কোথায় নেই ঘুস! | আলাপ | DW | 17.01.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

কোথায় নেই ঘুস!

বাংলাদেশে চাকরি বা কোনো কাজের ফাইল বের করে আনতে ঘুস দেয়া হয় বলে অনেকেরই একটা ধারণা আছে৷ কিন্তু এ দেশে এমন কিছু ক্ষেত্রে ঘুস নেয়া হয় বা দাবি করা হয়, যা অকল্পনীয়৷

ঘুস দেয়া এবং নেয়াটা আজকাল খুব সহজ হয়ে গেছে৷ দেশ ছেড়েছি মাত্র ক'বছর৷ কিন্তু তারপরও আত্মীয়দের ধারণা, এরমধ্যেই প্রচুর টাকা-পয়সা উপার্জন করে ফেলেছি৷ তাই প্রায়ই নানারকম ফোন আসে৷ এই যেমন, পল্লী বিদ্যুতে একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে আমার মামাতো বোনের ছেলের৷ পাঁচ লাখ টাকা হলেই চাকরিটা হয়ে যায়, দিতে পারবো কিনা৷ অথবা কোনো পিয়নের চাকরি....বেশি না লাখ তিনেক হলেই হয়ে যাবে৷ এতো গেল অন্যদের কথা৷ নিজের জীবনের দু'টো অভিজ্ঞতার কথা বরং বলি আজ আপনাদের৷

ঘটনা ১

উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি৷ পরিবারে নির্দিষ্ট কোনো আয় নেই৷ মায়ের সেলাই, বাচ্চাদের পড়ানো এবং দিদির টিউশনি – এই করে চলছে সংসার৷ তাই আমার উপরও তখন বেশ চাপ৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পর নিজের খরচ নিজেই চালাতে হবে, পাশাপাশি বাসায় কিছু টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে৷ এর মধ্যে মাধ্যমিকে বৃত্তি পাওয়ার টাকা নিয়ে চলে এসেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ডিপার্টমেন্টের একজন বড় আপু জানালেন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে দরিদ্র-মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রেজিস্ট্রার অফিস বা লাইব্রেরিতে পার্টটাইম চাকরির ব্যবস্থা আছে৷ সেখানকার দায়িত্বে আছেন আমাদের বিভাগের শিক্ষক৷ প্রথমে সাক্ষাৎকার দিতে হবে৷ তারপর পরিবারের উপার্জন দেখে তাঁরা ঠিক করবেন কাকে দেবেন চাকরিটা৷ আমি সাক্ষাৎকার দিলাম এবং চাকরিটা হয়ে গেল৷ প্রতি সপ্তাহে যেতে হবে লাইব্রেরিতে৷ প্রতি মাসে ২০০ (বা ৫০০ টাকা) দেয়া হবে৷ যেখানে সাক্ষাৎকার দিলাম, তার পাশের কক্ষের এক ব্যক্তিকে ডেকে একটা খাতায় আমার নাম, বিভাগের নাম লিখে নেয়া হলো এবং তার সাথে (নামটা মনে নেই, ধরুন আজিজ) শিক্ষিকা আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন৷

ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে লাইব্রেরিতে গিয়ে কাজ করা শুরু করলাম৷ এর মধ্যে দু'টো টিউশনি জুটে গেল৷ নিয়ম ছিল প্রতি মাসে খণ্ডকালীন ঐ চাকরির বেতন তোলা যাবে না৷ তুলতে হবে ছ'মাস পর৷ ছ'মাস পর যখন গেলাম, আজিজ নামের ঐ ব্যক্তি নানা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা শুরু করলেন৷ জানতে চাইলেন আসলেই আমাদের টাকাটার প্রয়োজন আছে কিনা৷ এরপর সই করে যখন টাকা নিতে যাবো বললেন, তাকে তো কিছু মিষ্টি খাওয়ার টাকা দিতে হবে৷ সবাই দেয়৷ আমি অবাক হয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম৷ কিন্তু সেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টি দেখে সে অভ্যস্ত৷ তাই চোখ নামিয়ে দু'শ টাকা রেখে একটা খামে আমার টাকাটা দিয়ে দিলেন৷ হুমকি দিলেন, আমি যদি আমার শিক্ষককে বলি, পরের বছর চাকরিটা যাতে না পাই সে ব্যবস্থা তিনি করবেন৷ আপনারাই বলুন, জীবনে যে মেয়েটি ঘুস দেয়া-নেয়া দূরের কথা এই শব্দটার সাথে যার পরিচয় ঘটেনি, ঢাকা শহরে জীবনে প্রথমবারের মতো এসেছে, তার প্রতিবাদ করার মতো শক্তি কীভাবে হবে?  না, আমার প্রতিবাদ করার শক্তি তখনও হয়নি৷ তবে অন্যরা হয়ত তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিল, যার ফলে পরে তাকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া হয়৷

