কেন হত্যা মামলা নয়? | বিশ্ব | DW | 01.09.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

কেন হত্যা মামলা নয়?

সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সহজে হত্যা মামলা করা যাচ্ছে না৷ আইনের দুর্বলতা এবং পুলিশের সঙ্গে ‘অশুভ আঁতাত'-এর কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে৷ নতুন আইনেও পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা দেখেন না অনেকেই৷ 

শিশু আফিফার মৃত্যু আবারো ‘সড়ক দুর্ঘটনা' নিয়ে দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছে৷ গত ২৮ আগস্ট দুপুরে কুষ্টিয়ার চৌড়হাস মোড়ে একটি বাস মা রিনা বেগমকে ধাক্কা দিলে তার কোলে থাকা তার এক বছর বয়সের শিশু সন্তান রাস্তায় ছিটকে পড়ে৷ শিশুটি মাথায় গুরুতর আঘাত পেলে প্রথমে কুষ্টিয়া সদর হাসপতাল এবং পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়৷ ৩০ আগষ্ট ভোরে শিশুটি মারা যায়৷

এরই মধ্যে ওই ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷ আর তাতে স্পষ্ট যে রিনা বেগম যখন রাস্তা পার হচ্ছিলেন তখন রাজশাহী থেকে ফরিদপুরগামী গঞ্জেরাজ পরিবহনের বাসটি বাস কুস্টিয়ার চৌড়হাস মোড়ের কাউন্টারে দাঁড়ানো ছিল৷ আর সেই দাঁড়ানো বাসের সামনে থেকে রাস্তা পার হওয়ার সময়ই বাসটি কোনো হর্ন না দিয়ে চলতে শুরু করে৷ বাস থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল রিনা বেগমকে৷ তারপরও ধীরগতিতে এগিয়ে যাওয়া বাসটি থামেনি৷ বাসের চালক খোকন রিনাকে ধাক্কা দিয়ে বাসসহ দ্রুত চলে যান৷ বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে শিশুটি রাস্তায় ছিটকে পড়ে৷

অডিও শুনুন 01:09

‘এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়নি’

কিন্তু অবাক করার মত ঘটনা হল যে এ ব্যাপারে মামলা হয়েছে দুর্ঘটনার ৩০৪ ধারায়৷ ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা হয়নি৷ কুষ্টিয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন ডয়েচে ভেলের কাছে দাবি করেন, ‘‘এই ঘটনায় হত্যা মামলার কোনো সুযোগ নেই৷ সড়ক দুর্ঘটনার আইনে হত্যা মামলার কোনো বিধান নেই৷'' যে ধারায় মামলা করা হয়েছে তা জামিনযোগ্য এবং সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড৷

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা হলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা হয়৷ এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়নি৷''

একটি দাঁড়িয়ে থাকা বাসের সামনে দিয়ে কেউ যাওয়ার সময় চালক যদি দেখেও তাকে ধাক্কা দেয় বা চাপা দেয় তাহলে সেটা অনিচ্ছাকৃত হয় কীভাবে? এমন প্রশ্ন করলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো জবাব দেননি৷ এরপর তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, একটি বাসের যদি ফিটনেস না থাকে, ড্রাইভারের যদি লাইসেন্সই না থাকে তাহলে কি সেটা হত্যাকান্ড হবে না? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি তার অফিসে গিয়ে আইন নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে ফোনের লাইন কেটে দেন৷

পুলিশ গঞ্জেরাজ পরিবহণের ওই বাসটি শনিবার আটক করলেও ওই বাসের চালক বা কোনো স্টাফকে এখনো আটক করেনি৷

এদিকে নিহত আফিফার বাবা হারুন অর রশীদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা করতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু ওসি সাহেব হত্যা মামলা নেননি৷ তিনি আমাকে বলেছেন হত্যা মামলা নেয়ার মত আইনগত বাস্তবতা নেই৷ নতুন আইন পাশ হলে যদি তদন্তে দেখা যায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তখন দেখা যাবে৷'' তিনি বলেন, ‘‘আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে৷ তারপরও হত্যা মামলা হবে না৷ এ কেমন আইন?''

অডিও শুনুন 01:33

‘এ কেমন আইন?’

আরো একটি অবাক করা তথ্য হলো, গত ২৯ জুলাই ঢাকায় বেপরোয়া বাসের চাপায় যে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণে ঢাকাসহ সারাদেশ নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল তাদের মৃত্যুর ব্যাপারেও হত্যা মামলা হয়নি৷ হয়েছে ৩০৪ ধারায় দুর্ঘটনার মামলা৷

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, এত আন্দোলন ও সরকারের প্রতিশ্রুতির পর নিরাপদ সড়কের ব্যাপারে কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না৷ তারা ঈদের সময়ে ১৬ অগাস্ট থেকে ২৮ অগস্ট পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার একটি হিসেব দিয়েছে৷ এই সময়ে ঢাকাসহ সারাদেশে মোট ২৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ তাতে নিহত হয়েছেন ২৫৯ জন৷ আর আহত হয়েছেন ৯৬০ জন৷ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর কোনো আইন নেই৷ আর যা আছে তার কোনো প্রয়োগ নেই৷ সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে কোনো শাস্তি হয় না৷ ফলে চালক মালিকরা এটাকে কেয়ার করে না৷''

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে সাত লাখ ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করে৷ আর ১০ লাখ অবৈধ নসিমন, করিমন বা ভটভটি চলাচল করে৷ এটি সম্ভব হয় পরিবহণ মালিক শ্রমিকদের সঙ্গে অশুভ আঁতাতের কারণে৷ মালিক শ্রমিকরা এতই শক্তিশালী যে তারা সরকারকেও কেয়ার করে না৷ পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে অর্থের বিনিময় সম্পর্ক রেখে যদি যানবাহন চলে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেয়া যাবে? তাই কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পুলিশের প্রথম কাজ হয় বাস চালক ও শ্রমিকেদের রক্ষা করা৷ তারা এমন ধারায় মামলা নেয় যাতে চালক হেলপাররা বেঁচে যায়৷ হত্যাকাণ্ড হলেও তারা দুর্ঘটনা বলে মামলা নেয়৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘কুষ্টিয়ায় শিশু আফিফা, চট্টগ্রামে রেজাউল করিম রনির মৃত্যুর ঘটনা সরাসরি হত্যাকাণ্ড৷ কিন্তু পুলিশ চালক হেলপারদেরর রক্ষায় গোড়া থেকেই কাজ করেছে৷''

অডিও শুনুন 04:40

‘মালিক শ্রমিকরা এতই শক্তিশালী যে তারা সরকারকেও কেয়ার করে না’

চট্টগ্রামে রেজাউল করিম রনির মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ শেষ পর্যন্ত হত্যা মামলা নিয়েছে৷ তবে সেখানেও পুলিশের তৎপরতা ছিল বাস চালক ও হেলপারকে রক্ষায়৷ ২৭ আগষ্ট বিকেলে লুসাই পরিবহণের একটি বাসের মধ্যেই রনিকে মধ্যেই মারধোর করে হত্যা করা হয়৷ এরপর বাস থেকে ফেলে দিয়ে চাপা দেয়া হয়৷ পুলিশ এটাকে দুর্ঘটনার মামলা হিসেবে নিতে চাইলেও রনির পরিবারের সদস্যদের দাবির মুখে তা পারেনি৷ মামলার বাদী রনির ভাগ্নে ইয়াসিন আহমেদ অভিযোগ করেন, ‘‘তারপরও পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপর ছিল না৷ আমরা মানব বন্ধন করার পর আজ (শনিবার) একজন হেলপারকে আটক করেছে৷ কিন্তু চালককে এখনো আটক করেনি৷''

মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া সড়ক পরিবহন আইনে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে৷ বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণে কেউ আহত হলে বা প্রাণহানি ঘটলে এই আইনে মামলা হবে৷ তদন্ত করে এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে নির্ধারণ করা হবে দুর্ঘটনার প্রকৃতি কী ছিল৷ যদি তদন্তে মনে হয়, হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, বেপরোয়া চালানোর কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাহলে সড়ক পরিবহন আইনের ১০৩ ধারায় মামলা হবে (দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা আছে বর্তমানে)৷ এই ধারায় সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল, অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে৷ তবে তবে হত্যার উদ্দেশ্যে গাড়ি চালানো হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণ হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ৩০২ ধারায় মামলা হবে৷

অডিও শুনুন 01:05

‘আমরা একে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু বলি কিভাবে?’

কিন্তু ৩০২ ধারায় হত্যা মামলার বিধানটি সড়ক পরিবহণ আইনে নেই৷ আর দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড৷ কিন্তু এই ৩০২ ধারা নতুন কোনো ধারা নয়৷ এটা বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে আগে থেকেই আছে৷ এখন প্রশ্ন হল মামলাটি শুরুতে কোন আইনে হবে৷ কারণ ৩০২ ধারা সড়ক পরিবহণ আইনের কোনো ধারা নয়৷ এটা দন্ডবিধির৷

এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘৩০৪ ধারা হল অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর জন্য৷ আর ৩০২ ধরা হল ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের জন্য৷ বাংলাদেশে প্রতিবছর ১০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়৷ যেখানে গাড়ির কাগজপত্র নেই, ফিটনেস নেই, চালকের লাইসেন্স নেই, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, গতিসীমা না মেনে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো হয় সেখানে আমরা একে অনিচ্ছাকৃত মৃত্যু বলি কিভাবে? এগুলো হত্যাকাণ্ড৷ তাই হত্যা মামলাই হওয়া উচিত৷''তিনি আরো বলেন, ‘‘নতুন আইন যেটা মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে সেটা সংসদে পাশ হওয়ার আগেই ঠিক করা দরকার৷ কারণ প্রথমে দুর্ঘটনার মামলা করে পরে তদন্ত করে ধারা পরিবর্তন করে হত্যা মামলায় রূপান্তর বাস্তবে খুব কঠিন হবে৷ আসলে এটা সম্ভব হবেনা৷ কারণ নতুন আইনে হত্যার (৩০২) ধারাটিই রাখা হয়নি৷ নতুন আইনে হত্যাকাণ্ডের ধারা রাখা না হলে আসলে এই ধরনের মৃত্যুকে সব দুর্ঘটনার আওতায় ফেলা হবে৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন