফলে আমাদের সামনের সম্ভাবনা বেড়েছে সুযোগ বেড়েছে৷’’

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়