ঘটনা ২

আমার বাবা তাঁর মৃত্যুর আগে মায়ের নামে একটি সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন, যেটা থেকে মা প্রতি ছ'মাসে টাকা তুলতেন সংসার চালানোর জন্য৷ পোস্ট অফিসে আমাদের একজন পরিচিত মানুষ থাকায় মাকে কখনোই গিয়ে টাকা তোলার জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি৷ এমনকি আমরা সেখানে গেলে ঐ কাকু বা চাচা টাকা তোলার ব্যবস্থা করে দিতেন৷ ২০১৫ সালে আমি জার্মানি থেকে দেশে ফিরে দিনাজপুরে গেছি মায়ের কাছে৷ মা বললেন পোস্ট অফিসে যেতে হবে টাকা তুলতে৷ মা জানালেন পরিচিত ঐ কাকু অবসর নিয়েছেন৷ তাই হয়ত অন্যবারের মতো তাড়াতাড়ি টাকা তোলা যাবে না৷ কারণ এর আগেরবার তাঁকে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে৷ তাই আমিও মায়ের সাথে গেলাম৷

DW Bengali Redaktion (DW/P. Henriksen)

অমৃতা পারভেজ, ডয়চে ভেলে

পোস্ট অফিসে গিয়ে অফিসটায় একটু পরিবর্তন এসেছে৷ প্রচুর মানুষ সেই সকালবেলা অপেক্ষা করে আছে৷ মায়ের বইটা জমা দিলাম৷ আমাদের সামনেই দেখলাম কিছু মানুষ, যাঁরা আমাদের পরে এসেছেন, পোস্ট অফিসের কর্মকর্তাদের হাতে বই দেয়ার সময় টাকা দিলেন এবং আমাদের আগেই টাকা পেয়ে গেলেন৷ মা বললেন আমাদেরও টাকা দেয়া উচিত না হলে কাজ হবে না৷ আমি ঘুস দেয়ার একেবারেই বিরোধী৷ কিছুতেই টাকা দেবো না৷ বললাম কী করবে সারাদিন আটকে রাখবে? মা বললো সেটাও করতে পারে৷ কারণ গতবারও এমনটা হয়েছে৷ আমি বললাম, ওদের বড় অফিসারের সাথে কথা বলবো৷ সিনিয়র অফিসার পিছনেই বসে ছিলেন৷ তাকে গিয়ে বললাম, আপনার চোখের সামনে এমন অন্যায় হচ্ছে আপনি কিছু বলছেন না? তিনি যে ব্যক্তির কাছে আমাদের বই ছিল, তাকে ডেকে বললেন আমাকে যেন বুঝিয়ে দেয়৷ তিনি আমাকে বোঝালেন, তিনশ' টাকা দিতে হবে৷ এর মধ্যে একশ' টাকা ওনার আর দুশ' টাকা বড় বাবুর, অর্থাৎ যাকে আমি একটু আগে অভিযোগ জানিয়ে এসেছি৷ বুঝুন অবস্থা! এত মানুষের কাছ থেকে যদি প্রতিদিন এরা এভাবে টাকা নেয়, তাহলে এদের তো টাকা রাখার জায়গা নেই!

বাইরে এসে যখন অন্যদের বললাম আপনারা কেন এই অন্যায় মেনে নিচ্ছেন প্রতিদিন? সবাই বললো শান্ত হন৷ এদের বিরুদ্ধে গিয়ে কী লাভ! আমাদের প্রত্যেকের কত টাকা এদের কাছে৷ আমরা এদের হাতে জিম্মি৷ সত্যিই জিম্মিই তো৷ আমি আর কী বলবো? সকাল থেকে চার ঘণ্টা একটানা বসে থেকে মায়েরও কষ্ট হচ্ছিল৷ তাই বাধ্য হয়ে ঘুস দিতেই হলো আমাকে৷

কিন্তু কী ভীষণ আত্মগ্লানিতে ভুগেছিলাম আমি৷ দু'বছর পার হলে গেলেও এখনো সেই কষ্টটা যায়নি৷ কিন্তু মায়ের যদি কষ্ট হয়, সেই কথা ভেবে কিছু করার সাহস হয় না৷

সমস্যাটা হতো না, যদি না সবাই আমার মতো করে ভাবত৷ যদি অন্যরাও ঘুস দিতে অস্বীকার করত, আমার সাথে প্রতিবাদ করত, তাহলে হয়ত এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হতো৷ তাই তো এভাবেই চলছে পুরো দেশ৷ নীচ থেকে শুরু করে উপর পর্যন্ত....প্রতিটি স্তর দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে৷ এর প্রতিকার হবে কেবলমাত্র এক হয়ে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে৷

 

বিপরীত কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে কি কারো? লিখুন নিচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন